নিশিপুরের নিশিডাক
দিব্যেন্দু ঘোষ
গ্রামের নাম নিশিপুর। নামটা শুনলেই যেন শিড়দাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে, যেখানে কালনাগিনী নদীটা মৃত সাপের মতো বাঁক নিয়েছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে মুখুজ্জেদের সেই পোড়ো ভিটে। এককালে প্রতাপ ছিল, কিন্তু এখন সেখানে শুধুই বুনো লতা আর প্রাচীন বটগাছের রাজত্ব। গ্রামের বুড়োরা বলে, ওটা নাকি অপদেবতাদের আস্তানা। দিনের বেলাতেও ওই চত্বরে ঘুঘুর ডাক শুনলে মনে হয় কোনও অশরীরী কাঁদছে। এই নিশিপুর গ্রামেরই তিন ইয়ার গদাই, ফটিক আর ন্যাপা। গদাই লম্বা-চওড়া, গায়ে অসুরের শক্তি, কিন্তু মাথায় গোবর। ফটিক বড্ড পেটুক, আর ন্যাপা হল দলের মগজ, যদিও সে বড্ড ভীতু। গদাই একদিন বুক ফুলিয়ে বলল,
-মুখুজ্জেদের ভিটেয় নাকি নিশি রাতে বুড়িদের নূপুর বাজে? সব বাজে কথা। আজ রাতেই আমরা ওখানে যাব। দেখব কার কত ক্ষমতা!
ফটিক একটা বড় শসায় কামড় দিয়ে থমকে গেল।
-আরে গদাই, ওখানে যারা গেছে, তারা কেউ আস্ত ফেরেনি। ওখানকার ভূতগুলো সব গেঁয়ো শাঁকচুন্নি আর ব্রহ্মদত্যি। ওসব শহুরে ভূত নয় যে ঘাড় মটকে ছেড়ে দেবে!
সেদিন ছিল ভাদ্র মাসের গুমোট অমাবস্যা। আকাশে চাঁদ নেই, যেন কেউ কালো আলকাতরা ঢেলে দিয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঝিঁঝিঁ পোকাদের ডাকও যেন হঠাৎ হঠাৎ থমকে যাচ্ছে। তিন বন্ধু মিলে একটা পুরনো লণ্ঠন আর হাতে একটা মস্ত লাঠি নিয়ে বেরোল। মুখুজ্জেদের ভিটেয় ঢোকার মুখে একটা মস্ত দিঘি। সবাই বলে অন্ধকূপ। দিঘির পাড়ে একটা পুরনো শ্যাওলা ধরা ঘাট। লণ্ঠনের আলোয় দেখা গেল, ঘাটের ওপর কে একজন বসে আছে। ধবধবে সাদা থান পরা, পিঠ পর্যন্ত ছড়ানো চুল। লণ্ঠনের আলো পড়তেই সেই মূর্তির মাথাটা ঝট করে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। কোনও মুখ নেই, শুধু গর্তের মতো দুটো চোখ থেকে টকটকে লাল আভা বেরোচ্ছে। ফটিকের হাতের লাঠি ঠকঠক করে কাঁপছে। ন্যাপা ফিসফিস করে বলল,
-গদাই, চল পালাই। ওটা মেছো ভূত নয়, ওটা নির্ঘাত কোনও অতৃপ্ত আত্মা।
কিন্তু গদাই জেদি। সে লাঠি উঁচিয়ে বলল,
-কে রে তুই? মানুষকে ভয় দেখাচ্ছিস?
পরমুহূর্তেই এক বিকট অট্টহাসি ভেসে এল চারপাশ থেকে। লণ্ঠনের আলোটা নীল হয়ে দপ করে নিভে গেল। অন্ধকারের মধ্যেই হঠাৎ দেখা গেল ভিটের একটা ভাঙা জানলার আড়ালে আগুনের মতো শিখা জ্বলছে। তিন বন্ধু সেদিকে এগিয়ে গেল। ঘরে ঢুকে দেখল, মাটির মেঝের এক কোণে একটা পেতলের হাঁড়ি উপুড় করা। সেই হাড়ির চারপাশ থেকে হিরের মতো জ্বলজ্বলে কিছু দানা ছড়িয়ে আছে। গদাই লোভে পড়ে হাঁড়িটা যেই সোজা করল, অমনি হাড় হিম করা ঠান্ডা হাওয়া তাদের ঘিরে ধরল। হাঁড়ির ভেতর একগুচ্ছ করোটি আর হাড়। সেই হাড়গুলো থেকে নীলচে আলো বেরোচ্ছে। হঠাৎ ন্যাপা খেয়াল করল, গদাইয়ের ছায়াটা দেওয়ালের গায়ে নেই। শুধু তাই নয়, গদাই কথা বলছে না। গদাইয়ের শরীরটা ধীরে ধীরে মাটির ওপর থেকে ওপরে উঠে যাচ্ছে। ন্যাপা লণ্ঠনটা জ্বালানোর চেষ্টা করতেই দেখল, গদাইয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘকায় কুচকুচে কালো মূর্তি, যার হাতগুলো মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে এসে গদাইকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। সেই মূর্তি গম্ভীর গলায় বলল,
-নিশিপুরের ভিটেয় যে একবার আসে, সে আর উচ্ছিষ্ট হতে ফেরে না, সে হয় আমাদের ভোজ।
ফটিক আর ন্যাপা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। প্রাণের ভয়ে তারা অন্ধকার জঙ্গল চিরে ছুটতে লাগল। পেছনে শুনতে পেল গদাইয়ের গলার শেষ চিৎকার, যা মুহূর্তের মধ্যে কর্কশ পশুর ডাকে বদলে গেল।
পরদিন সকালে নিশিপুর গ্রামের মানুষ দেখল মুখুজ্জেদের দিঘির পাড়ে গদাইয়ের জামাটা পড়ে আছে, কিন্তু গদাই উধাও। ফটিক আর ন্যাপা সেই থেকে আর কথা বলতে পারে না, তাদের চোখ দুটো যেন চিরকালের মতো আতঙ্কে জমে গেছে। আজও নিশিপুর গ্রামে বর্ষাকালে যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন মুখুজ্জেদের পোড়ো ভিটে থেকে নূপুরের আওয়াজ নয়, শোনা যায় মাটির নীচ থেকে কেউ একজন কর্কশ গলায় ডাকছে—
-ফটিক... ন্যাপা... আসবি না?
গ্রামের মানুষ জানে, ওটা নিশির ডাক। একবার সাড়া দিলেই সব শেষ। নিশিপুরের সেই অভিশপ্ত ভিটের রহস্য কেবল গদাইয়ের নিখোঁজ হওয়াতেই থমকে থাকেনি। সেই রাতের পর থেকে গ্রামের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। ফটিক আর ন্যাপা যখন গ্রামবাসীর কাছে সেই রাতের বর্ণনা দিচ্ছিল, তখন তাদের গলার স্বর ঠিক করে ফুটছিল না। গ্রামের বৃদ্ধ ওঝা রাঘব দাদু হ্যারিকেনের আলোয় ওদের চোখের মণি পরীক্ষা করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
-তোরা যা দেখেছিস, তা দেখার পর মানুষের জ্ঞান থাকে না। নিশিপুরের ওই ভিটেয় যারা যায়, তারা কেবল শরীরটা হারায় না, তাদের আত্মাকেও ওই ভিটের মাটির নীচে বন্ধক দিয়ে আসতে হয়।
সেদিন রাত থেকেই শুরু হল এক নতুন উৎপাত। ন্যাপা তার ঘরের জানলা বন্ধ করে শুয়ে ছিল। মাঝরাতে হঠাৎ তার কানে এল এক অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর। জানলার ওপার থেকে কেউ খোনা গলায় ডাকছে,
-ন্যাপা... ও ন্যাপা... জানলাটা খোল না ভাই। বড্ড ঠান্ডা লাগছে রে। ভিটের সেই হাঁড়িটার ভেতর বড় অন্ধকার।
ন্যাপার শিরদাঁড়া দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। ও তো গদাইয়ের গলা! কিন্তু মানুষের গলা কি এতটা খসখসে আর ভেজা হতে পারে? জানলার ওপার থেকে অদ্ভুত এক পচা মাংসের গন্ধ ঘরের ভেতর ঢুকে আসছে। ন্যাপা জানলা খুলল না ঠিকই, কিন্তু সকালে দেখা গেল, জানলার কাচের ওপর কাদা মাখা পাঁচটা আঙুলের ছাপ, আর প্রতিটা আঙুলের নখ যেন কেউ উপড়ে নিয়েছে।
গ্রামের আরও তিন-চারটে ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর রাঘব ওঝা ঠিক করলেন, এই পাপের শেষ করতেই হবে। তিনি ফটিক আর ন্যাপাকে নিয়ে আবার সেই ভিটের দিকে রওনা হলেন। সঙ্গে নিলেন মরণ-বাঁচন মন্ত্রপূত সর্ষে আর পুরনো লাল সুতো। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় চারপাশের বাঁশঝাড়গুলো এমনভাবে ঝুঁকে আসছিল, যেন জীবন্ত কোনও হাত তাদের জাপটে ধরতে চাইছে। ঘাটে পৌঁছতেই দেখা গেল, সেই দিঘির জল এখন আর কালো নেই, তা টকটকে রক্তের মতো লাল হয়ে গেছে। আর সেই লাল জলের ওপর ভেসে আছে গদাইয়ের হাতের সেই লাঠিটা, যা এখন লম্বায় প্রায় দশ ফুট। রাঘব ওঝা চিৎকার করে উঠলেন,
-ন্যাপা, ফটিক! কেউ চোখ মেলবি না! যা দেখবি সব মায়া। কেবল মন্ত্রের আওয়াজ শোন।
ওরা যখন ভিটের ভেতরে ঢুকল, তখন মেঝের সেই পেতলের হাঁড়িটা আর উপুড় করা নেই। ওটা এখন হাঁ করে বসে আছে রাক্ষসের মতো। আর অবাক করা বিষয় হল, ঘরের দেওয়ালে কোনও ইট নেই। দেওয়ালগুলো যেন জ্যান্ত মানুষের চামড়া দিয়ে তৈরি, যা ধুকপুক করছে! যেন গোটা বাড়িটাই একটা বিশাল দানবের শরীরের অংশ। হঠাৎ দেওয়ালের গা থেকে গদাইয়ের মুখটা বেরিয়ে এল। তার শরীরটা ওই দেওয়ালের সঙ্গে মিশে গেছে। তার চোখ দিয়ে রক্ত নয়, ঘন কালো আলকাতরার মতো কিছু গড়িয়ে পড়ছে। সে আর্তনাদ করে উঠল,
-ওঝা দাদু, আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাও! এখানে বড্ড খিদে! ওরা আমাকে কামড়াতে বলছে!
রাঘব ওঝা মন্ত্র পড়া শুরু করতেই ঘরটা কাঁপতে লাগল। হাঁড়ি থেকে বেরিয়ে এল হাজার হাজার বিষাক্ত বিছের মতো দেখতে ছায়ামূর্তি। সেগুলো ন্যাপা আর ফটিকের পা বেয়ে উঠতে শুরু করল। ওঝা দাদু তাঁর হাতের রক্ষাকবচ ছুড়ে দিতেই এক বিকট চিৎকার হল, মনে হল যেন আকাশ ফেটে পড়ছে। ঠিক তখনই ন্যাপা দেখল এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। রাঘব ওঝা যাকে তাড়ানোর চেষ্টা করছেন, সেই ছায়ামূর্তি আসলে ওঝার নিজেরই ছায়া! ওঝা দাদু যখনই মন্ত্র পড়ছেন, তাঁর ছায়াটা তত বেশি বড় হয়ে ঘরটাকে গিলে নিচ্ছে। আসলে রাঘব ওঝাই ছিলেন সেই কালান্তরের জাদুকর, যিনি পঁচিশ বছর আগে নিজের আয়ু বাড়ানোর জন্য এই ভিটেয় নরবলি শুরু করেছিলেন। গদাইকে তিনি নিজেই মন্ত্রবলে টেনে নিয়েছিলেন। ন্যাপা আর ফটিককে তিনি উদ্ধার করতে নয়, ওই বাড়ির খাদ্য হিসেবে সঙ্গে এনেছেন। ওঝা দাদু ক্রুর হাসি হাসলেন।
-ন্যাপা, ফটিক, তোরা কি ভেবেছিস এই পচা ভিটের কোনও ক্ষমতা আছে? ক্ষমতা সব এই মন্ত্রে। তোরা আজ গদাইয়ের পাশে জায়গা পাবি।
কিন্তু ওঝা দাদু একটা ভুল করেছিলেন। তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে অপশক্তিকে জাগিয়ে তোলা যায়, কিন্তু সবসময় তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। হঠাৎ মেঝের সেই উপুড় করা হাঁড়িটা ফেটে গেল। তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকশো বছর আগের সেই মুখুজ্জে বাড়ির কর্তার কঙ্কাল। সেই কঙ্কাল রাঘব ওঝাকে জাপটে ধরল। ওঝার মন্ত্র তখন আর কাজ করছে না। ঘরের দেওয়ালের সেই মাংসের আবরণ চিরে শত শত হাত বেরিয়ে এসে ওঝাকে টেনে নিল অন্ধকারের গহ্বরে। ওঝা দাদুর চিৎকার নিশিপুরের আকাশ কাঁপিয়ে মিলিয়ে গেল। ন্যাপা আর ফটিক কোনওমতে প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে এল। তারা যখন পেছনে ফিরে তাকাল, দেখল সেই বিশাল ভিটেটা মাটির নীচে বসে যাচ্ছে। নদীপারের সেই অশুভ বাতাস হঠাৎ থেমে গেছে।
পরদিন সকালে নিশিপুরের মানুষ দেখল, নদীর ধারের সেই জঙ্গল একদম সাফ হয়ে গেছে। কিন্তু ভিটের জায়গায় রয়ে গেছে এক প্রকাণ্ড গর্ত, যার তল দেখা যায় না। আজও অমাবস্যার রাতে গ্রামের মানুষ সেই গর্তের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পায়, মাটির গভীর থেকে গদাই আর রাঘব ওঝার গলা মিলেমিশে একাকার হয়ে ডাকছে,
-সর্ষে দিস না রে, আগুন দিস না, আমরা আসছি!
গ্রামের মানুষ এখন আর ওই পথে হ্যারিকেন নিয়েও যায় না। কারণ তারা জানে, আলো দেখলেই ছায়া পড়ে, আর সেই ছায়া যদি একবার ওই ভিটের গর্তে ঢুকে যায় তবে মানুষটা আর ফিরে আসে না। মানুষের লোভ আর কুসংস্কার যখন অশুভ শক্তির হাত ধরে, তখন প্রকৃতি নিজেই তার প্রতিশোধ নেয়। নিশিপুরের সেই নিশিডাক আজও আছে, শুধু রূপ বদলেছে।
নিশিপুরের সেই গর্তের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই ছিল মৃত্যুর পরোয়ানা হাতে নেওয়া। গদাই আর রাঘব ওঝার সেই মিলিত হাহাকার গ্রামবাসীর রক্ত হিম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আসল বিভীষিকা তখনও বাকি ছিল। নিশিপুরের মানুষ ভাবত ভিটেটা ধসে যাওয়া মানেই আপদ বিদেয় হওয়া, কিন্তু তারা জানত না শয়তান যখন মাটি খুঁড়ে নীচে যায়, তখন সে শিকড় ছড়াতে শুরু করে।
ভিটে ধসে যাওয়ার এক মাস পর। ন্যাপা আর ফটিক শহর পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু নিশিপুরের মাটি তাদের ছাড়ল না। ন্যাপার বাড়ির উঠোনে রাখা তুলসী মঞ্চটা হঠাৎ একদিন মাঝখান থেকে ফেটে গেল। আর সেই ফাটল দিয়ে বেরোতে লাগল তীব্র দুর্গন্ধ, ঠিক সেই পচা মাংসের গন্ধ, যা মুখুজ্জেদের ভিটেয় পাওয়া গিয়েছিল। ফটিক দেখল, তার খাবারের থালায় রাখা ভাতের গ্রাসগুলো হঠাৎ কালো পোকা হয়ে যাচ্ছে। সে রাতে ঘুমোনোর সময় অনুভব করল, তার খাটের নীচ থেকে কেউ একজন নখ দিয়ে তক্তা আঁচড়াচ্ছে। খসখসে গলায় কে যেন বলল,
-ফটিক, গদাইয়ের খুব খিদে পেয়েছে রে। ও তোকে ডাকছে।
ন্যাপা আর ফটিক বুঝল, পালিয়ে নিস্তার নেই। রাঘব ওঝা আর গদাই এখন এই গ্রামের মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া এক সংক্রামক অভিশাপ। ঠিক সেই সময় নিশিপুরে এক সন্ন্যাসীর আগমন ঘটল। জটাধারী সেই সন্ন্যাসী কালনাগিনী নদীর পাড়ে ধুনী জ্বালিয়ে বসলেন। তাঁর চোখে আগুনের আভা। তিনি গ্রামের মানুষদের ডেকে বললেন,
-তোরা যাকে ধ্বংস ভাবছিস, সে আসলে পুনর্জন্ম নিচ্ছে। মুখুজ্জেদের ভিটেটা ছিল এক যক্ষপুরী। রাঘব ওঝা সেই যক্ষকে জাগিয়ে দিয়েছে। এখন ওই যক্ষ গ্রামের প্রতিটা মানুষের ছায়া গ্রাস না করা পর্যন্ত থামবে না।
গ্রামবাসীরা ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। সন্ন্যাসী বললেন,
-একটাই উপায় আছে। কালনাগিনী নদীর মাঝখানে যে চরটা জেগেছে, সেখানে গিয়ে ওই হাঁড়িটার ভাঙা অংশটা বিসর্জন দিতে হবে। কিন্তু মনে রাখিস, চরে যাওয়ার সময় কেউ পেছনে ফিরবি না। পেছনে ফিরলেই তুই আর তুই থাকবি না।
ন্যাপা আর ফটিক ঠিক করল, এই অভিশাপের শেষ তারা করবেই। তাদের সামনে আর কোনও পথ নেই। অমাবস্যার মাঝরাতে ন্যাপা আর ফটিক একটা ডিঙি নৌকা নিয়ে নদীতে নামল। সঙ্গে সেই জটাধারী সন্ন্যাসী। নদীর জল আজ স্থির, কিন্তু আয়নার মতো পরিষ্কার। সেই জলে চাঁদের আলো নেই, অথচ নীচ থেকে এক বিচিত্র সবুজ আলো আভা দিচ্ছে। নৌকা যখন মাঝনদীতে, তখন জলের নীচ থেকে হাজার হাজার হাত উঠে এল। হাতগুলো নৌকার কিনারা ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল। ন্যাপা দেখল জলের নীচে সার সার মুখ, গ্রামের সেই সব মানুষ যারা গত দশ বছরে নিখোঁজ হয়েছে। তাদের মধ্যে গদাইও আছে। গদাইয়ের মুখটা জলের ওপর ভেসে উঠে বলল,
-ন্যাপা, নীচে আয় ভাই। এখানে কোনও রোদে পোড়া নেই, কোনও জরা নেই। শুধু আমরা আর আমাদের এই অনন্ত খিদে।
সন্ন্যাসী গর্জন করে উঠলেন,
-ন্যাপা, কান বন্ধ কর! পেছনে তাকাবি না!
নৌকা যখন সেই বালুচরে পৌঁছল, ন্যাপা দেখল চরের বালুগুলো সাদা নয়, ওগুলো আসলে গুঁড়ো করা হাড়। সন্ন্যাসী সেই হাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে হাসতে শুরু করলেন। সেই হাসি শুনে ন্যাপার মনে হল তার কান ফেটে যাবে। হঠাৎ সন্ন্যাসীর জটাগুলো খসে পড়ল। ন্যাপা চিৎকার করে উঠল,
-এ তো সন্ন্যাসী নয়! এ তো রাঘব ওঝার সেই অপচ্ছায়া, যা দহনের পরেও ফিরে এসেছে।
-ন্যাপা, ফটিক, তোরা কি ভেবেছিস আমি মরে গেছি? আমি তো এই কালনাগিনী নদীর সঙ্গে মিশে গেছি। তোদের এখানে নিয়ে এলাম কারণ যক্ষপুরীর সেই হাঁড়িটা পূর্ণ হতে আরও দুটো তাজা কলজে লাগবে।
রাঘব ওঝার সেই ছায়ামূর্তি এবার ন্যাপার দিকে হাত বাড়াল। ফটিক তখন ভয়ে অজ্ঞান হয়ে নৌকায় পড়ে আছে। ন্যাপা দেখল তার চারপাশ ঘিরে ধরেছে সেই সব ছায়া-মানুষরা। তারা সবাই ওঝার আজ্ঞাবহ দাস। ন্যাপা বুঝল, আজ আর ফেরার পথ নেই। সে তার ব্যাগ থেকে বের করল এক পুরনো হ্যারিকেন, যা সে সঙ্গে এনেছিল। সে জানত, এই হ্যারিকেনের ভেতর রাখা তেল সাধারণ কেরোসিন নয়, সেই ওঝার বাড়িতে পাওয়া মরণ-বাঁচন মন্ত্রপূত তেল। ন্যাপা চিৎকার করে বলল,
-ওঝা দাদু, আপনি বলেছিলেন না আমি ভীতুর ডিম? আজ দেখুন ভীতু মানুষ কী করতে পারে!
ন্যাপা হ্যারিকেনটা আছাড় দিয়ে ভাঙল বালুচরের সেই হাড়ের স্তূপের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠল। কিন্তু সেই আগুন লাল নয়, সেই আগুনের রং ছিল পবিত্র সাদা। আগুন ওঝার সেই অপচ্ছায়াকে গ্রাস করতে লাগল। ওঝার জ্যান্ত চামড়া আগুনের তাপে খসে পড়তে লাগল। কালনাগিনী নদীর সেই সবুজ আলো নিভে গিয়ে এক স্বর্গীয় জ্যোতিতে ভরে গেল চরটা। ন্যাপা দেখল গদাইয়ের আত্মা সেই আগুনের ভেতর থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। গদাই এখন আর দানব নয়, সে আবার সেই পুরনো বন্ধু।
পরদিন সকালে নিশিপুরের মানুষ দেখল নদীর চরে ন্যাপা আর ফটিক অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। রাঘব ওঝা বা মুখুজ্জেদের ভিটের কোনও চিহ্ন আর কোথাও নেই। এমনকি সেই গর্তটাও ভরাট হয়ে গেছে সাদা বালিতে। ন্যাপা আর ফটিক বেঁচে ফিরল ঠিকই, কিন্তু তাদের চুলে পাক ধরেছে। তারা এখন আর নিশিপুরে থাকে না, কিন্তু প্রতি বছর অমাবস্যার রাতে তারা কালনাগিনী নদীর পাড়ে এসে একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। গ্রামের মানুষ এখন আর নিশিডাক শোনে না। তবে আজও যখন ঝোড়ো হাওয়া বয়, তখন বাঁশঝাড়ের শব্দে কেউ কেউ শোনে এক ধীর কন্ঠস্বর,
-ভাল থাকিস ন্যাপা, ভাল থাকিস ফটিক।
অন্ধকারকে জয় করতে হলে নিজেকেও কখনও কখনও সেই অন্ধকারের আগুনে পুড়তে হয়। নিশিপুরের সেই রক্ত হিম করা কাহিনী এখন এক লোকগাথা।
নিশিপুরের সেই বালুচরে আগুনের লেলিহান শিখা যখন ওঝার অপচ্ছায়াকে গ্রাস করছিল, ন্যাপা ভেবেছিল সব শেষ। কিন্তু আগুনের ভেতর থেকে হঠাৎ এক অমানুষিক আর্তনাদ নয়, পরিচিত অট্টহাসি ভেসে আসে। ওঝার শরীরটা পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও তাঁর ছায়াটা আগুনের ওপর দাঁড়িয়ে রইল দীর্ঘকায় হয়ে। ন্যাপা দেখল আগুনের সাদা শিখা ওঝার ছায়াকে পোড়াতে পারছে না। ওঝা হাসলেন, তাঁর চোখ থেকে তখন আগুন ঝরছে।
-ন্যাপা রে, তোকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। অপশক্তি কখনও মরে না, সে শুধু ঘর বদলায়।
ন্যাপা থরথর করে কাঁপছে। সে দেখল ওঝার সেই বিশালাকার ছায়া হঠাৎ কুঁচকে ছোট হয়ে এল এবং তিরের মতো ছুটে গিয়ে নৌকায় অচৈতন্য হয়ে পড়ে থাকা ফটিকের শরীরের ভেতর ঢুকে গেল। ফটিকের শরীরটা এক ঝটকায় খাড়া হয়ে বসল। তার চোখ দুটো এখন আর মানুষের মতো নয়, একদম সাদা, মণিহীন। ফটিকের মুখ দিয়ে ওঝার গম্ভীর গলা বেরোল,
-কেমন বুঝলি ন্যাপা? ওঝা মরলেও এই ভিটের বংশধর তো বেঁচে রইল।
ন্যাপার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে চিৎকার করে উঠল,
-ফটিক! তুই ফিরে আয়! ওঝা তোকে ব্যবহার করছে!
ফটিক এক অদ্ভুত খোনা গলায় বলল,
-ফটিক তো অনেক আগেই মরে গেছে ন্যাপা। সেই প্রথম রাতে ভিটেয় যখন লণ্ঠন নিভেছিল, তখনই গদাই আর ফটিক দুজনেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি শুধু এতক্ষণ তোর ছায়ার লোভে ফটিকের শরীরটা নিয়ে অভিনয় করছিলাম। কারণ যক্ষপুরীর হাঁড়ি পূর্ণ করতে শুধু আত্মা নয়, একটা জ্যান্ত মানুষের স্বেচ্ছায় দেওয়া ভয় লাগে। তুই যত ভয় পাচ্ছিলি, হাঁড়িটা তত পূর্ণ হচ্ছিল।
ন্যাপা দেখল ফটিকের হাতগুলো অবিশ্বাস্যভাবে লম্বা হয়ে তার গলার দিকে এগিয়ে আসছে। ফটিকের নখগুলো কুচকুচে কালো। ন্যাপা বুঝতে পারল, সে যাকে বন্ধু ভেবে বাঁচাতে চেয়েছিল, সে আসলে গত এক মাস ধরে একটা জ্যান্ত লাশ বয়ে বেড়াচ্ছে। ন্যাপা শেষবারের মতো হ্যারিকেনের অবশিষ্টাংশ ফটিকের শরীরের দিকে ছুড়ে দিল। কিন্তু ফটিক সেই আগুন হাত দিয়ে খপ করে ধরে ফেলল। আগুন তার হাতে নিভে গেল এক মুহূর্তেই। ফটিকের মুখটা ন্যাপার কানের কাছে এল। এক ভ্যাপসা পচা গন্ধ ন্যাপার নাকে ঝাপটা দিল। ফটিক ফিসফিস করে বলল,
-ন্যাপা, তুই একা ফিরে যাবি? গদাই আর আমি তোকে ছাড়া ওপারে খুব একা রে, চল আমাদের সঙ্গে।
হঠাৎ নদীর জল তোলপাড় করে এক বিশাল হাত ন্যাপাকে জাপটে ধরল। ন্যাপা দেখল সেই হাতটা গদাইয়ের নয়, সেই হাতটা আসলে ন্যাপার নিজেরই ছায়া, যা মাটি থেকে আলাদা হয়ে তাকেই শ্বাসরোধ করছে।
পরদিন সকালে নিশিপুরের মানুষ দেখল কালনাগিনী নদীর চরে একটি ডিঙি নৌকা ভিড়েছে। নৌকায় কেউ নেই। শুধু নৌকার তক্তায় কাদা দিয়ে তিনটে নাম লেখা— গদাই, ফটিক, ন্যাপা। গ্রামের মানুষ এখন আর নদীর চরে যায় না। তবে অমাবস্যার রাতে যারা সাহসী হয়ে নদীর পাড়ে কান পাতে, তারা শুনতে পায় তিন বন্ধুর হাসাহাসি আর তাসের শব্দ। কিন্তু সেই হাসির মাঝে মাঝে ভেসে আসে এক করুণ আর্তি,
-কে যাবি রে আমাদের ভিটেয়? হ্যারিকেনটা নিয়ে আসিস, বড্ড অন্ধকার!
গ্রামের এক যুবক একদিন নদীর পাড়ে এক জোড়া চটি পড়ে থাকতে দেখল। চটিগুলো ন্যাপার। সে যেই চটিগুলো তুলতে গেল, দেখল তার নিজের ছায়াটা হঠাৎ তার থেকে আলাদা হয়ে জঙ্গলের দিকে দৌড়ে পালাচ্ছে। সে বুঝতে পারল না সে কি এখনও জ্যান্ত, নাকি সে-ও নিশিপুরের সেই অশরীরী ইতিহাসের নতুন পাতা হয়ে গেছে?
হ্যারিকেনটা এবার ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিন। আপনার ছায়াটা কি এখনও আপনার সঙ্গেই আছে? ভাল করে দেখুন তো দেওয়ালের দিকে........................................................

Comments
Post a Comment