পাশের বাড়ি
অরণ্যানী
পাশের বাড়িটি আজ নির্জন ও নিস্তব্ধ। শিশুর কলকাকলি আর ভেসে আসে না। কর্মব্যস্ত মায়ের কন্ঠস্বর শোনা যায় না। কিছু বৎসর পূর্বেও মা ও শিশুদের কলতান ও দস্যিপনায় ঘুম ভেঙে যেত সকালে। এখন বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকলেও কারুর কন্ঠস্বরে ঘুম ভাঙে না। উপরে বয়স্ক স্বামী স্ত্রীর গলার আওয়াজ বিশেষ পাওয়া যায় না। নীচের তলায় ছেলে বৌমা থাকত। যারা আজ কোথায় ভাড়া আছে কেউ জানে না।
আমার নীচের ঘরের শান্ত শীতল নির্জন পরিবেশ তখন মাঝে মধ্যেই অশান্ত হয়ে উঠত পাশের বাড়ির গোলমালে। অল্পবয়সী স্বামী স্ত্রী। তিনটি বাচ্চা। বড় মেয়েটিই তবু একটু বড়। কিশোরী বলা চলে। অল্পবয়সী বউটিকে সদা-সর্বদা হাসিখুশি ভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুনতাম। কখনোবা বেশ দক্ষতার সঙ্গে ছোট দুটি সন্তানকে সামলাতে দেখতাম। পাশাপাশি বাড়ি। দুই বাড়ির জানলা খুললে সবই দেখা যেত।
একদিন বউটির সঙ্গে আলাপ করলাম। তারপর থেকে মাঝে মধ্যে কথাবার্তা হতো। বউটির মুখেই শুনি, তাদের প্রেমের বিয়ে। আঠারো বছর বয়সে বিয়ে করে সিজার করে তিনটি সন্তান হয়। তৃতীয় সন্তানটি অজান্তে গর্ভে এসে যায়। ইউট্রাস বাদ দিতে হয় টিউমারের কারণে। এরমধ্যে আবার গল্ডব্লাডার অপারেশন হয়ে গেছে। এতগুলো সন্তানের জন্ম দেওয়া, ও এতগুলো অপারেশনের পরও কর্মশক্তি কিছুমাত্র কম ছিল না বউটির। সকালে উঠে একলা হাতেই সব কাজ সেরে ফেলত খুব দ্রুত হাতে। ওই কাজ করতে করতেই গল্প চলত আমাদের। আর গল্প করতে করতেই এত কথা জানা।
কিন্তু এই সুখের সংসারে একদিন দারিদ্র্যের ছোঁয়া লাগলো। বড় মেয়েটার পড়ার খরচ, সেছাড়া স্বামীর ব্যবসার ক্ষতি। গাড়ির ব্যবসা ছিল। গাড়ি বিক্রি হয়ে গেল। বউটি দারিদ্র্যের মধ্যেও পূর্বের ন্যায় খুশি মনেই থাকত। কিন্তু স্বামীর ডিপ্রেশন এল। ডিপ্রেশন থেকে নেশা। মদের আসক্তি দিয়ে ডিপ্রেশনকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করল। কিন্তু নেশার প্রতি আসক্তি ক্রমশ সংসারে অশান্তির সৃষ্টি করল। বউটি চাইত না তার স্বামী মদ খাক। অশান্তির শুরু এখান থেকেই। কিন্তু নেশা একবার ধরলে তার পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকে। স্ত্রী প্রতিবাদ করলে স্ত্রীকে মারধর করা শুরু করল। স্ত্রী কিছুতেই মেনে নিতে পারল না স্বামীর এই আচরণ। স্ত্রীর প্রতি নির্যাতনের পরিমাণ বাড়তে লাগল। মদ্যপ অবস্থায় মাঝরাতে বাড়ি ফিরে স্বামী অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকত। ক্রমশ স্ত্রীও অকথ্য গালাগালি দিতে থাকত পাল্টা। কিন্তু পুরুষ মানুষের সঙ্গে গায়ের জোরে পেরে উঠত না। বাচ্চাদের সামনে মাকে মারধর করলে বাচ্চারা চিৎকার করে কাঁদতে থাকত। চমকে মধ্যরাতে আমারও ঘুম ভেঙে যেত। স্বামীটি ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করত। আমি ভাবতাম, বাচ্চাগুলোর আতঙ্কের কথা। প্রতিবেশীরা কেউ হস্তক্ষেপ করত না। আমি একা কী করতে পারি? অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে কতক্ষণ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সহ্য করা যায়? একদিন প্রতিবাদ করতে প্রতিবেশী দু 'একজন এলেন। তখনকার মত থামল। কিন্তু দু' একদিন পর সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
কিন্তু বউটির মুখের হাসি এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কেড়ে নিতে পারেনি। আগের মতই দিনেরবেলা হাসিখুশি ভাবেই বাচ্চাদের সঙ্গে কাটত। কিন্তু গভীর রাতে স্বামীর মাতলামি ও নির্যাতন বন্ধ হল না। প্রতিবেশীরা ছোটলোক উপাধি দিয়ে সরে গেল একে একে পাশ থেকে। বউটি নিজেই থানায় খবর দিয়ে সব জানায়। তারপর মারধর না করলেও অকথ্য গালিগালাজ চলতে থাকত স্বামী স্ত্রীর মধ্যে। একদিন ছোট মেয়েটার মুখে শুনলাম বাবা মাকে বলছে, "তোমরা কেউই ভালো নয়"।
আমার ঘুম নিয়ে সমস্যা তো ছিলই, তার উপর হঠাৎ হঠাৎ আচমকা বাড়িটিতে চিৎকার, মারামারি, ইত্যাদি দেখে বড় টেনশন হত। কোনদিন কী ঘটে যায়। প্রতিবেশীরাও বিরক্ত এই পরিবারটিকে নিয়ে। উপরে বয়স্ক শ্বশুর শাশুড়িরও ভদ্র সমাজে মেলামেশা বন্ধ হওয়ার জোগাড়। শেষ পর্যন্ত শ্বশুর মশাই তার ছেলেকে পরিবার সহ উঠে চলে যেতে নির্দেশ দিলেন। হঠাৎ একদিন সকালে দেখলাম তাদের বাড়ির সামনে ম্যাটাডর। তাতে ঘরের আসবাব-পত্র বোঝাই করা হচ্ছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে না। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।
চলে গেল উঠে ওই পরিবার। ভদ্র পাড়ায় আর কেউ ছোটলোকি করে না। পাশের বাড়ির নীচের তলা আজও ফাঁকা, নীরব অবস্থায় পড়ে আছে। কারুর কন্ঠস্বরে আজ আর ঘুম ভাঙে না। যার যতক্ষণ খুশি ঘুমাতে পারে। নেই কোনো প্রকাশ্য অশান্তি। নেই পাশের বাড়িতে শিশুর কলতান। নেই ব্যস্ত মায়ের সকালবেলা উঠে কাজের ব্যস্ততা।

Comments
Post a Comment