গল্প
জলমাতালের ঘর
মামুন সরকার
চেহারা সুরত রাজপুত্রের মত না কিন্তু নাম তার রাজা মিয়া। পোষাক পরিধানে সাহেব বাবু। চালচলন আর দশটা মানুষ থেকে আলাদা।
চার বার মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে টেনেটুনে পাশ করলেও আড্ডাতে বাকপটু। মগজ ভর্তি কথার পাহাড়। একবার কথা শুরু করলে আর থামে না। হাসি ঠাট্টায় মজমা মাতিয়ে রাখে। একসপ্তাহ হয় নতুন বিয়ে করেছে। বউ শিক্ষিত এবং সুন্দরী।
গায়ের রং দুধসাদা না হলেও নজর কাড়ার মত আর্কষণী মুখমণ্ডল। বন্ধুদের একজন বলে, দোস্ত একটা কতা কই রাগ করিছ না। সত্যিই তর রাজ কপাল। খুব সুন্দর একটা বৌ পাইছস। ভাবী সাহেবার আঁচল ছাড়িস না। চোখে চোখে রাখিস। তর দুর্বলতার সুযোগ নিয়া কেউ যেনো ভাবী সাহেবার সাথে ফুসুরফাসুর না করতে পারে। তর যা স্বভাব। জানি না ভবিষ্যতে তর কপালে কি আছে।
রাজা মিয়া বলে, বৌ আমার। মাইনষে ফুসুরফাসুর করব মানে? কি বুঝাইতে চাইলি বুঝলাম না দোস্ত।
আছমানে চান উঠলে সবাই সবাই গায়ে জোছনা মাখতে চায়। আমার ভাবী সাহেবা হইল আকাশে চান।
রাজা মিয়া কথা বাড়ায় না। বুঝতে পারে তার দোস্ত কি বুঝাতে চেয়েছে। সুন্দরের প্রতি সবাই দুর্বল।
রাজা মিয়ার বাবা একজন চেয়ারম্যান। অঢেল ধন-সম্পদের মালিক তিনি। জলপাত্রের মত রঙ বদলের জীবন। যখন যে ক্ষমতায় আসে তিনি তাদের পদধূলি কিনে নেন। বলা যায় রদবদলের খেলায় তিনি পাকা খেলোয়াড়। সময়ের সাথে তালমিলিয়ে চলতে টাকার বস্তা ঢালেন। তিন তিনটি বিয়ে করেছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীর কোলে কোন সন্তান নেই। তৃতীয় স্ত্রীর কোল জুড়ে রাজা মিয়ার জন্ম। রাজা মিয়া বড় হয়েছে তিন মা আর দাদীর আদরযত্নে। জমিজিরাতের অভাব নেই বলে রাজা মিয়ার লেখাপড়া নিয়ে কখনো কঠোর হননি বাবা মোতালেব চেয়ারম্যান। কারণ বেশি লেখাপড়া শিখে কি হবে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পদ আর নিজের গড়া যা সম্পদ আছে তা সাতপুরুষ বসে খেলেও ফুরাবে না। রাজা মিয়া হলো চেয়ারম্যান সাহেবের আঁধার ঘরে চাঁদের আলো। বংশের বাতি।
খুব ধুমধাম করে রাজা মিয়াকে বিয়া করালেন। পাঁচ গ্রাম যাচাই-বাছাই করে সেরা সুন্দরী মেয়েকে তিনি পুত্রবধু করে এনেছেন। বিয়ের দেনমহর হিসাবে মেয়ের নামে দুই বিঘা জমি লিখে দিয়েছেন। সোনার গহনা সবার নজরে পড়ার মত। গ্রামের গণ্যমান্য ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ একহাজার মেহমান এই বিয়েতে দাওয়াতি ছিল। সবাই পুত্রবধুর রূপের প্রশংসা করেছে। বৌভাতের দিন একবন্ধু বলেছে, চেয়ারম্যান তোমার পছন্দের তুলনা হয় না। মেয়ে তো না যেনো ফুলপরি।
আরেক বন্ধু জানতে চেয়েছে, চেয়ারম্যান সত্যি কইরা কও। এমন চান্দের মত মাইয়া তোমার কালা পোলারে বিয়া করতে কেমনে রাজি হইল।
ছেলেকে কালো বলাতে চেয়ারম্যান সাহেবের হাসিমাখা মুখটা নিমিষে ফেকাসে হয়ে যায়। ছেলে রাজা মিয়া না কালো না শ্যামলা। শ্যাম কালোর অনেক কষ্টে বন্ধুর খোঁচা হজম করে ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটিয়ে জবাব দেন, পুরুষ মানুষ আবার কালা ধলা আছেনি। আজকালকার সব মাইয়া মানুষ চায় শক্ত-সামর্থ্য বিত্তবান পুরুষ। সেই দিক বিচার করলে আমার পোলা হাজারে একটা। কি নাই আমার। বৌমার সাথে তুলনা করলে আমার পোলা গায়ের রঙ একটু কালা। কিন্তু অর্থ-সম্পদ থাকলে কালা ধলা কোনো বিষয় না।
কতা মন্দ কও নাই। আবার সবকিছুর বিচার অর্থ-সম্পদ দিয়া হয় না। যাই হোক তুমি একটা সুন্দর বৌমা পাইছ।
বৌমা জান্নাতুন নেছার বাবার নাম সাইদ মাহমুদ। চেয়ারম্যান সাহেবের মত তেমন ধনসম্পদ নাই কিন্তু মেধাবী ছাত্র গড়ার শিক্ষক হিসাবে তাকে সাত গাঁয়ের মানুষ চিনে। শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতি হিসাবে তিনি দুবার স্বর্ণপদক পেয়েছেন। মেয়ে জান্নাতুন নেছা স্থানীয় সরকারি কলেজ থেকে অর্নাস কমপ্লিট করেছে। ইচ্ছে ছিল মেয়েও তাঁর মত শিক্ষক হবে। কিন্তু গ্রামের মাতব্বরদের চাপাচাপিতে শিক্ষক বানানোর স্বপ্নকে মাটি চাপা দিতে হলো। ছেলে একটু কম শিক্ষত হলেও মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সুখের কথা চিন্তা করে চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হলেন। গ্রামের কিছু বদলোক কানাঘুষা করে বলেছে, মাষ্টার সাহেব টাকার লোভে ফুলের মত মাইয়াডা একটা অশিক্ষিত পোলার হাতে তুইলা দিছে।
ফুলশয্যা রাতের ঘটনা। জান্নাতুন নেছা বৌ সেজে বসে আছে। রাজা মিয়া ঘরে ঢুকবে বলে চারপাশের সব মানুষ চলে যায়। শুধু দুই কিশোর কিশোরী দরজার পাশে দাড়িয়ে থাকে। রাজা মিয়া এলে তার কাছ থেকে বাসরঘর সাজানোর টাকা দাবী করবে। টাকা না দিলে নতুন বৌয়ের মুখ দেখতে দিবে না। রাত গবীর হয় কিন্তু রাজা মিয়ার আসার নাম নেই। সবাই চিন্তিত রাজা মিয়া কোথায় যেতে পারে। বাড়ি ভর্তি আত্মীয় স্বজন। দাদী এসে জান্নাতুন নেছাকে কানে কানে বলে যান, বুবু। আরেকটু অপেক্ষা করো। বাড়ি ভর্তি মানুষ। আমার রাজা শরম পাইতাছে। মানুষজন একটু কমলেই আমার রাজারে ঘরে ঢুকাইয়া দিমু। জান্নাতুন নেছা উত্তরে কিছুই বলে না। শুধু আড়চোখে দাদী-শাশুড়িকে এক নজর দেখে।
একসময় আত্মীয় স্বজনদের কোলাহল রাতের নিরবতার সাথে মিশে যায়। দুই কিশোর কিশোরীও ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে। দাদী রাজা মিয়াকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। রাজা মিয়া দরজা লক নতুন বৌয়ের মুখোমুখি বসে। জান্নাতুন নেছা ঘোমটা টেনে বসে আছে। রাজা মিয়া পকেট থেকে একটা আংটি বের করে বৌয়ের আঙুলে পরিয়ে দিয়ে বলে, আমার আব্বা আম্মা আর দাদীর পছন্দ আছে। মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর।
জান্নাতুন নেছা বলে, শুধু আব্বা আম্মার পছন্দ হইছে, আপনার পছন্দ হয় নাই।
কি যে কয়। পছন্দ হইব না ক্যান। আমার দোস্তরা তো কয় কাউয়ার মুখে কমলা। আমি নাকি কাউয়া আর তুমি নাকি কমলা।
জান্নাতুন নেছা মুচকি হাসে। সে হাসি ঘোমটার আড়ালেই থাকে রাজা মিয়া দেখতে পায় না। রাজা মিয়া কালো বলে এ বিয়েতে জান্নাতুনের মত ছিল না। আত্মীয় স্বজন আর রাজা মিয়ার দাদীর পিড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত কালো মানুষটাকেই কবুল করে নিয়েছে। মনে বারুদের মত জ্বলেে উঠা কষ্ট দমন করে বলে, আপনার দোস্তরা মজা করছে। আপনেও সুন্দর।
রাজা মিয়া জান্নাতুন নেছার কোমটা সরিয়ে একটা হাত টেনে নিজের হাতের সাথে চেপে ধরে বলে, কই আকাশের চান আর পাতিলের কালি। দেখো এই নিমনিমা আলোতেও তোমারে স্পষ্ট দেখা যায়। আর আমারে মনে হয় কাইল্লা ভূত।
# দুই #
নিজেরে নিজে এমটা ভাবতে নাই। আল্লাহ পাক সব মানুষরে খুব যত্ন কইরা বানাইছে। কোনো মানুষই অসুন্দর না। এই ধরেন একটা বাগানে কত রকমের ফুল থাকে। লাল নীল সবুজ সাদা কালা। আপনে হইলেন কালা গোলাপ। আর আমি হইলাম বাদামি গোলাপ।
বৌয়ের এমন কথা শুনে রাজা মিয়া প্রাণ খুলে হাসে। হাসির সাথে একটা নিষিদ্ধ গন্ধ বের হয়ে আসে। জান্নাতুন নেছা বুঝতে পারে এটা কোন পারফিউমের ঘ্রাণ নয়। এটা মদের গন্ধ। গন্ধটা এত তীব্র যে পেটের নাড়িভুঁড়ি মোচর দিয়ে বুমি হবার উপক্রম। মধুময় একটা সময় মুহূর্তে মলিন হয়ে যায়। বুকের ভেতরে অজানা একটা শঙ্কা বাসা বাঁধে। ভালোবাসার প্রথম রাতে এমন একটা পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না জান্নাতুন নেছা। মনে হচ্ছে বিয়েতে রাজি হওয়াটা ছিল ভুল । মেঘে ঢাকা চাঁদের মত উজ্জ্বল ফর্সা হাসিমাখা মুখে নিমিষে কালো ছায়া পড়ে। রাজা মিয়ার হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে জানতে চায়, আপনি কি নেশা করছেন?
না। নেশা করি নাই। সব দোস্তরা মিল্লা একটা পার্টি দিছিল। জোসের কতা কইয়া কি জানি খাওয়াইয়া দিছে। বিশ্বাস করো আমি নেশা করি নাই।
রাজা মিয়ার কথা স্বাভাবিক নয়। কথার মাঝে মৃদু মাতলামি স্পষ্ট। রাজা মিয়া বৌয়ের হাত ধরার চেষ্টা করে। জান্নাতুন এক হাতে রাজা মিয়াকে ধাক্কা দিয়ে একটু পিছু সরে গর্জে উঠে, আপনি আমারে ধরার চেষ্টা করবেন না।
আমার বৌ আমি ধরমু না তো ধরবো কে? তুমি হইলা আমার বিয়া করা বৌ। আসো কাছে আসো।
কথা বলার মধ্যে বেশ জড়তা। নেশার তীব্রতায় চোখ ঘোলা হয়ে আসে। জান্নাতুন বলে, কোনো নেশাখোর আমার স্বামী হইতে পারে না। আপনি আমার কাছের আসার চেষ্টা কইরেন না। আর একপা আগাইলে চিৎকার কইরা বাড়ির সব মানুষ জড়ো করমু। যেইদিন তোবা কইরা নেশা ছাড়তে পারবেন সেইদিন আমার কাছে আসবেন।
রাজা মিয়া কিছু একটা বলতে চেষ্টা করে কিন্তু বলতে পারে না। ধপাস করে খাটে পড়ে হুঁশ হারিয়ে ফেলে। জান্নাতুন নেছা কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না। নির্বাক চোখ থেকে ঘৃণা আর কষ্টের কয়েক ফোঁটা গরম জল রাজা মিয়ার বুকে ঝরে পড়ে।
বাকি রাতটা নির্ঘুম কাটে জান্নাতুন নেছার। হিসাব মেলাতে পারে না এটা কি হলো। সবার নতুন জীবনটা কি এমন শঙ্কিত। মানুষের মুখ আর প্রতিপত্তিতে সাধু শয়তান আলাদা করা মুশকিল। সম্পর্কের পরে বুঝা যায় মানুষের আসল রূপ। রাজা মিয়া বেহুঁশের মত ঘুমাচ্ছে। সূর্যের নরম আলো ঘরের ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকে। দরজায় খটখট শব্দে ভাবনার জগতে চিড় ধরে। বুকের ভেতরটা অজানা শঙ্কায় চিনচিন করতে থাকে। নিজেকে একটু পরিপাটি করে দরজার খিল খুলে দেয় জান্নাতুন নেছা। রাজা মিয়ার কাজিন বোন নাছিমার সাথে দাদী-শাশুড়িও ঘরে ঢুকে। একটা টক টক ভোঁটকা গন্ধ নাকে ঢুকতেই দাদী মা জানতে চান, কি গো নাতবৌ। ঘরে কেমন একটা চুক্কা (টক) গন্ধ পাইতাছি।
জান্নাতুন নেছা কোনো জবাব দেয় না। দাদী মার মুখের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকে। নাছিমা বলে, ঘটনা বেশি ভালা মনে হইতাছে না দাদীমা। বাড়ির পোলা মাইয়ারা কতরকম ফুল দিয়া বাসর সাজাইছে। কিন্তু ঘরে কোনু ফুলের বাসনা নাই। কেমন একটা পচা গন্ধ পাইতাছি। মনডা কইতাছে ভাবী সাহেবার সাথে রাজা ভাইয়ের মিলন হয় নাই।
তুই কি ভাবে বুঝলি নাত-বৌয়ের মিলন হয় নাই।
না বুঝার কি আছে দাদীমা। দেখেন না, ভাবী সাহেবার শাড়ির ভাজ একটুও ভাঙ্গে নাই। আর ঠোঁটের লিপস্টিক ঝলমল করতাছে।
নাছিমার কথার মাঝে দাদীমা দুটো জানালা খুলে দিতেই বাহিরের আলো এসে ঘর ভরে যায়। দাদীমা দেখেন রাজা মিয়া উপুড় হয়ে খাটে ঘুমাচ্ছে। কিছু বমি বিছানার যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দাদীমার বুঝতে বাকি থাকে না সারা ঘর জুড়ে কিসের গন্ধ। দাদীমা জান্নাতুন নেছার দিকে চোখ রাখতেই সে দাদী মা'কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। দাদীমা বুঝতে পারেন নাছিমার কথাগুলো অমূলক নয়। সারারাত না ঘুমানোর একটা কালো ছাপ মুখে স্পষ্ট। শান্তনা দিয়ে বলেন, কন্দিস না নাতবৌ। সবকিছু ঠিক হইয়া যাইব। আমার রাজা মিয়া এতটা খারাপ মানুষ না। তোমার সাথে রাজা মিয়ার বিয়া হউক অনেকেই চাইছে না। আল্লাহপাক জোড়া লেইখা রাখছে বিয়া হইয়া গেছে। এখন মন শক্ত কইরা সংসার করতে হইব। প্রেম ভালোবাসা দিয়া তারে ভালো পথে আনতে হইব। আমার বিশ্বাস তুমি তা পারবা। আসো তুমি আমার ঘরে আইসা বসো। আমি রাজা মিয়ার হুঁশ ফিরাইতাছি।
কথা বলতে বলতে জান্নাতুন নেছাকে দাদীমার ঘরে রেখে আবার ফিরে আসেন। নাছিমাকে দিয়ে এক বালতি পানি এনে রাজা মিয়ার গায়ে ঢেলে দেন। রাজা মিয়া বিদ্যুৎ চমকানোর মত তড়িৎ উঠে বসে চোখ কচলাতে থাকে। ফ্রেশ একটা ঘুম হওয়াতে নেশার রেশ আর নেই। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে তার তিন মা এবং দাদীমা দাড়িয়ে আছেন। কেন তাকে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দেয়া হলো তা বুঝার আগেই দাদী বলেন, তোর বদনেশার লাইগা আমাদের মানসম্মান সব শেষ হইয়া গেছে। পাড়ার মাইনষে তোর চেয়ারম্যান বাপে মুখে চুনকালি দিবো।
ক্যান কি হইছে দাদীমা। আমি আবার কি করছি।
কি করছ নাই। চাইয়া দেখতো বিছনার মইধ্যে এইগুলা কি? নাত-বৌয়ের চেহারা দেইখা মনে হইতাছে সে সারা রাইত সজাগ আছিলো।
রাজা মিয়া চেয়ে দেখে চাদর ভর্তি বমি আর বমি। এসব কখন করেছে কিছুই মনে করতে পারে না। রাজা মিয়ার আপন মা বলেন, বাবা তুই যা করছছ তা কোনো ভালো মানুষের কাম না। যা খাইলে পেটে থাকে না সেই গু না খাইলেইতো পারতি। তুই কেমন মানুষ নতুন বৌ জাইনা গেছে।
মায়ের কথা শুনে মাথা নত করে ফেলে রাজা মিয়া। কি বলবে মাথায় কিছুই আসছে না। জীবনের প্রথম ভালোবাসার রাতটা এমন তেতো হবে তা ভাবতেই শীতে গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে।
তুই আমার পোলা না। তোর মত কুলাঙ্গার পোলা য্যান আর কারো ঘরে জন্ম না নেয়। ইচ্ছা হইতাছে বিষ খাইয়া নিজের জীবনডা শেষ কইরা দেই। বাঁইচা থাইকা তোর অসভ্যপনা আর দেখতে চাই না।
কথার মাঝে শাড়ির আচলে চোখ মুছেন। আচমকা হাতের মুষ্টিতে রাজা মিয়ার চুল ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, দে। তুই যে গু খাছ তা আমারে দে। আমি খাইয়া জীবনডা শেষ কইরা দেই।
রাজা মিয়া কোনো শব্দ করে না। গতরাতে কাজটা যে সে ভালো করেনি তা বুঝতে পারে। নয়া বৌ জেনে গেলো তার স্বামী নেশাখোর। বিষয়টা খুবই লজ্জার। নিজের ভুল বুঝতে পেরে রাজা মিয়াও নিরবে কাঁদে আর ভাবে নতুন বৌকে এই মুখ কিভাবে দেখাবে। মনে মনে বন্ধুদের প্রতি খুব রাগ হয়।
# তিন#
ইচ্ছে হয় সব শালাদের ধরে পানিতে ডুবিয়ে মারে। বন্ধুরা জোর করে পাগলা পানি না পান করালে এই বিব্রতকর ঘটনা সৃষ্টি হতো না। দাদীমা রাজা মিয়ার মা'কে টেনে সরিয়ে আনেন। মা বলতে থাকেন, যদি এই বদনেশা না ছাড়ছ তুই আমার মরা মুখ দেখবি।
দাদী বলেন, এমন কতা বলতে নাই বৌমা। দোয়া করো আল্লাহ য্যান আমার রাজা ভাইরে হেদায়েত দান করে।
মা বের হওয়ার জন্য সামনে পা বাড়াতেই দেখেন নতুন বৌ দরজা ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে। মা এবং দাদীমার সব কথা সে শুনেছে। মা'কে আটকে জান্নাতুন নেছা বলে, শুনেন আম্মা। আমি সব কতাই শুনছি। মানুষ একদিনে খারাপ হয় না। পোলা একটা। ধনসম্পদের অভাব নাই। বংশের বাতি। সোনার টুকরা মনে কইরা কোনো শাসন করেন নাই। যদি ছোটবেলা থাইকা শাসন করতেন আজ এই পরিস্থিতির জন্ম হইত না। আমি নতুন বৌ। আমার জীবনডার কি হইব ভাইবা দেখছেন?
মারে। কোনো মা কি চায় তার পোলা খারাপ হউক?
গত রাইতে যা ঘটছে এইডা একটা দুর্ঘটনা। এইডা নিয়া বেশি চিন্তা কইরো না। সব ঠিক হইয়া যাইব। আমি একজন মা হইয়া তোমার কোনো ক্ষতি হইতে দিমু না। বাড়ি ভর্তি মেহমান। একটা অনুরোধ করি মা। ঘটনা যা ঘটছে তা মনে মনে রাখো। বাইরের মানুষ জানলে চেয়ারম্যান বাড়ির মাথা কাটা যাইব।
কতা দাও মা'য়ের কতাডা রাখবা।
কথার মাঝে অপরাধীর মত হাতজোড় করে নতুন বৌয়ের কাছে। তাঁর সাথে সৎ দুই মা এবং দাদীমাও হাতজোড় করে। জান্নাতুন নেছার মাথায় কাজ করে না কি করবে। নতুন জীবন। অল্পতে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। সম্পর্ক ছিন্ন করলে উভয় পক্ষেরই মান সম্মানের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। জীবনে ঝড়তুফান তো থাকবেই। সবকিছু সামাল দিয়ে ঘোরে দাঁড়ানোর নামই তো জীবন। নারীর ভালোবাসা পেলে অনেক পুরুষ বদলে যায়। এমন কথা সে মুরুব্বিদের কাছে শুনেছে। মনে জমা কষ্টটাকে মাটিচাপা দিয়ে জান্নাতুন নেছা বলে, ভয়ের কিছু নাই আম্মা। আমি চেয়ারম্যান বাড়ির বৌ। এই বাড়ির সাথে আমার জীবনের ভালোমন্দ জড়িত। আমি শিক্ষিত মাইয়া। জীবনযুদ্ধে সহজেই হার মানতে রাজি না। আইজ থাইকা রাজা মিয়ার ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব আমি নিলাম।
জান্নাতুন নেছার ইতিবাচক কথা শুনে সবার মনের মেঘ কেটে যায়। তিন মা আর দাদীমা জান্নাতুনকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় আদরমাখা হাত বুলিয়ে দেয়।
সকালে নাস্তার টেবিলে মুখোমুখি বসে জান্নাতুন আর রাজা মিয়া। রাজা মিয়া মাথা নিচু করে বসে আছে। গত রাতের ঘটনার জন্য সে অপরাধবোধ করছে। মাথা তুলে জান্নাতুনের চোখে চোখ রাখতে লজ্জা পাচ্ছে। দাদীমা প্লেটে নাস্তা তুলে দিচ্ছে। তিন শাশুড়ীমাও টেবিলে এসে বসে। কারো মুখে কোনো কথা নাই। নিরবতা ভঙ্গ করে রাজা মিয়াকে লক্ষ্য করে জান্নাতুন নেছা বলে, কেমন আছেন আপনি?
মাথা নিচু করে রাজা মিয়া জবাব দেয়, ভালো।
না। আমার মনে হইতাছে আপনি অসুস্থ। নাস্তা খাইয়া একটা ঘুম দেন।
না আমি ঠিক আছি। গত রাইতের ঘটনার জন্য আমি লজ্জিত। আমারে ক্ষমা কইরা দাও। আমার তিন মাইয়ের কছম। আমি আর কোনদিন নেশা করমু না।
আমি কোনো কছম টছম বিশ্বাস করি না। একটা শর্তে আমি আপনারে ক্ষমা কইরা দিতে পারি।
কি শর্ত কও মাইননা নিমু।
আপনি আইজ থাইকা চল্লিশ দিন নামাজ পড়বেন মসজিদে গিয়া।
নামাজের কথা শুনে রাজা মিয়া চুপ হয়ে যায়। লোকমুখে শুনেছে চল্লিশ দিন একাধারে নামাজ পড়লে শয়তানও মানুষ হয়ে যায়। বদঅভ্যাস ছাড়ানোর জন্য বৌ যে নামাজের কথা বলেছে তা রাজা মিয়ার বুঝতে পারে। সংসার টিকিয়ে রাখতে হলে এই শর্ত না মেনে উপায় নেই। দাদীমা বলেন, দাদা ভাই নাতবৌ যা কইছে মাইননা নেও।
মাইনা নিলাম দাদীমা। আইজ থাইকা আমি নামাজ পড়মু।
আরেকটা শর্ত আছে।
কও।
এই চল্লিশ দিন আপনার সাথে আমার কোনো ঘর হইব না। যদি দেখি চল্লিশ দিনে আপনার স্বভাব বদলাইছে তাইলে আপনার সাথে আমার ঘর হইব।
বড় কঠিন শর্ত। এমন শর্তে তিন মা এবং দাদীমার
বুকটা কেঁপে উঠে। রাজা মিয়ার জন্য এই শর্তটা একটা অশনি শংকেত। যদি শর্ত পূরণ করতে না পারে বৌ যে সংসার করবে না তা স্পষ্ট। রাজা মিয়া বলে, তাই হইব। শর্ত মাইননা নিলাম। মা দাদীমা তোমরা সবাই আমারে মাফ কইরা দেও। কতা দিলাম আমি আর কোনদিন নেশা করমু না।
মা বলেন, বাবারে কোনো মা বাপই চায় না তার সন্তানের অমঙ্গল হউক। আমি প্রাণ খুইলা দোয়া করি। তুই ফুলের মত সুন্দর বৌমার কথা চিন্তা কইরা সব বাজে নেশা ছাইড়া দে।
রাজা মিয়া মায়ের দু'হাত টেনে নিজের মাথার উপর নিয়ে বলে, কতা দিলাম সব ছাইড়া দিমু।
মা পরম আদরে রাজা মিয়াকে টেনে নিয়ে নিরবে চোখের জল মুছেন।
একসপ্তাহের মধ্যে রাজা মিয়া বদলে যায়। নিয়মিত নামাজ পড়ে। অসৎ বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করে। কেউ ডাকলেও আর কোনো আড্ডাতে পা রাখে না। সবাইকে তার মত নামাজ পড়ে জীবন বদলে কথা বলে। নেশা হইলো নিজের জীবন নিজে ধ্বংস কইরা দেওয়া। রাজা মিয়ার এমন পরিবর্তনে সবাই অবাক হয়। কেউ কেউ বলে বিয়ার পর রাজা মিয়া একটা বলদ হইয়া গেছে। বলদ না হইলে কেউ বউয়ের কতায় ওঠাবসা করে?
আগুনের আঁচে মোম গলার মত জান্নাতুন নেছাও একদিন গলে যায়। চল্লিশ দিনের আগেই তাদের মিলন হয়। বছর শেষে জোড়া সন্তানের গর্বিত পিতা হয় রাজা মিয়া। জোড়া সন্তান সাধারণত মেয়ে কিংবা ছেলে হয়। কিন্তু রাজা মিয়া পেয়েছে একটি ছেলে একটি মেয়ে। যা সাত গাঁয়ে মধ্যে বিরল ঘটনা। যারা ভেবেছিল এই সংসার টিকবে না তাদের ক্ষতে নুনের ছিটা পড়েছে। গায়ের চমড়া ফর্সা হলেই মানুষ সুন্দর হয় না। পবিত্র মনই হলো সুন্দরের আসল পরিচয়। তেতো মন দাম্পত্য জীবনকে থেঁতো করে দেয়। সংসার গড়ার আগে পরে মানুষের কিছু ভুলত্রুটি থাকে। সেই ভুলগুলো শুধরে নিতে পারলে তাদের মত সুখী আর কেউ হতে পারে না।
*******
প্রয়োজনে
হলি হোমস সাগর সৈকত
অভিযান# ১৫ ফ্ল্যাট # এ-৭
টঙ্গী কলেজ গেট, গাজীপুর।
বাংলাদেশ।
মোবাইল : ০১৭১৮০৬০২৭৭( What's app)

Comments
Post a Comment