মানুষ যখন মানুষ থাকে না
মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় মানুষ। আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির অসংখ্য জীবের মধ্যে মানুষকে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদাবান করেছি।” (সূরা আল-ইসরা: ৭০)। কিন্তু এই মর্যাদা কেবল মানুষের অবয়বের জন্য নয়; বরং তার ঈমান, বিবেক, ন্যায়পরায়ণতা, করুণা ও মানবিকতার জন্য। মানুষ যখন আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরে যায়, তখন সে নিজের শ্রেষ্ঠত্বও হারিয়ে ফেলে। তখন বাহ্যিকভাবে মানুষ হলেও অন্তরে সে আর মানুষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে প্রবৃত্তির দাস, লোভের বন্দী এবং ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ এক সত্তা।
আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। ভোরবেলা সংবাদপত্র খুললেই কিংবা মোবাইল ফোনে খবর পড়লেই চোখে পড়ে হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি, মাদক ব্যবসা, চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, সাইবার অপরাধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অসংখ্য সংবাদ। প্রতিটি ঘটনাই যেন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে—কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের মানবতা? কেন মানুষের জীবন, সম্মান ও সম্পদ এত সহজে পদদলিত হচ্ছে? কেন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের কান্না শুনেও নির্বিকার থাকতে শিখে যাচ্ছে?
এক সময় বাংলার গ্রামে সন্ধ্যা নামলে মানুষ একে অপরের খোঁজ নিত। প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে পুরো গ্রাম ছুটে আসত। কোনো দরিদ্র পরিবারের বিয়ে হলে সবাই মিলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। আজ সেই সমাজের অনেক অংশে অবিশ্বাসের দেয়াল গড়ে উঠেছে। মানুষ এখন বাড়ির দরজায় লোহার গেট লাগায়, সিসি ক্যামেরা বসায়, রাত জেগে পাহারা দেয়। কারণ মানুষের ভয় এখন পশুর প্রতি নয়; মানুষের ভয় মানুষের কাছেই।
খুন আজ শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। একটি প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা মানে একটি পরিবারকে অনন্ত অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল।” (সূরা আল-মায়িদা: ৩২)। অথচ সামান্য বিরোধ, অর্থের লোভ, আধিপত্যের লড়াই কিংবা প্রতিহিংসার বশে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও আমরা দেখতে পাই। যখন একটি প্রাণের মূল্য ক্ষমতা কিংবা অর্থের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে সমাজের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আরও বেদনাদায়ক হলো নারীর প্রতি সহিংসতা। ধর্ষণ কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মানুষের আত্মমর্যাদা এবং সমগ্র সমাজের বিবেককে ক্ষতবিক্ষত করে। ইসলাম নারীর সম্মানকে ইবাদতের মতোই পবিত্র মর্যাদা দিয়েছে। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিদায় হজের ভাষণে নারীদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ যখন কোনো নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন শুধু একজন ব্যক্তি নয়—সমাজের নৈতিক চেতনারই পরাজয় ঘটে।
চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতিও সমাজের আরেকটি নীরব মহামারি। মানুষের শ্রমে অর্জিত সম্পদ অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া, প্রভাব খাটিয়ে জনসম্পদ আত্মসাৎ করা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিল করা ইসলামের দৃষ্টিতে কঠিন গুনাহ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, *“যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”* অথচ যখন অসততা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন সৎ মানুষও নিজেকে অসহায় মনে করতে শুরু করেন।
ক্ষমতা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। কিন্তু যখন ক্ষমতা সেবার পরিবর্তে ভয় প্রদর্শনের অস্ত্র হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে। যে শক্তি দুর্বলকে রক্ষা করার কথা, সেই শক্তি যদি দুর্বলকেই ভীত করে তোলে, তবে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—শাসক, নেতা, শিক্ষক, অভিভাবক—প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জবাবদিহির মুখোমুখি হবে।
চুরি ও ডাকাতিও শুধু সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনা নয়; এগুলো মানুষের নিরাপত্তাবোধকে ধ্বংস করে। একজন কৃষক যখন বছরের পর বছর পরিশ্রম করে ফসল ফলান, একজন ব্যবসায়ী যখন সততার সঙ্গে ব্যবসা করেন, একজন শ্রমিক যখন ঘাম ঝরিয়ে জীবিকা উপার্জন করেন—তখন তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেওয়া শুধু অর্থের ক্ষতি নয়; এটি তাদের পরিশ্রম, স্বপ্ন ও আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অবক্ষয়ের শুরু কোথায়? এর শুরু হয় মানুষের অন্তরে। যখন আল্লাহভীতি কমে যায়, যখন পরিবারে নৈতিক শিক্ষা দুর্বল হয়, যখন শিক্ষা কেবল চাকরির মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, যখন অর্থকে জীবনের একমাত্র সফলতা মনে করা হয়, তখন ধীরে ধীরে বিবেক নিস্তেজ হয়ে পড়ে। আর বিবেক নিস্তেজ হয়ে গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না; সে কেবল নিজের স্বার্থের জন্য বেঁচে থাকা একটি সত্তায় পরিণত হয়।
এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী? ইসলাম এর উত্তর দিয়েছে বহু আগেই। মানুষের হৃদয়ে তাকওয়া, সমাজে ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হলেই মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।" (সূরা আন-নাহল: ৯০)। এই একটি আয়াতই একটি আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক সংবিধান হতে পারে।
সমস্যার শুরু পরিবারে, সমাধানের শুরুটাও পরিবার থেকেই। সন্তান যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে তার বাবা মিথ্যা বলেন, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন, অসৎ উপার্জনকে সাফল্য মনে করেন, তবে সে বড় হয়ে সততার মূল্য বুঝবে কীভাবে? আবার যে পরিবারে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, সত্যবাদিতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও হালাল উপার্জনের শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই পরিবার সমাজের জন্য সৎ মানুষ উপহার দেয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার পরিবারগুলোর চরিত্র দিয়ে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার কারখানা হতে পারে না। একজন শিক্ষার্থী যদি অনেক ডিগ্রি অর্জন করেও দুর্নীতিবাজ, নিষ্ঠুর কিংবা প্রতারক হয়ে ওঠে, তবে সেই শিক্ষা সমাজের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং বোঝা। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের ভেতরে আল্লাহভীতি, দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি চরিত্রও গড়ে তোলেন। তাই শিক্ষা ও নৈতিকতার বিচ্ছেদ একটি জাতির জন্য ভয়াবহ সংকেত।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তাদের হাতে রয়েছে প্রযুক্তি, জ্ঞান অর্জনের অসীম সুযোগ এবং পরিবর্তন আনার শক্তি। এই শক্তি যদি কল্যাণের পথে ব্যবহৃত হয়, তবে দেশ সমৃদ্ধ হবে; আর যদি মিথ্যা, বিদ্বেষ, সহিংসতা কিংবা অনৈতিকতার পথে ব্যবহৃত হয়, তবে সমাজ আরও বিপর্যস্ত হবে। একজন তরুণ যখন ঘুষ প্রত্যাখ্যান করেন, গুজব ছড়ান না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং নিজের কর্মক্ষেত্রে সততার পরিচয় দেন, তখন তিনি নীরবে একটি নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ করেন।
আমরা প্রায়ই বড় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি, কিন্তু ছোট ছোট ভালো কাজকে গুরুত্ব দিই না। অথচ একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে একবেলা খাবার দেওয়া, পথ হারানো শিশুকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া, রাস্তায় আহত কাউকে হাসপাতালে নেওয়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা করা কিংবা প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো—এসবই মানবতার সর্বোচ্চ প্রকাশ। ইসলাম শেখায়, মানুষের উপকার করাই সর্বোত্তম আমলগুলোর একটি। যে সমাজে মানুষ মানুষকে ভালোবাসে, সেখানে অপরাধের স্থান সংকুচিত হয়ে আসে।
রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনে। যখন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন যে অন্যায়ের বিচার হবে এবং সৎ মানুষ মর্যাদা পাবে, তখন সমাজে নৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। ন্যায়বিচার কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য নয়; এটি সবার মৌলিক অধিকার। ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-দুর্বল—কাউকেই আলাদা মানদণ্ডে বিচার করা হতো না। এই নীতিই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষকে বদলানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় ভয় নয়; বরং নৈতিক জাগরণ। হৃদয়ে আল্লাহর ভয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার বিশ্বাস জাগ্রত হলে একজন মানুষ একা থাকলেও অন্যায় করতে সংকোচ বোধ করে। কারণ সে জানে, পৃথিবীর আদালতকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও আল্লাহর আদালতকে ফাঁকি দেওয়া যাবে না।
আজ আমাদের প্রয়োজন নতুন স্লোগান নয়; নতুন বিবেক। নতুন প্রতিশ্রুতি নয়; প্রতিশ্রুতি রক্ষার সাহস। নতুন নেতৃত্ব নয়; সৎ নেতৃত্ব। এমন একটি সমাজ, যেখানে ক্ষমতা হবে সেবার মাধ্যম, সম্পদ হবে আমানত, শিক্ষা হবে চরিত্র গঠনের আলো এবং ধর্ম হবে মানবতার সর্বোচ্চ প্রেরণা। তখন খুনের বদলে প্রাণ রক্ষার প্রতিযোগিতা হবে, ধর্ষণের বদলে নারীর মর্যাদা রক্ষার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, চাঁদাবাজির বদলে সহযোগিতার হাত প্রসারিত হবে, দুর্নীতির বদলে সততা সম্মানিত হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আমাদের প্রত্যেকের কাছে—আমি কি সত্যিই মানুষ? আমার কারণে কি কেউ নিরাপদ বোধ করে? আমার ভাষা কি কাউকে আঘাত করে, নাকি সান্ত্বনা দেয়? আমার উপার্জন কি হালাল? আমার ক্ষমতা কি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়? আমার কলম, আমার জ্ঞান, আমার প্রভাব—এসব কি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমরা কেবল মানুষের আকৃতি ধারণ করেছি, নাকি প্রকৃত অর্থেই মানুষ হয়েছি।
মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক শক্তিশালী সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছে অস্ত্রের অভাবে নয়, নৈতিকতার পতনের কারণে। আবার বহু দুর্বল জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তাদের সততা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শক্তিতে। তাই বাংলাদেশকে বদলাতে হলে প্রথমে বদলাতে হবে নিজেকে। নিজের ঘর, নিজের পরিবার, নিজের কর্মক্ষেত্র, নিজের বিবেককে শুদ্ধ করতে হবে।
আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করি, যেখানে মানুষের পরিচয় তার সম্পদ বা ক্ষমতা নয়, তার চরিত্র; যেখানে সফলতার মানদণ্ড হবে সততা; যেখানে ধর্মের পরিচয় হবে মানবসেবা; যেখানে দুর্বল মানুষের চোখের জল মুছে দেওয়াকে ইবাদত মনে করা হবে। কারণ মানুষ যখন মানুষ হয়ে ওঠে, তখন সমাজে শান্তি ফিরে আসে, রাষ্ট্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর রহমত নেমে আসে।
মানুষের মুখ নিয়ে বেঁচে থাকা সহজ; কিন্তু মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় ইবাদত, সবচেয়ে বড় সংগ্রাম এবং সবচেয়ে বড় সফলতা।

Comments
Post a Comment