প্রেমের অনন্ত অনুরণন :
ক্রিস্টোফার মার্লো ও কাজী নজরুল ইসলাম
আহমেদ বেলাল
পৃথিবীর ইতিহাসে সভ্যতা বদলেছে, সাম্রাজ্য উঠেছে ও ভেঙে পড়েছে, মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা—সবই যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু মানুষের হৃদয়ের গভীরে যে প্রেম বাস করে, তার রূপ কখনো বদলায়নি। প্রেম চিরকাল একইভাবে মানুষকে কাঁদিয়েছে, স্বপ্ন দেখিয়েছে, সৌন্দর্যের সন্ধান শিখিয়েছে। এই প্রেমই কখনো কবির হাতে ফুল হয়ে ফুটেছে, কখনো সুর হয়ে ঝরেছে, কখনো বা জোছনার মতো নিঃশব্দে নেমে এসেছে কবিতার পাতায়।
বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত ভুবনে এমন বহু কবি আছেন, যাঁদের জন্ম ভিন্ন দেশে, ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন সংস্কৃতিতে; অথচ তাঁদের হৃদয়ের স্পন্দন যেন এক অদৃশ্য সেতুবন্ধনে যুক্ত। ইংরেজ কবি ও নাট্যকার ক্রিস্টোফার মার্লো এবং বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী অথচ অসামান্য রোমান্টিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেই বিরল দুই কবি, যাঁদের কাব্যে আমরা একই প্রেমময় আকুতির অনুরণন দেখতে পাই।
একজন ষোড়শ শতকের ইউরোপীয় রেনেসাঁর সন্তান, অন্যজন বিংশ শতকের উপমহাদেশীয় ঔপনিবেশিক বাস্তবতার বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর। একজনের হাতে ইংরেজি সনেট ও নাটকের কলম, অন্যজনের কণ্ঠে বিদ্রোহের বাঁশি ও প্রেমের জয়গান। কিন্তু যখন তাঁরা প্রেমের কথা বলেছেন, তখন ভাষা ও ভূগোলের সমস্ত ব্যবধান যেন মিলিয়ে গেছে। তাঁদের কবিতায় একইভাবে ধ্বনিত হয়েছে প্রিয় মানুষকে কাছে পাওয়ার আকুতি, তাকে সৌন্দর্যের অলংকারে সাজিয়ে তোলার বাসনা এবং প্রেমকে স্বর্গীয় আনন্দের এক চিরন্তন উৎসব হিসেবে দেখার মানসিকতা।
ক্রিস্টোফার মার্লোর বিখ্যাত কবিতা 'The Passionate Shepherd to His Love' মূলত এক প্রেমিক রাখালের নিবেদন। সেখানে কবি তাঁর প্রেমিকাকে আহ্বান জানান প্রকৃতির কোলে এসে এক স্বপ্নময় জীবন গড়ে তুলতে। কবিতার শুরুতেই তিনি বলেন-
“Come live with me and be my love”
এই একটি পঙ্ক্তির মধ্যে যেন প্রেমের সমস্ত কোমলতা জমাট বেঁধে আছে। এখানে কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই; আছে শুধু হৃদয়ের একান্ত ডাক। যেন প্রেমিক তাঁর সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে প্রিয়তমাকে বলতে চাইছেন—এসো, পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ভুলে আমরা একসাথে ভালোবাসার এক নতুন জগৎ গড়ে তুলি।
অপরদিকে, বাংলা সাহিত্যের অগ্নিবীণা হাতে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামও তাঁর গীতিকবিতা 'মোর প্রিয়া হবে এসো রানী'-তে একই আকুতি ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন—
“মোর প্রিয়া হবে, এসো রানী”
এই আহ্বানেও আছে প্রেমিক হৃদয়ের নিবিড় আকাঙ্ক্ষা। তবে নজরুলের কণ্ঠে প্রেম যেন আরও অলংকৃত, আরও রূপময়। তিনি তাঁর প্রেমিকাকে কেবল প্রিয়া বলে ডাকেননি; তাঁকে রাণীর মর্যাদা দিয়েছেন। প্রেম এখানে কেবল অনুভূতি নয়, এক আরাধনা।
মার্লো তাঁর প্রেমিকাকে প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা এক জীবনের প্রতিশ্রুতি দেন-
“Come live with me and be my love
And we will all the pleasures prove,
That valleys, groves, hills and fields,
Woods, or steepy mountain yields.”
উপত্যকা, বনভূমি, পাহাড়, মাঠ- প্রকৃতির প্রতিটি সৌন্দর্য যেন প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য উন্মুক্ত। মার্লোর প্রেম প্রকৃতিনির্ভর, নির্মল ও শান্ত। সেখানে সভ্যতার কোলাহল নেই; আছে সবুজ ঘাসের ওপর বসে দু’জন মানুষের ভালোবাসার স্বপ্ন।
অন্যদিকে নজরুল যখন তাঁর প্রেমিকাকে সাজানোর কথা বলেন, তখন তাঁর কল্পনা ছুঁয়ে যায় আকাশের সীমানা—
"মোর প্রিয়া হবে, এসো রানী
দেবো খোঁপায় তারার ফুল,
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির
চৈতী চাঁদেরো দুল।”
এ যেন কল্পনার এক অপার্থিব জগৎ। তিনি বাজারের সোনা-রূপার গয়না দিয়ে প্রিয়াকে সাজাতে চান না; তিনি সাজাতে চান নক্ষত্রের ফুল দিয়ে, চৈত্রের চাঁদের আলো দিয়ে। তাঁর প্রেমিক হৃদয় এতটাই উদার যে পৃথিবীর কোনো বস্তু তাঁর প্রেমিকার সৌন্দর্যের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে না।
মার্লো তাঁর কবিতায় প্রেমিকাকে গোলাপের বিছানা উপহার দিতে চান—
"And I will make thee bed of roses
And a thousand fragrant poises,
A cap of flowers, and a little
Embroidered all with leafs of Myrtle."
গোলাপের বিছানা এখানে শুধু রোমান্টিক কল্পনা নয়; এটি প্রেমের কোমলতা ও সুগন্ধের প্রতীক। তিনি আরও বলেন, মার্টল পাতায় সূচিকর্ম করা পোশাক তিনি তাঁর প্রেমিকাকে পরাবেন। প্রেম যেন প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে যায়।
নজরুলও তাঁর প্রেমিকাকে সাজানোর জন্য এমন সব চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন, যা বাংলা গীতিকবিতাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে—
“কণ্ঠে তোমার পরাবো বালিকা,
হংস-সারির দুলানো মালিকা।
বিজলী জরীণ ফিতায় বাঁধিবো
মেঘ-রঙ এলো চুল।”
কী আশ্চর্য কল্পনা! বিদ্যুতের ঝলক যেন ফিতার কাজ করছে, মেঘের রঙ এসে জড়িয়ে যাচ্ছে প্রিয়ার চুলে। এখানে প্রেম শুধুই অনুভূতি নয়; এটি হয়ে ওঠে এক বিশাল শিল্পলোক।
মার্লো তাঁর প্রেমিকাকে উলের নরম পোশাক, খাঁটি সোনার বকলস আর শীতের আরামের প্রতিশ্রুতি দেন-
"A gown made of the finest wool
Which from our pretty lambs we pull,
Fair lined slippers for the cold
With buckle of the purest gold."
অন্যদিকে নজরুল তাঁর প্রেমিকাকে সাজাতে চান জোছনা, চন্দন আর রামধনুর রঙে—
“জোছনার সাথে চন্দন দিয়া
মাখাবো তোমার গায়,
রামধনু হতে লাল রঙ ছানি
আলতা পরাবো পায়।”
এখানে চাঁদের আলো যেন চন্দনের সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রেমিকার শরীরে এক স্বর্গীয় আভা ছড়িয়ে দেয়। রামধনুর রঙ এসে আলতা হয়ে রাঙিয়ে তোলে তাঁর পা। এমন কল্পনা কেবল একজন মহৎ কবির পক্ষেই সম্ভব।
মার্লো তাঁর প্রেমিকাকে আনন্দ দিতে চান রাখালদের নাচ-গানের মাধ্যমে—
"The shepherd's swains shall dance and sing For the delight each may morning,
If these delights thy mind may move
Then live with me and be my love."
অন্যদিকে নজরুল তাঁর গানের সাত সুর দিয়ে প্রেমিকার বাসর সাজাতে চান—
“আমার গানের সাত-সুর দিয়া,
তোমার বাসর রচিবো প্রিয়া।
তোমারে ঘিরিয়া গাহিবে আমার
কবিতার বুলবুল।”
এ যেন প্রেম, সংগীত ও কবিতার এক ত্রিবেণী মিলন। নজরুলের কাছে প্রেম শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি এক সৃজনশীল উৎসব। তাঁর কবিতার বুলবুল যেন প্রেমিকার চারপাশে গান গেয়ে তাকে ভালোবাসার আবরণে ঢেকে দেয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য হলো—এই দুই কবির জীবন ও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মার্লো জন্মগ্রহণ করেছেন ১৫৬৪ সালে ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবেরিতে। Canterbury- এর রেনেসাঁ যুগে জন্ম নেওয়া মার্লো ছিলেন মানবতাবাদী চিন্তার কবি। তিনি এমন এক ইউরোপে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনের নতুন জাগরণ শুরু হয়েছিল। মার্লো ১৫৯৩ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে বন্ধুর ছুরিকাঘাতে মারা যান। অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছেন ১৮৯৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে এবং ১৯৭৬ সালে ৭৭ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। দরিদ্র এক গ্রামে জন্ম নেওয়া নজরুল বড় হয়েছেন সংগ্রাম ও দারিদ্র্যের ভেতর দিয়ে। তিনি ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক। তাঁর কবিতায় যেমন বজ্রের গর্জন ছিল, তেমনি ছিল ফুলের কোমল সুবাস। তিনি যেমন 'বিদ্রোহী' কবিতায় পৃথিবী কাঁপিয়েছেন, তেমনি প্রেমের গানে মানুষের হৃদয় ভরিয়ে দিয়েছেন অপার্থিব সৌন্দর্যে।
এই দুই কবির সৃষ্টিকর্ম আমাদের শেখায়—মানুষের হৃদয়ের অনুভূতি আসলে সর্বজনীন। একজন ইংরেজ কবি আর একজন বাঙালি কবি, শতাব্দীর ব্যবধান পেরিয়েও একইভাবে প্রেমের সৌন্দর্য অনুভব করেছেন। তাঁরা দু’জনেই বিশ্বাস করতেন- প্রেম মানে কেবল দু’টি মানুষের সম্পর্ক নয়; প্রেম মানে সৌন্দর্যের আরাধনা, কল্পনার মুক্ত উড়ান এবং জীবনের গভীরতম আনন্দকে উপলব্ধি করা।
সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—এটি মানুষকে দেশ, ভাষা ও সময়ের সীমার বাইরে এনে এক মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ করে। তাই ক্রিস্টোফার মার্লো ও কাজী নজরুল ইসলাম আজও একই আকাশের দুটি দীপ্ত নক্ষত্রের মতো আমাদের হৃদয়ে জ্বলে থাকেন। একজনের কণ্ঠে ইংল্যান্ডের সবুজ উপত্যকার সুর, অন্যজনের কণ্ঠে বাংলার চৈতী চাঁদের আলো; কিন্তু তাঁদের প্রেমের ভাষা একই- মানবহৃদয়ের চিরন্তন ভাষা।
Comments
Post a Comment