অন্ধকারে আবছা দেখা যায়
আদীবা আবসারী
রাসেলের ঘুম ভাঙলো বেলা এগারোটায়। তার কলেজে টেস্ট পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা শুরু দশটা থেকে। অদ্ভুত ব্যাপার তার চোখে মুখে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে সে যেন একটা অযুহাত খুঁজে পেল। না, পড়াশোনার প্রতি উদাসীন নয় রাসেল। বাবার মৃত্যুর পর থেকে বেশ গুরুত্বের সাথেই পড়ায় মন দিয়েছিল সে। বাড়ির কাছের কলেজ রেখে খানিকটা দূরের ভালো কলেজে ভর্তি হয়েছিল মায়ের সাথে একপ্রকার যুদ্ধ করেই। ছেলের সুমতি তে আনন্দিত হলেই তো কেবল চলবে না সালমার। ভাবতে হবে তো সংসারের কথা। ভবিষ্যতের কথা। অবশ্য সংসার বলতে আর কিই বা আছে তার। টিনশেডের দুটো ছোট্ট ঘরে ছেলেকে নিয়ে এক রকমে বেঁচে থাকা। বস্তি নয়, তবে বস্তির চেয়ে ঠিক কতটা ভালো তা বোঝা কঠিন। সেটা সুযোগ সুবিধার প্রসঙ্গ হোক কিংবা প্রতিবেশীদের আচার আচরণের। অবশ্য স্বামী মারা যাবার কারনেই যে তাদের এই পরিনতি তা নয়। স্বামীর মৃত্যুতে বহুদিনের অভ্যস্ত জীবনের ইতি টানতে হয়েছে সালমাকে এর বেশি কিছু না। রোজগার? হায়রে! সে কপাল কি আছে তার। বিয়ের পর থেকেই সে দেখছে তার স্বামীর চাকরি আজ আছে কাল নেই। বেশ ফুর্তিবাজ ছিল লোকটা। মাঝে মাঝেই তিন চার দিনের জন্য লোকাল ট্রেনে করে ঘুরতে চলে যেত বিভিন্ন জায়গায়। যেন ভবঘুরে একজন মানুষকে জোর করে পরিবারের বাঁধনে বেঁধেছিল কেউ। অবশ্য দায়িত্বহীন হবার সুবিধা হলো দায়িত্বহীনদের পাশের মানুষটা সবসময় দায়িত্ববান হয়।সালমাও এই সূত্রের বাইরে না। গার্মেন্টসে রাত দিন খেটে মাস শেষে যা পেত তা দিয়ে চলতো সংসার। এখনো তেমনি কোনো রকমে চলে। আচ্ছা,এমন একটা লোকের প্রভাব কি একটুও ছিল এই পরিবারে? মুখে স্বীকার না করলেও সালমা জানে তার মনের জোর কতটা কমে গেছে। ঐ মানুষটার অস্তিত্বের একটা সামাজিক সুরক্ষা এবং ধারণা করি কিছু মর্যাদা ও ছিল তার জীবনে। সালমা এ ও জানে বাবার স্বভাব পাওয়া উড়নচণ্ডী ছেলেটার মাঝে দায়িত্ববোধ জন্মানো কারণ ঐ দায়িত্বহীন মানুষটার মৃত্যু। সালমার মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেই বেপরোয়া ছেলেটার কথা। প্রতিটা কথায় যেন ধমকে উঠতো রাসেল। দিনের বেশিরভাগ বন্ধুবান্ধবের সাথে পুরো এলাকা চষে বেড়াতো । সালমা তবু কিছু বলতো না। যদি ছেলে আরো বিগড়ে যায়? নেশায় জড়িয়ে পড়ে? কি হবে ?তার যে একটা মাত্র ছেলে। আর রাসেল,তার কি মনে পড়ে না পুরোনো কথা? ক্লাস নাইনে বাবাকে হারানোর সাথে সাথে যেন নিজের অস্তিত্ব ও হারিয়ে ফেলেছিল ।কেন এমন হয়েছিল জানে না সে। মানব জীবন পদ্ম পাতার শিশির বিন্দুর মতন, ক্ষণস্থায়ী।রাসেল কি জানতো না সেটা? জানতো। তবে পূর্বপুরুষ দের রেখে যাওয়া উপদেশ বাণী মানুষকে খুব কমই প্রভাবিত করে, যতক্ষণ না সে তার নিজের জীবন থেকে তা উপলব্ধি করতে পারে।
একবার বন্ধুদের সাথে একটা লোকের মানিব্যাগ ছিনতাই করেছিল রাসেল। এরকম মাঝে মাঝে করতো ওরা। যেন একটা খেলা। ছুরি দেখে লোকগুলো কেমন ঘাবড়ে যেত,কেমন বোকা বোকা দেখাতো তাদের। আবছা আলোয় সেই দৃশ্যের এক অন্যরকম মজা। তাছাড়া কার সাহস কতটা সেও পরোখ করে দেখা যায় এই খেলায়।আর টাকা পয়সা তো উপড়ি পাওনা। খুব নিরীহ জাতের লোক হলে টাকা ফিরিয়েও দিত ওরা। মূল মজা তো মানুষের অসহায়ত্বে। দিনের আলোয় যারা ওদের অবজ্ঞা করে রাতের আঁধারে তারাই প্রাণের ভয়ে মাথা নোয়ায়। তাই এর মধ্যে যাদের করুন মুখ ওদের সন্তুষ্ট করতে পারতো তাদের ছেড়ে দিত ওরা। তারপর কতদিন গেল, বছর গেল । রাসেলের নতুন জীবন পুরনো হলো। সময়ের সাথে সাথে তার মনের ক্ষতও যেন কেমন করে সেরে উঠলো। রাসেল কলেজে ভর্তি হলো। নতুন একটা সার্কেল ও তৈরি হলো তার, তবে এরা মুচি কিংবা কাঠমিস্ত্রির ছেলে নয়। এরা একদল স্বপ্নবাজ কিশোর। অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবারের ।তাদের সাথে তাল মিলাতেই সম্ভবত রাসেলের ইংলিশ ক্লাব, ভলেন্টিয়ারিং কিংবা বইয়ের প্রতি হঠাৎ দারুন ঝোঁক তৈরি হলো। কিন্তু তখনো কি সুখী ছিল রাসেল? মনের দ্বন্দ্ব যে তার নিত্য সঙ্গী। সেই ভবঘুরে জীবনে যখন ছুরি হাতে লোকজনকে ভয় দেখাতো , তখনো তার মনের কোথাও একটা অপরাধ বোধ জেগে উঠতো। তবু এসব ছাড়তে পারতো না।কি জানি,পারিপার্শ্বিকতা বোধ হয় বিবেকের কাছে প্রশ্ন করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। আর এসব ছেড়ে যখন কলেজে এসে নতুন এক জীবনদর্শন তৈরি হলো তখন বন্ধুদের সাথে শেক্সপিয়ারের সনেট নিয়ে আলোচনা করার পর বাড়ি ফিরে মায়ের ভাষাটা যেন ভীষণ অপরিশীলিত লাগতো। বাড়ির পরিবেশ, পাড়া-প্রতিবেশি, তার অতীত জীবন সব যেন তাকে টেনে হেঁচড়ে নিচে নামিয়ে আনতো তাকে। রুচিশীল, ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হয়ে যদি জীবনটা এমন নিঃসঙ্গ হয়ে যায় তবে সেই মুক্ত জীবনের অধিকারী রাসেলই তো ভালো ছিল। যে মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করতো কিন্তু মাকে ঘৃণা করতো না। যে অনায়াসে পাড়ার ছেলেদের সাথে মারামারি করতো কিন্তু তাদের তুচ্ছ বলে মনে করতো না।কোন জীবনটা আসলে ভালো ছিল? এসব প্রশ্ন রাসেলের মনকে অশান্ত করে তুলতো। এখনো করে। কিছুদিন আগে তার ক্যান্সার হয়েছে খবরটা জানার পর থেকে আরো বেশি করে।
প্রায় মাসখানেক আগে সপ্তাহব্যাপী ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইন করেছিল একটি সংস্থা। ক্যান্সার সম্পর্কিত বিভিন্ন পরামর্শ, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ নানারকমের পদক্ষেপ নিয়েছিল তারা।এই আয়োজনে রাসেল শামিল ছিল শুরু থেকেই। ভলেন্টিয়ারদের উৎসাহ দেবার জন্য কিছু মেডিকেল টেস্ট ও হেলথ সার্ভিস ফ্রি করে দিয়েছিল সংস্থাটি। বাকিদের সাথে সাথে রাসেলও কিছু টেস্ট করেছিল তার। রাসেলের সব রিপোর্ট ভালো আসলেও ব্লাড টেস্টে WBC এর আধিক্য সদ্য ইন্টার্ন শেষ করা ডাক্তারকে বিচলিত করে তোলে ।তরুণ ডাক্তার মেহেদী হাসান বিলম্ব না করে রাসেল কে বোন ম্যারো টেস্টটাও করালেন। তার পাঁচ-সাতদিন পর টেস্টের রিপোর্ট হাতে ডাক্তার রাসেলকে বেশ গুছিয়ে কিছু কথা বলতে চেষ্টা করলেন। প্রতিবছর কতসংখ্যক ক্যান্সার পেশেন্ট ওভারকাম করেন এই বিষয়টি ছিল সমস্ত কথার মূল প্রতিপাদ্য ।
মেহেদী হাসান বললেন,"রাসেল, তোমার এখনই ট্রিটমেন্ট শুরু হয় দরকার।"
রাসেল শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে কি চলছে ডাক্তার তো দূর সে নিজেও অনুভব করতে পারছে না। খানিকক্ষণ পর রাসেল বলল,"আমি আসি".
মেহেদী হাসান বললেন,"তোমার এখনো কোনো লক্ষণ নেই। তবে কিছুদিনের মধ্যে হয়তো শুরু হবে। মনটাকে শক্ত রেখো। তুমি চাইলে তোমার পরিবারের সাথে আমি কথা বলতে পারি."
এর জবাবে রাসেল কিছুটা হাসার চেষ্টা করে বলল, " আসি".
প্রতিটা কেমোতে কি ভয়াবহ কষ্ট রাসেল ক্যান্সার পেশেন্টদের মুখে শুনেছে বহুবার।কখনো টেলিভিশনে কখনো বা সামনাসামনি। ওর বন্ধু সৈকতের বাবা ও তো ক্যান্সারেই মারা গিয়েছিলেন । তাছাড়া রোগমুক্ত হয়ে ফিরে আসা পেশেন্টদের মৃত্যুর খবর ও পেয়েছে দু তিন বছর পর। তাদের কেউই পুরোপুরি সেরে উঠেছিল বলে মনে হয় না। তারচেয়ে বড় কথা সে পেশেন্টের আর্থিক সচ্ছলতা ছিল। রাসেল তো মরেই যাবে, কি দরকার তার পরিবারটাকে মেরে যাওয়ার। রাসেল সিদ্ধান্ত নিল পরিবারের কাউকে কিছু জানাবে না। তবে কিছু দিন পর যখন তার লক্ষণ গুলো প্রকাশিত হতে শুরু করবে তখন কি হবে? যা খুশি হোক কিন্তু এখন কোনোভাবেই মাকে তার পক্ষে এই খবরটা দেয়া সম্ভব নয়।
সে ভেবে রেখেছিল এই শেষ কয়টা দিন আনন্দের সাথে বাঁচবে। মন খারাপ হয় এমন কিছুই করবে না। কিন্তু বিবেকের দংশন ভীষণ ভয়াবহ। কত অন্যায় সে করেছে জীবনে। তবু কেন যেন সব ছাপিয়ে পাশের এলাকার মানিক মিয়ার কথা মনে পড়ছে। লোকটা রেল লাইনের শেষ মাথায় একটা ছোট্ট ঘরে থাকে। সহজ সরল মানুষ। স্থানীয় না বলেই হয়তো তার তেমন জোর নেই। হয়তোবা কিছুটা ভীতু ও ছিল নইলে একদল কিশোর মধ্য বয়সী এই লোকটাকে কেমন করে রোজ উত্ত্যক্ত করত। ভদ্রলোক কিছুই বলতেন না। কেবল একদিন কথা হয়েছিল রাসেল ও তার বন্ধুদের সাথে। রাতের আঁধারে সেদিন ও ওরা বেরিয়েছিল। বন্ধুদের মধ্যে শাকিলের চোখে পড়লো প্রথমে, "আরে এটা ওই হাম্পটি ডাম্পি টা না ?"সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। কাউসার বলল , 'চল একটু বাজিয়ে আসি" তারপর কি হয়েছিল সেদিন রাসেল আর মনে করতে চায় না। নিজের প্রতি ঘৃণায় তার মরে যেতে ইচ্ছা করে। লোকটা কি একটা যেন বলেছিল সেদিন, রাসেল মনে করতে পারে না । শুধু কানে বাজে ভারি গড়নের একজন লোকের রিনরিনে কণ্ঠস্বর শুনে ওদের উচ্চ হাসির শব্দ ।
আজকাল প্রায়ই রাসেল একটা স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে সে প্রাণপণে ছুটছে। তার পেছনে অনেক মানুষ। তারাও ছুটছে। তাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। রাসেলের থেকে ওদের ব্যবধান খুব বেশি না। যেই মাত্র রাসেলকে ওরা ছুঁয়ে ফেলবে ঠিক তখনই দৃশ্যপট পাল্টে যায়।
এখন রাসেল ছুটছে একটা রেললাইন ধরে। তার পেছনে থাকা মানুষগুলো এখন আর নেই।সন্ধ্যা হয়ে আসছে । রাসেল দেখতে পেল রেললাইনের উপর ভারী গড়নের একটা ছায়ামূর্তি ক্রমশই ছোট হয়ে যাচ্ছে। তবু রাসেল ছুটছে । শরীরটা যেন অবশ হয়ে আসছে তার। কিছুক্ষণ পর অবাধ্য শরীরটা রেল লাইনের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। ঝাপসা চোখে সেই ছায়া মূর্তি কে একটা বিন্দুর মতন দেখাচ্ছে এখন। । রাসেল কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে ।তার মুখ দিয়ে অদ্ভুত গোঙানির মতো আওয়াজ হচ্ছে।আজ ও এই স্বপ্নটা দেখেছে সে । নিজের গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙেছে । উঠে বসতে বসতে রাসেল দেখলো ১১ টা ৭ বাজে। রুটিনটা এখনো দেয়ালে ঝুলছে। কি হবে পরীক্ষা দিয়ে? কাজ থেকে বাসায় ফিরে মা পরীক্ষা নিয়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করবে, করুক। তার এখন বের হতে হবে। জমানো টাকাগুলো দিয়ে কিছু দোকান বাকি পরিশোধ করা দরকার। এভাবেই দিন কাটছে তার। দোকানে ঘুরতে ঘুরতেই সপ্তাহ খানেক আগে একদিন সেই মানিক মিয়া সাথে দেখা হয়েছিল তার। আচ্ছা, লোকটার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলে হয় না? লোকটার তো রাসেলের চেহারা মনে থাকার কথা না। বছর পাঁচেক আগের ঘটনা, তাছাড়া রাসেল তো অনেকটা বড় হয়ে গেছে এই কদিনে। কিন্তু পরিচয় দিয়ে ক্ষমা চাইবার সময় যখন সেই রাতের কথা মনে পড়বে, লোকটা কি পারবে তাকে ক্ষমা করতে? সে নিজেই কি পারবে ঐ মানুষটার সামনে দাঁড়াতে? রাসেলের আজকাল ঘনঘন জ্বর আসছে। ব্ল্যাক আউট ও হয়ে গেছে কয়েকবার। কি জানি ,হয়তো লক্ষণ গুলো দেখা দিতে শুরু করেছে। কিন্তু শরীরের যন্ত্রণার চাইতে মনের যন্ত্রণা যে শত গুণ। এসব কিছু ভাবতে ভাবতেই দুপুর বেলাটা কেটে গেল।
বিকেল দিকে রাসেল বেরিয়ে পড়লো ।আজ সে লোকটার মুখোমুখি দাঁড়াবে। বিবেকের দংশ ভয়াবহ। এই তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে রাসেল মরতে চায়না।
এলাকার শেষ মাথায় বড় মাঠটায় বেশ কিছুদিন ধরে মেলা বসেছে।রাসেল সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। এ কয়েকদিনে সে জানে বিকেল দিকে লোকটার এদিকটাতে আসা হয়। লোকটার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে রোজই সে তাকে অনুসরণ করেছে, সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। ঐতো লোকটা , একটা স্টলের সামনে দাঁড়ানো । রাসেলের হঠাৎ কি যেন হলো সোজা এগিয়ে গিয়ে বলল, "একটা ফোন করা যাবে?"
মানিক মিয়া খানিকটা ইতস্তুত করলো। তারপর কি একটা ভেবে ফোনটা বাড়িয়ে দিল।
কাঁপা কাঁপা হাতে রাসেল নিজের নাম্বারটা ডায়েল করলো। তার সাইলেন্ট করা ফোনটা পকেটে ভায়াব্রেট করছে।
রাসেল শুকনো গলায় বলল, "ফোনটা ধরছে না।"
লোকটার উত্তরের অপেক্ষা না করেই রাসেল কিছুটা দূরে নিজেকে আড়াল করে দ্রুত ঐ নাম্বারটায় একটা মেসেজ লিখলো । পুরো মেসেজটার সারকথা "দয়া করে আমার খোঁজ করবেন না, কেবল পারলে ক্ষমা করে দিন।"
তার টেক্সটে ক্ষমা চাইবার কারণ হিসেবে সে ঐ রাতের খানিকটা আভাস ছিল। লোকটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে ঐ কিশোর দলের কেউ একজনই তাকে টেক্সট করেছে। কিন্তু ফোন করার বাহানায় রাসেলই যে তার নাম্বার সংগ্রহ করে তাকে টেক্সট করেছে তা বোঝার ক্ষমতা নিশ্চয়ই ঐ লোকটার নেই। এইভেবে রাসেল নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল।
রাসেল টেক্সট পাঠিয়ে সামনের দিকে এগোতে শুরু করলো । বুকের ধকধকানি অনেকটা কমে এসেছে । কেমন যেন ভার মুক্ত লাগছে ।
হঠাৎ দ্রুত বেগে কে যেন ছুটে আসলো রাসেলের দিকে। রাসেলকে অতিক্রম করে আবার ফিরে এসে দাঁড়ালো তার সামনে। আপাদমস্তক তাকে দেখে একটা শিস দিয়ে বলল, " আরে, সূর্য কোনদিকে উঠলো রে"
রাসেল একটু হেসে বললো, " কোথায় যাচ্ছিস?"
শাকিল জবাব না দিয়ে বলল ,"তুই দেখি আগাগোড়া ভদ্রলোকের বাচ্চা হয়ে গেছিস। তা এই ছোটোলোকের এলাকায় কি মনে করে?"
প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য রাসেল বলল " দৌড়াচ্ছিলি কেন ওভাবে? ".
এবার শাকিলের মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। একটু কাছে এসে ফিসফিস করে বললো, " শুনলাম মাজারের পিছনের বস্তিতে ভালো সাপ্লাই আছে, টাকার দরকার ছিল। তাই বেরিয়েছিলাম । তুই যাবি নাকি?"
রাসেলের আহত চোখের দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারলোনা শাকিল। ইতস্তত করে বলল," আরেহ্ মামা , এলাকায় আমাদের বয়সী সবাই কমবেশি স্কোর করে। একদিনই তো, চল । তোর কোনো টাকা পয়সার মামলা নাই । টাকার জোগাড় আছে। সেজন্যই তো দৌড়াচ্ছিলাম।"
রাসেলের আর কিছু শোনার আগ্রহ হচ্ছে না। তবু শাকিল কোনো জবাবের অপেক্ষা না করে অনর্গল কথা বলে যেতে লাগলো ।" তোর ঐ হাম্টি ডাম্পির কথা মনে আছে? আরে ঐ যে মানিক মিয়া।"
রাসেল চমকে তাকালো,"হঠাৎ উনার কথা বলছিস কেন?"
" ওর ই তো পকেট মারলাম। মেলার মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল । ভিড়ের মধ্যে পকেট কেটে নিয়ে এসেছি।শালার মানিব্যাগে বেশি কিছু নাই। আগেই জানতাম, তবু ওর ক্ষেত্রে রিস্ক কম, ধরা পড়লেও ঐ ক্যাবলা ঘাটাতে যাবে না। আচ্ছা মোবাইলটা বিক্রি করলে হাজার দুয়েক তো পাবোই , না?
এতক্ষণে রাসেলের চোখে পড়লো শাকিলের হাতের মোবাইল ফোন টা। রাসেলের মাথা কেমন যেন ঝিম ঝিম করছে । তাকে অপ্রকৃতস্থের মতো লাগছে।
"কেন এটা করলি এটা করলি তুই, মেসেজটা দেখার সময়ও যে পেল না", চিৎকার করে উঠলে রাসেল।
শাকিল একটু অবাক হয়ে বলল,"এমন করছিস কেন , কিসের মেসেজ?"
" তুই এখনই ফিরিয়ে দিয়ে আয়। নইলে তোর খবর আছে" ।
শাকিল এবার একটু চোটে গিয়ে বললো, " ঢং! যেন নিজে কত সাধু। আমাকে পকেটমারি শেখালো কে ?"
শাকিলের শেষ কথাটা তীরের মত বাঁধলো রাসেলের বুকে। শাকিলকে রাসেলই তাদের দলে এনেছিল। সেই রাতের আঁধারের মিশনে রাসেলের সাথে থেকে থেকেই সব শিখেছে শাকিল। রাসেল মাটিতে বসে পড়লো। যেন দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। মিনিট দুয়েক নিঃশব্দে বসে রইলো সে । তারপর হঠাৎ রেললাইনের দিকে ছুটতে শুরু করলো। অবাক চোখে রাসেলের ছুটে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল শাকিল।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কার্তিকের হালকা কুয়াশা চারিদিকে বিষন্নতা ছড়িয়ে দিয়েছে ।রেললাইনের উপর ভারী গড়নের একটা ছায়ামূর্তি ক্রমশই ছোট হয়ে যাচ্ছে। রাসেল ছুটছে । শরীরটা যেন অবশ হয়ে আসছে তার। কিছুক্ষণ পর অবাধ্য শরীরটা রেল লাইনের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। ঝাপসা চোখে সেই ছায়া মূর্তি কে একটা বিন্দুর মতন দেখাচ্ছে এখন। রাসেল কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। তার মুখ দিয়ে অদ্ভুত গোঙানির মতো শব্দ হচ্ছে।হঠাৎ মাটি কেপে উঠলো। রাসেল তার সমস্ত শক্তি দিয়ে একবার তাকানোর চেষ্টা করলো। নাহ্ , চোখ মেলতে পারছে না ।সে কি আবারো ব্ল্যাক আউট হয়ে যাচ্ছে? হয়তো। নইলে এত তীব্র শব্দ শুনতে পাবে না কেন?
রাসেল শুনতে না পেলে ও রেল লাইনের খানিক দূরে ঘরমুখো পাখিগুলো শব্দটা শুনতে পাচ্ছে। আরো সতর্ক হয়ে উড়ে যাচ্ছে তারা। সন্ধ্যা আরো ঘন হয়ে আসছে। তবু সেই অন্ধকারে আবছা দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যার নিয়মিত ট্রেনটার ছন্দময় গতি।
......................................
মায়িশা আবসারী আদীবা
পাঠানটুলী,এল এন মিলস্ ১৪৩২, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা বিভাগ।

Comments
Post a Comment