অভিজিৎ হালদার
দহন
অন্ধকার ঘরে একা বসে থাকা—
এক মুঠো ধুলো, ভাঙা স্বপ্ন আর স্মৃতির কঙ্কাল।
পেট ভরে না অভাবের সংসারে,
তবুও শিরদাঁড়া টানটান করে লড়ে যাই রোজ।
তুমি দেখছো, আমার দুচোখ ফেটে জল,
তুমি দেখছো, আমার ঘর্মাক্ত কপাল।
আসলে ওটা জল নয়, ওটা আগ্নেয়গিরির লাভা,
যা আমাকে ভেতরে ভেতরে জ্বালিয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন।
শহরের ইট-পাথরের ভিড়ে আমরা কেবল সংখ্যা,
যাদের পায়ের চাপে রাস্তা হয় মসৃণ।
তবুও মাথা নুইয়ে মানতে শিখিনি পরাজয়,
বুকের ভেতর একগুচ্ছ জেদ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
পৃথিবী হয়তো পাল্টাবে না, পাল্টাবে না নিয়ম,
তবুও আমি আমার নিয়তি নিজে গড়ি।
ভাঙা আয়নায় মুখ দেখে হাসি একা,
এ এক অদ্ভুত লড়াই—অস্ত্রহীন যুদ্ধের ময়দান।
ক্লান্ত চোখ, তবু স্বপ্নের চাকা ঘোরে,
অসহায়ত্বকে পদদলিত করে এগিয়ে যাই পথে।
এই তো জীবন, যেখানে কান্নাও বিলাসিতা,
শিরদাঁড়া সোজা রাখাটাই সবচেয়ে বড় শৌর্য।
বাস্তুচ্যুত অভিমান
পোড়া ভিটেয় দাঁড়িয়ে আছে জীর্ণ ছায়া,
যেখানে একসময় হাসির সুর খেলত বাতাসে।
এখন শুধু হাহাকার, শুকনো খটখটে মাটি,
আর দিগন্তজোড়া একরাশ দীর্ঘশ্বাস।
আমরা উদ্বাস্তু, এই সময়ের নির্মম স্রোতে,
শিকড় ছিঁড়ে ভেসে যাওয়া এক টুকরো খড়।
বুকের ভেতর জমাট বাঁধা কষ্টগুলো
ঠোঁটের কোণে চেপে ধরি যাতে বেরিয়ে না আসে।
লোকে বলে সময় সব ভুলিয়ে দেয়,
মিথ্যা কথা! স্মৃতিগুলো ক্ষতের মতো জাগে।
আঙুল দিয়ে খুঁটি চিবুক, চোখ দিয়ে নোনা জল,
কার কাছে অভিযোগ করব, কে শুনবে কথা?
বিচারক তো আজ নিজেই অভিযুক্তের আসনে,
মানুষ কেবলই পণ্যের দরে কেনাবেচা।
তবুও কুঁড়েঘরের চালে যখন রোদ পড়ে,
নতুন করে বাঁচার নেশায় চোখ জ্বলে ওঠে।
আমরা মরিনি, বেঁচে আছি হার না মানা জেদে,
অন্ধকারের বুক চিরে সকাল আনার প্রতীক্ষায়।
ইতিহাস আমাদের নাম হয়তো লিখবে না কোথাও,
কিন্তু সত্যের শিরদাঁড়া আমরাই সোজা রেখেছি।
শ্রমিকের রোজনামচা
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই
হাতের মুঠোয় একমুঠো আকাশ আর এক আকাশ ক্লান্তি।
মেশিনের ঘর্ঘর শব্দে ডুবে যায় আর্তনাদ,
রক্ত মিশে যায় ঘামে—এই তো রুজির লড়াই।
কারখানার ধুলোয় ঢাকা মুখাবয়ব,
চোখেমুখে লেগে আছে দীর্ঘদিনের অনাহার।
বসের ধমক, বকেয়া বেতন, আর সংসারের টানাপোড়েন—
সব কিছু পিষে মরে শিরদাঁড়ার নিচে।
তবুও দিনশেষে বাড়ি ফেরার পথে
মেয়ের জন্য কেনা একটা লজেন্সের হাসি—
সেটাই আমার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।
কে বলে আমরা ছোট? আমরা তো ভিত্তিপ্রস্তর,
আমাদের কাঁধের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে এই শহর।
জল আসে চোখে, যখন দেখি নিজের হাত
নিজেরই গড়া প্রাসাদের দরজার বাইরে থাকে।
কিন্তু আমরা জানি, মাথা নোয়ানো বারণ,
আমরা লড়ি, কারণ না লড়লে অস্তিত্ব মুছে যাবে।
এই দহন, এই লড়াই, এই চোখের জল—
আমাদের সংগ্রামের জলছবি হয়ে অমর থাকবে।
নিঃসঙ্গ লড়াই
চারপাশের কোলাহলে আমি এক দ্বীপ,
একাকী দাঁড়িয়ে আছি প্রবল ঝড়ের মুখে।
সবাই যখন মিথ্যে জয়ের মিছিলে সামিল,
আমি তখন একা সত্যের ঝান্ডা ধরে।
লোকে বলে, তুই বোকা, মানিয়ে নিতে শিখ,
মেরুদণ্ড কি একটু বাঁকালে দোষ কি তাতে?
আমি শুধু হাসি, চোখ ঝাপসা হয় অভিমানে,
যে শিরদাঁড়া সোজা রাখা শিখিয়েছে মাটি,
তাকে বাঁকানো তো নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন।
মানুষের মুখোশ পরা দানবদের ভিড়ে
আমি এখনো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি।
বুকের ভেতর চেপে রাখা কষ্টগুলো
রাতের অন্ধকারে মুক্তোর মতো ঝরে পড়ে।
কোনো স্বীকৃতি নেই, নেই কোনো পদক,
কেবল নিজের কাছে স্বচ্ছ থাকার অঙ্গীকার।
অনেক তো হলো, এবার একটু থামি?
না, থামার মানেই তো হেরে যাওয়া চিরকাল।
আবার নতুন করে বাঁধি চুলে ফিতে,
চোখের জল মুছে আবার হাঁটা দিই পথে।
পৃথিবীর সকল দম্ভকে হার মানাতে,
একলা লড়ে যাওয়াটাই আমার ধর্ম।
নীরব আর্তনাদ
শহরের জাঁকজমকে আমরা এক টুকরো ছাই,
যার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু কোনো স্বীকৃতি নেই।
ফুটপাতে রাতে শুয়ে যখন দেখি আকাশের তারা,
তখন মনে হয়—আমরাই বোধহয় পৃথিবীর সেরা।
পকেট খালি, কিন্তু বুকটা বিশাল,
বঞ্চিত হয়েও আমরা বিলিয়ে দিই ভালোবাসা।
চোখে জল আসে যখন দেখি আপনজনদের অবহেলা,
পেটের ক্ষুধার চেয়ে মনের ক্ষিদে বড় হয়ে বাজে।
তবুও শিরদাঁড়া সোজা—আমরা কারোর করুণা চাই না,
আমরা নিজের ঘামেই নিজের ভাগ্য গড়ি।
দিনের শেষে আয়নায় দেখি ক্লান্ত এক পথিক,
যার চোখে স্বপ্ন আছে, আছে বাঁচার তীব্র নেশা।
কেউ দেখছে না আমার ভেতরের এই ক্ষত,
কেউ শুনছে না আমার নীরব আর্তনাদ।
তাতে কি? আকাশ তো দেখছে সব,
মাটি তো জানে আমার কতখানি ভার সইবার ক্ষমতা।
আমরা লড়ছি, লড়ব, যতক্ষণ হৃদয়ে স্পন্দন,
শিরদাঁড়া সোজা রেখে মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়ালেও—
আমরা অপরাজিত, আমরাই শাশ্বত জীবন।

Comments
Post a Comment