শেষ ভালো যার সব ভালো তার
দীনেশ সরকার
মেয়ে-জামাইয়ের গাড়ি বেরিয়ে যেতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ভানুমতী। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা মেয়েকে পার করা কী মুখের কথা! হাজার রকমের ঝক্কি পোয়াতে হয়। বাতের ব্যথায় পঙ্গু শাশুড়ি, তাই ঝক্কি-ঝামেলা সব বাড়ির একমাত্র বউ ভানুমতীকেই সামলাতে হ’ল। মোটামুটি সুশ্রী গ্রাজুয়েট ননদ তনুশ্রীর জন্য খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারে এইরকম একটা পাত্র জোটাতে হিমসিম খেতে হ’ল। একপক্ষ পাত্রীকে দেখে বলল, মেয়ের গায়ের রঙ চাপা তো আর একপক্ষ বলল, মেয়ের মাথায় চুল কম। আবার কোনপক্ষ বলল, মেয়ের সব ঠিক আছে শুধু হাইটটা একটু কম। আবার আর একপক্ষের পাত্রী পছন্দ, কিন্তু তাদের দাবী-দাওয়ার ফিরিস্তি শুনে চমকে যেতে হ’ল। পাত্র স্কুলের শিক্ষক ছিল। চাকরি চলে গেছে। টাকা ফেরাতে হবে। তাই অন্যান্য জিনিস পত্র গহনাগাঁটির সাথে নগদ দিতে হবে আট লক্ষ টাকা আর একটা মোটর বাইক এবং পরে ব্যবসা করার জন্য আরও দু লক্ষ টাকা। ভানুমতীর স্বামী রজত সামান্য রোজগেরে, এক জুট মিলের কর্মী। কত আর বেতন পায়। তারউপর মাঝে মাঝেই মিল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এত টাকার জোগাড় কোথা থেকে করবে! যদিও ভানুমতীর শ্বশুরমশাই (তিনিও জুট মিলের কর্মী ছিলেন) বলেছিলেন, ‘রজত, আমার যে কটা জমানো টাকা আছে, সেটা ভেঙে ফেলে ত্নুশ্রীর বিয়ে দে। তুই ওর বিয়ের খরচ কোথা থেকে জোগাড় করবি!’ কিন্তু রজত রাজি হয়নি। বলেছিল, ‘বাবা, তুমি তো জান আমাদের জুট মিল যে কোন সময়ে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন তোমার ওই টাকাগুলো দিয়ে একটা ছোটখাট ব্যবসা তো করতে পারব। না হলে পেট চালাব কী করে? তনুশ্রীর বিয়ে আমি ধার-দেনা করে যেভাবে হোক দেব।‘
এক একবার পাত্রপক্ষ আসে আর কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে যায়। তাদের খাবারের জোগাড় করতেই রজতের হিমসিম অবস্থা। ভানুমতী অতিকষ্টে হাসিমুখে সব কিছু ম্যানেজ করে। এত পাত্র দেখার পরেও যখন ননদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারল না তখন রেগেমেগে ভানুমতী একদিন ননদকে বলেই ফেলল, ‘পোড়ারমুখী কারও সঙ্গে প্রেম করতে পারলি না, তাহলে আমাদের আর এত ঝক্কি পোহাতে হ’ত না।‘ ত্নুশ্রী কাঁদতে কাঁদতে ঘরে যাবার সময় বলেছিল, ‘আমার জন্য তোমাদের আর ছেলে দেখতে হবে না। যদি দুমুঠো খেতে দিতে না পার তো বলে দিও, আমি আমার পথ দেখে নেব।‘ আসলে তনুশ্রীও দাদা-বৌদির কষ্টটা বোঝে। কিন্তু তার তো কিছু করার নেই।
কিন্তু হাতপা গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলে না। দেখাশোনা চলতেই থাকে। পত্রপক্ষ আসে আর খেয়েদেয়ে চলে যায়। এবার এল এক গ্রাজুয়েট ছেলে। চাকরি বাকরি না পেয়ে ডেলিভারি বয়ের কাজ করে। সে একটা ছোটখাট ব্যবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। তাই তার একটাই দাবী নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা চাই। ভানুমতীরা প্রায় রাজি হয়েছিল, এমন সময় আবির্ভাব ঘটল সুজয়ের। সুজয়রা আগে এপাড়ায় মল্লিকদের বাড়িতে ভাড়া থাকত। সুজয়ের বাবা ছিল মেকানিক। জুটমিলের মেকানিক হিসাবে কাজে যোগ দিয়েছিল। ত্নুশ্রীর খুড়তুতো দাদা গোবিন্দ ছিল সুজয়ের বন্ধু। একই ক্লাসে পড়ত। সুজয় তনুশ্রীদের বাড়িতে অনেকবারই এসেছে। তনুশ্রী তখন স্কুলে পড়ত। তারপর সুজয়ের বাবা জুটমিলের কাজ ছেড়ে দিয়ে হাওড়ার এক মিলের মেকানিকের কাজ নেয়। ওরা হালিশহর ছেড়ে হাওড়ায় চলে যায়।
বহু বছর পর সেই সুজয় এসেছে বন্ধু গোবিন্দের সঙ্গে দেখা করতে। সুজয় এখন ডিপ্লোমা ইনজিনিয়ার। একটা কোম্পানীতে ছ-মাস ট্রেনী হিসাবে কাজ করার পর কোম্পানীর চেন্নাইয়ের কারখানায় ওর পোস্টিং দিয়েছে। পরে আবার এখানে ভাকেন্সী হলে ফিরে আসতে পারবে। তাই চেন্নাইয়ে যাওয়ার আগে বন্ধু গোবিন্দর সাথে দেখা করতে এসেছে। গোবিন্দর সাথে সুজয় পুরানো পাড়াটা ঘুরে দেখতে বেরিয়ে তনুশ্রীদের বাড়িতে এল। ভানুমতীকে দেখে সুজয় বলল,’কি বৌদি, চিনতে পারছেন ?’
ভানুমতী বলল, ‘কেন চিনতে পারবো না ভাই? কত বছর তোমরা এই পাড়ায় কাটিয়ে গেছ। এসো ভাই, বসো।‘ গোবিন্দকে বলল, ‘ঠাকুরপো, তোমরা একটু বসো, আমি চা বানিয়ে আনছি।‘
তনুশ্রীকে দেখে সুজয় বলল, ‘তনুশ্রী, কেমন আছিস্?’
ত্নুশ্রী সংক্ষেপে বলল, ‘ভাল।‘
সুজয় রসিকতা করে বলল, ‘আমি চেন্নাই চলে যাচ্ছি বলে আমাকে যেন ভুলে যাস্ নে। বিয়ের নিমন্ত্রণটা যেন পাই। আমি ঠিক চলে আসব।‘
‘ঠিক আছে। তাই হবে।‘ তনুশ্রী ঘরে ঢুকে গেল।
পাশ থেকে গোবিন্দ বলল, ‘আর বিয়ে। বিয়ে হলে তো নিমন্ত্রণ পাবি।‘
‘কেন, কেন? বিয়ে হচ্ছে না কেন?’
‘দেখাশোনা তো অনেক চলছে, কিন্তু মনের মতো হচ্ছে কোথায়? আর এক একটা পাত্রের দাবিদাওয়ার ফিরিস্তি শুনলে মাথা ঘুরে যায়। আমরা হচ্ছি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার, অত টাকা আমরা কোথায় পাব বল্? শেষে একটা ডেলিভারি বয়ের সাথে কথাবার্তা চলছে, হয়তো ঠিকঠাক হয়ে যাবে। তাও একেও পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে, সে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করবে।‘
‘কী বলছিস্ তুই! তনুশ্রীর বিয়ে হবে একটা ডেলিভারি বয়ের সাথে!’
ভানুমতী চা-জলখাবার নিয়ে আসছিল। ভানুমতী বলল, ‘কী করব বলো ভাই। এর চেয়ে ভালো পাত্র আমরা কোথায় পাব। গোবিন্দর মুখে তো শুনলে এক একটা পাত্রের দাবি-দাওয়া শুনলে চমকে উঠতে হয়। আমাদের অত সামর্থ কোথায়?’
‘তাই বলে একটা ডেলিভারি বয়ের সাথে তনুশ্রীর বিয়ে হবে। না-না, এ হতে পারে না। একটা ডেলিভারি বয় কত আর মাইনে পায়। এ বিয়ে হলে তনুশ্রী সুখী হবে না। না-না, এ বিয়ে হতে পারে না। তাছাড়া পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে ব্যবসা করলে যে ব্যবসাটা দাঁড়াবে তার তো কোন নিশ্চয়তা নেই। এ তো একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হবে। তাই বলছি এ বিয়ে হতে পারে না।‘
গোবিন্দ বলল, ‘আমরা যে ওটা ভাবিনি তা নয়। কিন্তু উপায় কী বল্। একটা ভালো পাত্রের খাই তো আমরা মেটাতে পারব না। তাই তো তোকে বলছিলাম, বিয়ে আর হচ্ছে কোথায়। শেষমেষ হয়তো হাত-পা বেঁধে ওই ডেলিভারি বয়ের গলায় ঝুলিয়ে দিতে হবে।‘
সুজয় কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না তনুশ্রীর মতো একটা ভালো শিক্ষিত মেয়ের বিয়ে ডেলিভারি বয়ের মতো একটা ছেলের সাথে হতে পারে। তাই সুজয় আবার বলল, ‘না-না, এ বিয়ে হতে পারে না।‘
ভানুমতী বলল, ‘তাহলে তুমি একটা উপায় বলো না ভাই। তুমি একটা ভালো পাত্র জোগাড় করে দাও না ভাই।‘
‘আমি? আমি ভালো পাত্র কোথায় পাব। তারউপর আমি তো আর বাংলায় থাকছি না। আমার পোস্টিং হয়েছে চেন্নাইতে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমি চেন্নাই চলে যাচ্ছি।‘
‘কী করব বল। ওর কপালে যা লেখা আছে তাই হবে।‘
পাশ থেকে গোবিন্দ বলে উঠল, ‘আমি একটা কথা বলব? তুই তো তনুশ্রীকে জানিস্। তুই তনুশ্রীকে বিয়ে কর না। তাহলে আমাদের আর পাত্র খুঁজতে হয় না।‘
‘আমি!’ আকাশ থেকে পড়ল সুজয়।
‘কেন? আকাশ থেকে পড়লি নাকি? তনুশ্রী কি তোর অযোগ্য মেয়ে?’
‘না-না, আমি তা বলিনি। তনুশ্রী খুব ভালো মেয়ে।‘
‘তাহলে তোর আপত্তি কোথায়?’
‘আসলে বিয়ে নিয়ে আমি এখনো কিছু ভাবিনি। শুধু ক্যারিয়ার নিয়েই ভেবেছি। যদিও মা বহুবার বলেছে, চেন্নাই যাওয়ার আগে বিয়েটা করে যা। ওখানে তোকে কে দুটো ফিটিয়ে দেবে। কিন্তু আমি গায়ে মাখিনি।‘
‘ব্যাস। তাহলে তো হয়েই গেল। এখন একটু ভাব।।
‘আমাকে একটু ভাববার সময় দে।‘
ভানুমতী বলল, ‘হ্যা ভাই। তুমি যদি রাজি থাক তো খুব ভালো হয়। জানাশোনার মধ্যে হলে তো খুব ভালো হয়। জান ভাই, তনুশ্রীর জন্য পাত্র খুঁজতে খুঁজতে আমরা ক্লান্ত।‘
‘আমাকে একটু ভাববার সময় দিন বৌদি। তারউপর তনুশ্রীরও তো মত থাকা প্রয়োজন।‘
গোবিন্দ বলল, ‘সে তুই ভাবিস্ নে। তনুশ্রীকে আমি এখনই জিজ্ঞেস করছি, তনুশ্রী একটু বাইরে আয় তো।‘
ত্নুশ্রী বাইরে আসতে গোবিন্দ জিজ্ঞেস করল, ‘তনুশ্রী, সুজয়কে তোর পছন্দ হয়?’
‘তোরা যেটা ভালো মনে করবি তাতেই আমার মত আছে‘ বলে তনুশ্রী ঘরে ঢুকে গেল।
গোবিন্দ বলল, ‘ব্যাস। তবে তো হয়েই গেল। এখন তুই রাজি কিনা বল।‘
ভানুমতী বলল, ‘তোমার বাবা-মা তো তনুশ্রীকে চেনেন আর আমাদেরকেও জানেন। তুমি বাড়ি গিয়ে তোমার বাবা-মার সাথে কথা বল। তারা যদি রাজি থাকেন তো এ বিয়ে হবে। তোমার ওপর কোন চাপ আমরা দিচ্ছি না। তুমি ভাব, ভেবেচিন্তে তোমার মতামত জানাইও।‘
সুজয় বাড়িতে এসে মাকে তনুশ্রীর কথা বলতে মা খুব খুশি। ছেলে সংসারী হচ্ছে এর চেয়ে খুশির খবর আর কী হতে পারে! সে তো বারবার বলেছে চেন্নাই যাওয়ার আগে বিয়েটা করে যা যাতে কেউ তোকে দুটো ফুটিয়ে খাওয়াতে পারে। বাইরের খাবার না খেতে হয়। আর সুজয়ের মা তনুশ্রীকে ভালোমতোই চেনে, তার স্বভাব-চরিত্র চালচলন সবই জানে, কেননা তারা এ পাড়ায় বেশ কয়েক বছর কাটিয়ে গেছে। তাই অমতের কোন প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সমস্যা হ’লো সুজয়ের বাবাকে নিয়ে। সামান্য চাকুরে এত অল্প সময়ের মধ্যে বিয়ের খরচ কী করে যোগাড় করবে। ছেলের বিয়ে হলেও তো যথেষ্ট খরচ আছে। হাতে যে সময় খুব কম। কোম্পানী থেকে লোন নিতে গেলেও তো একটা সময় দরকার। সেই সময়টা তো নেই। আর সুজয় এতদিন ট্রেনী হিসাবে কাজ করেছে, তারও তো সঞ্চয় বলতে কিছু নেই।
সুজয় সবকিছু বন্ধু গোবিন্দকে খুলে জানাল। বিয়েটা চেন্নাই যাওয়ার আগেই তাকে করে যেতে হবে। কারণ নতুন চাকরীতে জয়েন করে এক বছরের মধ্যে সে ছুটি পাবে না। আর্থিক সমস্যার কথাও খুলে বলল গোবিন্দকে। শেষে দুপক্ষের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হ’লো সুজয়ের বিয়ের খরচের কিছুটা ত্নুশ্রীর দাদা রজত বহন করবে। আরও ঠিক হ’লো, সুজয় বৌভাতের পরেরদিনই চেন্নাই যাবে নতুন চাকরিতে জয়েন করতে। দ্বিরাগমন হবে না, কেননা সময় নেই। সুজয় চেন্নাইতে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে তনুশ্রীকে নিয়ে যাবে। ততদিন তনুশ্রী শ্বশুরবাড়িতে থাকবে।
অল্প সময়ের মধ্যে সব কিছুর ব্যবস্থা করতে রজত আর ভানুমতীর হিমসিম অবস্থা। যাই হোক নির্বিঘ্নে তনুশ্রী আর সুজয়ের বিয়েটা সম্পন্ন হ’লো। সুজয়ের হাত ধরে ত্নুশ্রী শ্বশুরবাড়ি চলল।

Comments
Post a Comment