অভিসার
রণেশ রায়
টেবিলের ওপর হা করে তাকিয়ে। এখনও কলঙ্কিত হয় নি। পাশে ফাউন্টেন পেনটা শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। নিরালা দুপুরে আমি একাই বসে আছি ঘরের কোণে। চারপাশটা বড্ড নিঝুম। আমার সামনের ওই ডায়েরি আর কলমটাই এখন আমার একমাত্র নিঃশব্দ বন্ধু। ওরা তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আর আমি তাকিয়ে আছি ওদের দিকে। এক ফোঁটা শব্দ নেই, কোনো ভাবনাও মাথায় খেলছে না। আমি চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছি—কখন এই নীরবতা ভেঙে মনের ভেতর থেকে কোনো শব্দ জেগে উঠবে, সাদা পাতাটা প্রাণ পাবে।
ঠিক এই অলস মুহূর্তে হুট করে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো—খট খট খট! খুব বিরক্তি লাগল। এই তপ্ত দুপুরে, যখন সবাই একটু জিরিয়ে নেয়, তখন কে আবার জ্বালাতে এল? নিশ্চয়ই ওই হাবুটা হবে! ছেলেটার একদম কাণ্ডজ্ঞান নেই। সময়-অসময় বোঝে না, হুটহাট চলে আসে। এখন এসে হয়তো বলবে, "কী রে, চল একটু চা খেয়ে আসি" কিংবা কোনো পরনিন্দা-পরচর্চা নিয়ে বসবে। এসে ফালতু বকবক করবে আর আমার এই লেখার মুহূর্তটা, মূল্যবান সময়টা এক্কেবারে নষ্ট করবে। মনে মনে হাবুর ওপর চটে গিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। ভাবলাম, সাড়া না পেয়ে চলে যাবে।
কিন্তু না! আবার কড়া নাড়ার শব্দ—'টক, টক, টক'। এবার শব্দটা যেন একটু চেনা, একটু নরম।
বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে গেল। ধড়ফড় করে উঠে গিয়ে ঝটপট দরজাটা খুললাম, হাবুকে আজ কড়া দুটো কথা শুনিয়ে দেব বলে। কিন্তু দরজা খুলতেই আমার ভেতরের সব রাগ এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল! আমার চোখ দুটো চড়কগাছ!
সামনে কোনো হাবু দাঁড়িয়ে নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আমার শৈশবের সেই প্রিয় বান্ধবী—স্মৃতি ! সেই চিরচেনা মিষ্টি হাসিটা মুখে নিয়ে সে আমার সামনে হাজির। তাকে দেখে আমার বুকের ভেতরটা আনন্দে তোলপাড় হয়ে উঠল। যারপরনাই খুশি হয়ে আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। স্মৃতির উপস্থিতিতে আমার এই একাকী একঘেয়ে ঘরটা যেন এক নিমেষে মায়াবী আলোয় ভরে গেল।
সে এক মাথা ভর্তি জীবন-কথার ডালি নিয়ে এসেছে। আমরা দুজনে ঘরে এসে বসতেই স্মৃতির ঝুলিতে ভরা আমাদের ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর উপহার একে একে খুলতে লাগল। স্মৃতির চোখের দিকে তাকাতেই আমার মনে পড়ে গেল আমাদের কত শত কাণ্ড!
মনে পড়ে গেল সেই বৈশাখের দুপুরের কথা, যখন পাড়ার সবাই ঘুমাত আর আমি আর স্মৃতি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে যেতাম বাগানে। চৈত্র-বৈশাখের কড়া রোদে গাছের তলা থেকে কুড়িয়ে আনা কাঁচা আম আর স্মৃতি তার ঘর থেকে চুরি করে আনা নুন-লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে সেই যে আম মাখা বানাত—তার স্বাদ যেন আজও আমার জিভে লেগে আছে। স্মৃতি হাসতে হাসতে মনে করিয়ে দিল সেই বৃষ্টির দিনের কথা, যেদিন স্কুলের খাতা থেকে পাতা ছিঁড়ে আমরা কাগজের নৌকা বানিয়ে ড্রেনের জলে ভাসিয়ে দিতাম। কার নৌকা কতদূর গেল, তা নিয়ে স্মৃতির সেই চিল-চিৎকার আর খুনসুটি আজও আমার কানে বাজে।
যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে যেসব কথা, যেসব সোনালী মুহূর্ত আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার বান্ধবী স্মৃতি আজ সেই বিস্মৃত অতীত আমার সামনে চমৎকার করে মেলে ধরতে লাগল।
স্মৃতির সেই স্নিগ্ধ সান্নিধ্যে আমার ঘরের পরিবেশটাই বদলে গেল। টেবিলের ওপর শুয়ে থাকা ওই 'নিঃশব্দ বন্ধু' অর্থাৎ আমার কলমটা যেন হরষে জেগে উঠল। এতক্ষণের মোহ-ঘোর, অলসতা আর একাকীত্ব কেটে গেল এক তুড়িতে। মনের ভেতর জমে থাকা মেঘগুলো যেন বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ার জন্য ছটফট করতে লাগল।
ভাবনার হাওয়া এসে জোর দোলা দিল মনে। স্মৃতি যখন সোফায় বসে পুরোনো দিনের গল্পে মশগুল, আমি তখন টেবিলটায় এসে বসলাম। দেখতে দেখতে শব্দেরা একে একে ডায়েরির পাতায় রাজকীয় পোশাকে সেজে উঠতে লাগল। কলমের প্রতিটা খোঁচায়, কথার পিঠে কথায়, ডায়েরির সাদা পাতা জুড়ে টুপটাপ ফুটে উঠল এক অনবদ্য কবিতার ফুল।

Comments
Post a Comment