ভুতেরাও ভদ্র হয়
দীপক পাল
কোন এক রহস্য পত্রিকার জন্য একটা ভুতের গল্প লেখার তাগিদে রাত
এগারোটা বাজার পরে শোওয়ার ঘরের লাইট নিভিয়ে আমার লেখার ঘরে ঢুকে
জানালার সামনের টেবিলে গিয়ে চেয়ারটা টেনে বসলাম। ঘরে লাইট জ্বললে
আমার স্ত্রীর চোখে ঘুম আসে না। অন্য দিকে ভাবলে ভুতের গল্প লিখতে গেলে
একটু বেশী রাত ও একদম নির্জন পরিবেশ দরকার। হাতে কাগজ কলম নিয়ে
জানালার বাইরের আলো আঁধারিতে চোখ মেলে তাকালাম। পথের আলোর
জন্য এই আলো আঁধারির সৃষ্টি যদিও এই অমাবস্যার রাতে সেই আলো বড়ো
অপর্যাপ্ত। একটু ভেবে আমার গল্প লেখা শুরু হলো। সারাদিন কাজের ফাঁকে
মনে মনে গল্পটা মোটামুটি ফেঁদে রেখেছিলাম। এখন সেটাই গুছিয়ে লেখার
পালা। সেটাই করে চলেছি একটানা। হঠাৎ একটা গলাখাঁকারির আওয়াজ
এলো কানে। ভাবলাম পাশের বাড়ী থেকে বুঝি আসছে। তাই পাত্তা না দিয়ে
লিখে যাচ্ছি। কিন্তু দ্বিতীয় বার গলা খাঁকারির আওয়াজ শুনে জানালার
বাইরে তাকালাম। দেখি জানালার ওপাশে একটা আবছা ছায়ামূর্তি যার
চোখজোড়া অল্প অল্প জ্বলছে। কিন্তু মুখে অল্প হাসি হাসি ভাব। এক মনে
ভুতের গল্প লেখি যাওয়ার ফলে আমি যেন ভুতের রাজ্যে বিচরণ করছিলাম
তাই স্বচক্ষে সত্যিকারের ছায়ামূর্তিটা দেখে বেশ ভয় পেয়ে গিয়ে জানালাটা
তাড়াতাড়ি বন্ধ করতে যাচ্ছি ছায়ামূর্তিটা হঠাৎ দুহাত জোর করে বলে ওঠে,
-' স্যার স্যার দয়া করে জানালাটা বন্ধ করবেন না স্যার। আমাকে দেখে
ভয় পাওয়ার জন্য আমি খুব দুঃখিত স্যার। মনে কিছু করবেন না। আমি
কিন্তু আপনাকে ভয় দেখাতে আসিনি। আর শুধু শুধু আমি কখনো কাউকে
ভয় দেখানোটা পছন্দ করি না। আমিতো আপনাদের বাড়ীর ওপরে থাকি।
সেই অর্থে আমি আপনার অতি কাছের লোক বলতে পারেন স্যার।'
-' আমাদের ওপর তলায় থাক মানে কি, সেটা কবে থেকে, কিন্তু কেন?'
-' এইতো স্যার আপনি আমার ওপর খুব রেগে গেলেন। আচ্ছা আপনি বা
আপনার ইসতিরি কি কোন দিন আমায় দেখতে পেয়েছে বলুন?'
- ' না কিন্তু আমরা মাঝরাতে ছাদে কখনো সখনো একটুআধটু আওয়াজ
শুনে আমার স্ত্রী ভয় পেতো। আমি ভাবতাম এখানকার ধেরে ইঁদুরটা যে
বেড়ালের থেকেও বড়। সেই বোধহয় পাইপ বেয়ে ওপরে উঠে উৎপাত করে।
তবেকি তুমিই কি আমাদের ওপরে রাত বিরেতে পায়চারী কর রোজ?'
- ' কি করবো স্যার, আজকাল কলকাতায় থাকার মতো আশ্রয় কোথায়
ভূতেদের। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ এই বাড়ীটা দেখে মনে হলো এটা থাকার মত
একটা জায়গা হতে পারে। ওপরে ছাদ আছে কিন্তু দেয়ালে বা ওপরে কোন
প্লাস্টারের চিন্হ নেই একেবারে ইঁট বার করা। তার ওপর দরজা জানালায়
ফ্রেম পর্যন্ত নেই। বারান্দা আছে দুটো ইঁট বার করা। আমার থাকার পক্ষে
একেবারে উপযুক্ত জায়গা। বারান্দার রেলিংয়ে অথবা জানালার খোপে
পা ঝুলিয়ে বসতে খুব আরাম লাগে স্যার।'
-' তবে ওপরে যখনই উঠি তোমাকে তো দেখতে পাইনি কোনদিন। আমার
স্ত্রীও কোনদিন তোমাকে দেখেনি। তবে তুমি যে বলছো তুমি ওপরে থাক।'
- ' থাকিই তো স্যার ঐ পেছনের গোডাউনের ভিতরে। তবে কিনা স্যার
আপনারা দুজনেই বেশ আছেন। আপনারা যেমন ভদ্র ও শান্ত তেমনিই
খুব বিনয়ী। আমাকে দেখে যদি ভয় পান সেজন্য আমি একেবারে সকাল
থেকে যতক্ষণ না আপনারা ছাদের দরজায় তালা দেন ততক্ষণ আমি ঐ
গোডাউনের আবর্জনার মধ্যে থাকি। আসলে আমি খুব অল্প জায়গার
মধ্যে ঠিক ধরে যাই স্যার। এটা আমার গুণ বলতে পারেন স্যার।'
- ' ঠিক আছে ঠিক আছে এখন তুমি যাও।'
-' হ্যাঁ স্যার যাব কিন্তু তার আগে আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই।
আপনাকে তো মনে হয় আগেই বলেছি আমি মানুষদের ভীষণ ভাবে
এরিয়ে চলি। আজকে কিহলো গোডাউনের ভেতর থেকে বেরিয়ে একটু
বসেছিলাম। তারপর ছাদের রেলিংয়ে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখি নিচের ঘরে
আলো জ্বলছে। এমনিতে প্রায়ই আলো জ্বলে। আপনি একজন লেখক।
খাতা কলম নিয়ে কিসব হাবিজাবি লেখেন। আজকে রেলিংয়ে ঝুঁকে
নিচে তাকাতেই কেমন যেন অনুকূল একটা গন্ধ পেলাম। অনেক রাত
হয়েছে বুঝে দুম করে নিচে নেমে চোখ জ্বালিয়ে দেখলাম যা ভেবেছি
ঠিক তাই। আপনি স্যার আমাদের নিয়ে গল্প লিখছেন। খুব খুশি হয়ে
আপনার সাথে আলাপ করতে ইচ্ছে করলো। আপনাদের বাড়ী ছেড়ে
চলে যাবার আগে আমাদের নিয়ে লেখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ
দিয়ে খুশী মনে যাচ্ছি স্যার।' আমি অবাক হয়ে জিগ্গেস করলাম,
- ' তা কোথায় যাওয়া হবে?' কেউ কি আছে দেখা করার?'
-' শুনবেন স্যার, তবে শুনুন। আমি মাঝরাতে রাস্তায় মাঠে-ঘাটে ঘুরে
বেরাই। গত পরশু হঠাৎ এক শাকচুন্নির সাথে দেখা। দুজন দুজনকে
দেখে আমাদের বেশ আনন্দ হলো। রাস্তার কালভার্টে বসে দুজনে খুব
গল্প করলাম। তারপর দুজনে পালিয়ে কোন অজ পাড়াগাঁয়ে বাসা
বাঁধবো। ওর সোয়ামি ওকে ছেড়ে আর একজন মেয়ে ভুতকে নিয়ে
পালিয়ে গেছে। কাল রাতে আমরা দুজনে কোন দিক দিয়ে পালানো
যায় সেটা ঠিক করে এসেছি। ও আমার সাথে কাল রাতে থাকতে
চেয়েছিল আমি রাজী হইনি। মেয়েলোক বলে কথা, কখন জোরে
হেসে উঠবে বা নাচানাচি করবে না কি করবে কে জানে। আপনারা
হঠাৎ ভয় পেয়ে যেতে পারেন তাই আমি রাজী হইনি। সেই কালভার্টে
আমাদের দেখা হওয়ার কথা। ঐ দেখুন ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বেজে
গেছে কথায় কথায় আপনার মতো মহান লেখকের সাথে।'
-' না না আমি মহান টহান কিছুনা, নেহাতই এক অতি নগন্য লেখক।'
-' ওটাই তো আপনার মহত্ব স্যার। আপনারা ভালো থাকবেন স্যার,
শুভরাত্রি, চললাম। আর কোনদিন দেখা হবে না।'
কিছু বলার আগেই সে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। জানালা
বন্ধ করে লাইট নিভিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে স্ত্রীর
পাশে গিয়ে শুয়ে পরলাম। কিন্তু মনে আমার আনন্দ হলো কিনা
সেটা ঠিক বুঝলাম না।
________________________
Dipak Kumar Paul (9007139853),
DTC SH, Block-8, Flat-1B,
D, H. Road, Kol-700

Comments
Post a Comment