শিল্পী
সুকান্ত ঘোষ
কেরামত দাকে চিনি সেই ছেলে বেলা থেকে। কেরামত দা মোটেই আমার দাদার বয়সী নয়। পাড়ার কাকারা যখন ক্লাবের মাঠে ফুটবল খেলত তখন কেরামত দাকে অসাধারণ গোল কিপিং করতে দেখেছি। সেই হিসাবে তাকেও আমার কাকা বলে ডাকাই উচিত।কিন্তু,সবাই দাদা ডাকে বলে আমিও ' কেরামত দা ' বলেই ডাকি।তাছাড়া বয়স হলেও শরীর টা বেশ ঝরঝরে রেখেছে এখনো।
কেরামত দা আমাদের মতো ফুটবল প্রেমী কিশোর দের কাছে খুব প্রিয়।প্রথমত যদি হয় আমরা ছেলেবেলায় তার অসাধারণ গোল কিপিং দেখেছি সেই জন্য,বিশেষত একটু লাফিয়ে বল রিসিভ করে শূন্যে একটা ডিগবাজি দেবার দৃশ্যটা চোখের উপর আমাদের ভেসে থাকে।দ্বিতীয়ত,তার অমায়িক ব্যবহার। আমাদের খুব ভালবাসে কেরামত দা। তাই আমাদের কাছে কেরামত দা খুব প্রিয়।
কম বয়সে নিজে খুব ভালো গোলকিপার ছিল কেরামত দা একথা আগেই বলেছি।মহমেডান জুনিয়র টিমে খেলতে গিয়ে বুকের পাঁজর ভেঙে গেলে ফুটবলার হবার আশা শেষ হয়ে যায় তার। পাড়ার ক্লাবে নিয়মিত আসতো।
তবে,বছর দুয়েক আগে ক্লাবে সরস্বতী পুজো হবে নাকি বিশ্বনবী দিবস এই বিতর্ক দানা বাধার পর থেকেই এত প্রিয় ক্লাবে আসাও বন্ধ করে দেয় কেরামত দা। ফুটবল মাঠে মাঝে মাঝে আসে এখনো।চুপচাপ খেলা দেখে।নিজে থেকে কিছু বলে না। আমরা জিজ্ঞেস করলে ভুল ত্রুটি শুধরে দেয়।
এখন নাকি কেরামত দা হ্যান্ড গ্লাভস এর ভালো মিস্ত্রী।চামড়ার ওপর ড্রয়িং করে কাঁচির এক এক প্যাঁচে চামড়ার ফালি বের করে নিখুঁত হ্যান্ড গ্লাভস তৈরী করে।সেই সব গ্লাভস বিদেশে রপ্তানী হয়।
সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটলো যার প্রসঙ্গে কেরামত দার অবতারণা করতে হল।
শিবপুর ক্লাব প্রতি বছরই এই সময় একটা ফুটবল লীগ এর আয়োজন করে। এবার আমরা অর্থাৎ চণ্ডীপুর বিদ্রোহী সংঘ লীগে খুব ভালো খেলছি। ষোলো টিমের লীগে দ্বিতীয় পজিশনে আছি।আমাদের দুই স্ট্রাইকার বিজন আর নিউটন গোলের মধ্যে আছে।বিশেষ করে নিউটনের সাপের মত এঁকেবেঁকে দৌড় কেউ ধরতেই পারছে না। ডিফেন্স এ আমিও মোটামুটি ভরসা যোগাচ্ছি। কিন্তু, বিপদ ঘটিয়ে বসালো পল্টু।পল্টু আমাদের ক্লাবের নির্ভরযোগ্য গোলকিপার। ও গোলে দাঁড়ালে বিপক্ষ স্ট্রাইকার এর বুক কেঁপে যায়। বল তো রিসিভ করেই।তার সাথে এমন চোরাগোপ্তা একটা মার মারে যে রেফারী ধরতেই পারে না। গত ম্যাচে তো বাঁশ বেড়িয়ার বনবিহারী কে মাঠ ছেড়ে উঠেই যেতে হল।অথচ,মুখ দেখলে মনে হবে দিব্যি শান্ত শিষ্ট।
এহেন পল্টু হঠাৎ জ্বর বাধিয়ে বসলো ।অথচ একদিন পরেই টেপুর ফিজিকাল এর সঙ্গে খেলা।ওরা লীগে এখনো পর্যন্ত প্রথম পজিশনে আছে। এই নিয়েই আমরা মাঠে আলোচনা করছিলাম খেলার পর। দীপু হয়তো একটা দুটো ম্যাচ খেলে দিতে পারবে। কিন্তু,পল্টুর মত পারবে কি না সেটা নিয়েই আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম।
আমাদের চিন্তায় দেখে কেরামত দা এগিয়ে এলো।বললো," চিন্তা করিসনা।ভালো একটা গোল কিপার আমার সন্ধানে আছে।কাল বিকাল তিনটায় খেলা তো? আমি ঠিক সময়ে তাকে নিয়ে শিবপুর মাঠে পৌঁছে যাবো।"
আমরা তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।কেরামত দা যখন ভালো বলছে তখন নিশ্চয়ই ভালো হবে।
কিন্তু,পরদিন শিবপুর মাঠে গিয়ে মাথায় বজ্রাঘাত হল।
কেরামত দা এলো ঠিকই ,কিন্তু তার সেই গোলকিপার নাকি অন্য কোথায় খেপ খেলতে চলে গেছে।আমরা তো আর টাকা দিতে পারবো না! সে নাকি ম্যাচ পিছু দুহাজার টাকা পাবে। চণ্ডীপুর বিবেক সংঘের এত টাকা কোথায়? এদিকে দীপু আবার অভিমান করে আসেনি।
কি করবো ভাবছি।এমন সময় কেরামত দা বললো," তোরা যদি রাজী থাকিস আমি খেলে দিতে পারি।"
আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলাম। যত বড় খেলোয়াড় ই হোক বয়স তো একটা ব্যাপার।কিন্তু,আর কিছু করার ছিল না।অগত্যা রাজী হতে হল।
টেপুর ফিজিক্যাল খুব ভালো টিম।ওদের ভাড়া করে আনা স্ট্রাইকার টা যেনো ভীম।যেমন তার চেহারা তেমন শক্তি। এক একটা শট যেন গোলার মত।
খেলা শুরু হবার মিনিট দশেকের মধ্যেই তিনবার আমাদের পেনাল্টি বক্সে ঢুকে এলো ভীম।আমাদের তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা।
কিন্তু,তার পরই খেলার গতি গেলো ঘুরে।এই বয়সেও কেরামত দার যে রিফ্লেক্স এত ভালো সেটা আমরা নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারলাম না।
ভীমের একটা শট অনেকটা লাফিয়ে উঠে রিসিভ করেই চিৎকার করে বললো," বিজু , এগো।"
বিজু ওপোনেন্ট বক্স এর দিকে দু পা এগিয়ে দেখলো বল গিয়ে পরলো তার পায়ে।ওখান থেকে গোল করবে না এতো বড় আহাম্মক বিজন নয়।আমরা 1 -0 গোলে এগিয়ে গেলাম।
কিন্তু,তারপর টেপুর ফিজিক্যাল যেন পাগল হয়ে গেল।ওদের কোচ সাইড লাইন থেকে প্লেয়ার দের উৎসাহ দিতে লাগলেন।ওরা আক্রমণের পর আক্রমণ করতে লাগলো ।আর আমরা কোনো রকমে সামাল দিতে লাগলাম।এইসময় হাফ টাইম হয়ে যাওয়ায় আমরা আপাতত বেঁচে গেলাম।
বিরতিতে কেরামত দা আমাদের কিছু উপদেশ দিল।তখন আর তাকে প্রাক্তন খেলোয়াড় মনে হচ্ছে না ।তখন,সে এগারো জনের একজন।আমাদের কোচ বাবলুদা ও যেন মন্ত্র মুগ্ধ।
বিরতির পর কেরামত দার কথা মত আমরা ভীম কে ম্যান মার্কিং করতে লাগলাম। সে আর আগের মত ওপেন পেলো না ।ফলে,তার মাথা গেল গরম হয়ে।দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময় । টেপুর ফিজিক্যাল তখন গোল শোধ করতে মরিয়া। হঠাৎ মাঝমাঠে বল পেয়ে গেল ভীম।একটা ঝটকায় মাঝমাঠের প্রকাশ কে ফেলে দিলে সে। গতিতে আর স্কিলে আমাকে পেরিয়ে গেল অনায়াসে।সামনে তখন নন্টে আর কেরামত দা। ভীম বুঝে গেছে দূরপাল্লার শট নিয়ে এই বুড়ো গোল কিপারকে পরাস্ত করা যাবে না।সুতরাং,সে অন্য স্ট্র্যাটেজি নিল।বিশাল চেহারা নিয়ে নন্টে কে সঙ্গে নিয়ে সোজা গোলের মধ্যে ঢুকে গেলো সে।আমরা দেখলাম আমাদের গোলের নেটে পাগলা হাতির মত আছড়ে পড়েছে ভীম স্বয়ং।
আমরা হতাশায় চোখ বুজলাম।
কিন্তু,তখন ই অবাক হয়ে দেখলাম বল পায়ে কেরামত দা মাঝমাঠে।কাঁচির নিখুঁত প্যাঁচে চামড়ার ফালি কাটার মত নিখুঁত শিল্পে ভীমের পায়ের ফুটবল এসে গিয়েছে কেরামত দার হাতে। তারপর ,যা ঘটলো তা আমরা বিশ্ব ফুটবলে হিগুইটা র মতো গোল কিপারের খেলায় দেখতে পাই।
সামনে টেপুর ফিনিক্যালের সাজানো ডিফেন্স নিয়ে সেন্টার সার্কেল এ দাঁড়িয়ে কেরামত দা একা।দুই পাশ দিয়ে ছুটছে আমাদের দুই ফরওয়ার্ড বিজন আর নিউটন। ওরা বিভ্রান্ত কাকে বেশী মার্ক করবে।
কেরামত দা এক পলক সামনেটা দেখে নিল ।কিন্তু,কাউকেই বল না দিয়ে ডান পা দিয়ে একটা গোলা ছুঁড়ে দিল ।আর ওদের গোল কিপার শুধু দাঁড়িয়ে দেখলো যে তাদের জালে জড়িয়ে গেছে বল।
এর পরের কয়েকটা মিনিট টেপুর ফিজিক্যাল শুধু নামে মাত্র খেললো।তারা,তখন বুঝে ফেলেছে এই ম্যাচ আর তারা বের করতে পারবে না।
2-0 ফলে ম্যাচ জিতলাম আমরা।
খেলা শেষে কেরামত দা যখন হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে মাঠ ছাড়ছে,আমরা পিছন থেকে শুধু দেখছি কেমন করে একজন শিল্পী অবলীলায় তার শিল্প কার্য সম্পন্ন করে বিশ্রামে ফেরে। তখন সে আবার আগের মানুষ।সাধারণ,সকলের মতোই।শুধু ,কিছু ক্ষণ আগে যে শিল্পকর্ম সে সম্পন্ন করে এসেছে তা চির অমর হয়ে গিয়েছে দর্শক মনে।
====================
SUKANTA GHOSH
CHANDIPUR
PIRPUR
HOWRAH

Comments
Post a Comment