শেষ সিদ্ধান্ত
ইদ্রিস মণ্ডল
বারো বছরের সংসার কি একদিনে ভেঙে যায়?
না। ভাঙন শুরু হয় অনেক আগে—যেদিন কথাগুলো আর মুখে আসে না, অভিমানগুলো নীরবে বুকের ভেতর জমতে থাকে, আর একই ছাদের নিচে থেকেও দুজন মানুষ একে অপরের কাছে অচেনা হয়ে ওঠে।
চুমকির জীবনও ঠিক তেমনই ছিল।
স্বামী মিজানুর ভোরে বের হতেন, ফিরতেন গভীর রাতে। সংসারের অভাব ছিল না, কিন্তু ভালোবাসার ভাষা যেন কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। দুটি সন্তান—নয় বছরের রিয়া আর ছয় বছরের টিয়া —ছিল চুমকির পৃথিবী। তবু মাঝেমধ্যে তার মনে হতো, এই সংসারে সে যেন শুধু একজন কর্মী; তার হাসি, কান্না কিংবা ক্লান্তির খবর রাখার সময় কারও নেই।
এক বর্ষার বিকেলে চুমকি জ্বরে পড়ল। টানা কয়েকদিন বিছানায়। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি, টিনের চালের ওপর টুপটাপ শব্দ, আর ঘরের ভেতর নিঃসঙ্গতার দীর্ঘশ্বাস।
সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় হয় আবিরের সঙ্গে। তরুণ, ভদ্র এবং ভীষণ যত্নশীল। প্রথম দিন শুধু লিখেছিল—
— "এখন কেমন আছেন?"
চুমকি অবাক হয়েছিল। বহুদিন কেউ তাকে এমন প্রশ্ন করেনি।
তারপর প্রতিদিন কথা। ওষুধ খেয়েছেন কি না, খাওয়া হয়েছে কি না, জ্বর কমেছে কি না—এসব ছোট ছোট খোঁজখবর কখন যে চুমকির নিঃসঙ্গ বিকেলগুলো ভরিয়ে দিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
একদিন আবির বলল,
— "আপনি খুব একা মনে হয়।"
চুমকি দীর্ঘক্ষণ উত্তর দিতে পারেনি। তারপর শুধু লিখেছিল—
— "হয়তো।"
এক মাস । মাত্র ত্রিশ দিন।
কিন্তু এই ত্রিশ দিনে চুমকি এমন এক আবেগের জগতে পা রাখল, যেখানে বাস্তব আর কল্পনার সীমানা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল।
সে বহুবার আবিরকে বলেছিল,
"আমার বাড়িতে এসো না। এতে শুধু বিপদই বাড়বে।"
কিন্তু এক বিকেলে আবির সত্যিই চলে এল।
ছোট্ট গ্রামের কোনো খবর গোপন থাকে না। প্রতিবেশীদের কৌতূহলী চোখে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল ঘটনাটি। সন্ধ্যার আগেই খবর পৌঁছে গেল মিজানুরের কানে।
বাড়িতে ফিরে সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর জমে থাকা রাগ, অপমান আর অবিশ্বাস একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।
কথার পর কথা। অভিযোগের পর অভিযোগ।
চুমকি শুধু একবার বলেছিল,
"আমি শুধু একটু মানুষের মতো কথা বলতে চেয়েছিলাম।"
কিন্তু সেই বাক্য আর কেউ শুনল না।
সেদিনের ঝড়ে শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়, কেঁপে উঠেছিল দুই শিশুর ছোট্ট পৃথিবীও।
রাতে রিয়া মায়ের আঁচল ধরে ফিসফিস করে বলেছিল,
"মা, তুমি কোথাও চলে যাবে না তো?"
চুমকি উত্তর দিতে পারেনি।
জানালার বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতিও যেন নীরবে একটি ভাঙতে বসা সংসারের সাক্ষী হয়ে আছে…
চুমকি সারারাত ঘুমোতে পারল না। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল রিয়ার সেই প্রশ্ন— "মা, তুমি কোথাও চলে যাবে না তো?" প্রশ্নটি বারবার তার বুকের ভেতর ধাক্কা মারছিল।
অন্যদিকে মিজানুরও নির্ঘুম। রাগের আগুন ধীরে ধীরে নিভে এলে মানুষ নিজের ভেতরটাই সবচেয়ে বেশি দেখতে পায়। সে ভাবতে লাগল, শেষ কবে স্ত্রীর সঙ্গে ভালোভাবে বসে কথা বলেছে? শেষ কবে চুমকিকে বলেছে, "তুমি কেমন আছো?" সংসারের খরচ মিটিয়েছে, সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু স্ত্রীর নিঃসঙ্গতাকে কি কোনো দিন বুঝতে পেরেছে?
পরদিন সকালে চুমকি চুপচাপ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কোথাও পালিয়ে যাওয়ার জন্য নয়; নিজের ভেতরের অস্থিরতা থেকে একটু দূরে দাঁড়ানোর জন্য।
আবির অপেক্ষা করছিল।
চুমকিকে দেখে সে মৃদু হেসে বলল, — "চলুন, নতুন করে জীবন শুরু করি।"
চুমকি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটি তাকে সম্মান করেছে, খোঁজ নিয়েছে, একাকিত্বের দিনে পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ কি সত্যিই জীবন? মাত্র কয়েক দিনের পরিচয় কি বারো বছরের সংসারের সব স্মৃতি মুছে দিতে পারে?
ঠিক তখনই চুমকির ফোনে একটি ছবি ভেসে উঠল। প্রতিবেশী পাঠিয়েছে। ছবিতে রিয়া বাবার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছে, আর টিয়া দরজার দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
ছবিটি দেখে চুমকির বুকের ভেতর যেন কেউ পাথর চাপিয়ে দিল।
সে ধীরে ধীরে বলল, — "আবির, মানুষ কখনো কখনো আবেগকে ভালোবাসা ভেবে ভুল করে। হয়তো আমিও সেই ভুলটাই করেছি।"
আবির অনেকক্ষণ নীরব থেকে উত্তর দিল, — "আপনি যদি আজ শুধু আবেগের টানে সব ছেড়ে দেন, কয়েক বছর পরে এই সিদ্ধান্তের ভার আপনাকেই বইতে হবে। আমি চাই না আপনার জীবনের অনুশোচনার কারণ হতে।"
চুমকির চোখ ভিজে উঠল।
সেদিনই সে বাড়ি ফিরে এল। ফিরে এসেই সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়নি। ভাঙা বিশ্বাস মুহূর্তে জোড়া লাগে না।
মিজানুরও মাথা নিচু করে বলল, — "আমি তোমাকে দোষ দিয়েছি, কিন্তু নিজের ভুলগুলোও আজ বুঝতে পারছি। সংসারে শুধু টাকা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।"
চুমকি শান্ত গলায় বলল, — "আর আমিও বুঝেছি, একাকিত্বের মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত সব সময় সঠিক হয় না।"
দুজনেই সিদ্ধান্ত নিল, রাগ নয়, এবার কথা বলবে। অভিযোগ নয়, একে অপরকে শুনবে।
কয়েক মাস পরে তাদের সংসার পুরোপুরি আগের মতো না হলেও নতুন এক বিশ্বাসের ওপর দাঁড়াতে শুরু করল। সন্ধ্যায় মিজানুর এখন আর অকারণে বাইরে থাকে না। সন্তানদের নিয়ে বসে, চুমকির সঙ্গেও গল্প করে। আর চুমকি বুঝে গেছে, কোনো সম্পর্কের অভাব অন্য একটি সম্পর্ক দিয়ে পূরণ হয় না; সেই অভাব পূরণ করতে হয় সত্য, সম্মান আর আন্তরিকতার মাধ্যমে।
একদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে রিয়া মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, — "মা, তুমি আর কোথাও যাবে না তো?"
চুমকি মেয়েকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে মৃদু হেসে বলল, — "না মা, কোথাও না। মানুষ কখনো কখনো পথ হারায়, কিন্তু ভালোবাসা যদি সত্যি থাকে, তবে সে আবার ঘরে ফিরতে শেখে।"
জানালার বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল। তবে সেই বৃষ্টি আর ভাঙনের ছিল না; ছিল ধুয়ে-মুছে নতুন করে বাঁচার।

Comments
Post a Comment