যে ভারত মানচিত্রে নেই, কিন্তু সংস্কৃতিতে বেঁচে আছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় সভ্যতার নীরব উত্তরাধিকার
জয়শ্রী ব্যানার্জি
একটি সভ্যতার পরিচয় কোথায় থাকে? মানচিত্রে? রাষ্ট্রের সীমানায়? নাকি মানুষের স্মৃতিতে?
মানচিত্র
আমাদের বলে একটি দেশ কোথায় শেষ হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বারবার জানিয়েছে,
সভ্যতার যাত্রা সেখানে থেমে থাকে না। নদীর মতো, সমুদ্রের স্রোতের মতো, সে
এক তীর থেকে আরেক তীরে পৌঁছে যায়। কখনও বণিকের জাহাজে, কখনও ভিক্ষুর
পদচারণায়, কখনও কবির কাব্যে, কখনও স্থপতির হাতে খোদাই হয়ে।
ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসও তেমনই এক দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস।
দক্ষিণ
ভারতের প্রাচীন সমুদ্রবন্দর, বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যপথ এবং ভারত মহাসাগরের
ঢেউ শুধু মসলা, রেশম কিংবা মূল্যবান পাথর বহন করেনি। তাদের সঙ্গে পাড়ি
দিয়েছিল সংস্কৃত ভাষা, রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি, মন্দির স্থাপত্যের
ধারণা, দর্শন, আচার এবং এক বিস্ময়কর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
আজও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা দেশে সেই যাত্রার নীরব সাক্ষ্য ছড়িয়ে আছে।
কম্বোডিয়ায়
পৌঁছালে প্রথমেই চোখে পড়ে আঙ্কোর ওয়াট—পৃথিবীর বৃহত্তম ধর্মীয়
স্থাপত্য। দ্বাদশ শতকে বিষ্ণুকে উৎসর্গ করে নির্মিত এই মন্দিরের দীর্ঘ
প্রাচীরে খোদাই করা রয়েছে 'সমুদ্র মন্থন'-এর দৃশ্য।
কম্বোডিয়ার
বহু প্রাচীন শিলালিপিও সংস্কৃত ভাষায় রচিত। যেমন, আজও বহু শিলালিপিতে
বিষ্ণু, শিব ও রাজাদের প্রশস্তি সংস্কৃত ভাষায় উৎকীর্ণ অবস্থায় সংরক্ষিত
রয়েছে।
রাজাদের উপাধি, ধর্মীয় স্তোত্র, দানপত্র—সব
ক্ষেত্রেই সংস্কৃতের ব্যবহার প্রমাণ করে, ভারতীয় ভাষা এখানে শুধু ধর্মের
নয়, রাজকীয় সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছিল।
তারপর পথ নিয়ে যায় থাইল্যান্ডে। আজকের ব্যাংককের রাজপ্রাসাদের দেওয়ালে আঁকা রয়েছে 'রামাকিয়েন'—রামায়ণের থাই রূপ।
থাইল্যান্ডের
প্রাচীন রাজধানীর নাম ছিল 'অযুথিয়া', যার উৎস ভারতীয় 'অযোধ্যা'। এমনকি
বর্তমান রাজবংশের রাজাদের আনুষ্ঠানিক উপাধিতেও 'রাম' নামটি আজও বহমান। একটি
মহাকাব্য এখানে শুধু অনূদিত হয়নি, নতুন সংস্কৃতির ভেতরে নতুন জীবন
পেয়েছে।
আজও থাইল্যান্ডের রাজকীয় কিছু
আচার-অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের অংশগ্রহণ দেখা যায়। বৌদ্ধধর্ম প্রধান
হলেও রাজপরম্পরায় হিন্দু আচার ও প্রতীকের উপস্থিতি ইতিহাসের দীর্ঘ
সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। থাই ভাষায় রাজাদের আনুষ্ঠানিক উপাধিতে
আজও সংস্কৃত ও পালি শব্দের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়।
আরও পূর্বে, লাওসে, রামায়ণের নাম বদলে হয়েছে 'ফ্রা লাখ ফ্রা লাম'।
লাওসের
এই কাহিনিতে লক্ষ্মণ—'ফ্রা লাখ'—অনেক সময় রামের সমান, এমনকি কোথাও কোথাও
আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। একই মহাকাব্য, কিন্তু অন্য সমাজে এসে তার
নায়করাও নতুন অর্থ পায়।
সেখানে গল্পটি একই থেকেও
একেবারে একই নেই। স্থানীয় সমাজ, বিশ্বাস ও কল্পনা তাকে নতুন রূপ দিয়েছে।
তখন মনে হয়, মহান কাহিনিগুলি ভ্রমণ করে—আর প্রতিটি ভূখণ্ডে পৌঁছে নতুন
ভাষায় নিজেদের পুনর্জন্ম ঘটায়।
ভিয়েতনামের
মধ্যভাগে মাই সন (Mỹ Sơn)-এর নিস্তব্ধ মন্দিরসমূহ আজ ভগ্নাবশেষ। কিন্তু সেই
ভাঙা ইটের গায়ে এখনও সংস্কৃত ভাষার শিলালিপি, শিবের উপাসনা এবং চাম
রাজ্যের স্মৃতি টিকে আছে।
চাম রাজ্যের বহু শাসকের
নামই ছিল সংস্কৃত উৎসের। 'ভদ্রবর্মণ', 'ইন্দ্রবর্মণ'—এই নামগুলো আজও
ইতিহাসের দলিলে সাক্ষ্য দেয় যে ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রভাব শুধু মন্দিরে
নয়, রাজশক্তির পরিচয়েও জায়গা করে নিয়েছিল।
ইতিহাসের সব শব্দ উচ্চস্বরে কথা বলে না; কিছু ইতিহাস নিঃশব্দেও শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থাকে।
মালয়েশিয়ার
বুজাং উপত্যকায় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ
নিদর্শনের পাশাপাশি লৌহগলনের প্রমাণও মিলেছে। অর্থাৎ এই অঞ্চল ছিল শুধু
ধর্মীয় যোগাযোগের কেন্দ্র নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তি
বিনিময়েরও গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ।
বহু শতাব্দী আগে
ভারতীয় বণিকদের নোঙর ফেলেছিল এই উপকূলে। তারা শুধু পণ্য বিনিময় করেনি;
সঙ্গে এনেছিল ভাষা, বিশ্বাস, শিল্প ও জীবনবোধের বীজ।
সিঙ্গাপুর নামটির মধ্যেও লুকিয়ে আছে সেই স্মৃতি।
সংস্কৃত
'সিংহপুর' বা 'সিংহপুরা' থেকে এসেছে 'সিঙ্গাপুর'। আজ এটি বিশ্বের অন্যতম
আধুনিক নগররাষ্ট্র, অথচ তার নামের ভেতর এখনও বেঁচে আছে বহু শতাব্দী আগের এক
ভাষার প্রতিধ্বনি।
ইন্দোনেশিয়ার কথা আলাদা করে বলার
অপেক্ষা রাখে না। বালির জীবন্ত হিন্দু ঐতিহ্য, প্রাম্বানানের রামায়ণ,
জাতীয় প্রতীক গরুড়—সব মিলিয়ে সেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি স্থানীয় ঐতিহ্যের
সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তাকে আর ধার করা সংস্কৃতি বলে মনে হয় না; সে
যেন সেই ভূখণ্ডেরই নিজস্ব উত্তরাধিকার।
এই সমস্ত
ইতিহাস একসঙ্গে পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ভারতীয় সভ্যতার বিস্তার
ছিল মূলত সাংস্কৃতিক সংলাপের ইতিহাস। কোথাও স্থানীয় সংস্কৃতি তাকে গ্রহণ
করেছে, কোথাও পরিবর্তন করেছে, কোথাও নিজের মতো করে নতুন অর্থ দিয়েছে। সেই
কারণেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতকে খুঁজতে গেলে ভারতকে নয়, মানুষের
সৃষ্টিকে দেখতে হয়।
হয়তো একটি দেশের সীমান্ত থাকতে পারে, কিন্তু একটি সভ্যতার শেষ নেই।
সে
মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে, ভাষার ভেতর বেঁচে থাকে, স্থাপত্যের পাথরে,
লোককথার সুরে, নৃত্যের ভঙ্গিমায় এবং একটি নামের মধ্যেও বেঁচে থাকে।
সমুদ্র তাই শুধু দুই ভূখণ্ডকে যুক্ত করেনি। সে যুক্ত করেছে দুই সভ্যতাকে।
আর
সেই কারণেই আজও মনে হয়—ভারতকে সবসময় ভারতের ভেতরে খুঁজতে হয় না। কখনও
কখনও তাকে খুঁজে পাওয়া যায় অন্য দেশের আকাশের নিচে, অন্য ভাষার উচ্চারণে,
অন্য মানুষের স্মৃতিতে।
আশ্চর্যের বিষয়, এই
ইতিহাসের অধিকাংশই কোনো যুদ্ধের ইতিহাস নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি বণিক,
নাবিক, সন্ন্যাসী, শিল্পী ও পণ্ডিতদের নীরব যাত্রার ইতিহাস। তারা সাম্রাজ্য
গড়তে যাননি; কিন্তু তাঁদের সঙ্গে ভেসে গিয়েছিল ভাষা, শিল্প, দর্শন আর
বিশ্বাস।
তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয়
সংস্কৃতির স্মৃতি কোনো বিজয়ের স্মারক নয়; এটি মানুষের পারস্পরিক গ্রহণ,
সহাবস্থান এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক জীবন্ত দলিল।
হয়তো সেই কারণেই সভ্যতার প্রকৃত মানচিত্র কখনও ভূগোলে আঁকা যায় না; তা আঁকা থাকে মানুষের স্মৃতি, ভাষা এবং সংস্কৃতির ভেতরে।

Comments
Post a Comment