গুচ্ছকবিতা ।। আশাদ আলী
১. মহাজীবনের গান
জীবনের এই অনন্ত পথ চলিয়াছে কোন্ পানে,
নিভৃত হিয়ার গোপন বেদনা কেবা তাহা আজ জানে।
নিশি অবসান হলে পর যবে জাগে নব প্রভাত-আলোক,
ধরণীর বুকে মুছিয়া যায় যত নিখিল মনের শোক।
ক্ষণিকের তরে আসিয়াছি মোরা এই জগতের মেলাভূমে,
দিন ফুরাইলে লীন হব পুন মহাকালের ওই ঘুমে।
সুখ আর দুখ দুই ভাই মিলি পাতে মায়ার এই খেলা,
তরীর মাঝি বোঝে না তো কভু কোন্ ঘাটে শেষ বেলা।
আশার প্রদীপ জ্বলিয়া উঠিছে ঝড়ের আঁধার মাঝে,
অনন্ত সুর বাজিয়া চলেছে বিশ্ব-হৃদয়-কাজে।
বনের বিহগ গাহে গান যবে লভিয়া আপন মুক্তি,
মানব কেবল খুঁজিয়া বেড়ায় বৃথা তর্কের যুক্তি।
অসীম আকাশ ডাকিছে তোমায় মেলিয়া আপন পাখা,
ধূলির ধরায় চিরদিন কভু সত্য কি যায় রাখা?
সঁপিয়া দাও আপনারে ওই চরণের পরম ছায়ায়,
তবেই মুক্তি লভিবে পরাণ মর্ত্যের এই মায়ায়।
জীবন-নদীর তরীখানি ওগো বাইয়া চলো অবিরত,
ধন্য হউক এই পথ চলা মহাজীবনের মতো।
২. অনন্ত ব্যাকুলতা
আজিকে গগনে মেঘের মেলা, বসিয়া আছি একা,
ঝরোঝরো বারিধারায় খুঁজি শুধু তোমারি দেখা।
কদম্বেরই বনে জাগে বিরহের ব্যাকুল গান,
সুরের মায়ায় ভাসিয়া চলিছে মোর অবুঝ পরান।
তুমি যে আমার চির-দিবসের নিভৃত সাধনা,
হৃদয়ের কুঞ্জে ফুটিয়া চলিছে অলখ আরাধনা।
সখা হে, মম তরণী মাঝারে বসিয়া লহো ঠাঁই,
ভব-সিন্ধুর মাঝারে ওগো তুমি বিনে কেহ নাই।
তোমার ওই চারু অধরে লাজের মধুর মৃদু হাসি,
বিরহের তারে বাজিয়া চলেছে মোহন সেই বাঁশি।
মর্ত্যভূমির ধূলিরে করিয়া পরম অবহেলা,
তোমারি ছায়ায় কাটিয়া যাইবে সারা জীবনের খেলা।
সঁপিয়া দিলাম আপনারে আজি ওগো মোর চিরন্তন,
চরণের ধূলি মাখিয়া ধন্য হউক এই মম জীবন।
নয়নের জলে লিখিয়া রাখি যে বিরহের গীতগাথা,
করুণ মর্মরে ঝরিয়া পড়িছে বনের মলিন পাতা।
মোদের মিলন অক্ষয় হউক মহাকালের ওই পটে,
শান্তি লভুক আকুল তৃষ্ণা জীবন-নদীর তটে।
৩. হৃদয়-কমল
তোমার চরণে যেথা থমকিয়া দাঁড়ায় সমীরণ,
মোর হিয়া-মাঝে জাগে আকুল এক নব গুঞ্জন।
তুমি বুঝি দূর আকাশের ওই মায়াবী শুকতারা,
যাহার লাগিয়া নিশীথ-গগনে পরান পাগলপারা।
কুঞ্জবনে আজি ফুটিয়াছে দেখ কেতকী ও চম্পা,
তোমারি পরশে কাঁপিয়া ওঠে যে ব্যাকুল তনু-কম্পা।
এসো সখা, মম তরণী-মাঝারে বসিয়া লহো ঠাঁই,
এ অকূল ভবসিন্ধুর বুকে তুমি বিনে কেহ নাই।
মেঘের মায়ায় ঢাকিয়া যায় যে চাঁদের রূপালী হাসি,
মম অন্তরে বাজিয়া চলেছে তোমারি মোহন বাঁশি।
তোমার ওই চারু অধরে জাগিছে লাজের মধুর রেখা,
জন্মান্তরের সাধন শেষে পাইনু তোমার দেখা।
সঁপিয়া দিনু আপনারে আজি ওগো মোর চিরন্তন,
তুমি ছাড়া ইহলোকে মোর অতি তুচ্ছ এ জীবন।
নয়নের জলে লিখিয়া রাখি যে বিরহের গীতগাথা,
বাতাসে ঝরিছে ব্যাকুল মর্মরে বনের মলিন পাতা।
মোদের মিলন অক্ষয় হউক মহাকালের ওই পটে,
শান্তি লভুক আকুল তৃষ্ণা জীবন-নদীর তটে।
...................................
- আশাদ আলী
- পাউলী, খেরুর, জঙ্গিপুর, মুর্শিদাবাদ – ৭৪২২৩৭.

Comments
Post a Comment