জীবনানন্দ দাশ: বাংলার নিসর্গে যে কবি রেখে গেছেন বিষণ্ন আলোর দাগ
শিকদার বাসির
বাংলা কবিতার আকাশে কিছু নক্ষত্র আছে, যারা আলো ছড়ায় না—আলো হয়ে থাকে। তাদের দীপ্তি চোখ ধাঁধায় না; বরং ধীরে ধীরে এসে বসে মনের গভীরে। জীবনানন্দ দাশ তেমনই এক কবি। তিনি উচ্চকণ্ঠে বাংলা কবিতার দরজায় কড়া নাড়েননি; নিভৃত অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে কবিতাকে দিয়েছেন এক নতুন চোখ, এক নতুন শ্রুতি, এক নতুন বিষণ্ন সৌন্দর্য।
তাঁকে পড়লে মনে হয়, আমরা যেন কোনো অচেনা অথচ বহুদিনের পরিচিত বাংলার ভেতর প্রবেশ করেছি—যেখানে কুয়াশায় ভেজা ধানক্ষেত, শালিকের ডানা, শিশিরে নুয়ে পড়া ঘাস, নদীর ধূসর জল, সন্ধ্যার পাখি আর দূর কোনো গ্রাম থেকে ভেসে আসা নিঃসঙ্গতার সুর একাকার হয়ে আছে। সেই বাংলার নাম জীবনানন্দের কবিতায় কখনো বনলতা সেন, কখনো ধানসিঁড়ি, কখনো রূপসী বাংলা।
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক ও ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত; মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি। মায়ের কাছ থেকেই যেন কবিতার প্রথম আলো তাঁর জীবনে প্রবেশ করেছিল। বরিশালের প্রকৃতি, নদী, পাখি, গাছপালা এবং নিসর্গের সঙ্গে তাঁর যে গভীর আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল, পরবর্তী সময়ে তা-ই তাঁর কবিতার এক অনন্য ভূগোল হয়ে উঠেছে।
বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন এবং পরে শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত হন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় কোনো প্রতিষ্ঠানের পদবি দিয়ে নির্ধারিত হওয়ার নয়। তিনি ছিলেন নিজের সময়ের ভিড় থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বতন্ত্র কবি—যিনি প্রচলিত কাব্যভাষার নিরাপদ পথ ছেড়ে নিজের জন্য নির্মাণ করেছিলেন এক আশ্চর্য, ধূসর অথচ দীপ্ত পথ।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। এরপর ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’—একটির পর একটি কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতার ভুবনকে বদলে দিতে থাকে। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি নিছক সৌন্দর্যের উপকরণ নয়; প্রকৃতি সেখানে মানুষের অস্তিত্ব, স্মৃতি, মৃত্যু, প্রেম ও নিঃসঙ্গতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত সত্তা।
‘বনলতা সেন’-এর দিকে তাকালেই আমরা সেই জাদুর স্পর্শ বুঝতে পারি। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ক্লান্ত এক মানুষের কাছে নাটোরের বনলতা সেন যেন কেবল একজন নারী নন—তিনি হয়ে ওঠেন আশ্রয়ের প্রতীক, ক্লান্ত পৃথিবীর মধ্যে এক মুহূর্তের শান্তি। জীবনানন্দের কবিতায় নারী কখনো মুখ, কখনো স্মৃতি, কখনো সৌন্দর্য, আবার কখনো হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
আর ‘রূপসী বাংলা’ যেন তাঁর কবিমানসের অন্তর্গত এক স্বপ্নভূমি। বাংলার মাঠ, নদী, পাখি, কুয়াশা, অন্ধকার ও আলো সেখানে এমনভাবে মিশে গেছে যে কবিতার পৃষ্ঠা আর শুধু পৃষ্ঠা থাকে না—তা হয়ে ওঠে এক বিস্মৃত বাংলার মানচিত্র। মনে হয়, কবি আমাদের চোখের সামনে এমন এক দেশ খুলে দিচ্ছেন, যে দেশ আমরা প্রতিদিন দেখি অথচ তার গভীর সৌন্দর্য কখনো সত্যিই দেখি না।
এই কারণেই জীবনানন্দ শুধু প্রকৃতির কবি নন; তিনি অস্তিত্বের কবি। তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে মৃত্যু, সময়, ক্ষয়, একাকিত্ব ও ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা। আধুনিক মানুষের ভেতরের যে অস্থিরতা, বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতা—জীবনানন্দ তাকে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেননি; বরং সন্ধ্যার পাখির মতো নিঃশব্দে কবিতার শরীরে বসিয়ে দিয়েছেন।
তাঁর কবিতার ভাষা প্রথমদিকে অনেকের কাছেই দুর্বোধ্য, অচেনা কিংবা বিচিত্র মনে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের দীপ্তি ও নজরুলের বিদ্রোহের পাশাপাশি জীবনানন্দ নিয়ে এলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক স্বর—ধীর, অন্তর্মুখী, স্বপ্নময় এবং কখনো কখনো অন্ধকারে ডুবে থাকা। তিনি যেন কবিতাকে বললেন, মানুষের হৃদয়ের সব কথা উচ্চারণ করতে হয় না; কিছু কথা কুয়াশার মতো থেকেও গভীরতর সত্য হয়ে ওঠে।
জীবনানন্দের জীবনও ছিল অনেকটা তাঁর কবিতার মতোই নিঃসঙ্গ। শিক্ষকতা করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, সম্পাদনার কাজ করেছেন, সাহিত্যচর্চা করেছেন; কিন্তু জীবনের বড় অংশ কেটেছে অনিশ্চয়তা, আর্থিক টানাপোড়েন ও একাকিত্বের মধ্যে। জীবদ্দশায় যে স্বীকৃতি তাঁর প্রাপ্য ছিল, তার সবটুকু তিনি পাননি। অথচ মৃত্যুর পর তাঁর কবিতাই ক্রমশ হয়ে উঠেছে বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় এক ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২২ অক্টোবরই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। একটি ট্রামের ধাক্কা যেন থামিয়ে দিয়েছিল একটি মানুষের জীবন; কিন্তু থামাতে পারেনি তাঁর কবিতার যাত্রা। বরং মৃত্যুর পরই তাঁর কবিতা আরও দূরে, আরও গভীরে, আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে যেতে থাকে।
জীবনানন্দ শুধু কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিকও। **‘মাল্যবান’, ‘সুতীর্থ’, ‘কারুবাসনা’**সহ তাঁর উপন্যাসগুলো তাঁর সৃজনশীলতার আরেকটি জটিল ও গভীর দিক উন্মোচন করে। তাঁর গদ্যেও আমরা দেখতে পাই সেই অন্তর্মুখী মানুষটিকে, যিনি বাইরের পৃথিবীর চেয়ে মানুষের মনের অন্ধকার অলিগলিতে বেশি আলো ফেলতে চেয়েছেন।
আজ জীবনানন্দ দাশ নেই। নেই তাঁর নীরব পদচারণা, নেই তাঁর ধূসর বিকেল, নেই কোনো টেবিলে ঝুঁকে কবিতা লেখার সেই মানুষটি। কিন্তু তিনি আছেন—বাংলার কুয়াশায়, শরতের নরম আলোয়, শীতের সকালে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে, দূর নদীর জলে, সন্ধ্যার পাখির ডানায়। সবচেয়ে বেশি আছেন সেই পাঠকের হৃদয়ে, যে একবার তাঁর কবিতার ভেতর প্রবেশ করে আর আগের পৃথিবীতে পুরোপুরি ফিরে যেতে পারে না।
জীবনানন্দ আমাদের শিখিয়েছেন—বাংলাকে ভালোবাসতে হলে শুধু তার সৌন্দর্য দেখতে হয় না; তার বিষণ্নতাকেও অনুভব করতে হয়। নদীর জলের মতো তার আনন্দ যেমন সত্য, তেমনি কুয়াশার মতো তার বিষাদও সত্য। জীবনের ক্ষয়, মৃত্যুর অনিবার্যতা, মানুষের একাকিত্ব—এসবের মধ্যেও যে সৌন্দর্য জন্ম নিতে পারে, জীবনানন্দ সেই সৌন্দর্যেরই কবি।
তাই বাংলা কবিতার ইতিহাসে তাঁর স্থান কোনো একক ঋতুর মতো নয়; তিনি যেন বাংলার দীর্ঘ ঋতুচক্রের এক অনিবার্য সুর। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয়—আমরা হয়তো কোথাও যাচ্ছি না, অথচ বহু দূর থেকে ফিরে আসছি। কোনো অচেনা পথের শেষে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হচ্ছে, এই পথ, এই নদী, এই ধানক্ষেত, এই পাখি—সবই তো একদিন দেখেছি।
সেই চেনা অথচ বিস্মৃত বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ।
তিনি চলে গেছেন—কিন্তু তাঁর কবিতার ভেতর বাংলা এখনো নিঃশব্দে হেঁটে যায়। কুয়াশার ভেতর দিয়ে, সন্ধ্যার পাখির ডানায়, ধানসিঁড়ির জলে—এক বিষণ্ন অথচ অনন্ত আলো হয়ে।
.......................................

শিকদার বাসির
শিকদার বাসির
ছড়াকার, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও গীতিকবি
বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বাংলাদেশ
ই-মেইল: shikderb95@gmail.com
Comments
Post a Comment