তিনটি কবিতা ।। পুণ্যব্রত মুখোপাধ্যায়
ডিম বৃষ্টির ইতিকথা
এক, দুই, তিন---
হাঁ করে দেখছিল ছেলেটা
আকাশ থেকে ডিম পড়ছে শিলাবৃষ্টির মত।
সেই সক্কাল থেকে সারাদিন ইট টেনেছে সে
অবনী বাবুর নির্মীয়মান বাড়ি পর্যন্ত।
ফেরার পথে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে
আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্বাক ছেলেটা।
এক, দুই, তিন ---ওই আবার!
মা রোগ-শয্যায়।
বাবা মারা গেছে রেল-অ্যাক্সিডেন্টে
হকারী করতে গিয়ে।
যদি একটা ডিম খপ করে লুফে নিয়ে
মায়ের জন্য নিয়ে যেতে পারত!
কত্ত ডিম। এক সঙ্গে এত ডিম!
আকাশ থেকে পড়ছে কেন?
ভগবান দিচ্ছে?
ওরা তো ডিম কতদিন খায়নি।
ভগবান ওদের জন্যে দেয়না কেন?
শব্দলেখা
পথ চলতি দেখলাম
বইয়ের দোকানে একটা বক বসে আছে।
যে সাঁকো দিয়ে আমি জলাটা পার হচ্ছিলাম
সেটি ভয়ানক ভাবে দুলে উঠল।
ঝাঁকুনি খেয়ে উঠলাম সড়কে।
প্রত্যাশী বকটা আমার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল।
দেখলাম বইয়ের দোকান থেকে উড়ে এসে জলে পড়ল কয়েকটা বইয়ের পৃষ্ঠা----
জলে ভেসে গেল শব্দলেখা নীরব জিজ্ঞাসা নিয়ে।
নির্জন সাঁকোর দোলা মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়াচ্ছিল।
আমি জলের দিকে চেয়েছিলাম।
কিসের আকর্ষণে জানিনা, চোখের চাহুনি আমাকে
ভাসিয়ে দিল জলে।
স্রোতের বিপরীতে যে অতীত নিশ্চিন্ত নিদ্রায়---
আমি তার পাশটিতে শুয়ে রইলাম জীবন্মৃত।
দেখলাম থরে থরে বই সাজানো।
দেখলাম অনেকগুলো পুরোনো ক্যালেন্ডার
দেওয়ালে ঝুলছে; সেখানে সাঁকো নেই, বক নেই।
বই সব হারিয়ে গেছে অথবা কাগজের রসায়ন।।
ইতিহাস থেকে বেরিয়ে
পণ্ডিত বিজ্ঞের মত সংস্কৃত আওড়ালেন,
-----ফলেন পরিচয়তে বৃক্ষ।
রাস্তার ধারে সারিবদ্ধ গাছগুলোর ফল তো নেই, তাহলে গাছ চিনব কীভাবে?
রাতের অন্ধকারে রাস্তা ধ'রে হাঁটতে হাঁটতে
জিজ্ঞেস করলাম---তোমাদের নাম কী?
উত্তর এল----আমরা গাছ।
একটু এগিয়ে দেখলাম জটাজুট গাছ-সন্ন্যাসী।
তার কাছে জানতে চাইলাম,
ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে
সম্রাট অশোক মার্গেশুভ্রিকা পদ্ধতিতে
রাস্তার ধারে গাছ লাগিয়েছিলেন,
কিন্তু গাছগুলোর নাম কোথাও লেখা নেই।
বলতে পারেন এদের নাম কী?
একটা ঝোড়ো বাতাস বয়ে গেল।
গাছের পাতার মর্মর ধ্বনি কোন্ ভাষা?
বুঝতে পারলাম না, শুধু শুনতে পেলাম
ভয়াবহ অট্টহাসি।
প্রাণ ভয়ে আমি ছুটলাম--ছুটলাম।
সেই থেকে আমি ছুটেই চলেছি,
ইতিহাস থেকে ছুটে চলেছি ভবিষ্যতের দিকে।।

Comments
Post a Comment