মেঘশালুর গল্প
বলরাম বিশ্বাস
১….
বর্ষা যাব যাব করছে। আকাশের হঠাৎ কেমন পরিবর্তন দেখা যায়। মেঘ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আকাশের এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে। তার ভালো লাগে।
রাস্তায় নামতে সৌমেন কে দেখল। বাইক দাঁড় করিয়ে সিগারেট টানছে। ধোঁয়ার রিং করার চেষ্টা করছে। মনোযোগ সেদিকে। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে যদিও আকাশ দেখছে না, ধোঁয়া দেখছে। মেঘ পাশ দিয়ে যেতে গেলে খেয়াল করল। ডাকল, সৌমেন; মেঘনাথবাবু যে, কোথায় চললে…
তোর শ্বশুরবাড়ি, মনের ভিতর এটা বলল, সামনে বলল কাজে।
কি কাজ তোর আবার ; আড্ডা, নিজে বলে নিজেই হাসতে থাকে, মেঘের গাঁ রি রি করে ওঠে, কিছু কিছু মানুষ থাকে ভালো হোক বা খারাপ হোক পছন্দ হয় না। মেঘেরও এই সৌমেন কে পছন্দ না। একে তো কথাবার্তার ধরণধারণ ভালো না। তার উপর কৌতূহল বেশি।
মেঘ কথা বাড়াতে চায় না, সে পাশ দিয়ে সোজা রাস্তা ধরে, সৌমেন পিছন থেকে চ্যাঁচায়
রাগ করলে গুরু?
মেঘ উত্তর করেনা।
মেঘের মেজাজ তিতিবিরক্ত করে ছাড়ল। তবু সঙ্গ ছাড়ল না। পিছনে পিছনে আসছে। মেঘ মাথা ঘোরাল, হাঁটার গতি বাড়াতে চাইল। কিন্তু বাইকের সাথে ওই শয়তান এগিয়ে এল।
এত রাগলে হয়? একসাথে পড়তাম। বন্ধু বলে কথা। মনে পড়েনা? বাইকে দাঁতকেলিয়ে বাচ্ছেনা। মেঘের ইচ্ছে করছে এক লাথি মারে। কোনো লাভ হবেনা। বরং উল্টো হবে, নিজের পায়ে লেগে যাবে।
কোন উত্তর করছেনা মেঘ। সৌমেন ততই মেঘ কে তাতিয়ে যাচ্ছে। কি গুরু? কথা কও?
মিশমিশে কালো একটা খারাপলাগা ঘিরে ধরছে, সৌমেন পিছন ছাড়ছে না। এমন অবস্থায় যাওয়ার জায়গা স্থির করা একটু কঠিন বইকি। যদিও সেরকম উদ্দেশ্য নেই। বাড়ি থেকে বার হয়ে একটু হেঁটে বেড়ানো ও শেষে গ্রন্থাগারে যাবে ভেবেছিল। হল না। অথবা বলা যায় হচ্ছেনা এই হতচ্ছাড়ার জন্য। মনে মনে অনেক খারাপ গালি আসছে;; প্রিয় গাল কালপ্যাঁচা।
আকাশের পরিবর্তন আর লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। কালপ্যাঁচা যতক্ষণ না যাচ্ছে। সৌমেন বলে, এখন কোথায় যেতে চাস বল। আমার তরফ থেকে পৌঁছে দেওয়া আছে। আমার লাগবেনা। মেঘ বলল।
খানিক হাঁটার পর বিশাখাদের চায়ের দোকান। মেঘ দোকানঘরে ঢুকে গেল। বাইরের ঝকঝকে রোদ আড়াল হল। বাইরে বাইকের শব্দ বন্ধ হল। প্যাঁচা পিছু নিয়েছে, আজকের দিনটাই বাতিল। খারাপলাগা। হাসতে হাসতে এসে বসল বেঞ্চে। মেঘ সরে যাবে কিনা ভাবছে। কাঁধ ধরে বসিয়ে দিল যেন। গগনদা দুটো চা।
চা খেতেও যেন ভালো লাগছেনা মেঘের। অথচ এলাকার সবচেয়ে নামকরা চা তৈরি করে গগনদা। পাশে এই পিন্ডি থাকায় এটা হচ্ছে। যায় না যেতেও দেয়না।
সিগারেট খাবি?.সৌমেন মেঘের মুখের দিকে তাকায়। ভাই আমাকে এত অপছন্দ করিস। অবশ্য তুই একা না। অনেকেই করে। যদিও তাতে আমার কিছু আসবে যাবেনা। তবু, মানুষের জন্য কিনা করি। দেখতে তো পাস। তোকে এরকম ভাবিনি। আমি যা করি সবটাই ইয়ার্কি। তোরা বুঝিন না?
মেঘের কথাগুলো একটু ঘাবড়ে দিল। সৌমেনের অন্য রূপ। অবশ্য একটা কথা সত্যি পাড়ায় কিছু হলে একে আগে দেখা যায়। আগবাড়িয় উপকার করা ছেলে।
মেঘ বলল, দে সিগারেট।
সৌমেন বলে জানতাম গুরু, সামনে ভোলাভালা, পিছনে তুমি ঘোড়েল মাল।
আবার মনখারাপ করা কথাবার্তা। ধুর।
রুকো যারা। মুখখারাপ বেড়িয়ে যাবে। ভালোছেলের তকমা খুলে যাবে বস।সৌমেন বলে মৃদু হাসে।
সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান দিয়েছে মেঘ। সৌমেন বলে, তোকে একটা সুসংবাদ দিই।
মেঘ আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে, বেফাঁস কিছু বললে, তোর সাথে জীবনের মতো কথা বলা বন্ধ।
ওরে শালারে। পিঠ চাপড়ে বলল। তোর জন্য খবর খারাপ ও ভালো দুই।
মেঘের মুখে বিশ্ময় চিহ্ন।
সৌমেন সিগারেটে জোর টান দিল। ধোঁয়ার রিং করার চেষ্টা করে বলল, পপি ফিরে এসছে। ফিরে এসছে বলা ভুল। তাকে রেখে গেছে ওর স্বামী। শুনলাম নাকি মাথার ব্যামোতে ধরেছে। এখানে রেখে গেছে তাই। ভাব কান্ড। ভালো মেয়ে। হঠাৎ করে মাথার ব্যামো ধরেছে। এখানে চিকিৎসা বা হবে কি করে, তুই তো জানিস পপির বাবা করাতকলে কাজ করে। কতটাকাই বা দেয়। দিনে তিনশো টিনশো হবে। দেখানো সম্ভব!
আর তাছাড়া ওই স্বামী না আসামী কী যেন নাম? মেঘ বলল, হরিশ, হ্যাঁ হ্যাঁ ওই চামার শালা, না দেখিয়ে বাড়ি দিয়ে পাঠিয়েছে। ভাব।
বিস্ময় বেড়ে যাচ্ছে। পপির এরমধ্যে কি হল?.বছরখানেক হল বিয়ে। মেঘ ভাবতে পারেনা।
সৌমেন পিঠ থাবড়ে বলে, গুরু ; তোর তো প্রথম প্রেম, দেখবি নাকি চেষ্টা করে।।
মেঘ হতম্ভবের মতো বসে থাকে। কি বলবে? কি করবে?
তার মাথার মধ্যে একটা কথায় অনুরণিত হচ্ছে। তোর তো প্রথম প্রেম।
২
পাঠাগারে যাবে ঠিক করল মেঘ। বাইরে বেড়িয়ে এসে সৌমেন কে বলল আমাকে একটু নামিয়ে দে।
সৌমেন গগনদার টাকা মিটিয়ে বাইক স্টার্ট দিল।
কোথায় গুরু? পপির পাছা দেখতে।
এবার কেন যেন রাগ করলনা মেঘ। সৌমেনের পিছনে চড়ে বসল। বেশ গতিতেই চালায় সৌমেন। মেঘের চুল উল্টোদিকে ছুটছে।
গো টু লাইব্রেরী। ও বাব্বা। তোর পড়ার বাতিক এখনও যায় নি দেখছি। ওসব পড়ে কি হয় গুরু?
মেঘ চুপ থাকে। কাকে বোঝাবে। এই সৌমেন। যে কিনা থ্রিল ছাড়া জীবন চেনেনা। বাবার ওই বড়র্যাঙ্কের চাকরি না থাকলে যে কি করত কে জানে? অবশ্য মেঘের বেলাতেও তাই। তবে মেঘ একটু ভালোমানুষ গোছের। আর সৌমেন অভদ্র গোছের। আবার কারও বিপদে সৌমেন ঝুপুস করে লাফ, মেঘ থাকে দূরে দূরে।
আসল ভালো খারাপ কে তবে। মেঘ ভাবল, এক এক জন এক এক দিকে ভালো আবার খারাপ। অর্থাৎ একটা মানুষ কে পুরোপুরি বিচার করা মুসকিল। ভালো খারাপ দুই দিক নিয়ে জীবন।
কোথায় যাবি বল? সৌমেন ফের কথা ছুড়ে দেয়।
বললাম তো লাইব্রেরী।
চলে এসছি বস। মন কোথায়, পপির চিড়িয়াখানায়।
হাসতে থাকে সৌমেন। আবার একটু রাগ জন্ম নিচ্ছে মেঘের। মনে মনে শালা বলে গালি দিল। নেমে পড়ল বাইক থেকে।
একটা বই হাতে নিয়ে বসে থাকল কিছুক্ষণ। পড়তে ইচ্ছে করছে না। সৌমেন নামিয়ে দিয়ে কেটে পড়েছে। মেঘের মনটা নাম না জানা এক বিষন্নতায় ভরে যাচ্ছে।
কার জন্য এই মনখারাপ?
পপি!!কিন্তু কেন?
সে তো অন্যের স্ত্রী।
বইটা এক পাতায় স্থির। মেঘের চোখ পাতায় বন্দি। মন সে বেবাগা। কথা শোনে না। সে চলে গেছে পপির পূর্বতন স্মৃতি হাতড়াতে।
কলেজে উঠে তাদের আলাপ। একেবারে ছোটবেলায় এত কাছাকাছি থাকলেও কখনও কথা হয় নি। মুখ চেনা চিনত। স্কুল লাইক গার্লস এ পড়েছে। কলেজে এসে হুট করে একগাদা ছেলের মধ্যে ; ততদিনে যদিও অনেককিছু জানা। তবুও ছেলে ছেলে থেকে দূরে দূরে থাকার ইচ্ছে।
পপির সঙ্গে যে আসত সেই সোনালী দারুণ মুখর। ছেলেদের হেলপ করা কিছু মেয়ে থাকে, ওকে অনায়াসে তাদের দলে ফেলা যায়। কদিন পিছে পিছে ঘুরে হয়রান হয়েছে মেঘ। একদিন ল্যাবে কেমিক্যাল নিয়ে কথার সূত্রপাত। ও সেই দিন!!
পপির চোখে যেন কত অপার সমুদ্র। চুলগুলো মুখের উপর পড়ে রহস্যময় রমণী করে তুলেছে। একটু দেখিয়ে দেবে ক্যামন করে করে?
কথা যেন বহু যুগের ওপার হতে। মেঘের প্রতিটা শিরা যেন জেগে উঠেছে। রক্ত দাপাদাপি করছে। একেই কি বলে যাকে দেখা যায় তার প্রতিটা ধ্বনি অনুরণিত করে গোপন অন্তরে।
তারপর ধীরে ধীরে মেলামেশা। কথা। চা খাওয়া। ক্যান্টিনে সিগারেট ফুঁকা। সব চলত। একসময় এমন হল, যে অন্যরা বলতে শুরু করল, তোর তো সেটিং কমপ্লিট বস। প্রেম প্রেম ভালো খেলছ গুরু। নামতে নামতে কতটা নেমেছিস। তলে তলে এত। ইত্যাদি ইত্যাদি।
মেঘের খারাপ লাগেনি। আরও ভালো লাগত। একদিন একসাথে ফেরার পথে এই বিবেকানন্দ পাঠাগারে হাজির হল পপির সাথে। দারুণ গল্প উপন্যাস পড়ার শখ পপির। মেঘের ততটা ভালো লাগতনা। কিন্তু পপির পাল্লায় একদিন সেও যোগ দিল। একটু একটু করে ইন্টারেস্ট গ্রো করল।
ভাই চা। লাইব্রেরিয়ান ভদ্রোলোকের হাসিমুখ।
কিছু ভাবছ নাকি? কেমন যেন উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে।
এ, হ্যাঁ ; নানা। মেঘ বাস্তবে ফিরতে চাইল।
দ্যান। চা খাওয়া বরাবরের অভ্যাস এই ভদ্রলোকের। মেঘের মনে পড়ল গৌরাঙ্গ নাম। উনি গৌরাঙ্গবাবু বললে খুব খুশি হন। মেঘের মতো গুটিকয়েক আসে বই নিতে। এখন পড়ার মানুষের বড় সঙ্কট।
এবার সিগারেট দেবেন গৌরাঙ্গবাবু। মেঘের এই প্রাপ্য ভালো লাগে। তবে সিগারেট খেতে হবে বাইরে গিয়ে। ওনার এটা মত যে লাইব্রেরি আর ঠাকুরঘরে সিগারেট খেতে নেয়। ক্যানো নেই তার কোন উত্তর নেই তবু উনি এটা মানেন। মেঘের অভ্যাস হয়ে গেছে। দুজনে বাইরে আসে। পাঠাগারের সামনে অল্প একটু জায়গা। লোহার রেলিং দেওয়া। মাটি সবুজ ঘুসে ঢাকা। দুজনে বসে।
সিগারেটে আগুন দিয়ে বলে, আপনার সেই পপির কথা মনে আছে গৌরাঙ্গবাবু।
হু। ক্যানো।
ও নাকি পাগলী হয়ে গেছে।
হোয়াই!
তুমি তো তাকে ভালোবাসতে?
কি যে বলেন।
আমি বুঝি। বয়স তো কম হলনা। তোমার বয়সি আমার দুই ছেলে।
তবুও আপনি কত ফ্রাঙ্ক।
ভালো হলে তবেই মনে রাখে মানুষ। বুঝলে। প্রত্যাশা রাখতে নেই।
মেঘের কথাগুলো কেমন যেন বই পড়ছে বই পড়ছে মনে হল।
সংক্ষেপে বলল হু।
ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে।
তো? গৌরাঙ্গবাবুর মুখ থেকে গলগল করে ধোঁয়া বেরুচ্ছে।
আমার কি দেখা করা উচিত?
নিশ্চয়ই।
ভালোবাসার মানুষকে একা ছাড়তে নেই। ছাড়লে সে ফস্কে যায়।
অনন্ত বসে থাকা যেন। মেঘ উপরে তাকাল। অনন্ত অসীম আকাশ। মেঘ নিজেকে এক ক্ষুদ্র নক্ষত্র ভাবল এই গোটা পৃথিবীতে। অথবা ছোট পিঁড়ড়ে।
তার কিই বা আছে?
ধীরে ধীরে বিকেলের দিকে এগোচ্ছে সময়।
আসি গৌরাঙ্গবাবু।
পায়ে পায়ে রাস্তা অব্দি এল। পিছনে তাকিয়ে দেখল মেঘ ;এখনও গৌরাঙ্গবাবু সেভাবেই বসে আছে।
৩…
মেঘের রাতে ঘুম হলনা ভালো। নাম না জানা ছটফট থেকে গেল। অথচ যে মানুষের জন্য সমস্ত খারাপলাগা কাটিয়ে উঠেছে। সেই পুরোনো কিছু কেন আবার ফিরে আসা।
সকালের খাবার খেয়ে কি করবে বুঝতে পারল না। মাঝেমাঝে বুকটা হু হু করছে। কাকে চায়। কার জন্য কে ভালো থাকে । অন্যের জন্য কেনই বা এত উতলাঢেউ।
মেঘের মা ছেলেকে দেখে কিছু হয়েছে আন্দাজ করে। চোখ লাল দেখে বোঝে রাতে ঘুমায়নি।
খোকা?
হু।
কিছু হয়েছে?
আচ্ছা মা; জীবন এত কঠিন কেন?
ছেলের মাথায় বিলি কেটে দেয়। বলবিনে?
কি বলব? আমাদের জীবনে সময় অনেক হলেও আমরা কত ছোট জায়গায় বন্দি। এই তোমাকে দেখ, এত বড়লোকের বৌ ; কিন্তু এই ঘর তোমার জীবন। এই বাইরে কতকি ঘটছে, তুমি তার কতটুকু জান?
ভালোবাসা নামক একটা শিকল পায়ে পড়িয়েছো। এটা সবার জন্য।
এই আমাকে ধর, কত কিছু করতে পারি। বাবা মানা করবে না, কিছু করতে পারছিনে। কোথায় যেন আটকে গেছি। কত কথা প্রচলিত আছে, বহমান জীবন থেমে গেলে শেওলাবন্দি। আসলে আমাদের জীবন তো চারপাশে জাল দিয়ে আটকা। সবাই বেরোতে চায়। পারছি কই?
সবই ঠিক খোকা। জীবন বড়ই ছোট। আর অভিনয় ছাড়া মিথ্যে ছাড়া জীবন চলেনা।
মেঘের চোখে বৃষ্টি ঝরছে….
ভেবেছিল যাবেনা, কিন্তু ভিতরের খিদে তাকে আটকে রাখতে পারছে না। যেতে চাইছে শালিনীদের বাড়ি। সেই শালিনী যাকে কতবার শালি শালি বলে ক্ষেপিয়েছে। তারপর প্রিয় ডাকনাম জানা হলে সেই নাম প্রচলিত হল পপি। শালিনী অনেকদিন নিছে কিসব আজগুবি ঘটনা ঘটিয়েছে। মাঝে মাঝে ফুচকা খাবার খুব জেদ ছিল। অন্য কিছু তেমন খেতে চাইত না। ক্যান্টিনে চা সিগারেট আর বাইরে ফুচকা। ছোট আবদার কিন্তু কঠিন আবদার। না পেলে সিনক্রিয়েট করে দিত।
হিসেব বড় খারাপ জিনিস। তবু করতে হয়। না করে থাকা যায় না। ভালোবাসা অবশ্য হিসেবের কোন গন্ডি মানে না। সে অদৃশ্য বৃত্তাকারে ঘুরছে ; অবুঝ, এ ভালোবাসার শেষ নেই।
পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে। কোন সুক্ষ্ টান যেন লেগেছে। অবাধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
বাড়ির সামনে গিয়ে দোটানায় পড়ল। একটা সঙ্কোচ আকড়ে ধরল। দোনামোনা..
শেষে ডাকল শালিনী। বেড়িয়ে আসল শালিনীর মা।
বল বাবা। ও ঘরে আছে। শরীর ভালো না।
ঘরে গিয়ে বসল। সবটা বলুন।
শালিনীর মা চোখে জল ছলছল। হঠাৎ কোথা থেকে কি হল কে জানে, আমার সুস্থ মেয়ে। ওরা নিশ্চয় অত্যাচার করেছে।
দেখানোর কি ব্যবস্থা করেছেন?
তুমি তো সবই জান বাবা। তবে তোমার কাকা একটা ডাক্তারের খোঁজ নিয়েছে, দেখাতে তো হবেই।
ভাবছি বাড়িটার একটা অংশ বিক্রি করে দিতে হবে।
এখনি এত কিছু করতে হবেনা। মেঘ বলল।
কবে যাবেন বলুন ; টাকা নিয়ে ভাবতে হবেনা।
কিন্তু বাবা ; তোমার সাথে যে ব্যবহার মেয়ে করেছে তার পরও…
আমি কিছু মনে রাখিনি।
সেটা তোমার বড় মন।
ওসব কথা থাক।
কবে যাবেন বলুন।
বুধবার বসেন।
আচ্ছা।
আপনি কাকা কে বলে রাখবেন কাজে না যেতে আমি চলে আসব।
ও কি পুরোপুরি
নানা বাবা। কেমন যেন হয়ে থাকে। মাঝেমাঝে ভুল কিসব বলে। স্নান করতে চায় না। ব্যামো বাড়লে লোকজন মানেনা,, তোমার সামনে কি করে বলি বাবা।
থাক। বলতে হবেনা। ডাক্তার সামনে বলবেন।
আসি।
দেখে যাবেনা বান্ধবীকে।
দুরু দুরু করছে বুকে। না থাক। আপনারা তৈরি থাকবেন ।
কটাই আসব।
পাঁচটা।
আচ্ছা।
গাড়ি?
আমি নিয়ে আসব।
মনটা যেন হালকা লাগছে। ভেবেছিল পপির মা মানা করবে। কিছু হলনা। রোদ বেশ চনমনে হয়ে উঠছে।
আকাশ বড় শান্ত। জমাট জমাট কুয়াশার মতো বকসাদা মেঘ।
মেঘ হাঁটতে লাগল রাস্তার ধার ধরে। একটু এগিয়েছে
পিছন থেকে সেই পরিচিত ডাক। গুরু তাহলে প্রেমে পাগল প্রেমিক থাকতে পারল না। তুমি বস সিনেমাকেও হার মানাবে।
মেঘ রাগল না। সৌমেন কে বলল।
বাড়ি চল। চা খাবি?
সৌমেন বলে তুই খাওয়াবি?
চল।
সৌমেন বাইকের নিউট্রাল অবস্থা বদলাল।
গগনদা আসছি বলে চ্যাঁচাল।
রাস্তার সেরকম লোক নেই। থাকলে পাগল ভাবত।
পাগল কথাটা মনে আসতে আবার মনটা কেমন করল।
পপিকে দেখে আসলে ক্যামন হত?
সেই তো চাইল না। নাকি পারল না?.তাকে পারতে হবে
মুখোমুখি হতে হবে। এটাই তো ভবিতব্য।
বাইকের হাওয়ার চুলগুলো উড়ছে।
তার মনও উড়ছে।
তালে তালে…
৪…
খুব কষ্টে নিয়ে যাওয়া হল। কামড়ে দিতে চায়। এই দেখল মেঘ তার শালিনীকে। বলা যায় শালু কে। ভালোবাসার শালু। কিন্তু এই দেখা ভিতরের গভীরে শতশত আঘাতের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। চোখে কে এত জ্বালা সেট করল। সে পারছেনা যেন ; তবু তাকে থাকতেই হবে। কাঁদবে না, সে পুরুষ, সে তৃতীয় ব্যক্তি এখন। তাকে শান্ত থেকে সবকিছু করতে হবে।
সাইক্রিয়াটিস্ট কে দেখানো হল। ডাক্তারবাবু সবরকম দেখে শুনে কিছু ওষুধ প্রেসক্রাইব করলেন। আশপাশের রোগীর পরিবারের অনেকের সাথে মেঘ কথা বলল। তাদের কেউ কেউ ডাক্তারবাবুর প্রশংসা করল। কেউ কেউ বলল সবই উপরওয়ালার ইচ্ছে।
সবমিলিয়ে বত্রিশশো টাকা লাগল। মেঘ মেটালো। ওর বাবা কি যেন বলতে গেল। পপির দিকে ভালোকরে তাকাতে পারছেনা কেন মেঘ। চুল যেন পাখির বাসা। মুখ পানসে। চোখ কোঠারগত। এই কি সে। যাকে দেখার জন্য অনেকেই।
মেঘ নিজেও কি ছিলনা। পপির রূপের প্রেমিক। আজ সেসব কথা ফিরে ফিরে আসছে কেন। মানুষ তো বদলাতেই পারে। অসুখ হতে পারে। হরিশের উপর রাগ হচ্ছে খুব।
বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে নিজে বাড়ি এল মেঘ। মা জানে সবটা। কিছু বলেনা। শুধু বলে আর যেন মায়ায় পড়িসনে। ভালো করতে চাস আপত্তি নেই। এবার যদি কিছু হয়। তোকে কিন্তু…
থাক মা। জীবনের বহমানতা মানতে হয়। কেউ হয়তো আমার হাতে ঠিক হতে চায়।
তোর মনে নেই।কি কান্ডটা করল।
সব মনে আছে মা।
একটা বিষয় তো জান মা। ভালোবাসা অনেককিছুকেই হার মানায়।
আমার বড় ভয় হয়।।
মেঘ হাসে। শুধু শুধু ভয়।।
একটু জিরোনোর জন্য শুল। বিছানায় গা এলিয়ে দিতে ভালো লাগছে। সারাটা সময়ের ধকল।
চোখের সামনে সেই পুরোনো ঘটনা চেন রিলে করে উঠছে।
তাহলে তুই আমাকে বিয়ে করবিনে?
পপি হাসে।
কি হল?
পাগল।
আমি সত্যি পাগল হয়ে যাব তোকে না পেলে
হয়ে যা
ইয়ার্কি করিস নে।
সিরিয়াস বলছি
তুই সত্যি আমাকে
তোকে ভালো বন্ধু ভাবি।
গা রি রি করছে মেঘের।
এতদিন এসব কি ছিল তাহলে।
তুই অন্যকিছু ভাবলে আমার কি দোষ
মানে?
চুমু খেলে বাচ্চা হয় না।
এটাই ফাইনাল।
পপির মুখচোখের ভাব বদলে যায় কিছু বলেনা।
মেঘের সামনে একটা ইট পড়ে ছিল সাটিয়ে লাথি মারে, গলগল করে রক্ত বার হয়।
পপি এগিয়ে আসে
মেঘ ছুঁতে দেয় না।
৫….
ওষুধপত্তর জোর করে খাওয়াতে বেশ বেগ পেতে হয়। মেঘ হেল্প করে গিয়ে। কটাদিন কাঁটতে একটু ভালোর দিকে মনে হতে লাগল। দিনের বেশিরভাগ সময় ঘুমায়। একটু একটু যেন সুস্থ। মাকে ডাকে।
দ্বিতীয়বার দেখানোর পর বেশ কিছুদিন কেটে গেল। মেঘের এ বাড়িতে আসা যাওয়া বেড়ে গেছে। বলা ভালো সারাক্ষণ পড়ে আছে। এটা ওটা গল্প করে পপির মায়ের সাথে।
মাঝেমাঝে ঘুমিয়ে পড়ে। পপির পা খুব আদরে খেতে দেয় এক দুই দিন। নিজের বাড়ির মতো তৃপ্তি করে খায়।
অবশেষে দিনটা এল। পপি চিনতে পারল মেঘ কে। তুই?
মেঘ তাকিয়ে থাকে।
ভালোআছিস?
হু।
দেখতে দেখতে দুইমাস কেটে গেল। এর মধ্যে হরিশ নাকি একদিন দেখে গেছে। মেঘের রাগ হচ্ছে। হওয়া তো স্বাভাবিক। যখন দেখানোর কথা খোঁজ নেই। এখন।
একটু একটু বাইরে যায় মেঘ। পপিকে নিয়ে। একদিন কাছে বিলের ধারে গেল। বিলভর্তি শালুক ফুটে। সাদা দেখতে যেন একঝাঁক বক মনে হচ্ছে।
পপির পরিবর্তন বেশ ভালো। আবার আগের মতো যেন ফিরে পাচ্ছে মেঘ। হাত ধরে মাঝে মাঝে বলে শালু তুই কেন আমার হলিনে?
পপি আগের মতো তত স্বাভাবকি না। তবুও কিছু বুঝতে পারে। চোখের কোনে চিকচিক করে জল।
আরও একবার দেখানো হল। ডাক্তারবাবু বললেন খুব উন্নতি হচ্ছে। আশা করি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
আবার যে জীবনের সাথে ভয়ানক খেলা খেলছে কে জানত। কাকে দোষ দেবে, অদৃষ্টকে।
মায়ের কথা মনে হতে খুব খারাপ লাগে। জীবনে পদে পদে হেরে যাওয়া মানুষের মতো মনে হয় নিজেকে।
বাইরে বসে আছে হরিশ। মেঘ ঢুকল। দেখে আগামাথা জ্বলে যাচ্ছে। বলার কিছু নেই। পপির মা এসে বলল, বাবা, জামাই এসছে নিয়ে যেতে। মেঘ থ বনে যায়। হাত পা অবশ হতে থাকে। নিথর।
আপনার মেয়ে কি চায়?
ও তো রেডি হচ্ছে।
মেঘ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেনা। টলছে। ভিতরে কোথায় আগুন লেগে গেছে। কিন্তু সেটা তো উচিত না।
চেয়ারে বসে পড়ল। একটু সামলে বলল মেঘ, দেখানোর কি হবে?
হরিশ হাসে আমি ওখানে দেখিয়ে নেবো।
মেঘের বলতে ইচ্ছে করছে এতদিন এই কথা কোথায় ছিল।
পপি তৈরি। দুজনে চলে যাবে। মেঘ চোখ ফেটে যাচ্ছে। সে তাকাল পপির দিকে। তোর ডাক্তার দেখানো বাকি।
চলে যাচ্ছিস।
স্বামী তো সব। পপি বলে।
আর কথা বলেনা মেঘ। দুজনে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে।
মেঘ ঠাই বসে। সে উঠতে পারছে না।
--------------------
বলরাম বিশ্বাস
নদীয়া

Comments
Post a Comment