আগুনের রঙহীন রঙ
রোকেয়া ইসলাম
দিকবিদিকশুন্য শিউলি দৌড়াচ্ছে , কোলে পাঁচ বছরের মেয়ে। কখনও হোটচ খেয়ে পড়ে যায়, ইটের কোণায় লেগে বুড়ো আঙ্গুল ফেটে রক্ত বের হয়, তবুও দৌড়াতে থাকে শিউলি।
গতকালই রুবেল বলেছিল ওদের বেতন হয়নি, মালিক বলেছে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম ওঠানামা করছে তাই অর্ডার বাতিল।
বারোতলা গার্মেন্টসে আগুন জ্বলে ওঠে।
শ্রমিকরা যখন ভেতরে আঁটকে আছে, দরজায় বিদেশি তালা ঝুলছে, চাবিসহ গেট কিপারের দেখা নেই।
ভেতরের মানুষগুলো ধোয়ার কুন্ডলিতে আচ্ছন্ন হয়ে হাতড়ে হাতড়ে নাকে মুখে ওরনার আঁচল আর শার্টের কোনা তুলে ধোয়া আঁটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
বারো তলার কাচের জানালা বিকট শব্দে ঝুরঝরো হয়ে নিচে পড়ছে। ওদের আর্তচিৎকারে ইউটিউবাররা লাইভ ভিডিওদাতারা দেশি বিদেশি সাংবাদিকরা এলোপাতাড়ি ছবি তুলতে থাকে । এগুলো ওদের সম্পদ।
বহু চেষ্টার পর ধোয়ার কুন্ডলী রেখে আগুন নেভে।
কিন্তু শিউলির ঘর ভরে থাকে আগুন তাপের রঙে।
রুবেল এই বারো তলা গার্মেন্টসের সুপার ভাইজার ছিল। রুবেলকে পাওয়া যায়নি শুধু রুবেলের শরীরের মাপে একটুকরো কয়লা পড়ে ছিল ভেজা ছাইয়ের স্তুপে।
মেয়ে প্রায় রাতেই ওর গলা জড়িয়ে বুকের কাছে মুখ নিয়ে বলে, আব্বু কবে আসবে কখন আসবে।
শিউলি চুপ করে থাকে ও জানে এই শহরের কোন কোন বাবা ফেরে না। ফেরা হয় না।
তাদের নাম লেখা হয় ক্ষতিপূরণের তালিকায়।
যা কেউ কেউ পায় বেশিরভাগই পায় না। যদিও জানে গার্মেন্টস সামগ্রীর বীমা করা থাকে। শুধু শ্রমিকের জীবন বীমা করা থাকে না।
শিউলি ক্ষতিপূরণ নয় মানুষটাকেই চায়।
শোক বুকের ভেতর ক্ষরণের কেন্দ্র রেখে জীবন স্বাভাবিক করতে চায়,
একদিন গার্মেন্টসের বড় পর্দায় দেখায় বিদেশি ভিডিও চ্যানেলে দেখানো সংবাদ।
শিউলির কান্না ব্যাকগ্রাইন্ড মিউজিক হয়ে গেছে
বিদেশি সাংবাদিক বলছে
"we mast ensure fair trade "
শিউলি চিৎকার করে বলতে চায় " আমরা শুধু বাঁচতে চাই "
কিন্তু ওর মুখে এই সাবটাইটেল বসানো হয় না।
ডিউটি শেষ করে ফেরার পথে প্রতিদিন আগুন পোড়া ফ্যক্টরির পোড়া ইটের উপর বসে থাকে।
আকাশ থেকে নেমে আসে ধোয়ার গন্ধের সাথে মানুষের মাংসের কাবাবের উৎকট গন্ধ।
মনে মনে বলে, এ আগুন কেউ নেভাতে পারবে না। এটা মানুষের গায়ে নয় সিস্টেমে লেগেছে লেলিহান আগুন।
তবুও অনির্বাণ আগুন প্রতিদিন নতুন করে জ্বলে ওঠে প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের ঘামে মানুষের চোখে।
সর্বস্ব পোড়া মানুষগুলো প্রতিদিন বিশ্বাস করে একদিন ওদের শ্রমের বিনিময়ে একটু সুস্থির জীবন পাবে ওরা....

Comments
Post a Comment