নীল ডায়েরির কবিতা
রণক্ষেত্রের চিঠি
বারুদের গন্ধে আজ বসন্তের হাওয়া ভারী,
হাতে বন্দুক, আর পকেটে তোমার দেওয়া শেষ চিঠি।
পরম মমতায় বেঁচে থাকা কতটুকু আর জানি?
শুধু জানি—দূর দিগন্তে তুমি ভালো আছো, এটাই বড় ফাঁকি।
এখানে আকাশ নীল নয়, এখানে আকাশ ধোঁয়ায় ঢাকা,
প্রতিটা পদক্ষেপে মরণের সাথে লুকোচুরি খেলা।
ভালোবাসা আজ বিলাসিতা, বেঁচে থাকাটা অভ্যাস,
তোমার চোখের ছবিটা বুলেটের চেয়েও বেশি দাহ্য।
যদি ফিরি, তবে চিনে নিও ক্ষতবিক্ষত এই দেহ,
যদি না ফিরি, বুঝো—দেশপ্রেমই ছিল আমার গহ।
শিরদাঁড়া সোজা রেখেছি আগুনের শিখায়,
তোমায় ভালোবেসেই বেঁচে আছি, আবার তোমায় ভালোবাসার অপেক্ষায়।
তুমি কি শুনছো? গুলির আওয়াজেও তোমার নাম বাজে,
এই যুদ্ধ শেষে শুধু জানি, শান্তি মানে তুমিই আমার কাছে।
পৃথিবীটা ধ্বংস হোক, ছাই হয়ে যাক মিথ্যে অহংকার,
আমার প্রেম বেঁচে থাকবে, এই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে বারবার।
বৃষ্টির শহর ও বিচ্ছেদ
বৃষ্টির শহরে আজ একলা আমি, সাথে এক কাপ বিষাদ,
জানলার কাঁচে তোমার আঙুলের দাগ, মুছে গেছে অনেক আগেই।
মানুষ বলে সব নাকি ভুলে যেতে হয় সময়ের স্রোতে,
আমি আজও সেই পুরনো ট্রামে খুঁজে বেড়াই তোমায় প্রতি রাতে।
তোমার চোখের জল আর আমার জমে থাকা অভিমান,
এই শহরের কোণে কোণে বেঁচে আছে এক অদ্ভুত ব্যবধান।
যুদ্ধ চলছে ভেতরে, বাইরে, পৃথিবীর মানচিত্রে কোথাও—
আমার যুদ্ধটা শুধু তোমার স্মৃতি নিয়ে, তুমি জানো তা কোনোদিনও?
বাস্তবের কঠিন দেয়ালে মাথা খুঁড়ে মরি রোজ,
প্রেমের মানে কি কেবলই হারিয়ে যাওয়ার খোঁজ?
যদি না থাকো, তবে কেন এই দীর্ঘশ্বাস ভারী?
আবারও কোনো এক জনমে তোমার হাত ধরার প্রস্তুতি সারি।
চোখ খুললেই দেখি আকাশটা যেন আমাদেরই রক্তে রাঙা,
ভালোবাসা কোনোদিন মরে না, শুধু হয়ে যায় ছন্নছাড়া ও ভাঙা।
ধ্বংসের পরেও বাগান
বোমা পড়ে ধুলোয় মিশে গেছে বাড়ির শেষ দেয়াল,
তবু মাটির গভীর থেকে উঁকি দিচ্ছে একগুচ্ছ জংলি ফুল।
এটাই কি বেঁচে থাকা? এটাই কি জীবনের চিরন্তন পাঠ?
সব হারিয়েও আকাশ দেখবার নেশায় আমরা আজও অবিচল।
যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে আপনজন, কেড়ে নিয়েছে স্বপ্নরাশি,
তবু ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটাই—এই তো আমাদের জয়।
প্রেম আর বিরহ—এ যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ,
তোমাকে হারিয়েই আমি খুঁজে পেয়েছি নিজের আসল রূপ।
শিরদাঁড়া সোজা রেখে দাঁড়িয়ে আছি ধ্বংসের এই কঙ্কালে,
ভয়ংকর সুন্দর পৃথিবী, যেখানে জীবন লড়ে মৃত্যুর জালে।
মানুষের রক্তে ভেজা মাটি, তবুও নতুন প্রাণের গান,
আমরাই সেই অদম্য যোদ্ধা, যাদের নেই কোনো পিছুটান।
যদি কোনোদিন পৃথিবীটা শান্ত হয়, তবে এসো দেখা করি,
এই পোড়া জমিতেই আমরা নতুন এক বাগান গড়ি।
সময়ের নিষ্ঠুর ঘড়ি
ঘড়ির কাঁটা কাঁপছে, সাথে কাঁপছে আমার বুক,
সময় নিষ্ঠুর—সে কোনোদিন কারো চোখের জল দেখেনি।
তুমি চলে গেছো বহুদূর, যেখানে ফেরার পথ বন্ধ,
আমি এখানে বাস্তবতার নগ্ন রূপ দেখে আজ স্তব্ধ।
প্রেম এক মরীচিকা, বিরহ এক চিরন্তন সত্য,
যুদ্ধ শেষে পড়ে থাকে কেবলই শূন্যতার নগ্ন নৃত্য।
আমরা কি কখনো মানুষ ছিলাম, না কি শুধুই পুতুল?
বাস্তবতা আমাদের শিখিয়েছে—আশা করাটাই বড় ভুল।
শিরদাঁড়া বাঁকিয়ে যারা টিকে থাকে, তারা অভিশপ্ত,
আমি সোজা মেরুদণ্ডে লড়াই করি—এটাই আমার প্রাপ্তি।
তোমার গলার স্বর এখনো বাজে ওই দূর আকাশের নীলে,
আমি কি পাবো কোনোদিন মুক্তি? তোমার স্মৃতিগুলো ছিঁড়ে ফেলে?
না, মুক্তি চাই না—এই বেদনাই তো আমার বেঁচে থাকার রসদ,
তোমার বিরহ নিয়েই আমি পাড়ি দেবো এই দীর্ঘ পথ।
অপরাজিত আমি
আমি কোনো দেবদূত নই, আমি এক রক্তমাংসের মানুষ,
যার বুকে যুদ্ধের ক্ষত, চোখে বিরহের অতল সাগর।
প্রতিটা ভোর যখন শুরু হয়, আমি আবার নতুন করে লড়ি,
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের নামটা জোরে উচ্চারণ করি।
প্রেম কি খুব সুন্দর? হ্যাঁ, যদি তাতে থাকে ত্যাগের স্বাদ,
আর বিরহ? তা তো আত্মার পরিশুদ্ধি—এক শান্ত অবগাহন।
বাস্তবতা রুক্ষ, পাথরচাপা জীবন আমাদের উপহার,
তবুও আমরা ডানা মেলি—এই তো জয় করার অহংকার।
তুমি কি দেখছো? আমার চোখ দিয়ে ঝরছে উজ্জ্বল হীরা,
ওগুলো জল নয়, ওগুলো লড়াইয়ের শেষ চিহ্ন।
ভয়ংকর সুন্দর পৃথিবী, তুমি আমায় হারাতে পারবে না,
আমি সেই শিখা, যা নিভে গিয়েও আবার জ্বলে ওঠে নতুন আয়নায়।
শিরদাঁড়া সোজা, বুকটা টানটান—আমি এখনো বর্তমান,
পৃথিবীর সমস্ত আঘাত তুচ্ছ করে, আমিই অপরাজিত জীবন।

Comments
Post a Comment