অহংকার পতনের মূল
মিঠুন মুখার্জী
সেদিন
সোমবার। ২৯শে ডিসেম্বর। সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সুভাষিনী মুখোপাধ্যায়ের
একমাত্র কন্যা সুহাসিনীর তৃতীয় শ্রেণীর শেষ মূল্যায়নের রেজাল্ট বেরনোর
দিন। সুভাষ ও সুভাষিনী মেয়ের রেজাল্ট নিতে এসেছেন। তারা জানেন তাদের মেয়ে
খুব একটা ভালো রেজাল্ট করবে না। কারণ পড়াশোনা বিষয়ে তার সেই সচেতনতা
এখনো আসেনি। সুভাষ হঠাৎ শোনেন একজন ভদ্রমহিলা আরেকজনকে বলছেন-- " দেখেছেন
দিদি, মেয়ের রেজাল্ট নিতে বাবা-মা দুজনেই এসেছেন। দেখে মনে হচ্ছে পরীক্ষা
মেয়ে নয় বাবা-মা দিয়েছেন। তাছাড়া মেয়ে মনে হয় প্রথম কিংবা দ্বিতীয়
হয়।" আরেকজন বলেন--- " না না ওদের মেয়ে তো তেমন ভালো নয়। ওদের মেয়ের
রোল নম্বর পঞ্চাশের বেশি। তাছাড়া চূড়ান্ত অবাধ্য মেয়ে। ক্লাসের
ছাত্র-ছাত্রীরা ওর সঙ্গে কথা বলতে চায় না।" এই কথাগুলো শুনে সুভাষের খুবই
খারাপ লাগে। তিনি ভাবেন, বাচ্চাদের নিয়েও আজকালকার অভিভাবিকাদের এত হিংসা!
অচেনা মানুষের সম্পর্কে কিছু না জেনে শুনে এমন মন্তব্য করেন এরা। মানুষ
এখন খুবই অমানবিক হয়ে গেছে। এরপর তিনি অভিভাবিকা দুজনের কাছে গিয়ে
বলেন---" দেখুন আপনারা দুজন আমাদের দুজনকে উদ্দেশ্য করে যে কথাগুলো বললেন
সেগুলো ঠিক নয়। আমার সঙ্গে আপনাদের ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই। তাছাড়া
আপনারা আমার মেয়েকে নিয়েও কোনো রকম মন্তব্য করতে পারেন না। সব বাচ্চা
একরকম হয় না, কিংবা সবার বিকাশ একসময় হয় না। আপনাদের বাচ্চা হয়তো আমার
মেয়ের থেকে পড়াশোনায় ভালো বা তার বিকাশ আমার মেয়ের আগে হয়েছে। তাই বলে
আপনারা এমন বলতে পারেন না। আমি যদি এরকম অপমানজনক কথা পুনরায় আপনাদের
মুখে শুনি তবে প্রধান শিক্ষক মহাশয়কে জানাব। বাচ্চাদের মন এখন থেকেই কেন
বিষিয়ে দিচ্ছেন!! জীবনে উত্থান - পতন তো আছেই । কে উঠবে কে নামবে সে তো
সময় বলবে। কথাগুলো মনে রাখবেন।" সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ঠান্ডা মাথায় জুতোর
বাড়ি খেয়ে দুজনেই একেবারে চুপ করে যান।
সুহাসিনীর বাবা মা সুভাষিনীর কাছে গেলে তিনি তাকে বলেন--"ঠিক করেছ, একেবারে
মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছ। আর কোনোদিন কারো পেছনে কাঠি করবে না। করতে গেলে
আজকের দিনের কথা বারংবার মনে পড়বে। অবশ্য এদের লজ্জা নেই। কাঠি করাই এদের
স্বভাব। চুপচাপ থাকলে মানুষ একেবারে পেয়ে বসে। " এরপর দুপুর দুটোর সময়
রেজাল্ট আউট হয়। দেখাযায় সুহাসিনীর এবারের রেজাল্ট অন্যবারের তুলনায়
অনেক ভালো হয়েছে। বাবা -মার চিন্তা ভাবনা এবার ভুল হয়ে গেছে। বরং যারা
দুজন সুহাসিনীর বাবা-মাকে অপমান করেছিলেন তাদের মেয়েরা এবার তুলনামূলক
ভাবে রেজাল্ট খারাপ করেছে। মেয়েদের রেজাল্ট দেখে তাদের একেবারে লজ্জায়
মাথা নত হয়েছে। মেয়ে বউকে নিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় যখন স্কুটি করে বাড়ি
ফিরছিলেন তখন তাদের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি বলেন --- " দেখলেন তো অন্যকে ছোট
করতে গিয়ে নিজেরাই কেমন ছোট হয়ে গেলেন। দুদিনের এই জীবনে এত অহংকার করে
কি হবে? সবার ভালো করুন ঈশ্বর আপনারও ভালো করবেন।" অভিভাবক দুজন তৎক্ষণাৎ
সুহাসিনীর বাবা-মার কাছে ক্ষমা চান। বলেন---"আজ থেকে তারা আর কারো সঙ্গে
খারাপ ব্যবহার করবেন না। উপকার করতে না পারেন অপকার করবেন না।"

Comments
Post a Comment