যেখানে শিকড় রয়ে গেছে
কাবেরী মিত্র
কিছু দরজা শুধু কাঠের হয় না, স্মৃতির ও হয় একবার খুললেই বহু বছরের চাপা পড়ে থাকা জীবন আবার ভীড় করে সামনে এসে দাঁড়ায়
"যেখানে শিকড় রয়ে গেছে"
প্রায় পঁচিশ বছর পর নীলা ফিরে এলো তার ছেড়ে যাওয়া শিকড়ের কাছে।
বাইরের
ভারী দরজাটা দু'হাত দিয়ে ঠেলে খুলতেই ক্যাঁচ করে এক বিকট শব্দ তুলে খুলে
গেল। নীলা ধীরে ধীরে ভিতরে প্রবেশ করল। কত বছর পর! অথচ মনে হলো, সময় যেন এই
বাড়ির উঠোনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে আছে।
আজও একইভাবে
দাঁড়িয়ে আছে উঠোনের একধারে নিজে থেকে বেড়ে ওঠা সেই শিউলি গাছটা। শরৎ এলেই
যার ফুলের গন্ধে চারদিক ভরে উঠত। সেই গন্ধই যেন জানিয়ে দিত—মা দুর্গা
আসছেন।
ভোরবেলা ফুল তোলা নিয়ে নীলা আর ওর বোনের মধ্যে
রোজ ঝগড়া বাঁধত। কেউই এত সকালে ঘুম থেকে উঠে ফুল তুলতে রাজি হতো না। অথচ
ঠাম্মির হুকুম—দুই বোনকেই ফুল তুলতে হবে।
দেখতে দেখতে
মহালয়ার দিন এসে যেত। ভোরবেলায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শুরু
হতেই সারা বাড়ি যেন এক মঙ্গলময় আবহে ভরে উঠত। সেই দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত
মা, কাকিমা আর জেঠিমাদের ব্যস্ততা। পুজোয় আসা অতিথিদের জন্য নানারকম মিষ্টি
তৈরির ধুম পড়ে যেত রান্নাঘরে। আর এদিকে ভাইবোনদের মধ্যে চলত অন্তহীন
আলোচনা—কে কোন দিন কোন জামা পরবে, কীভাবে সাজবে, কোথায় কোথায় ঠাকুর দেখতে
যাবে।
মাঝে মাঝে বড়দা বকুনি দিত। কিন্তু সেই বকুনির মধ্যেও লুকিয়ে থাকত এক অদ্ভুত মায়া, এক অগাধ ভালোবাসা।
আজ এই উঠোনে দাঁড়িয়ে নীলার বড় ইচ্ছে করছে আবার শুনতে—জেঠুর সেই মায়াভরা ডাক, "বড় বুড়ি, আমার চশমাটা খুঁজে দে তো মা।"
অথবা জেঠিমার সেই স্নেহমাখা গলা—"ও বড় বুড়ি, তোর জন্য আজ বেশি করে ঘি দিয়ে মোহনভোগ করে রাখব। স্কুল থেকে এসে খাস।"
স্মৃতিরা একের পর এক দরজায় কড়া নাড়তে লাগল।
যেদিন
নীলা খুব ভালো রেজাল্ট করে শহরের নামী কলেজে ভর্তি হয়েছিল, সেদিন বড়দার
আনন্দ যেন ধরে না। অফিস থেকে ফেরার সময় ওর জন্য মেরুন রঙের এক সুন্দর
সিল্কের শাড়ি আর কত মিষ্টি নিয়ে এসেছিল। মায়ের দিকে তাকিয়ে গর্ব করে
বলেছিল—
"মা, দেখো তো, এই শাড়িটায় আমার খেন্দিকে কী সুন্দর লাগবে!"
বড়দা আদর করে, আবার মাঝেমধ্যেই রাগানোর জন্য নীলাকে ওই নামেই ডাকত।
কিন্তু...
আজ সেই দিনগুলো কোথায় হারিয়ে গেছে?
সব ভাইবোন আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। বাবা, মা, জেঠু, জেঠিমা, কাকিমারা—কেউ আর এই পৃথিবীতে নেই।
এক
বুক চাপা কষ্ট নিয়ে নীলা ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল। বিরাট হলঘরে ঢুকেই থমকে
দাঁড়াল। দেয়ালে টাঙানো একের পর এক পরিচিত মুখ—সবার ফটোফ্রেম। বাবার ছবিটার
দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, বাবা যেন মৃদু অভিমানে বলছেন, "এই এলি? কিন্তু
বড্ড দেরি করে এলি। এত অভিমান?"
নীলার চোখ বেয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল।
"না
বাবা, অভিমান নয়... লজ্জা। যে ভালোবাসার মোহে অন্ধ হয়ে তোমাদের ছেড়ে চলে
গিয়েছিলাম, কয়েক বছরের মধ্যেই সেই ভালোবাসাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। শেখর এখন আর
আমার নেই বাবা। সে এখন অন্য কারও। আমি তার জীবন থেকে ব্রাত্য হয়ে গেছি।
বলো, কোন মুখে তোমাদের সামনে আসতাম?
সব
হারিয়ে, শূন্য হাতে তোমাদের সামনে দাঁড়াতে যে ভীষণ লজ্জা করত, বাবা। সেদিন
তো আমিই জোর গলায় বলেছিলাম—'শেখর আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। ও কোনোদিন আমাকে
ছেড়ে যাবে না। তোমরা আমার পাশে না থাকলেও, আমার শেখর থাকলেই হবে।' এই বলেই
ওর হাত ধরে এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।
ভুল...
সবটাই ভুল ছিল, বাবা। আমি ভুল করেছিলাম, কিন্তু তোমরাও কি একটু জেদ ছাড়তে
পারতে না? তোমাদের জাত আর বংশমর্যাদার অহংকারই হয়তো সেই জেদ ভাঙতে দেয়নি।"
কলেজে
পড়ার সময় শেখরের সঙ্গে নীলার পরিচয়। সুদর্শন, উচ্চশিক্ষিত,
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শেখরের প্রতি খুব অল্প সময়েই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে নীলা। তারপর
ধীরে ধীরে তাদের ভালোবাসা গভীর হতে থাকে। নীলার ধ্যান-জ্ঞান তখন শুধুই
শেখর।
শেখর একটি বহুজাতিক
সংস্থায় চাকরি করত। বাড়ির অবস্থাও ভালো। বাবা-মা বীরভূমে থাকতেন, মাঝে মাঝে
ছেলের কাছে আসতেন। কোনো দিক থেকেই শেখর অযোগ্য ছিল না। একটাই বাধা—তারা
ব্রাহ্মণ ছিল না।
আর
নীলাদের পরিবারে বহুদিনের রীতি—ব্রাহ্মণ ছাড়া সেই পরিবারের বড় ছেলে বা বড়
মেয়ের বিয়ে হবে না। তার ওপর আবার প্রেমের বিয়ে! নীলার বাবা আর জেঠুর কাছে
বিষয়টা ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। একদিকে প্রেম, অন্যদিকে অন্য জাতের
ছেলে—হাজার বোঝালেও তাঁদের মত বদলানো যায়নি।
একদিন শেখর নিজেই এসে বলল, "আমি নীলাকে বিয়ে করতে চাই।"
নীলার বাবা অত্যন্ত শান্ত গলায় প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলেন। কথাটা শেখরের আত্মসম্মানে আঘাত করল। সে সোজা নীলার দিকে তাকিয়ে বলল,
"তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, আর সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকতে চাও, তাহলে এই মুহূর্তে এক কাপড়ে আমার সঙ্গে বেরিয়ে এসো।"
নীলা একবারের জন্যও দ্বিধা করেনি। সবার সামনে শেখরের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল।
বাবা, মা, জেঠু, বড়মা—সবাই শেষবারের মতো ভেবে দেখতে বলেছিলেন। কিন্তু নীলা কারও কথা শোনেনি।
বাড়ির বাইরে পা বাড়াতেই জেঠুর গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—
"যাচ্ছ, যাও। তবে শুনে রাখো, আর কোনোদিন এই বাড়িতে পা রাখবে না। আজ থেকে তুমি আমাদের কাছে মৃত।"
নীলার
মা, কাকিমা, বড়মা আঁচল দিয়ে মুখ চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। কিন্তু
নীলা সেদিন শেখরের হাত ছাড়েনি। এক মুহূর্তে সমস্ত স্নেহের বন্ধন ছিন্ন করে
বেরিয়ে গিয়েছিল।
তারপর জীবনে কত জল গড়াল।
ভালো
চাকরির সুযোগ পেয়ে শেখর আমাকে আর আমাদের ছেলেকে নিয়ে বিদেশে চলে গেল। দেশে
থাকতে বন্ধুদের মাধ্যমে অন্তত এই বাড়ির খবর পেতাম। বিদেশে যাওয়ার পর সেই
যোগাযোগও হারিয়ে গেল।
প্রথম
প্রথম সবকিছু ভালোই চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে শেখর বদলে যেতে লাগল। আমার
প্রতিটি কাজেই সে খুঁত খুঁজে পেত। ঘর সাজানো, রান্না, পোশাক—সবকিছুই যেন
তার বিরক্তির কারণ হয়ে উঠল। প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে বুঝিয়ে দিত, আমি
তার যোগ্য নই।
একদিন একটি পার্টিতে শেখর তার সহকর্মী মিস এলিনার সঙ্গে এমন আচরণ করল, যা আমি সহ্য করতে পারিনি। সেখান থেকে একাই বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।
তারপর
আর কিছুই গোপন রইল না। এলিনা নিয়মিত আমাদের বাড়িতে আসতে শুরু করল।
প্রথমদিকে আমি প্রতিবাদ করলে শেখরj বলত, "তুমি খুব ছোট মনের মানুষ।"
তারপর
একসময় সে এলিনার বাড়িতেই রাত কাটাতে শুরু করল। বাড়িতে এলেই অকারণ ঝগড়া।
আমি কিছু বললেই ঠান্ডা গলায় বলত, "পোষায় না তো ইন্ডিয়ায়, তোমার বাবার বাড়ি
চলে যাও।"
আমি অসহায়ের মতো চিৎকার করে বলতাম, "তুমি তো খুব ভালো করেই জানো, সেই পথ আমি নিজের হাতেই বন্ধ করে দিয়ে এসেছি।"
সে
নির্বিকারভাবে বলত, "তাহলে একটা চাকরি খুঁজে নাও। সারাদিন বাড়িতে বসে থেকে
তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এখানে এটাই নিয়ম। মানতে না পারলে সেটা তোমার
সমস্যা।"
প্রতিদিনের এই
অশান্তি থেকে ছেলেকে দূরে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে তাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে
দিলাম। শেখর যেন তাতেই সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল। তার আর কোনো দায় রইল না।
এরপর সে বাড়ি আসাও প্রায় ছেড়ে দিল।
শেষ পর্যন্ত আমিও বললাম, "আমি ডিভোর্স চাই।"
ঠিক সেই সময়, শেখর কিছু বলার আগেই কোথা থেকে আমার ফোন নম্বর জোগাড় করে বড়দা ফোন করল। বলল, এই বাড়ি ভাগ হবে।
সেদিন আর কোনো দিকে তাকাইনি। আবার একবার নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি দেশে ফিরব। আমার শিকড়ের কাছে।
ক্ষমা চাইব সেই মানুষগুলোর কাছে, যাদের অগাধ ভালোবাসা আমি একদিন নিজের হাতে উপেক্ষা করে চলে গিয়েছিলাম।
বড়দাকে বলব—
"তোমরা
সব নিয়ে নাও। আমাকে শুধু দক্ষিণের ছোট্ট ঘরটা আর তার সামনে একফালি বাগানটা
দিও। আমি বাকি জীবনটা এই মাটিতেই কাটাতে চাই। এই বাড়ির মানুষগুলোর স্মৃতি
নিয়েই বাঁচতে চাই। যেখানে বাবা, জেঠু আর সবার নিঃশ্বাস মিশে আছে।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে বলব—ভালো থেকো তোমরা।
আর কান পেতে শুনব সেই চেনা ডাক—
'বড়ো বুড়িইই... এলি? আর যাবি না তো...?'"

Comments
Post a Comment