রথের দড়িতে বাঁধা শৈশব
কুহেলী রায়
বর্ষার মেঘে ঢাকা আকাশ, ভেজা বাতাসের গন্ধ আর দূরে কোথাও ভেসে আসা কীর্তনের সুর— এসব মিললেই আমার মনে পড়ে যায় রথযাত্রার কথা। ক্যালেন্ডারের একটি উৎসবের দিন নয়, রথযাত্রা যেন আমার শৈশবের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়, যার পাতায় পাতায় লেগে আছে আনন্দ, বিস্ময় আর অজস্র স্মৃতি।
ছোটবেলায় রথযাত্রা মানেই ছিল এক অন্যরকম উত্তেজনা। দিন গুনতাম কবে রথ আসবে। সকাল থেকেই নতুন জামা পরে বারবার বাড়ির দরজায় উঁকি দিতাম। কখন মেলায় যাব, কখন রথ দেখব— সেই অপেক্ষার যেন শেষই হতো না।
আমাদের পাড়ার রথটি খুব বড় ছিল না। তবু আমার ছোট্ট চোখে সেটিই ছিল যেন এক রাজরথ। রঙিন কাপড়ে সাজানো, ফুলে ফুলে মোড়া সেই রথকে দেখে মনে হতো, স্বর্গ থেকে বুঝি কোনো রূপকথার গল্প নেমে এসেছে। রথের উপরে বসে আছেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। তাঁদের মুখের সেই মিষ্টি হাসি আজও যেন চোখে ভাসে।
সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ছিল রথের দড়ি টানা। ছোট্ট হাত দিয়ে যখন সেই মোটা দড়িটি ধরতাম, তখন মনে হতো আমিও যেন উৎসবের একটি অংশ হয়ে গেছি। চারপাশে কত মানুষ! কেউ চেনে, কেউ চেনে না। অথচ সবাই একসঙ্গে একই দড়ি টানছে। তখন বুঝিনি, আজ বুঝি— রথের দড়ি শুধু রথ টানে না, মানুষকেও এক সুতোয় বেঁধে রাখে।
রথযাত্রার মেলা ছিল শৈশবের স্বপ্নরাজ্য। সারি সারি দোকান, রঙিন বেলুন, বাঁশি, খেলনা, কাঠের পাখি, মাটির পুতুল— সবকিছুই ছিল চোখ ধাঁধানো। একটি খেলনা কেনার আনন্দ যে কত বড় ছিল, আজকের দিনে তা বোঝানো কঠিন। হাতে একটি কাগজের পাখা কিংবা একটি ছোট্ট বাঁশি পেলেই মনে হতো পৃথিবীর সব সুখ যেন আমারই।
মেলার আরেকটি আকর্ষণ ছিল খাবার। গরম গরম জিলিপির গন্ধ, পাপড়ভাজার মুচমুচে স্বাদ, আর নানা রঙের মিষ্টি— সবকিছু মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠত উৎসবের মতো। মা বারবার সাবধান করতেন, "বেশি খাস না!" কিন্তু শিশুমন কি আর সে কথা শোনে?
সন্ধ্যা নামলে মেলার আলো জ্বলে উঠত। রঙিন বাতিগুলো ঝিকমিক করত, আর মনে হতো তারাগুলো যেন মাটিতে নেমে এসেছে। সেই আলো, সেই ভিড়, সেই আনন্দ— সব মিলিয়ে রথযাত্রা হয়ে উঠত এক জাদুময় অভিজ্ঞতা।
আজ অনেক বছর কেটে গেছে। শৈশব পিছনে পড়ে আছে। জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে, সময়ের গতি বদলেছে। তবু রথযাত্রা এলেই মনের কোনো এক কোণে লুকিয়ে থাকা শিশুটি জেগে ওঠে। সে আবার রথের দড়ি ধরতে চায়, আবার মেলার ভিড়ে হারিয়ে যেতে চায়, আবার একটি রঙিন বেলুন কিনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে চায়।
সময় মানুষকে বড় করে, কিন্তু শৈশবকে মুছে দিতে পারে না। রথযাত্রা এলেই সেই শৈশব ফিরে আসে স্মৃতির হাত ধরে। ফিরে আসে কাদামাখা পথ, মেলার কোলাহল, কীর্তনের সুর আর একরাশ নির্ভেজাল আনন্দ।
তাই আজও মনে হয়, রথের দড়িতে শুধু কাঠের রথ বাঁধা থাকে না; বাঁধা থাকে আমাদের শৈশব, আমাদের স্মৃতি, আমাদের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোও। সেই দড়ি ধরে টানলেই হৃদয়ের গভীর থেকে ভেসে আসে এক পরিচিত ডাক— "চলো, আর একবার ফিরে যাই সেই ছোটবেলার রথের মেলায়।"
...................................................
কুহেলী রায়
সহকারী শিক্ষিকা( ইংরেজি বিভাগ)
আরামবাগ বিবেকানন্দ একাডেমী
আরামবাগ, হুগলি

Comments
Post a Comment