কদমফুলের ভালোবাসা
তপন মাইতি
রথযাত্রার দিন মানেই আকাশে মেঘের ভেলা, বাতাসে কদমফুলের গন্ধ, আর ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির টুপটাপ সুর। স্কুলের ইউনিফর্ম পরে শুভ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মাঠের ওপারে কদমগাছটা যেন আজও অপেক্ষা করছে কারও জন্য। দিশা সেদিন ছাতা হাতে স্কুলে ঢুকেছিল। ভেজা চুলের ডগা থেকে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল কাঁধে। শুভ তাকিয়ে ছিল, আর দিশা চোখ তুলে হেসে বলেছিল—'এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?' শুভ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করেছিল। সেদিনই তাদের বন্ধুত্বের শুরু। তারপর থেকে রোজই টিফিনে দেখা, লাইব্রেরির বই আদান-প্রদান, খাতার পাতায় ছোট ছোট নোট। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব এমন জায়গায় পৌঁছাল, যেখানে কথা না বললেও দুজনেই একে অন্যের মনের ভাষা বুঝে ফেলত। রথের মেলা এল।
স্কুলে যাওয়ার কথা থাকলেও সেদিন দুজনেই ঠিক করল, কয়েক ঘণ্টা মেলা ঘুরে আবার বাড়ি ফিরবে। দুপুরের দিকে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি নেমে এল। তারা পাশাপাশি হাঁটছিল। চারদিকে রথের ঢাক, শঙ্খধ্বনি, জিলিপির গন্ধ আর ভেজা মাটির সুবাস। দিশা বলল, —'জানো, এই বৃষ্টি আমার খুব প্রিয়।' শুভ হেসে উত্তর দিল, —'আজ থেকে আমারও।' একটি কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে তারা বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছিল। বাতাসে কদমফুল দুলছিল। দিশা একটি ঝরে পড়া কদমফুল তুলে শুভর হাতে দিয়ে বলল,—'এটা রেখে দিও। অনেক বছর পরে যদি আমরা এই দিনটা ভুলে যাই, ফুলটা মনে করিয়ে দেবে।' সেই ছোট্ট উপহার শুভর কাছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হয়ে উঠল। সন্ধ্যা নামার পর শুরু হল লুকিয়ে লুকিয়ে ফোনে কথা বলা। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে শুভ বারান্দায় চলে আসত। দিশাও জানালার পাশে দাঁড়াত।
—'ঘুমাওনি?'
—'না। তোমার সঙ্গে কথা না বলে ঘুম আসে?'
এভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত। কখনও পড়াশোনার গল্প, কখনও ভবিষ্যতের স্বপ্ন, কখনও শুধু নীরবতা—তবু সেই নীরবতারও ছিল নিজস্ব ভাষা। একদিন প্রবল বৃষ্টিতে স্কুল ছুটি হয়ে গেল। ফেরার পথে রাস্তা জলে ভরে গেছে। দুজন পাশাপাশি হাঁটছে। হঠাৎ দিশা পিছলে যেতে উদ্যত হলে শুভ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার হাত ধরে ফেলল, যাতে সে পড়ে না যায়। এক মুহূর্তের সেই স্পর্শে দুজনেই থমকে গেল। কোনো বাড়াবাড়ি নয়, শুধু একজন আরেকজনকে নিরাপদে রাখার আন্তরিকতা। দিশা মৃদু হেসে বলল,
—'আজ যদি তুমি না থাকতে...'
শুভ উত্তর দিল,—'আমি থাকব। যতদিন পারি, তোমার পাশে থাকব।'
সেদিনের সেই হাত ধরা ছিল বিশ্বাসের, নির্ভরতার, আর প্রথম ভালোবাসার নীরব প্রতিশ্রুতি। বর্ষার বিকেলগুলো এরপর আরও রঙিন হয়ে উঠল। স্কুল ছুটির পরে তারা মাঝে মাঝে পুকুরপাড়ে বসে বৃষ্টির জল পড়া দেখত, কদমফুল কুড়িয়ে বইয়ের পাতায় শুকিয়ে রাখত, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন বুনত।
দিশা বলত,—'যদি কোনোদিন আমরা খুব ব্যস্ত হয়ে যাই?'
শুভ মুচকি হেসে বলত,—'তাহলে রথের দিন কদমফুলের গন্ধ পেলেই আমরা আবার এই বিকেলে ফিরে আসব।'
বছর কেটে গেল। স্কুলজীবন শেষ হল। নতুন পথ, নতুন দায়িত্ব, নতুন শহর—সবকিছু বদলে গেল। তবু প্রতি রথযাত্রায় যখন আকাশে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি নামে, যখন কদমফুলের গন্ধ ভেসে আসে, শুভর পুরোনো ডায়েরির ভেতর থেকে সেই শুকনো কদমফুলটি যেন আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তার পাতায় আজও লেখা আছে—
'প্রথম ভালোবাসা সব সময় একসঙ্গে পথ চলার গল্প নয়। কখনও কখনও তা কদমফুলের সুবাস, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির স্মৃতি, আর দুটি কিশোর হৃদয়ের নিষ্পাপ বিশ্বাস হয়ে সারাজীবন বেঁচে থাকে।'
রথের রশি যেমন হাজার মানুষের হাত একসঙ্গে টানে, তেমনি জীবনের বহু দূরত্ব পেরিয়েও কিছু সম্পর্ক স্মৃতির অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা থাকে। শুভ আর দিশার স্কুলজীবনের সেই বর্ষাভেজা দিনগুলো তাই শেষ হয়ে যায়নি—প্রতি বর্ষায়, প্রতি কদমফুলে, প্রতি রথযাত্রায় তারা আবার নতুন করে ফিরে আসে।

Comments
Post a Comment