
অনুর অপেক্ষা
নাজিরুল ইসলাম
গ্রামের নাম জলামাদুল। গ্রাম বললে অবশ্য ভুলই বলা হবে, আসলে সেটি এক অজপাড়া গাঁ। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ চাষবাস করেই জীবন ধারণ করে। শহরের আধুনিক হাওয়া এখানে এখনো এসে পৌঁছায়নি। কাঁচা-পাকা রাস্তা, তাই বর্ষাকালে জল জমে কাদা প্যাচপ্যাচে হয়ে থাকে। গ্রামে গাছপালা, জলাজমি, পুকুর, ধান রাখার মরাই আর খড়ের গাদা—সবই আছে। এই প্রাকৃতিক সুন্দর পরিবেশে মানুষের সংখ্যা খুব কম। সব মিলিয়ে কুড়ি-বাইশটি ঘর হবে, সবাই সবাইকে চেনে। সন্ধ্যার পর গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা একজোট হয়ে আড্ডা জমায়, তারপর হুঁকোয় টান দিতে দিতে যে যার বাড়ি চলে যায়।
গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটা একলা দোকান—চায়ের দোকান। দোকান বলতে বাঁশের খুঁটি, টালির ছাউনি আর সামনে পাতা দুটো কাঠের বেঞ্চ। দোকানটা চালায় অনু। অনুর বয়স ১৯ কিংবা ২০ হবে। শ্যামবর্ণের রোগাটে চেহারা, গোলগাল মুখ। তবে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো জোড়া ভুরুর নিচে একজোড়া নীল চোখের মণি, যা তাকে আর পাঁচটা মানুষের থেকে আলাদা করে। অনু অনাথ। কীভাবে সে মানুষ হয়েছে, সে নিজেও তা ভালো করে জানে না। আপনজন বলতে এক দাদি ছিল, সেও গত হয়েছে কয়েক বছর আগে। মা-বাবাকে তো সে চোখেও দেখেনি।
অনু খুব সকালে দোকান খোলে, সারাদিন খড়িদ্দার সামলে সন্ধ্যার আগেই দোকান বন্ধ করে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে যায়। এই দোকান চালিয়েই কোনো মতে তার পেট চলে। তবে এইভাবে কতদিন চলবে, তা অনু নিজেও জানে না। অনুর দাদি যখন মরণাপন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছিল, অনু অনেকের কাছে হাত পেতেছিল, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। তবে একজন এসেছিল বটে! সে দাদির চিকিৎসার যাবতীয় খরচ দিয়েছিল। কিন্তু তার বদলে কায়দা করে তাদের শেষ সম্বল ভিটেটুকু নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছিল। এখন হিসাব মতো এই বাড়ি গ্রামের মোড়লের। সে দয়া করে অনুকে থাকতে দিয়েছে, যেদিন চাইবে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে।
একদিন সকালে দোকান খোলার পর এক খদ্দের এসে বলল, "এক কাপ চা দেবেন তো, সাথে একটা বিস্কুট।"
"হ্যাঁ, একটু বসুন, দিচ্ছি। চা হচ্ছে..."
লোকটি কাঠের বেঞ্চে বসে চা খেয়েই হুট করে চলে গেল।
" এই দাঁড়াও। চায়ের পয়সা টা.... "
পরের দিন সেই লোকটা আবার চা খেতে এল। এবার অনু রেগে গিয়ে বলল, "এই যে মশাই, কাল টাকা না দিয়ে চলে গেলেন কেন?"
লোকটি একটু বোকা বোকা হেসে বলল, "আসলে কিছু মনে করবেন না, কাল আমার কাছে টাকা ছিল না।"
"টাকা ছিল না তো চা খেলেন কেন? জানেন না চা খেলে টাকা দিতে হয়? তাও আবার সকাল সকাল বওনির সময়ে!"
"জানি তো। আসলে রাজমিস্ত্রির কাজ করি তো , মহাজন টাকা আটকে রেখেছে। মাসের শেষে পকেট পুরো ফাঁকা, তাই..."
অনুর মাথাটা এবার একটু ঠান্ডা হলো। সে বলল, "ওহ! তা মশাই, আপনাকে তো এই গ্রামে আগে কখনো দেখিনি। আপনি কি নতুন?"
"না, আসলে আমার বাড়ি পাশের মোল্লার চকে। এই গ্রামে একটা বাড়ি তৈরির কাজ করছি।"
"ও আচ্ছা। তা আজও কি ধারে খাবেন?"
কমল একটু হাসল, "আজকের দিনটা বাকি রাখুন, কাল আপনার পুরো টাকা মিটিয়ে দেবো।"
"ঠিক আছে, আজ দিচ্ছি। কিন্তু পরের বার থেকে টাকা দিয়ে খাবেন, মনে থাকবে?"
"আচ্ছা, আচ্ছা," বলে কমল চা খেয়ে চলে গেল।
এইভাবে বেশ কিছুদিন চলতে লাগল। সকালে কমল আসে, চা খায়, দু-একটা কথা বলে চলে যায়। মাঝেমধ্যে কমল দোকান খোলার আগেই এসে বসে থাকে। অনু এসে একটু হেসে তাড়াতাড়ি উনুন জ্বালিয়ে চা বসায়। কমল দূর থেকে তা মুগ্ধ হয়ে দেখে, আর দুজনের মধ্যে টুকটাক কথা হয়।
কয়েকদিনের মধ্যে তাদের মধ্যে এক না-বলা সম্পর্ক তৈরি হলো। কমল রোজ সকালে অনুর কাছে চা খেয়ে তবেই কাজে যেত। কাজ থেকে সন্ধ্যায় ফেরার সময় দেখত অনুর দোকান বন্ধ। কমলের মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে যেত, কেন হতো সে নিজে তা জানত না।
কমল যেদিন একটু আসতে দেরি করতো, অনু তার মুখ চেয়ে বসে থাকতো।
দোকানে গ্রামের অনেকেই চা খেতে আসে। কিছু বখাটে ছেলেও আসে আড্ডা দিতে। গরিব অনাথ তরুণী দেখে কিছু আজেবাজে মন্তব্য যে ওড়ে না, তা নয়। অনু ওসব কান খাড়া করে না। অনেকে অনেক কুপ্রস্তাবও দিয়েছে, অনু তখন ঝাড়ুটা হাতে নিয়ে বলত, "এটা দেখছিস? মেরে বিষ ঝেড়ে দেবো!"
সেদিন গ্রামেরই এক বকাটে ছেলে দোকানে চা খেতে এসে অনুর সাথে খারাপ ব্যবহার করছিল। ঠিক তখনই কমল এসে হাজির। কমল এসে ছেলেটাকে আচ্ছা করে ধমকে দিল। ছেলেটি চোখ রাঙিয়ে "দেখে নেবো, দেখে নেবো" বলতে বলতে চলে গেল। অনু তখন চেয়ারে বসে মাথা নিচু করে কেঁদে ফেললো।
কমল কিভাবে শান্ত করবে বুঝতে পারলো না। একটা হাত আলতো করে কাঁধের ওপর রাখতে চমকে উঠলো অনু।
কমল ভয়ে একপা পিছিয়ে এলো।
কমলের অবস্থা দেখে অনু হেসে ফেললো।
এই একটা মানুষই আছে, যাকে অনুর একটু ভালো লাগে। লোকটা খারাপ না, তাকে ভরসা করা যায়। সে বাকিদের থেকে, একটু আলাদা।
একদিন অনু জিজ্ঞাসা করেই ফেলল, "কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
চায়ে চুমুক দিয়ে কমল উত্তর দিল, "হ্যাঁ, বলুন না।"
"না মানে, রোজ আপনি সকালে এখানে চা খেতে আসেন, বাড়ি থেকে কিছু খেয়ে আসতে পারেন না? শুধু চা-বিস্কুট খেয়ে কি পেট ভরে?"
কমল একটু মুচকি হেসে বলল, "আমি একা মানুষ, একাই থাকি। হোটেলে বা কোনো দোকানে কিছু কিনে খেয়ে নিই।"
অনু অবাক হয়ে বলল, "কেন, একা থাকেন কেন? আপনার পরিবার?"
"আমার জন্মদাত্রী মা অনেক আগেই মারা গেছেন। বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। সৎ মায়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমি বাড়ি ছাড়ি। ব্যস, তারপর থেকে একাই থাকি। ছোটবেলা থেকে জোগাড়ের কাজ করতাম, এখন রাজমিস্ত্রির কাজ করি। প্রতিদিন যা পাই, তাতেই আমার একার কোনো রকমে চলে যায়। জানেন, আমি আমার মাকে খুব ভালোবাসতাম... কী থেকে কী হয়ে গেল!" হাতের ভাঁড়ের চা-টা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, কমল সেটা এক ঢোকে খেয়ে নিল।
কথাগুলো শুনে অনুর বুকটা মায়ায় ভারী হয়ে গেল। সে বলল, "কী আশ্চর্য ব্যাপার ভাবুন! আপনারও কেউ নেই, আর আমারও পোড়া কপাল, আমারও কেউ নেই।"
কমল তাকাল অনুর দিকে। অনুর চোখে বোধহয় কিছু একটা পড়েছে, তাই চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। কমল চায়ের টাকা দিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
কাজে যাওয়ার পর এক সহকর্মী কমলকে বলল, "খবর শুনেছ হে কমল?"
কমল সিমেন্ট-বালি মাখাতে মাখাতে বলল, "কী খবর ভাই?"
"আরে, ওই এসআইআর (SIR) নাকি একটা হচ্ছে! যাদের বাবা-মা ২০০২ সালে ভোট দেয়নি, যাদের কাগজপত্র নেই, তাদের নাকি দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে!"
কমল প্রথম কিছুই বুঝতে পারলো না।
দু একবার বলার পর একটু তাচ্ছিল ভাবে হেসে বলল ' দূর! যতসব সব উল্টো পাল্টা কথা। তাই আবার এমন হয়। কি শুনতে কি বুঝেছো.. কাজ করো তো.. "
"আরে আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ দাদা, অতশত বুঝি না। সকালে কাজে আসার সময় দেখলাম রাস্তার ধারে কয়েকজন এই নিয়ে আলোচনা করছিল। আমার কানে এলো আর কী!"
কমল মনে মনে ভাবতে লাগল—ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়, তাহলে তার নিজের কি সব কাগজপত্র আছে? হ্যাঁ, থাকার তো কথা, ঘরে গিয়ে দেখতে হবে। কিন্তু হঠাৎ অনুর কথা মনে পড়তেই কমলের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল।
সে হাতের কাজটা সেরে যত তাড়াতাড়ি হয় অনুর কাছে গেলো।
হাঁপাতে হাঁপাতে কমলকে আসতে দেখে অনু অবাক হয়ে বলল, "কী ব্যাপার, এত হাঁপাচ্ছ কেন? কী হয়েছে?"
কমল একটু দম নিয়ে এসআইআর-এর যা শুনেছে সেটা টাকে জানাল। জিজ্ঞেস করল, "তোমার কাগজপত্তর আছে তো অনু?"
অনু একটু অবাক হয়েই জানাল, কাগজ বলতে একটা ভোটার কার্ড আর একটা আধার কার্ড আছে, তাও সেটা গ্রামের স্থানীয় নেতা ভোট পাওয়ার লোভে বানিয়ে দিয়েছিল। অনু সেগুলো টিনের বাক্স থেকে এনে কমলের হাতে দিল।
"কী হবে এবার? আমার তো আর কিছুই নেই! বাবা-মা ভোট দিয়েছিল কি না, আমি তো তাও জানি না! দূর কি সব উৎকাত ঝামেলা।"
"ঠিক আছে, তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরো না। আমি দেখছি," মুখে বললেও কমলের মনে তীব্র উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তা দানা বাধঁতে লাগলো।
পরের দিন সকালে কমল দোকানে এল। তার হাতে একটা প্যাকেট। কমল সেটা অনুর হাতে দিয়ে বলল, "এই নাও, এটা তোমার জন্য।"
"কী এটা?"
"খুলেই দেখো না।"
প্যাকেটটা খুলে অনু অবাক হয়ে গেল। ভেতরে একটা সুন্দর লাল রঙের সালোয়ার-কামিজ। অনু কিছুই বুঝতে পারল না।
কমল হেসেই বলল,
"কাল তুমি তোমার কার্ডগুলো আমার হাতে দিলে না? ভুল করে ওটা আমার পকেটে ঢুকে গিয়েছিল। খানিকটা রাস্তা যাওয়ার পর মনে পড়তে যখন বের করলাম, তখন দেখলাম আজ তোমার জন্মদিন! তাই সন্ধ্যায় হাটে গিয়ে তোমার জন্য এই সালোয়ারটা নিয়ে এলাম।"
অনুর মনে পড়ল তার গায়ের পুরনো সালোয়ারটার কথা। সেটার আসল রঙ কী ছিল, এখন আর বোঝার উপায় নেই। চার জায়গায় সেলাই আর চায়ের দাগে ভরা। আজ এই উপহারটা পেয়ে সে নিজেকে সামলাতে পারল না, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। জীবনে এর আগে কেউ তাকে এভাবে কিছু দেয়নি।
এখন অনু রাতে দুটো রুটি বেশি বানায়। সকালে যখন কমল চা খেতে আসে, অনু জোর করে তাকে রুটিগুলো খেতে দেয়। কমল প্রথমে নিতে চায় না, কিন্তু অনুর জেদের কাছে হেরে যায়। রুটি মুখে দিয়ে কমলের বড্ড মায়ের কথা মনে পড়ে।
কদিন পর গ্রামে শুরু হলো এসআইআর-এর প্রক্রিয়া। সারা গ্রামে হইচই পড়ে গেল। যথারীতি বিএলও (BLO) অফিসার এল এবং অনুর কাছে একটা ফর্ম দিয়ে বলল, এটা ফিলাপ করে জমা দিতে। কিন্তু হাই, অনু তো লেখাপড়া কিছুই জানে না! সে কোনোদিন স্কুলের মুখ দেখেনি। অনু চিন্তিত মুখে কমলের অপেক্ষা করতে লাগল। কমল এসে কোনো রকমে ফর্মটা লিখে জমা দিতে গেল। কমল যে খুব লেখাপড়া করেছে তা নয়, ওই ক্লাস ফোর পর্যন্ত। তারপরই তাকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল। কমলের কাগজ ঠিক থাকলেও, অনুর কোনো লিঙ্ক ডকুমেন্ট ছিল না। অনুর হিয়ারিংয়ে ডাক পড়ল। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে সে কাগজ জমা দিল। তবে কমল জানত এতে কাজ হবে না, নাম বাতিল হতে পারে। আর হলোও তাই—অনুর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেল।
কমল নিজের কাজকাম ফেলে সব রকম চেষ্টা করল। মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, যে যা বলছে সে তাই করছে। হাজার দৌড়াদৌড়ি করেও কোনো লাভ হলো না। এই সব দেখে অনুর বুক ফেটে মায়া লাগছিল। কে এই মানুষটা? কেনই বা তার জন্য এত কিছু করছে? এর আগে তো কেউ তার জন্য এক পা-ও এগোয়নি! অনুর ভেতরটা কেঁদে উঠল।
এক রাতে কমল হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছিল। রাস্তার ধারে কিছু মানুষ আলোচনা করছিল—যাদের নাম বাতিল হয়েছে, তাদের নাকি ধরে ধরে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হবে। সেদিন রাতে কমলের আর ঘুম এল না। শেষ রাতে সে একটা ভয়ানক স্বপ্ন দেখল—অনুকে কারা যেন টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলছে, অনু কাঁদছে। কমল ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসল। না, এটা সে কিছুতেই হতে দিতে পারে না! জীবনে এখন তার অনু ছাড়া কেউ নেই, আর অনুর জীবনেও সে ছাড়া কেউ নেই।
সকালে অনু দোকান খুলতে গিয়ে দেখে কমল আগেই সেখানে অপেক্ষা করছে। কমলের চোখ-মুখ শুকনো, ক্লান্ত। অনু এগিয়ে গিয়ে বলল, "কী অবস্থা তোমার? চোখ-মুখ এমন শুকিয়ে গেছে কেন? রাতে ঘুমাওনি?"
কমল অনুর হাত ধরে হিড়হিড় করে দোকানের ভেতরে নিয়ে গেল। রুদ্ধশ্বাসে বলল, "অনু, আমি যা বলছি ভালো করে শোনো। অনেক চিন্তা করে দেখলাম, আমাদের এই গ্রাম, এই রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।"
"এইসব কী বলছো তুমি? কোথায় যাব আমরা ?"
"তুমি জানো না অনু, এখানে থাকলে ওরা তোমাকে নিয়ে যাবে। আমি তোমাকে হারাতে পারব না..." বলতে বলতে কমল কেঁদে ফেলল।
অনু কী করবে বুঝতে না পেরে কমলের মুখে হাত রাখল। তখনই, দুজনের অজান্তেই তারা একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এ যেন এক বুক ভরা শান্তি, যেন শত জনমের এক অপূর্ণতা নিমেষে পূর্ণ হলো। যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীতে হঠাৎ জোয়ার এল। অনুর ইচ্ছা করল নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে। কিন্তু তার মতো গরিব অনাথ মেয়ে এই একমুঠো ভালোবাসা ছাড়া আর কী-ই বা দিতে পারে! মুখে কিছু না বলেও আজ অনেক কথাই বলা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর অনু নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে লজ্জায় অপরাধীর মাথা নিচু করে মতো দাঁড়িয়ে রইল।
কমল বলল, "অনু, যাবে আমার সঙ্গে? অন্য কোথাও গিয়ে আমরা নতুন করে জীবন শুরু করব। এই সব ঝুটঝামেলা থেকে অনেক দূরে।"
অনু কিছু না বুঝেই বোকার মতো শুধু মাথা
নাড়লো।
"তাহলে তুমি কাল সকালে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে অপেক্ষা কোরো। আমি আসব।"
"আচ্ছা।"
কমল ফিরে যাবার পথের একবার পিছন ফিরে দেখলো।
অনু তার দিকে একভাবে তাকিয়েই আছে।
কমলের ইচ্ছা করলো আরেক বার তাকে বুকে চেপে ধরতে। কিন্তু পারলো না।
সেদিন রাতে অনুর চোখে ঘুম নেই। এক নতুন জীবনের হাতছানি তাকে ডাকছে। অনু ভাবতে লাগল—তার ভাগ্যে কি এত সুখ জুটবে? সে তো ছোটবেলা থেকেই হতভাগা। সব হারিয়ে এখন সে সর্বহারা। তবু মনের ভেতর এক চিলতে আশা জেগে উঠল। সকালের সেই আলিঙ্গনের উষ্ণতা সে এখনো অনুভব করছে। জীবনের প্রথম পুরুষের ছোঁয়া, ভাবতেই তার গা শিউরে উঠছিল।
পরের দিন সকালে সে নিজেকে একটু সাজিয়ে নিল। কমলের দেওয়া সেই লাল সালোয়ারটা পরল। আয়নায় দেখল, বেশ মানিয়েছে তাকে। তারপর ব্যাগ গুছিয়ে বাইরে বেরিয়ে ঘরে তালা লাগাল। দোকান ঘরটা ফেলে যেতে একটু মন কেমন করছিল বটে, কিন্তু মায়া করেই বা কী হবে? বাড়িটা তো আর তার নয়, মোড়লের। মোড়ল একদিকে খুশিই হবে, জমিটা এবার পুরোপুরি দখল করতে পারবে। অনু কমলের কথামতো বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে অপেক্ষা করতে লাগল।
ওদিকে কমলের কিছু টাকা-পয়সা জোগাড় করতে একটু বেলা হয়ে গেল। সে হন্তদন্ত হয়ে বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। কিন্তু রাস্তার মধ্যে কারা জানি পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করছিলো।
কমল রাস্তায় আটকে পড়লো।
হঠাৎ রাস্তায় মারামারি, বোমাবাজি শুরু হলে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ আরম্ভ করলো।
কমল কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই ভিড়ের মধ্যে পড়ে গেল। পুলিশ তাকেও তাদের একজন ভেবে ধরে ফেলল। মারতে মারতে গাড়িতে তুলে নিল।
কমল চিৎকার করে বলছিল, "আমি কিছু করিনি স্যার! আমাকে ছেড়ে দিন! আমাকে যেতে হবে!" কিন্তু রণক্ষেত্রের সেই চিৎকারে কমলের গলা ঢাকা পড়ে গেল।
পুলিশ তাকে সোজা লকআপে পুরে দিল। কমলের মনে হচ্ছিল দেওয়ালে মাথা ঠুকতে।
সে ছটফট করছিলো।
কিন্তু শোনার কেউ ছিল না।
মিথ্যা অপরাধ স্বীকার করানোর জন্য কমলের ওপর নির্মম নির্যাতন চলতে লাগল।
আর এদিকে, কমলের অপেক্ষায় ঠায় বসে রইল অনু। দিন যায়, রাত যায়, অনুর অপেক্ষা আর শেষ হয় না। তার বিশ্বাস কমল তাকে নিতে আসবেই।
দীর্ঘ দশ দিন পর কমলকে তারা ছেড়ে দিলো।
যখন জেল থেকে ছাড়া পেল ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছিলো না।
সে উন্মাদদের মতো খোঁড়া পায়েই দৌড়ে গেল বাস স্ট্যান্ডে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আশেপাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করল সে, কিন্তু অনুর কোনো হদিস পেলো না। অবশেষে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত হয়ে সে একটা বসার জায়গায় ধপ করে বসে পড়ল।
তার নজরে এল, বেঞ্চের নিচের কোণায় কেউ একজন গুটিসুটি মেরে বসে আছে। পরনে ধুলোবালি মাখা লাল সালোয়ার। কাঁপতে কাঁপতে কমল এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখতেই মেয়েটি ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল।
মুহূর্তেই আতঙ্কে জমে গেল কমল।
উসকোখুসকো চুল, মুখজুড়ে নখের আঁচড়ের দগদগে ক্ষত, ফেটে যাওয়া ঠোঁটে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। সারা শরীর থেকে ভেসে আসছে তীব্র দুর্গন্ধ। চারপাশে কয়েকটি মাছি ভনভন করে উড়ছে। অথচ সেই ভয়াবহ মুখের মাঝেই এখনও জ্বলজ্বল করছে একজোড়া নীল চোখ।
সেই চোখ দুটো চিনতে কমলের এক মুহূর্তও লাগল না।
কমলের কথায় বিশ্বাস রেখে, তার ফেরার আশায় অনু অপেক্ষা করেছিল। তার অসহায়তার সুযোগ পেয়ে সমাজের বুকে ঘুরে বেড়ানো নরপশুরা তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে।
অনু ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল আর বিড়বিড় করে কী যেন বলতে লাগল। তার শরীরের ছেঁড়া সালোয়ারের দড়িটা নিচে ঝুলছে।
ঠিক তখনই কালো রঙের একটা গাড়ি এসে থামল। ইউনিফর্ম পরা দুজন লোক এসে অনুকে জোর করে ধরতে গেল।
অনু চিৎকার করে উঠল, "ছাড় আমাকে! ছাড়!" বলে একজনের হাতে কামড়ে দিল।
"আঃ! শালা পাগলি কোথাকার! ধর একে, গাড়িতে তোল!"
কমলের চোখে ভেসে উঠলো সেদিনের সেই দুঃস্বপ্নের ছবিটা।
না, তারা পারল না। নতুন করে জীবন শুরু করা আর হলো না। একে অপরকে ভালোবাসার কথাটুকুও মুখ ফুটে বলা হলো না। মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল দুটি নিষ্পাপ স্বপ্ন, দুটি অদেখা ভবিষ্যৎ।
বুকভাঙা কান্নায় ডুকরে উঠে বলল,
"হায় ভগবান... এ তুমি কী করলে!"
এখন সে আর একটা থাকে না, তার সাথে থাকে
অনুর ফেলে যাওয়া স্মৃতি, অপূর্ণ ভালোবাসা আর অসহ্য রকম অপরাধবোধ—এই তিনটিই হয়ে উঠল তার আজীবনের সঙ্গী।
(সমাপ্ত )
নোট - SIR ব্যাপার টা শুধু মাত্র গল্পের প্লট জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
গল্পের নাম - অনুর অপেক্ষা
আমি - সেখ নাজিরুল ইসলাম
জলামাদুল মণ্ডল পাড়া, চণ্ডীতলা, হুগলী।
মোবাইল - 9800083939
ইমেইল -najirulislam3939@gmail.com
Comments
Post a Comment