এক অপূর্ণ ভালোবাসা
সারাবান তহুরা মৌমিতা
ভালোবাসার মানুষ কি অশান্তি দেয়? হয় তো না। কিন্তু কিছু মানুষ নিজের অজান্তে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের জীবনে অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে। এই অশান্তি জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে খারাপ কিছু বয়ে নিয়ে আসে।
মনি তখন নবম শ্রেণির ছাত্রী। একদিন বাবাকে চিকিৎসার জন্য এক ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যায়। ডাক্তার তার বাবার চিকিৎসা চালায়। চেম্বারে যাতায়াত করতে করতে সেই ডাক্তারের সাথে তার বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
চেম্বারেই তাদের প্রথম পরিচয়। ভালোবাসা কখন, কোথায়, কীভাবে এসে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তা কেউ বলতে পারে না। কিশোরী মন অজান্তেই সেই ডাক্তারকে ভালোবেসে ফেলে।
চিকিৎসা শেষে ডাক্তার নিজের ব্যক্তিগত নম্বর দিয়ে বলেছিলেন, কোনো প্রয়োজন হলে যেন যোগাযোগ করে। যেহেতু ডাক্তারকে তার ভালো লেগে যায়, তাই সে মনে মনে খুশি হলো।
বাসায় ফিরেই মনির প্রথম কাজ হলো তাকে একটি বার্তা পাঠানো। সে বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই বার্তা পাঠিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে উত্তরও পেয়ে গেল। সেই ছোট্ট উত্তরই তার মনে এক বিশাল আশার জন্ম দেয়। সে ভাবতে শুরু করে, হয়তো ডাক্তারও তাকে আলাদা করে গুরুত্ব দেন।
এরপর প্রায় ছয় মাস তাদের মাঝে মাঝেই কথা হতো। ধীরে ধীরে মনির অনুভূতি আরও গভীর হতে থাকে। একসময় আর নিজের মনের কথা লুকিয়ে রাখতে না পেরে সে ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেয়।
ডাক্তার শান্তভাবে বলেন, "এখন প্রেম করার বয়স নয়। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হও। একদিন দেখবে, আমার থেকেও ভালো মানুষ তোমার জীবনে আসবে।"
এই কথাগুলো মনির হৃদয় ভেঙে দেয়। তার কাছে অন্য কাউকে নয়, শুধু সেই মানুষটিকেই প্রয়োজন ছিল। এরপর থেকে ডাক্তার কখনো তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিতেন, আবার কয়েকদিন পর ব্লক খুলে দিতেন। আমি বুঝি না এই কাজটা করার কি দরকার ছিল তার? তাকে সে ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করত মনে হয়। এই অনিশ্চয়তা মনিকে আরও অস্থির করে তুলত। সে বুঝতে পারত না আসলে ডাক্তার তাকে ভালোবাসত নাকি বাসত না? ব্লক খুললেই সে এক মুহূর্ত কথা বলার আশায় অপেক্ষা করত।
দিন গড়াতে থাকে। এসএসসি ও এইচএসসি পেরিয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় আসে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে এসে তার মনে পরীক্ষার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় আরেকটি ইচ্ছা, একবার সেই ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করা। তখন তার চেম্বার দিনাজপুরেই ছিল। কিন্তু মনি জানত না চেম্বারের লোকেশন। যেহেতু ডাক্তার মানুষ তাই সে সকলকে জিজ্ঞাসা করতে করতেই অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে ডাক্তারের চেম্বারে পৌঁছে যায়।
হঠাৎ তাকে সামনে দেখে ডাক্তার অবাক হয়ে বলেন, "তুমি কি পাগল? এসব না করে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবো। মন দিয়ে পড়াশোনা করো।"
মনি কোনো উত্তর দিতে পারেনি। নীরবে সেখান থেকে ফিরে আসে। কিন্তু ফিরে এলেও মনটা আর ফেরাতে পারেনি।
আজ সে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সময় অনেক পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তার হৃদয়ে সেই মানুষটির জন্য অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি। হয়তো সে জানে, এই অপেক্ষার কোনো শেষ নেই। তবুও মনের এক কোণে এখনো একটি ক্ষীণ আশা বেঁচে আছে। যদি কোনো একদিন সেই মানুষটি ফিরে আসে, যদি একবার তার ভালোবাসাকে বুঝতে পারে, যদি একদিন এই অপূর্ণ ভালোবাসা পূর্ণতা পায়।
কিন্তু জীবনের সব গল্প পূর্ণতা পায় না। কিছু গল্প অসম্পূর্ণ বলেই হয়তো মানুষের মনে আজীবন বেঁচে থাকে।
...............................
সারাবান তহুরা মৌমিতা
অনার্স চতুর্থ বর্ষ
দিনাজপুর সরকারি কলেজ

Comments
Post a Comment