ফুচকা থেরাপি
অরিন্দম পাল
বাঙালী স্বাস্থ্য নিয়ে যতটা উদাসীন, তেমন জাতি আর একটাও আছে কিনা সন্দেহ। নিজের পেটটা যখন নৈমিত্তিক সূর্যোদয়ের মতো প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হতে লাগল, আয়নায় নিজের মুখ দেখতে ইচ্ছে করত না। বাইরে গেলে লজ্জায় প্রায় খাওয়া বন্ধ। শার্ট দিয়ে যতই ঢাকি, ভুঁড়ি প্রকাশ্যে সভা ডাকে।
লজ্জা, তিরস্কার, আর কিঞ্চিৎ আত্মসম্মান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম—জিমে ভর্তি হবো। পাড়ায় মোড়ে ‘ফিটনাসটিক জিম সেন্টার’—দোতলা, কাচের দেওয়াল। এমন কাচ যে ভেতরে আমি স্কোয়াট দিলেও বাইরে থেকে পাড়ার কাকু হাত নেড়ে বলবেন, “ভালো করছো বাবা, বসো… বসো…”—মানে আরেক সেট!
ইন্সট্রাক্টর গম্ভীর গলায় বললেন, “গোল শরীর নয়, V-শেপ চাই।”
প্রথম দিনেই ‘ওয়ার্ম-আপ’ শুনে ভেবেছিলাম গরম স্যুপ কিছু দেয় কি না। কেননা রোগা হওয়ার জন্য আগে অনেক রকম টোটকা যেমন ওটস, লেবু জল, গ্রিন টি, কি না ট্রাই করেছি!! না, এই সব কিছু নয়, ওটা আসলে হাঁসফাঁস। পাঁচ মিনিট ট্রেডমিলে দৌড়ে এমন হাঁপাচ্ছি যে মনে হচ্ছে শরীর থেকে হৃদপিণ্ড, লান্স, লিভার সব বেরিয়ে চলে আসবে।
ইন্সট্রাক্টরের দয়ার সীমা নেই:
— “আরও দশটা ক্রাঞ্চ।”
— “আরও পাঁচটা। পাঁচটা তো আর সংখ্যা না, হাওয়া!”
— “বুকডাউন—স্টাইল বদলাও। হাত নামিয়ে, পা ফাঁক করে, বুক নিচে।”
আমি মুখ বুজে সব সহ্য করি। বাড়ি ফিরে থালা থেকে ভাত তোলার সময় বাইসেপ ফুলেছে কি না দেখে নিই!
উৎসাহের চূড়োতে সকাল-বিকেল দুই বেলা। সকালে “পেট”, রাতে “চেস্ট”—শরীরটাকে আমি তখন যেন সময়সূচি মেনে বিভাগীয় অফিসে পাঠাই। দিন যায়; ইন্সট্রাক্টরও খাতা দেখে দেখে ওজন বাড়ান—ওজন কমাতে গেলে বুঝি ওজনই তুলতে হয়।
এক বছর পর এল ডাম্বেল–বারবেল—লোহার সঙ্গে বন্ধুত্ব।
সব ঠিকঠাকই চলছিল—যতক্ষণ না জিমের ঠিক নিচে একটা ফুচকাওয়ালা বসলো। কাচের দেওয়াল দিয়ে ট্রেডমিলে হেঁটে হেঁটে দেখি—তেঁতুলজলের উপর পুদিনাপাতা, ধনেপাতা, কাঁচালঙ্কা ভাসছে, জিভে জল চলে আসে।
সেদিন জিমশেষে ফুচকার দোকান ফাঁকা দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম —
— “ বেশি নয় দশ টাকার দাও।”
চার খান কোন দিকে যেন উড়ে গেল।
— “আরো দাও।”
আরও আট খানা যেন আহ্লাদে আটখানা।
— “আচ্ছা, এবার শেষ কর ভাই।”
শেষ তো আর শেষ হয় না। ঘড়ির কাঁটা, পেট, আর বিবেক—তিনটেই তখন উল্টো দিকে ঘুরছে।
ঠিক তখনই বিপর্যয়। এক ফুচকা মুখে পুরে চোয়াল আর নিচে নামে না। চোয়াল লক। “হা” করে মুখ খোলা, তারপর আর বন্ধ হয় না। না চিবোতে পারি, না গিলতে পারি, না বলতে পারি। ফুচকার ঝাল চোখ দিয়ে টপটপ পড়ছে; লোকজন ভাবছে আবেগাপ্লুত হয়ে খেলাম বোধহয়!
কষ্টেসৃষ্টে টাকা মিটিয়ে বাড়ি ফিরলাম। মুখে বলে তো আর বোঝানো যায় না—তাই খাতা-কলম। বড় বড় হরফে লিখলাম—“জিম করতে গিয়ে হয়েছে।” সত্যিটা—“ফুচকা”—বন্ধনীতে রেখে দিলাম, পারিবারিক শান্তির স্বার্থে।
রাতে লিকুইড ডায়েট—ডাল ঝোল, স্যুপ, দুধ; চিবোনো অসম্ভব। খাবার ঢেলে দিলে নিজে থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়, আমি শুধু প্রার্থনা করি, “ওম নমঃ শ্লিপ্ অফ গলা।”
পরদিন সকালে দাঁতের ডাক্তারের কাছে গেলাম। তিনি আমার চোয়াল পরীক্ষা করে দুবার দাঁতে হাতুড়ি মেরে বললেন,
— “এটা আমার কাম নয়।”
গিন্নি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কাদের কাছে যাবো?”
— “ফিজিওথেরাপিস্ট।”
মনে হলো, শরীরটা এখন সরকারি অফিসের মতো—এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল ঘুরছে।
ফিজিও সেন্টারে গিয়ে দেখি এক ভদ্রলোকের হাত হ্যাঙারের মতো ঝুলছে—“বেঞ্চ প্রেস”; আরেকজনের ঘাড় গাছের ডালের মতো বাঁকা—“ডেডলিফ্ট”; একজন হাঁটছেন গরুর ঘণ্টার ছন্দে—“লাঞ্জ”। সবাই এক সুরে বলছে, “জিম লাইফ বড় খারাপ।” আমি কোন মন্তব্য করতে পারছি না কেননা আমার গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না। হাঁ করে ইডলি বলার মত অবস্থা।
কয়েকদিন ধরে থেরাপি—গরম প্যাক, ঠান্ডা প্যাক, অদ্ভুত সব নড়াচড়া—“আ, ই, উ”—আমি অক্ষরপরিচয় পাশ করে ফেললাম। অবশেষে চোয়াল ফিরল আগের ঠিকানায়। আবার কথা বলে শান্তি, খেয়ে শান্তি, ঝগড়া করে তো দ্বিগুণ শান্তি।
এই সময়ে অপ্রত্যাশিত সুখবর—ওজন কয়েক কেজি কমে গেছে। কারণ? সম্পূর্ণ তরল জীবন। বুঝলাম, ডায়েট চার্টে নতুন অধ্যায় লেখার সময় এসেছে—“চোয়াল-ফ্রেন্ডলি খাদ্যসূচি” তারই বাই প্রোডাক্ট “ওয়েইট লস”।
তারপর থেকে গিন্নির সিদ্ধান্ত—জিম আর কখনোই না। কে জানে, কাল আবার কোন যন্ত্রে কী লক হবে!
আর আমার সিদ্ধান্ত, ফুচকা? হ্যাঁ, সেটাই খাব।
যাইহোক, ফুচকা মাতার কৃপায় এই সময়ে অপ্রত্যাশিত শরীরের ওজনটা তো কিছুটা কমানো গেল—যতই তরল খাবারের কারণে কয়েক কেজি ওজন কমুক না কেন?
তাই বুঝলাম, জিম নয়, আসল ওষুধ লুকিয়ে আছে ফুচকার ভেতরে। যদি ফুচকা খেয়ে চোয়াল লক হয়, আর সেই কারণে ওজন কমে যায়—তাহলে ফুচকাই তো একরকম ফিটনেস ডায়েট, শুধু একটু অন্যরকম পদ্ধতিতে! ঠিক যেমনটি গোটস (ছাগল)কে ওটস খাইয়ে চিরকাল গোটস খাওয়ার পক্ষে ছিলাম আমি। আজও।
তারপর থেকে পাকা সিদ্ধান্ত নিয়েছি—ওজন বাড়লে জিম নয়, সরাসরি ফুচকা। তবে এখন নয় কিছুদিন বিরিয়ানি, মোগলাই, চিকেন তন্দুর, মাটন চাপ খেতে হবে। তারপর আবার যদি পেট বাড়ে তখন ফুচকা।
Comments
Post a Comment