দাদা ঠাকুর ও কাজী নজরুলের দ্বিমুখী সখ্যতা
আবদুস সালাম
কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে দাদাঠাকুরের পরিচয় কীভাবে হয়, সেই প্রসঙ্গে আলোকপাত করেন আবদুল আযীয আল-আমান। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়, নলিনীকান্ত সরকার মহাশয়ের মাধ্যমে দাদাঠাকুরের সঙ্গে নজরুলের প্রথম পরিচয় হয়। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তখনও প্রকাশিত হয়নি। মোসলেম ভারতে প্রকাশিত কবির কয়েকটি কবিতা নিয়ে বাংলার সাহিত্যিক, কবি, পাঠক, সমালোচক মহলে রীতিমতো উঠেছে আলোড়ন। সেই সময় দাদাঠাকুরের সঙ্গে নজরুলের প্রথম আলাপ।
*"দাদাঠাকুর" ওরফে শরৎচন্দ্র পণ্ডিত – ১৯ শতকের শেষ আর ২০ শতকের প্রথম দিকের এক তুখোড় ব্যঙ্গকার, সাংবাদিক এবং নাট্যকার। উনার "জঙ্গম" পত্রিকা তখন কলকাতার সাহিত্য-রাজনীতির আখড়া ।সবাই মুখিয়ে থাকতো কখন আসছে “জঙ্গম”। সারাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর শ্লেষাত্মক ছড়া।
কাজী নজরুল ইসলাম তখন সদ্য সাহিত্য জগতে এসেছেন। এসেই সাহিত্যের আঙিনায় তুলেছেন ঝড়। অসহ্য।কোথাকার এক গেঁয়ো- ভূত এসে তছনছ করে দিচ্ছে সব হিসেব । কিছুতেই কেউ যেন মেলাতে পারছে না অঙ্ক ।বিভিন্ন আলাপ আলোচনা ও সমসাময়িক বহু কলমচীর কথায় উঠে আসে দাদা ঠাকুর ও নজরুল প্রসঙ্গ। এই প্রসঙ্গটি অনেকটাই অসস্তিকর।
দাদাঠাকুর কি কাজী নজরুল ইসলামের উত্থান মেনে নিতে পারেননি?
সাহিত্য ও সাহিত্যের শালীনতা নিয়ে আপত্তি।
ভাষার ব্যবহার। ছন্দ, বিষয় নির্বাচন। সমাজ আর রাজনীতি নিয়ে দূরত্ব।
ব্যক্তিগত জায়গা হারানোর ভয়।
হ্যাঁ, পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি। তবে কারণটা শুধু হিংসা না। এর পিছনে সাহিত্য, সমাজ আর ব্যক্তিগত অবস্থানের লড়াই ছিল।
*১. সাহিত্য নিয়ে আপত্তি –: আরবি- ফার্সি- বাংলা মিশিয়ে একটি খিঁচুড়ী শব্দের অশালীন,অমার্জিত উচ্চারণ "এগুলো কি কবিতা হলো?"
দাদাঠাকুর ছিলেন ক্লাসিকাল ধাঁচের লোক। ওনার অস্ত্র ছিল শ্লেষ, কটাক্ষ,সংস্কৃত-ঘেঁষা ভাষা। "জঙ্গম"-এ উনি সমাজের ভণ্ডামি ফাঁস করতেন, কিন্তু ভাষাটা ছিল নিয়ন্ত্রিত, বাঁধা ছন্দের বাঁধন।
নজরুল যখন এলেন, তখন তিনি নিয়ম ভাঙার বন্যায় ভাসিয়ে দিতে চাইলেন। নিয়ে এলেন নতুন মাত্রা।
ভাষা:- চলতি, ফার্সি, আরবি মেশানো। "বিদ্রোহী"-তে "বল বীর, বল উন্নত মমশির" – এটা দাদাঠাকুরের কানে বড্ড ঠেকেছিল। ওনার কাছে এটা ছিল "উচ্ছৃঙ্খল" ভাষার বেসাতি।
- *ছন্দ*:- মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ভেঙে নতুন তাল। দাদাঠাকুর, যিনি নিজে পয়ার-ত্রিপদী নিয়ে কারবার করতেন, তার কাছে এটা ছিল সাহিত্যের শৃঙ্খলা ভাঙা উচ্ছৃঙ্খলতা। এটা তিনি কোনো মতেই মেনে নিতে পারেন নি।
*বিষয়*: নজরুল সরাসরি ব্রিটিশকে গালাগাল দিলেন,নিলেন আল্লাহ-খোদার নাম। বললেন দলিত-মজুরদের কথা। দাদাঠাকুর ব্যঙ্গ করে সমাজের অসংগতি গুলো তুলে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে এনে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু সরাসরি বিদ্রোহের ডাক দিতে পারেন নি।
সোজা কথা :- দাদাঠাকুর ভাবতেন, সাহিত্যের একটা "ভদ্রতা" আছে। নজরুল সেই ভদ্রতার গলা টিপে ধরতে শুরু করেছে।
২. সমাজ আর রাজনীতি নিয়ে দূরত্ব:-
দাদাঠাকুর ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজ ঘেঁষা, শহুরে, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী। নজরুল ছিলেন গেঁয়ো হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এক সামরিক বাহিনীর ছোকরা।
দাদাঠাকুর হিন্দু-মুসলিম সমস্যাকে ব্যঙ্গ করতেন । আর নজরুল বলছেন "হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?" – এইভাবে ধর্মের দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছেন।
- নজরুল যখন "ধূমকেতু" পত্রিকায় আগুন ছড়ালেন, দাদাঠাকুরের "জঙ্গম" তখনও শ্লেষের সীমানায় ছিল। নজরুলের গতি আর সাহস, দাদাঠাকুরের পুরনো কাঠামোয় ধাক্কা দিল।
*৩. ব্যক্তিগত জায়গা হারানোর ভয়*
এটাও অস্বীকার করা যায় না। দাদাঠাকুর তখন "ব্যঙ্গ-সাহিত্যের রাজা"। হঠাৎ করে এল নজরুল – আরও তরুণ, আরও জোরালো, আরও জনপ্রিয়। "বিদ্রোহী" বেরোনোর পর গোটা বাংলা নজরুলময়। দাদাঠাকুরের স্পেসটা ছোট হয়ে এল।
ওনার "জঙ্গম"-এ নজরুলকে নিয়ে কিছু কটাক্ষও বেরিয়েছিল। সরাসরি আক্রমণ না, কিন্তু "এইসব চিৎকারে সাহিত্য হয় না" – এই টোন ছিল।
*তবে পুরো ছবিটা এটাও না*
দাদাঠাকুর নজরুলকে একেবারে উড়িয়ে দেননি। নজরুলের প্রতিভা উনি অস্বীকার করতে পারেননি। পরে নজরুলের গান, নাটকও প্রশংসা করেছেন। সমস্যা ছিল পদ্ধতি নিয়ে, প্রতিভা নিয়ে না।
*এক কথায় বললে:*
দাদাঠাকুর ছিলেন পুরনো প্রাসাদের রক্ষী। নজরুল এসে প্রাসাদের দেওয়াল ভেঙে রাস্তায় নেমে এলেন। রক্ষীর কাজই হল চেঁচানো – "এভাবে হয় না"। কিন্তু জনতা ততদিনে রাস্তায় নেমে গেছে।
দাদাঠাকুর ছিলেন শ্লেষের সাপ, নজরুল ছিলেন বিদ্রোহের সাপ। দুজনের ছোবলের ধরণ আলাদা, কিন্তু দুজনেই সমাজের পচা অংশে কামড় বসিয়েছিলেন।
প্রশ্নটা আসলে এখানেই – *দাদাঠাকুর কি নজরুলকে পাশ কাটাতে চেয়েছিলেন? আর যদি চান, তবে সেটা ধর্মীয় ভণ্ডামি, নাকি শহুরে-গেঁয়ো সংস্কৃতির ধাক্কা?*
উত্তরটা সাদা-কালো না। তিনটে রং মিশে আছে:
*১. "পাশ কাটানো" – হ্যাঁ, কিছুটা ছিলই*
দাদাঠাকুর কৌশলী লোক ছিলেন। নজরুলকে সরাসরি গালাগালি করলে নিজেরই স্ট্যান্ডার্ড নষ্ট হত। তাই উনি করলেন দুটো কাজ:
- *চুপ করে থাকা*: "বিদ্রোহী" বেরোনোর পর গোটা বাংলা যখন নজরুল নিয়ে পাগল, "জঙ্গম"-এ প্রথম দিকে নজরুলের নাম উচ্চারণই করেননি। এটাই সবচেয়ে বড় পাশ কাটানো। আলোচনা না করলে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠা যায় না।
- *ক্লাসের তাস খেলা*: যখন লিখলেন, তখন নজরুলের "ভাষার উচ্ছৃঙ্খলতা" আর "ছন্দের অনাচার" নিয়ে কথা বললেন। মানে, "ছেলেটার সাহস আছে, কিন্তু সাহিত্য জানে না" – এই টোন। এটা এক ধরণের ভদ্রভাবে সরিয়ে দেওয়া।
তাই হ্যাঁ, পাশ কাটানোর চেষ্টা ছিল। কারণ নজরুলের সামনে দাঁড়ালে দাদাঠাকুরের পুরনো অস্ত্র ভোঁতা হয়ে যেত।
*২. এটা কি ধর্মীয় ভণ্ডামি? – পুরোপুরি না*
দাদাঠাকুরকে "হিন্দু ভণ্ড" বলা যাবে না। কেন?
- উনি নিজেই ব্রাহ্ম সমাজের লোক। মূর্তি পূজা, পুরুততন্ত্র – এসব নিয়ে সারাজীবন ব্যঙ্গ করেছেন।
- নজরুল যখন "আল্লাহ-ভগবান এক" বললেন, দাদাঠাকুরের আপত্তি সেখানে ছিল না। বরং নজরুলের এই সাম্যবাদ দাদাঠাকুরের ব্রাহ্ম আদর্শের কাছাকাছিই।
তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যা ছিল *"ভাষায় মুসলমানি গন্ধ"* নিয়ে। নজরুল ফার্সি-আরবি শব্দ, "মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই" – এগুলো ব্যবহার করলেন। দাদাঠাকুরের মতো শুদ্ধ সংস্কৃত-বাংলার লোকের কাছে এটা "বিদেশী" লাগল। এটা ধর্মীয় ভণ্ডামি না, এটা ভাষাগত রক্ষণশীলতা।
*৩. আসল লড়াইটা ছিল – শহুরে বাবু বনাম গেঁয়ো কবি*
এটাই মূল জায়গা।
দাদাঠাকুর শহরের লোক। নজরুল গ্রাম থেকে উঠে আসা এক মেকি বাবু।
দাদাঠাকুর কলকাতার বাবু সমাজে এক পরিচিত নাম পোশাক-আষাক, চালচলন, ভাষা – সব "ভদ্রসমাজের" মতো।
অন্যদিকে গ্রামের ছেলে। লেটোর দলে গান গেয়ে বড় হওয়া। ভাষায় মাটির গন্ধ।
ব্যঙ্গ করতেন চাবুক মেরে। শ্লেষ, উপমা, সংস্কৃত শব্দ। বিদ্রোহ করতেন আগুন ছুঁড়ে। চিৎকার, গর্জন, চলতি কথা।
সাহিত্য মানে নিয়ম, ছন্দ, শৃঙ্খলা। সাহিত্য মানে ভেঙে ফেলা, নতুন গড়া।
পাঠক ছিলেন শহুরে মধ্যবিত্ত। পাঠক ছিলেন ছাত্র, মজুর, গরিব মানুষ।
দাদাঠাকুরের আপত্তিটা ছিল – "এই গেঁয়ো ছেলেটা এসে আমাদের সাহিত্যের টেবিলে জুতো পরে বসে পড়ল কেন?"
নজরুলের জবাব ছিল – "টেবিলটা তোমাদের একার না। এটা সবার।"
তাই এটাকে শুধু ধর্মীয় ভণ্ডামি বললে ভুল হবে। এটা ছিল *পুরনো শহুরে এলিট বনাম নতুন গ্রামীণ শক্তির* সংঘাত। দাদাঠাকুর প্রতিনিধিত্ব করতেন পুরনো বাংলার, নজরুল ডাক দিলেন নতুন বাংলার।
*শেষ কথা:*
দাদাঠাকুর নজরুলকে হিংসে করতেন না, ভয় পেতেন। ভয় পেতেন এই কারণে যে, নজরুলের উত্থান মানে দাদাঠাকুরের মতো "ভদ্রলোক ব্যঙ্গকার"-এর যুগ শেষ হওয়া। উনি পাশ কাটাতে চেয়েছিলেন, পারেননি। কারণ নজরুলকে পাশ কাটানো মানে তখন গোটা বাংলাকে পাশ কাটানো।
নজরুল পুরনো কাঠামোয় মেরেছিলেন। দাদাঠাকুর ছিলেন সেই কাঠামোর একজন দারোয়ান। দারোয়ানের কাজই হল চেঁচানো – যতক্ষণ না দরজা ভেঙে পড়ে।
দাদাঠাকুর যে নজরুলের উত্থানকে "এড়িয়ে যেতে" চেয়েছিলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ লুকিয়ে আছে ওনার নিজের লেখাতেই।
*১. সবচেয়ে বড় প্রমাণ – "বিষহীন ঢোড়ার আশীর্বাদ"*
নজরুল যখন ১৯২৩ সালে *"ধূমকেতু"* পত্রিকা বার করলেন, আগুন ছড়াতে শুরু করলেন, তখন দাদাঠাকুর করলেন একটা কাজ। সরাসরি আক্রমণ না, সরাসরি প্রশংসাও না। উনি পাঠালেন একটা "শুভেচ্ছা"।
সেটা কী ছিল জানো?
*"ধূমকেতুর প্রতি বিষহীন ঢোড়ার অযাচিত আশীর্বাদ"
এখানে তিনটে ছোবল আছে একসাথে:
- *"ধূমকেতু"* – নজরুলের পত্রিকার নাম। ধূমকেতু মানে লেজওয়ালা তারা, যেটা এসে তাণ্ডব করে।
- *"বিষহীন ঢোড়া"* – দাদাঠাকুর নিজেকে বলছেন। মানে, "আমি পুরনো সাপ, আমার বিষ নেই। আমি কামড়াই না, শুধু হিসহিস করি।"
- *"অযাচিত আশীর্বাদ"* – মানে, "তুমি চাওনি, তবু আমি আশীর্বাদ করছি।" এটা আসলে ঠাট্টা।
সোজা অনুবাদ: "নজরুল, তুমি ধূমকেতুর মতো তাণ্ডব করছ। আমি বুড়ো ঢোঁড়া সাপ। আমার আর কামড়ানোর ক্ষমতা নেই। তবু তোমায় আশীর্বাদ করলাম – যদিও তুমি চাওনি।"
এটা প্রশংসা না, এটা হল *ভদ্রভাবে নাকচ করে দেওয়া*। "তুমি আগুন, আমি ছাই" – এই ভাব দেখিয়ে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া।
*২. "জঙ্গিপুর সংবাদ"-এ নজরুলের অনুপস্থিতি*
দাদাঠাকুরের "জঙ্গিপুর সংবাদ" তখন মফস্বলের সবচেয়ে বলিষ্ঠ পত্রিকা। ১৯২-২৪ সাল, যখন "বিদ্রোহী", "ধূমকেতু", "অগ্নিবীণা" নিয়ে বাংলা তোলপাড়, তখন "জঙ্গিপুর সংবাদ"-এ নজরুল নিয়ে কোনো জোরালো আলোচনা নেই।
এটাই সবচেয়ে বড় এড়িয়ে যাওয়া। দাদাঠাকুর সবকিছু নিয়েই লিখতেন – কংগ্রেস, গান্ধী, ব্রাহ্মণ্যবাদ, ইংরেজ। কিন্তু নজরুল? চুপ। কারণ লিখলেই স্বীকার করতে হয় – "এই ছেলেটা আমার চেয়ে বড় হয়ে গেছে।"
*৩. ভাষা নিয়ে পরোক্ষ খোঁচা*
দাদাঠাকুরের লেখায় বারবার আসত "শুদ্ধ বাংলা"র কথা। উনি "বিদূষক", "বোতল পুরাণ"-এ হাসির ছলে লিখতেন – "এখনকার কবিরা ফার্সি-আরবি মিশিয়ে ভাষার বারোটা বাজাচ্ছে।"
নাম করতেন না, কিন্তু তীরটা নজরুলের দিকেই যেত। নজরুলের "মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই" বা "বল বীর, বল উন্নত মম শির" – দাদাঠাকুরের কানে এগুলো ছিল "উচ্ছৃঙ্খলতা"।
*সোজা কথা*
দাদাঠাকুর কখনো বলেননি "নজরুল খারাপ কবি"। বরং বলেছেন, "নজরুল আমাদের লাইনের কবি না।" এটাই সবচেয়ে সূক্ষ্ম এড়িয়ে যাওয়া।
উনি নজরুলকে শত্রু ভাবেননি, ভেবেছিলেন *প্রতিযোগী*। আর প্রতিযোগীকে হারানোর সবচেয়ে সহজ উপায় – তাকে খেলার মাঠেই না নামতে দেওয়া। "বিষহীন ঢোড়ার আশীর্বাদ" – এই একটা লাইনেই দাদাঠাকুর বুঝিয়ে দিলেন, "আমি খেলব না। কারণ খেললে হারব।"
এটা শুধু শহুরে-গেঁয়োর লড়াই না। এটা ছিল পুরনো ব্যঙ্গকার বনাম নতুন বিদ্রোহীর ক্ষমতার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে দাদাঠাকুর প্রথম রাউন্ডেই রিং ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ।
দাদা ঠাকুর সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন । সরাসরি প্রশংসা ও করেন নি সরাসরি নিন্দা ও করেন নি। তবে তাঁর আশির্বাদ সম্বলিত উক্তি অনেকটা প্রমাণ করে “বিষহীন ঢোঁড়ার আশির্বাদ”
তথ্যসূত্র
ধূমকেতু পত্রিকায় পাঠানো শুভেচ্ছা পত্র।।
“ধূমকেতুর প্রতি বিষহীন ঢোঁড়ার অযাচিত আশির্বাদ।”
অবশ্যই পরে সে পরিচয় সুগভীর আন্তরিকতায় পরিণত হয়।
নজরুলের সঙ্গে দাদাঠাকুরের সম্পর্ক কতটা আন্তরিক ছিল সেই সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় দাদাঠাকুরের স্নেহভাজন ও জীবনী লেখক, হাসির গানের বিখ্যাত গায়ক নলিনীকান্ত সরকারের লেখায় - ‘‘কবিবন্ধু নজরুল ইসলাম দাদাঠাকুরকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর ‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থখানি তিনি এই শ্রদ্ধার্ঘ্যস্বরূপ দাদাঠাকুরকে উৎসর্গ করেছেন। নজরুলকেও দাদাঠাকুর যথেষ্ট স্নেহ করতেন। আমাকে যেমন তিনি ‘তুই’ সম্বোধন করে থাকেন, নজরুলের সঙ্গেও তাঁর এই ‘তুই’ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। একদিন নজরুল কথায় কথায় দাদাঠাকুরকে বললেন, ‘দাদা আপনি বৈষ্ণব না শাক্ত?’ দাদাঠাকুর বললেন, ‘শাক্ত’। নজরুল বললেন, ‘শাক্ত? শাক্তরা তো তান্ত্রিক মতে পঞ্চ ম-কারের উপকরণ নিয়ে সাধনা করে। বেশ মজার সাধনা।’ দাদাঠাকুর বললেন, ‘আমাদের তো পঞ্চ ম-কার, তোদের যে বিংশ ম-কার।’ ‘সে আবার কি?’ দাদা ঠাকুর বললেন, ‘জানিস নে বুঝি? তবে শোন আর গুনে যা - তোরা (১) মুসলমান; জল আনিস (২) মশকে; জল খাস (৩) মগে; গায়ে দিস (৪) মেরজাই; লেখাপড়া শিখিস (৫) মাদ্রাসায় কিম্বা (৬) মক্তবে; পণ্ডিত হয়ে যাস (৭) মৌলবী (৮) মৌলানা, না হয় (৯) মুন্সি তীর্থস্থান (১০) মক্কা (১১) মদিনা; ধর্মগুরু (১২) মহম্মদ ; পরব (১৩) মহরম; পাঠ করিস (১৪) মউলুদ শরীফ; প্রিয় খাদ্য (১৫) মাংস; তার মধ্যে রুচিকর (১৬) মুরগী; মরে পাস (১৭) মাটি; ভূত হলে হোস (১৮) মামদো; জবর খুব (১৯) মারা-মারিতে আর (২০) মামলায়। দেখলি তো? আমাদের পঞ্চ ম-কার আর তোদের বিশ ম-কার। নজরুল হাসতে হাসতে বললেন, খুঁজে দেখুন আরও মিলবে।’’
মনের দিক থেকে কাজী সাহেব কে কি পরিমাণ স্নেহ করতেন তা এ থেকেই বোঝা যায়।
কাজী নজরুল ইসলাম এবং দাদা ঠাকুর–এর সম্পর্ক ছিল মূলত স্নেহ, সাহিত্যিক সহমর্মিতা এবং বিদ্রোহী মননের পারস্পরিক স্বীকৃতির সম্পর্ক। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই সম্পর্কটি খুব বেশি আলোচিত না হলেও গুরুত্বপূর্ণ।
দাদা ঠাকুর, যাঁর প্রকৃত নাম শরৎচন্দ্র পণ্ডিত, ছিলেন বাংলা ব্যঙ্গ-রসিকতার এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি সমাজের ভণ্ডামি, কুসংস্কার এবং রাজনৈতিক অসঙ্গতিকে কৌতুক ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরতেন। অন্যদিকে নজরুলও তাঁর কবিতা, গান ও প্রবন্ধে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাষা সৃষ্টি করেছিলেন। এই মানসিক সাদৃশ্য দু’জনকে কাছাকাছি এনেছিল।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার জন্য দাদা ঠাকুর একটি আশীর্বাণীমূলক ছড়া লিখেছিলেন। সেখানে তিনি নজরুলকে “কাজের কাজী” বলে সম্বোধন করে তাঁর সত্যভাষণ ও প্রতিবাদী কণ্ঠকে অভিনন্দন জানান। ছড়াটির অংশ ছিল—
“ধূমকেতুতে সওয়ার হয়ে
আসরে আজ নামলো কাজী।
আয় চলে ভাই কাজের কাজী!”
এই লেখাটি থেকে বোঝা যায় যে দাদা ঠাকুর নজরুলের সাহিত্যিক সাহস ও রাজনৈতিক চেতনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
নজরুলের জনপ্রিয়তা যখন তরুণ সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তখন প্রবীণ সাহিত্যিকদের অনেকেই তাঁর বিদ্রোহী ভাষা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু দাদা ঠাকুর তুলনামূলকভাবে উদার দৃষ্টিতে তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন। কারণ তিনিও ছিলেন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গের ভাষায় প্রতিবাদী।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দু’জনেই সাধারণ মানুষের ভাষাকে সাহিত্যে মর্যাদা দিয়েছিলেন। দাদা ঠাকুর তাঁর ছড়া ও রম্যে লোকভাষার ব্যবহার করতেন, আর নজরুলও আরবি-ফারসি-দেশজ শব্দ মিলিয়ে বাংলা কবিতাকে নতুন প্রাণ দিয়েছিলেন। এই ভাষাগত মুক্তচিন্তাও তাঁদের মধ্যে এক ধরনের আত্মীয়তা তৈরি করে।
যদিও তাঁদের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ বা দীর্ঘ চিঠিপত্রের তথ্য খুব বেশি সংরক্ষিত নেই, তবু সমকালীন সাহিত্যপত্র ও স্মৃতিচারণ থেকে বোঝা যায় যে দাদা ঠাকুর নজরুলকে স্নেহের চোখে দেখতেন এবং বাংলা সাহিত্যের এক শক্তিশালী নবীন কণ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
“
সম্পর্ক নিয়ে যেটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তা মূলত সাহিত্যপত্র, স্মৃতিকথা ও সমকালীন সাহিত্য-আড্ডার সূত্রে ছড়িয়ে আছে। বিস্তারিত দলিল খুব বেশি নেই, তবে বিভিন্ন সূত্র একত্র করলে তাঁদের সম্পর্কের একটি স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়।
১. ‘ধূমকেতু’ এবং দাদা ঠাকুরের সমর্থন
নজরুল যখন ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন, তখন সেটি শুধু সাহিত্যপত্র ছিল না; বরং ব্রিটিশবিরোধী চেতনারও মুখপত্র হয়ে ওঠে। এই সময় অনেকেই নজরুলের ভাষা ও রাজনৈতিক অবস্থানকে “অতিরিক্ত উগ্র” বলতেন। কিন্তু দাদা ঠাকুর প্রকাশ্যেই তাঁর পাশে দাঁড়ান।
তিনি নজরুলকে উদ্দেশ করে যে ছড়াটি লেখেন, তা শুধু রসিকতা নয়, বরং একধরনের সাহিত্যিক স্বীকৃতি—
“ধূমকেতুতে সওয়ার হয়ে
আসরে আজ নামলো কাজী
দে না দেখে ভীম পাল্লা
কাজের বেলায় ঠিক যে কাজী।”
এখানে “কাজের কাজী” শব্দবন্ধে দাদা ঠাকুর নজরুলের কর্মচঞ্চলতা ও প্রতিবাদী চরিত্রকে প্রশংসা করেছেন। এটি সে সময়ের সাহিত্যমহলে যথেষ্ট আলোচিত হয়েছিল।
২. দু’জনের স্বভাবগত মিল
দাদা ঠাকুর ও নজরুলের লেখার ভঙ্গি আলাদা হলেও তাঁদের ভিতরে কিছু মৌলিক মিল ছিল—
দু’জনেই প্রথাভাঙা।
দু’জনেই ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচক।
সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহার করতেন।
হাস্যরস বা বিদ্রোহ—দুটোকেই সামাজিক পরিবর্তনের অস্ত্র হিসেবে দেখতেন।
দাদা ঠাকুর ব্যঙ্গের মাধ্যমে সমাজকে আঘাত করতেন, আর নজরুল করতেন কবিতার অগ্নিময় উচ্চারণে। ফলে তাঁদের মধ্যে একধরনের মানসিক সহমর্মিতা তৈরি হয়েছিল।
৩. সাহিত্যসভা ও আড্ডা
সমকালীন কলকাতার সাহিত্যজগতে নানা সভা-সমিতি, পত্রিকা অফিস ও আড্ডায় তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষ করে কলেজ স্ট্রিটকেন্দ্রিক সাহিত্যিক পরিবেশে দাদা ঠাকুর ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ। তরুণ নজরুলের উত্থান তিনি আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য করেছিলেন।
কিছু স্মৃতিচারণে উল্লেখ আছে যে দাদা ঠাকুর নজরুলের তাৎক্ষণিক কবিতা রচনা ও গান বাঁধার ক্ষমতায় মুগ্ধ ছিলেন। নজরুলও প্রবীণ এই ব্যঙ্গকারের উপস্থিতিতে সহজ ও আন্তরিক আচরণ করতেন।
৪. রাজনৈতিক সাহসের প্রতি শ্রদ্ধা
নজরুল যখন “আনন্দময়ীর আগমনে” কবিতার জন্য কারাবন্দি হন, তখন বাংলার বহু সাহিত্যিক তাঁর পাশে দাঁড়ান। দাদা ঠাকুরও ব্যক্তিগতভাবে নজরুলের সাহসিকতার প্রশংসা করেছিলেন বলে বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে। কারণ দাদা ঠাকুর নিজেও ব্রিটিশ প্রশাসন ও সমাজের ভণ্ডামিকে ব্যঙ্গ করতে ভয় পেতেন না।
৫. রসবোধ ও তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া
দাদা ঠাকুর ছিলেন তাৎক্ষণিক ছড়া ও কৌতুক রচনার জন্য বিখ্যাত। নজরুলও ছিলেন অসাধারণ উপস্থিতবুদ্ধিসম্পন্ন। সাহিত্যিক মহলে তাঁদের কথোপকথন নিয়ে কিছু লোকমুখে প্রচলিত গল্প রয়েছে, যদিও সেগুলোর সবকটির ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করা কঠিন।
তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়—দাদা ঠাকুর নজরুলকে কেবল জনপ্রিয় কবি হিসেবে নয়, বাংলা সাহিত্যের এক নবযুগের প্রতিনিধি হিসেবেও দেখেছিলেন। আর নজরুলও প্রবীণ এই ব্যঙ্গস্রষ্টার প্রতি সম্মান ও আন্তরিকতা বজায় রেখেছিলেন।

Comments
Post a Comment