ছয় দিনের ব্যবধান
ইদ্রিস মণ্ডল
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। শিউলি গাছের নিচে সারা রাত ঝরে পড়া ফুলে সাদা হয়ে আছে উঠোন। কুয়াশার পাতলা চাদর মুড়ে শহরের পুরোনো পাড়াটা যেন আরও নীরব, আরও আপন হয়ে উঠেছে। দূরের মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে এলে একতলা ছোট্ট বাড়িটির একটি ঘরে আলো জ্বলে ওঠে।
এ বাড়িতে এটাই নিয়ম।
আজানের আগেই ঘুম ভাঙে কাশেম সাহেবের। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই, তবু জীবনযাপনের ছন্দে কোনো আলস্য নেই। তিনি ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে বসেন, পাশে ঘুমিয়ে থাকা স্ত্রী মিরা বেগমের দিকে একবার তাকান। ঘুমের ভেতরেও মিরা বেগমের মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি লেগে থাকে। এত বছর একসঙ্গে থাকার পর মানুষটিকে আর নতুন করে দেখার কিছু নেই, তবু প্রতিদিন ভোরে তাঁর মনে হয়—এই মানুষটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ওজু সেরে নামাজ পড়ে তিনি বারান্দায় এসে বসেন। শীতের বাতাসে তুলসীপাতার গন্ধ মিশে আছে। একটু পরেই মিরা বেগম দু'কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এসে পাশে বসেন।
— "চায়ে চিনি কম দিয়েছি। ডাক্তার তো বারবার নিষেধ করেছেন।"
কাশেম সাহেব কাপ হাতে নিয়ে হেসে বললেন,
— "ডাক্তার যতটা নিষেধ করেন, তুমি তার চেয়েও বেশি করো।"
মিরা বেগম চোখ রাঙানোর ভান করলেন।
— "বয়স হয়েছে, তবু কথাগুলো একদম ছোট ছেলেদের মতো।"
কাশেম সাহেব মৃদু হেসে উঠলেন।
এই হাসির ভেতরে কোনো উচ্ছ্বাস নেই; আছে দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের একসঙ্গে পথচলার নিশ্চিন্ত উষ্ণতা।
সংসারের শুরুটা এমন ছিল না।
বিয়ের পর ভাড়া বাড়ির একটি ছোট ঘরে তাদের নতুন জীবন শুরু হয়েছিল। বেতন ছিল অল্প, চাহিদা ছিল অনেক। মাসের শেষে চালের হাঁড়ি ফাঁকা হয়ে যেত, কিন্তু আশা ফুরাত না। মিরা বেগম নিজের একটি সোনার চুড়ি বিক্রি করেছিলেন কাশেম সাহেবের জন্য নয়, সংসারের জন্য। আর কাশেম সাহেব বহু ঈদে নিজের জন্য নতুন জামা না কিনে সেই টাকায় সন্তানদের বই কিনেছিলেন।
সেই ত্যাগের ইট দিয়েই একদিন গড়ে উঠেছিল এই বাড়ি।
লোকজন বলত, "বাড়িটা খুব সুন্দর।"
কাশেম সাহেব মনে মনে বলতেন, "সুন্দর বাড়ি নয়, সুন্দর সংসার গড়তে পেরেছি বলেই বাড়িটা সুন্দর লাগে।"
মিরা বেগম ছিলেন সেই সংসারের নীরব ছায়া। কার কখন কী খেতে ভালো লাগে, কার কোন ওষুধ শেষ হয়ে এসেছে, কোন প্রতিবেশীর ঘরে অসুস্থ মানুষ আছে—এসব যেন তাঁর বুকের ভেতর লেখা থাকত।
মহল্লার কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে ছুটে যেতেন তিনি।
কখনো এক বাটি খিচুড়ি নিয়ে, কখনো এক গ্লাস স্যুপ, কখনো শুধু দুটো সান্ত্বনার কথা নিয়ে।
তিনি বলতেন,
— "মানুষের পাশে দাঁড়ালে নিজের দুঃখটাও ছোট হয়ে যায়।"
এ কারণেই মহল্লার সবাই তাঁকে 'মিরা ভাবি' বলে ডাকত। কেউ তাঁকে শুধু একজন গৃহিণী হিসেবে দেখেনি; তিনি ছিলেন সবার আপন মানুষ।
কাশেম সাহেবও মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন তাঁর সততার জন্য।
ছত্রিশ বছর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। অবসর নেওয়ার পরও সপ্তাহে কয়েক দিন পার্টটাইম কাজ করেন।
টাকার জন্য নয়।
ঘরে বসে থাকতে তাঁর ভালো লাগে না।
তিনি বলতেন,
— "কাজ মানুষকে শুধু রোজগার দেয় না, বেঁচে থাকার কারণও দেয়।"
মহল্লার মুদি দোকানদার রশিদ মিয়া একদিন মজা করে বলেছিলেন,
— "কাশেম ভাই, আপনার নামে তো দোকানে কোনো বাকিই নেই। আজকাল এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।"
কাশেম সাহেব হেসে উত্তর দিয়েছিলেন,
— "ধার করে জিনিস কেনা আমার অভ্যাস নয়। যা আজ কিনতে পারি না, কাল কিনব। কিন্তু অন্যের পাওনা রেখে শান্তিতে ঘুমাতে পারব না।"
এই সরল বিশ্বাস নিয়েই তিনি জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু জীবনের সব হিসাব কি মানুষের হাতে থাকে?
চার মেয়ে—কনিকা, কুহেলী, কাজরী আর কবিতা—সবাই এখন নিজেদের সংসারে সুখে আছে। ঈদে কিংবা কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে তারা বাবার বাড়িতে এলে বাড়িটা আবার উৎসবের রঙে ভরে ওঠে।
মিরা বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
কাশেম সাহেব বারান্দায় বসে নাতি-নাতনিদের খেলতে দেখেন।
তখন তাঁর মনে হয়, জীবনের সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।
শুধু একটি জায়গায় যেন কোথাও একটি অপূর্ণতা থেকে গেছে।
ছোট ছেলে শাহেদ।
ছেলেটিকে মানুষ করার জন্য কাশেম সাহেব কত চেষ্টা করেছেন, তার হিসাব তিনি নিজেও জানেন না।
স্কুল পালিয়ে বেড়ানো সেই ছেলেটি কোনো দিনই পড়াশোনায় মন বসাতে পারেনি।
আজ সে অটোরিকশা চালায়।
বিয়ে করেছে।
তার পাঁচ বছরের একটি মেয়েও আছে।
কিন্তু সংসারের দায়িত্ব যেন এখনো তার কাঁধে এসে পৌঁছায়নি।
মাসের পর মাস কেটে যায়, বাবা-মায়ের হাতে একদিনও বাজারের ব্যাগ তুলে দেয় না।
মায়ের হার্টের ওষুধ শেষ হয়েছে কি না, বাবার চশমার কাচ ভেঙেছে কি না—এসব জানার চেয়ে বন্ধুদের আড্ডা, নেশা আর হোটেলের খাবারই যেন তার কাছে বেশি জরুরি।
কাশেম সাহেব মাঝে মাঝে ছেলেকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যান।
মিরা বেগম আস্তে করে বলেন,
— "ছেড়ে দাও। হয়তো একদিন বুঝবে।"
কাশেম সাহেব জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
— "সব বাবা-মা শেষ পর্যন্ত এই 'একদিন'-এর অপেক্ষাতেই বুড়ো হয়ে যায়, মিরা।"
মিরা বেগম কোনো উত্তর দেন না।
শুধু স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকেন।
সেই দৃষ্টিতে অভিযোগ নেই, অভিমানও নেই।
আছে শুধু দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে জন্ম নেওয়া এক নীরব মমতা।
তখনও তাঁরা কেউ জানতেন না—
জীবন তাদের জন্য এমন একটি পরীক্ষা লিখে রেখেছে, যার উত্তর কোনো মানুষ নিজের ইচ্ছেমতো লিখতে পারে না।
আর সেই পরীক্ষার শুরু হবে মাত্র কয়েকটি দিনের ব্যবধানে।
(২)
শীত যত গাঢ় হতে লাগল, কাশেম সাহেবের বাড়িটাও যেন আরও শান্ত হয়ে উঠল। ভোরের শিউলি কুড়িয়ে মিরা বেগম ছোট্ট একটি পিতলের বাটিতে রেখে দিতেন। তারপর উঠোনে পানি ছিটিয়ে ঝাড়ু দিতেন। ভেজা মাটির গন্ধে সকালটা অন্য রকম হয়ে উঠত।
কাশেম সাহেব বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়তেন। মাঝেমধ্যে চশমার ওপর দিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলতেন,
— "তোমার বয়স বাড়ছে, কিন্তু কাজের বয়স কমছে না। একটু বসো।"
মিরা বেগম হেসে উত্তর দিতেন,
— "সংসারে মায়েদের অবসর বলে কিছু নেই। একদিন শুয়ে থাকব, সেদিনই ছুটি পাব।"
কথাটা শুনে কাশেম সাহেব হেসেছিলেন বটে, কিন্তু বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা অজানা কষ্ট খচখচ করে উঠেছিল।
তিনি জানতেন, মিরা বেগমের হার্টের সমস্যা অনেক দিনের। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। চিকিৎসক বারবার বিশ্রাম নিতে বলেছেন। কিন্তু বিশ্রাম যেন তাঁর অভিধানে লেখা নেই।
সকালে রান্না, নাতনির খোঁজ, প্রতিবেশীর অসুস্থ মাকে দেখে আসা, আবার বিকেলে সেলাইয়ের সুতো আনতে রিনাকে মনে করিয়ে দেওয়া—সবই তিনি করেন নীরবে।
মহল্লার লোকেরা বলত,
— "মিরা ভাবি, নিজের শরীরটারও একটু খেয়াল রাখুন।"
তিনি শুধু মৃদু হেসে বলতেন,
— "নিজের কথা ভাবতে ভাবতেই তো জীবন শেষ হয়ে যায়। মানুষ যদি মানুষের কাজে না লাগে, তবে বেঁচে থাকার মানে কী?"
এই সরল কথাগুলোর জন্যই সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করত।
তবে সংসারের ভেতরে একটি অদৃশ্য টানাপোড়েন ছিল।
শাহেদের স্ত্রী রিনা বাড়িতেই দর্জির কাজ করত। হাতের কাজ ভালো হওয়ায় রোজগারও মন্দ ছিল না। কিন্তু টাকার ব্যাপারে সে ছিল অদ্ভুত রকমের হিসাবি। নিজের প্রয়োজন ছাড়া সহজে একটি টাকাও খরচ করত না।
একদিন দুপুরে বাথরুমের বাতিটি হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেল।
রিনা দেখল।
শাহেদও দেখল।
কেউ কিছু বলল না।
সন্ধ্যায় অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে মিরা বেগম প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন।
পরদিন কাশেম সাহেব বাজার থেকে নতুন বাতি কিনে এনে নিজেই লাগাতে লাগাতে হেসে বললেন,
— "একটা বাতি নষ্ট হলে ঘর অন্ধকার হয়, আর দায়িত্ব নষ্ট হলে সংসার।"
কথাটা কাউকে উদ্দেশ করে বলা নয়।
তবু সবাই বুঝেছিল।
রিনা মুখ নিচু করে নিজের ঘরে চলে গেল।
মিরা বেগম ধীরে এসে বললেন,
— "ওকে কিছু বোলো না। বয়স কম। সংসার করতে করতে একদিন সব শিখে যাবে।"
কাশেম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— "তুমি আজও সবাইকে ক্ষমা করতে পারো, মিরা।"
— "ক্ষমা না করলে সংসার টেকে?"
উত্তর দিতে পারলেন না কাশেম সাহেব।
শুধু স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সন্ধ্যায় শাহেদ বাড়ি ফিরল।
অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় করেছে, তার বেশির ভাগই বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া আর নেশায় উড়িয়ে এসেছে।
রাতের খাবার খেতে বসে বলল,
— "আম্মা, কাল বড় একটা ইলিশ আনবে। অনেক দিন ভালো মাছ খাই না।"
মিরা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— "দেখি বাবা, বাজারে ভালো পেলে আনব।"
কাশেম সাহেব চুপচাপ ভাত খাচ্ছিলেন।
খাওয়া শেষে শুধু বললেন,
— "মাছের কথা বলার আগে একবার জিজ্ঞেস করতে পারতে, তোমার মায়ের ওষুধ আছে কি না।"
শাহেদ বিরক্ত হয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রাখল।
— "আবার শুরু করলে, আব্বা?"
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
মিরা বেগম দ্রুত কথার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন।
— "আনিকা, দাদুর কাছে যা তো। দেখ, দাদু তোর জন্য মিষ্টি এনেছে।"
পাঁচ বছরের আনিকা দৌড়ে এসে দাদুর কোলে উঠতেই কাশেম সাহেবের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল।
নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি মনে মনে ভাবলেন—
সব সম্পর্ক এক রকম হয় না। তবু মানুষ ভালোবাসতে জানে বলেই সংসার ভেঙে পড়ে না।
সেদিন রাতে খাওয়া শেষে বারান্দায় পাশাপাশি বসেছিলেন কাশেম সাহেব আর মিরা বেগম।
চারদিকে শীতের কুয়াশা।
দূরের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসছে পুরোনো একটি গানের সুর।
মিরা বেগম আস্তে বললেন,
— "শুনছো, একটা কথা বলি?"
— "বলো।"
— "যদি আমি তোমার আগে চলে যাই..."
কাশেম সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিলেন।
— "এই কথাটা আর কোনো দিন বলবে না।"
মিরা বেগম মৃদু হেসে বললেন,
— "না, শুনো। যদি সত্যিই এমন হয়, তাহলে নিজের খেয়াল রাখবে। সময়মতো ওষুধ খাবে। আর মেয়েরা এলে কখনো যেন মনে না করে, তাদের মা নেই।"
কাশেম সাহেবের চোখ ভিজে উঠল।
তিনি ধীরে স্ত্রীর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
— "এত বছর ধরে তুমি আমার সংসারকে ঘর বানিয়েছ। তোমাকে ছাড়া এই বাড়িতে আমি একদিনও থাকতে পারব না।"
মিরা বেগম কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কুয়াশার আড়ালে সেদিন চাঁদটাকেও বড় মলিন লাগছিল।
কেউ জানত না, সেই রাতই ছিল তাদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের শেষ শান্ত রাত।
পরদিন গভীর রাতে হঠাৎ মিরা বেগমের বুকের ভেতর অসহ্য ব্যথা শুরু হলো।
ঘুম ভেঙে উঠে কাশেম সাহেব দেখলেন, তাঁর সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে।
বুক চেপে ধরে তিনি শুধু বললেন—
— "কাশেম... আমার খুব কষ্ট হচ্ছে..."
বাইরে তখনও ফজরের আজান হয়নি।
শীতের নিস্তব্ধ রাত যেন অদৃশ্য কোনো আশঙ্কায় আরও ভারী হয়ে উঠল।
(৩)
রাত তখন শেষ প্রহর। জানালার কাঁচে কুয়াশা জমেছে। দূরের মসজিদ থেকে এখনো আজানের ধ্বনি ভেসে আসেনি। বাড়ির চারপাশে এমন নীরবতা, যেন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে।
হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে উঠল মিরা বেগমের চাপা গোঙানিতে।
কাশেম সাহেব ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন।
দেখলেন, মিরা বেগম বুকের ওপর হাত চেপে ধরে কষ্টে শ্বাস নিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পরপর বমি হচ্ছে। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এসেছে।
— "মিরা, কী হয়েছে? বুকে বেশি ব্যথা?"
মিরা বেগম উত্তর দিতে পারলেন না। শুধু মাথা নাড়লেন।
কাশেম সাহেব তাড়াতাড়ি এক গ্লাস গরম পানি এনে দিলেন। কপালে হাত রাখতেই বুঝলেন, শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে।
এত বছরের সংসারে তিনি স্ত্রীর অসুখ অনেকবার দেখেছেন, কিন্তু আজকের মতো আতঙ্ক কোনো দিন তাঁর বুকের ভেতর নামেনি।
ভোরের আলো ফুটতেই তিনি বড় জামাইকে ফোন করলেন।
কাঁপা কণ্ঠে শুধু বললেন,
— "বাবা, তোমার আম্মার অবস্থা ভালো না। যদি পারো, এখনই চলে এসো।"
ওপাশ থেকে কোনো প্রশ্ন এল না।
— "আমি রওনা হচ্ছি, আব্বা।"
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বড় জামাই এসে পৌঁছাল।
মিরা বেগমকে দেখে সে বিস্মিত হয়ে বলল,
— "আব্বা, শাহেদ কোথায়?"
কাশেম সাহেব কিছু বলার আগেই মিরা বেগম দুর্বল কণ্ঠে বললেন,
— "ও রিনাকে নিয়ে কুয়াকাটা গেছে। গতকাল বিকেলে বেরিয়েছে।"
ঘরের ভেতর হঠাৎ এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।
কাশেম সাহেব মাথা নিচু করলেন।
তিনি কোনো অভিযোগ করলেন না।
শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
অ্যাম্বুলেন্স ডেকে মিরা বেগমকে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলো।
জরুরি বিভাগে চিকিৎসকেরা দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন।
স্যালাইন চলল।
ইসিজি হলো।
রক্ত পরীক্ষা করা হলো।
করিডোরে দাঁড়িয়ে কাশেম সাহেব একের পর এক তসবিহ পড়ে যাচ্ছিলেন।
মনে হচ্ছিল, প্রতিটি দানার সঙ্গে তিনি নিজের জীবনটাও আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছেন।
দুই ঘণ্টা পর চিকিৎসক বেরিয়ে এলেন।
— "ভয়ের কিছুটা কেটে গেছে। হার্টের রোগী হওয়ায় একটু জটিলতা হয়েছিল। এখন আপাতত স্থিতিশীল আছেন। কয়েক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখব।"
কাশেম সাহেব যেন বুকভরে শ্বাস নিলেন।
চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন,
— "আলহামদুলিল্লাহ।"
বিকেলের দিকে মিরা বেগম কিছুটা সুস্থ বোধ করলেন।
কাশেম সাহেব তাঁর পাশে বসে হাত ধরে রইলেন।
মিরা বেগম ধীরে বললেন,
— "তুমি কিছু খেয়েছ?"
কাশেম সাহেব হেসে বললেন,
— "তুমি অসুস্থ, আর আমি খাওয়ার কথা ভাবব?"
মিরা বেগম মৃদু অভিমান করে বললেন,
— "আমি না থাকলে তোমাকে কে বকবে?"
কাশেম সাহেব চোখ নামিয়ে নিলেন।
তিনি জানতেন না কেন, হঠাৎ বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছে।
সন্ধ্যার আগে চিকিৎসক বললেন,
— "রোগী এখন অনেকটাই ভালো। আজ বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন। তবে সাবধানে থাকবেন। কাল আবার দেখাবেন।"
বাড়িতে ফিরে চার মেয়ে একে একে এসে মায়ের খোঁজ নিল।
রাতের কিছু পরে শাহেদ আর রিনাও কুয়াকাটা থেকে ফিরে এল।
শাহেদের মুখে ক্লান্তির ছাপ।
রিনা এসে শাশুড়ির পায়ে হাত রেখে বলল,
— "আম্মা, আমরা খবর পেয়েই চলে এসেছি। এখন কেমন আছেন?"
মিরা বেগম শুধু বললেন,
— "আল্লাহর রহমতে একটু ভালো আছি।"
তিনি আর কিছু বললেন না।
মায়েরা অনেক সময় অভিযোগ জমিয়ে রাখেন না।
কাশেম সাহেবও কোনো কথা তুললেন না।
শুধু ছেলের মুখের দিকে একবার তাকালেন।
সেই দৃষ্টিতে রাগ ছিল না।
ছিল গভীর ক্লান্তি।
সেদিন রাতে মিরা বেগম খুব অল্প ভাত খেলেন।
ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়লেন।
ঘুমানোর আগে কাশেম সাহেব ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
— "এখন কেমন লাগছে?"
— "অনেক ভালো। তুমি দুশ্চিন্তা কোরো না।"
কথাটা শুনে কাশেম সাহেবের বুকের পাথর যেন একটু নেমে গেল।
তিনি মনে মনে ভাবলেন—
হয়তো আল্লাহ বড় বিপদ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন।
কিন্তু মানুষের আশা আর নিয়তির পথ কখনো এক হয় না।
পরদিন দুপুর।
শীতের রোদ উঠোনে নেমে এসেছে।
মিরা বেগম বারান্দায় বসে আনিকার সঙ্গে গল্প করছিলেন।
হঠাৎ তাঁর মুখের রঙ বদলে গেল।
ডান হাত বুকের ওপর চেপে ধরলেন।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ঠোঁট কাঁপছে।
তিনি কষ্ট করে বললেন—
— "কাশেম... আবার... বুকটা..."
কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি চেয়ারের ওপর ঢলে পড়লেন।
কাশেম সাহেব ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন।
তাঁর কণ্ঠ কেঁপে উঠল—
— "শাহেদ! গাড়ি ডাক! এক মুহূর্ত দেরি করিস না!"
মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির শান্ত উঠোন আবার অস্থির হয়ে উঠল।
যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও নাতনির হাসির শব্দ ছিল, সেখানে এখন শুধু উৎকণ্ঠা, কান্না আর দৌড়ঝাঁপ।
আর কাশেম সাহেবের ঠোঁটে তখন একটাই প্রার্থনা—
"হে আল্লাহ, আমার আয়ু থেকে যত দিন ইচ্ছে কেটে নিন, কিন্তু মানুষটাকে ফিরিয়ে দিন। ওকে ছাড়া কেমনে কটবে দিন।
(৪)
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শীতের বিকেলের নিস্তব্ধতা চিরে এগিয়ে চলেছে।
কাশেম সাহেব মিরা বেগমের মাথাটা নিজের কোলে তুলে বসে আছেন। তাঁর কাঁপা হাত বারবার স্ত্রীর কপালে ছুঁয়ে যাচ্ছে। ঠোঁট নড়ছে, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না। হয়তো সূরা ইয়াসিন পড়ছেন, হয়তো শুধু আল্লাহকে ডাকছেন।
মিরা বেগম আধখোলা চোখে একবার স্বামীর দিকে তাকালেন।
সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো ভয়।
ছিল দীর্ঘ পথচলার এক নিঃশব্দ ক্লান্তি।
সদর হাসপাতালে পৌঁছাতেই চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলেন।
দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
দরজার ওপারে চিকিৎসা।
এপারে অপেক্ষা।
অপেক্ষার চেয়ে দীর্ঘ আর কিছু নেই।
খবর পেয়ে একে একে চার মেয়েই এসে পৌঁছাল।
কনিকা ছুটে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল।
— "আব্বা..."
একটি শব্দের পর আর কিছু বলতে পারল না।
কাশেম সাহেব শুধু মাথা নাড়লেন।
চোখের নিচে রাত জাগার গভীর কালো দাগ।
মনে হচ্ছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মানুষটা আরও অনেকটা বুড়ো হয়ে গেছেন।
কুহেলী চুপচাপ বাবার পাশে বসে রইল।
বাবার হাতে ধরা তসবিহটা কখন যে থেমে গেছে, কেউ খেয়াল করেনি।
হাসপাতালের করিডোরে শুধু দেয়ালঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছিল।
সময় চলছিল।
কিন্তু অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোর কাছে সময় যেন থেমে ছিল।
একজন চিকিৎসক বেরিয়ে এলেন।
গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— "রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। হার্টের বড় ধরনের জটিলতা হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আপনারা দোয়া করুন।"
'দোয়া করুন'—
দুটি শব্দ।
কিন্তু সেই দুটি শব্দই যেন সবাইকে বুঝিয়ে দিল, মানুষের ক্ষমতারও একটি শেষ সীমা আছে।
কাশেম সাহেব ধীরে উঠে হাসপাতালের ছোট্ট নামাজঘরে গেলেন।
সিজদায় মাথা রেখে অনেকক্ষণ আর উঠলেন না।
চোখের জল নীরবে জায়নামাজ ভিজিয়ে দিল।
কেউ তাঁর কান্নার শব্দ শোনেনি।
তিনি কাঁদছিলেন না।
তিনি ভেঙে পড়ছিলেন।
অনেক বছর আগে বিয়ের রাতের কথা তাঁর মনে পড়ল।
মিরা বেগম লাজুক মুখে বলেছিলেন—
— "আমার বেশি কিছু চাওয়া নেই। শুধু পাশে থাকবেন।"
কাশেম সাহেব হেসে উত্তর দিয়েছিলেন—
— "আল্লাহ যত দিন রাখেন, তত দিন।"
আজ সেই কথাগুলো বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধছিল।
একসময় আইসিইউ থেকে একজন নার্স এসে বললেন,
— "রোগী তাঁর স্বামীকে একবার দেখতে চাইছেন।"
কাশেম সাহেব ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন।
বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তাঁর বুকটা হুহু করে উঠল।
এ কি সেই মিরা?
যে সারাজীবন সংসারের সব ঝড় নিজের বুকে সামলেছে?
অক্সিজেনের মাস্কের ভেতর থেকেও মিরা বেগম তাঁকে চিনে ফেললেন।
চোখের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
কাশেম সাহেব তাঁর হাতটি নিজের দুই হাতে তুলে নিলেন।
হাতটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
— "মিরা... আমি এসেছি।"
মিরা বেগম খুব কষ্ট করে ফিসফিসিয়ে বললেন,
— "মেয়েদের... কষ্ট... দিও না..."
কাশেম সাহেব চোখ মুছলেন।
— "তুমি নিজেই বলবে ওদের। তুমি সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবে। উঠোনে বসে আবার শিউলি কুড়াবে।"
মিরা বেগম খুব ধীরে মাথা নাড়লেন।
তারপর অস্পষ্ট কণ্ঠে বললেন—
— "সব... গাছগুলোতে... পানি... দিও..."
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই তাঁর চোখ বেয়ে দুটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।
কাশেম সাহেব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।
তিনি স্ত্রীর কপালে কপাল ছুঁইয়ে নিঃশব্দে কেঁদে উঠলেন।
কোনো শব্দ নেই।
কেবল কাঁধ দুটো কেঁপে উঠছিল।
যেন দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের সংসার নীরবে ভেঙে ভেঙে পড়ছে।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কনিকা কাচের জানালা দিয়ে সেই দৃশ্য দেখে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
কুহেলী এসে বোনের কাঁধে হাত রাখল।
কেউ উচ্চস্বরে কাঁদছিল না।
হাসপাতালের করিডোরে শুধু চাপা কান্নার শব্দ।
যে কান্না বুকের ভেতর জমে থাকে, ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
হঠাৎ আইসিইউর ভেতরে ব্যস্ততা বেড়ে গেল।
চিকিৎসকেরা ছুটে এলেন।
মনিটরের শব্দ দ্রুত বদলে যেতে লাগল।
দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল।
করিডোরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
কয়েক মিনিট...
তারপর আরও কয়েক মিনিট...
সময় যেন আর এগোতে চাইছিল না।
অবশেষে দরজাটি ধীরে খুলল।
চিকিৎসক এগিয়ে এলেন।
চশমাটা খুলে নিচু স্বরে বললেন—
— "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন... আমরা তাঁকে আর বাঁচাতে পারলাম না।"
শব্দগুলো শেষ হতেই কনিকা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মেঝেতে বসে পড়ল।
কাজরী দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিল।
কবিতার চোখে জল ছিল, কিন্তু কোনো শব্দ ছিল না।
কুহেলী শুধু বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
কাশেম সাহেব স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মনে হচ্ছিল, তিনি কিছুই শুনতে পাননি।
ধীরে ধীরে তিনি আইসিইউর দরজার কাছে গেলেন।
স্ত্রীর নিথর মুখের দিকে একবার তাকালেন।
তারপর খুব আস্তে তাঁর কপালে হাত রেখে বললেন—
— "মিরা... আজ প্রথমবার তুমি আমার অপেক্ষা না করেই চলে গেলে..."
এরপর আর কোনো কথা বলতে পারলেন না।
চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
তিনি শিশুদের মতো হাউমাউ করে কাঁদেননি।
শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন।
যে কান্নার শব্দ বাইরে শোনা যায় না—
কিন্তু ভেতরে ভেতরে একজন মানুষকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়।
(৫)
মিরা বেগমকে গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হলো।
আসর নামাজের পর জানাজা শেষ হতে না হতেই শীতের আকাশে একঝাঁক সাদা বক উড়ে গেল। মানুষের ভিড় ধীরে ধীরে কমে এল। কেউ কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিল, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল। কিন্তু কাশেম সাহেব নড়লেন না।
তিনি কবরের পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ভেজা মাটির দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ যেন তাঁর কানে পৌঁছানো বন্ধ হয়ে গেছে।
ধীরে ধীরে তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন।
আঙুল দিয়ে কবরের মাটি ছুঁয়ে খুব আস্তে বললেন,
— "মিরা... এত তাড়াতাড়ি কথা রাখলে? বলেছিলে, আমায় একা রেখে যাবে না।"
বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে গেল।
কোনো উত্তর এল না।
শুধু দূরে একটি শালিক ডেকে উঠল।
...
বাড়িতে ফিরে দরজা খুলতেই বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল।
এই তো সেই ঘর।
এই তো সেই বারান্দা।
এই তো সেই চেয়ার, যেখানে বসে প্রতিদিন বিকেলে মিরা বেগম সুপারি কাটতেন।
সবকিছু আছে।
শুধু মানুষটি নেই।
বিছানার পাশে ভাঁজ করে রাখা শাড়িটি তিনি হাতে তুলে নিলেন।
শাড়ির আঁচলে এখনো মৃদু আতরের গন্ধ।
কাশেম সাহেব শাড়িটি বুকের সঙ্গে চেপে ধরলেন।
চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
কেউ দেখল না।
মানুষটি সারা জীবন সংসারের সামনে নিজের কান্না লুকিয়ে রেখেছেন।
আজও পারলেন না বদলাতে।
রাত নামল।
অভ্যাসবশত তিনি বললেন,
— "মিরা, ওষুধ খেয়েছ?"
কথা শেষ করেই থমকে গেলেন।
ঘরের নীরবতা তাঁর প্রশ্নটিকে ফিরিয়ে দিল।
সেই রাতে তাঁর আর ঘুম আসেনি।
ফজরের আগে তিনি উঠোনে বেরিয়ে এলেন।
শিউলি গাছের নিচে অসংখ্য ফুল ঝরে আছে।

Comments
Post a Comment