ছেলে বেলার স্কুল জীবন
শিউলী ব্যানার্জী মুখার্জী
প্রত্যেকের
জীবনে তার শৈশবের প্রথম স্কুলটি এবং স্কুল জীবন সত্যি ই সুন্দর ও স্মৃতি
বহন কারি হয়ে থাকে। আমার স্কুল জীবনের এইরকমই দিনগুলি আজ স্মৃতিচারণ করছি
আমার এই কলমে। তখন আমার বয়স পাঁচ কি ছয় বছর। আমার বাবা পোস্ট অফিসে
সার্ভিস করতেন। সেই সূত্রে বাবার বদলি হলো ঝাঁটি পাহাড়িতে, এই নামটা
আপনারা টেনিদার গল্পে ও পেয়ে থাকবেন ঝাঁটিপাহাড়ি রেলস্টেশন। হ্যাঁ
সেই ঝাঁটি পাহাড়ি সেখানে বাবার বদলি হোলো কর্ম সূত্রে ঝাঁটিপাহাড়ি
পোস্ট অফিসে। সালটা ১৯৮৯ হবে। বাবা মা দিদি ভাই ও আমি ... আমরা বাবার
নেওয়া একটা ভাড়া বাড়িতে ঝাঁটিপাহাড়ি সিনেমা হলের পাশেই কুন্ডু কাকুর
একটা বাড়িতে থাকতাম। প্রথম দু চার দিন যাবার পর বাবার হাত ধরে দুই বোনে
ভর্তি হলাম প্রীতি কল্যান নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে। বিশাল স্কুলের গেট
ঠিক যেনো ফটকের মতো চোখে পড়লো । স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম
বিশাল স্কুল চত্বর।। প্রথমেই বিশাল দোতলা স্কুল বিল্ডিং টি হাইস্কুলের
মেয়েদের জন্য আর পাশেই আরো একটা বিল্ডিং সেটা প্রাথমিকের জন্য পঞ্চম
শ্রেণি পর্যন্ত। আমাকে সেখানেই ভর্তি করা হোলো প্রথম শ্রেণীতে। স্কুলে
ভর্তি হবার পর পেলাম অনেক নতুন বন্ধু। আমরা যেখানে থাকতাম সেখান থেকে স্কুল
প্রায় ৪০মিনিটের হাঁটা পথ তো হবেই।কারন স্কুল টি ছিলো বাস স্ট্যান্ড এর
কাছে আর আমরা থাকতাম সিনেমা হল এলাকার কাছাকাছি পরে অবশ্য পোস্ট অফিসের
কাছাকাছি একটা বাড়িতে থাকতাম। তবে সেই সময় সকলে হেঁটেই দলে দলে সব ছেলে
মেয়েরা আনন্দ করতে করতে স্কুলে যেত। আমাদেরও একটা দল ছিল তাই স্কুলে যেতে
কোন অসুবিধা হতো না। এবার আসি স্কুলের পরিবেশে । আমাদের প্রীতি কল্যাণ
নিম্ন বুনিয়াদি স্কুলটি ছিল এখনকার একটি আধুনিক স্কুলের সংস্করণ। যদি বলি
কেন কারন এখনকার সময়ে আমরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলকে যেমন আধুনিকতার
ছোঁয়ায় দেখি ঠিক সেরকমই ছিল আমাদের প্রীতি কল্যাণ নিম্ন বুনিয়াদি
স্কুলটি। দোতলা স্কুল বিল্ডিংটি নিচে ছিল ক্লাস ঘর। প্রতিটি ক্লাসরুমে
ছেলেমেয়েদের জন্য ছিল চেয়ার ও ডেক্সের ব্যবস্থা। প্রতিটি ক্লাসরুম
সুন্দর করে ডেকোরেশন করা। আলাদা আলাদা ক্লাস রুম আর সেকশেন ও আলাদা আলাদা ।
বিস্তর স্কুলের ফাঁকা জায়গা। চারিদিকে কাঁঠাল গাছ আর দেবদারু, ঝাউ গাছে
ঘেরা। সুন্দর করে সাজানো অফিস ঘর। আমাদের স্কুলে সাতজন দিদিমনিকে আমার মনে
আছে । তবে তার মধ্যে মিনতি দি, মমতাদি, কৃষ্ণা দিকে খুব মনে পড়ে। স্কুলের
উপরে বিল্ডিংগুলোতে দিদিমণিদের সুন্দর থাকার কোয়াটার্স ছিল। সেখানেই ওনারা
থাকতেন। আমাদের স্কুল শুরুর প্রথমে ই কাঁঠাল গাছে ঘেরা দেবদারু ঝাউ গাছে
ঘেরা জায়গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুন্দর পরিবেশে প্রার্থনা শুরু হতো। শুরুতে
ই সকলেই পায়ে সাদা মোজা কেডস জুতো ,নীল সাদা স্কুলের ড্রেসে সুসজ্জিত
হয়ে পরপর লাইনে দাঁড়িয়ে পড়তাম এরপর শুরু হোতো স্বাস্থ্য চর্চা, একটু
হালকা শরীর চর্চা তারপর বেদ মন্ত্র উচ্চারণ, তারপর প্রার্থনা সংগীত , পরে
হতো জাতীয় সংগীত। দিদিমনিরা লাল সাদা কাপড় পরে কি পরি পাটিতে আসতেন ।
কড়া শাসন, অনুশাসন নিয়ম শৃঙ্খলা আর ভালোবাসা সবই ছিল। তবে একবার স্কুলে
ঢুকে গেলে সেই সাড়ে চারটের পর স্কুল ছুটি হলে তবেই বের হতাম । স্কুলের
বিশাল গেট টি স্কুল শুরুর পরে বন্ধ করে দেওয়া হতো আর বাইরে যাওয়ার উপায়
ছিল না। স্কুল ছুটি হলে দারোয়ান গেট খুলতো। আমাদের স্কুলে ক্লাস গুলিতে
মনিটর ব্যবস্থা ছিলো । স্কুলে সব করানো হতো টিফিনের আগে চারটে ক্লাস ও
টিফিনের পর আরো দুটো কি তিনটে ক্লাস সঙ্গে ব্যায়াম, গান ,নাচ, আঁকা,
নাটক, হাতের কাজ সমস্ত কিছু শেখানো হতো।। তখন পড়াশোনার বাইরেও এক্সট্রা
ক্যালিকুলার একটিভিটি হিসাবে গান, কবিতা, নাচ, নাটক সেলাই বা হাতের নানা
জিনিস বানানোর কাজ নিতে পারত হ্যাঁ এটা প্রাইমারি লেবেল থেকেই ছিল।। আমাদের
স্কুলে মমতাদি আমাদের গান শেখাতেন ... মমতাদি হারমোনিয়ামে গাইছেন
..."একই সূত্রে বাঁধি আছি সহস্রটি মন... একই কার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন
... বন্দেমাতরম... ,"
আমরাও তার সুরে সুরে গলা মেলাচ্ছি
মনে পড়ে আজো সেই দিন.. ।।
সুন্দর
ভাবে তিনি আবৃত্তি ও শেখাতেন। প্রতিবছর ১৫ আগস্ট প্যারেড করানো হতো , আর
শিক্ষক দিবসে আমাদের স্কুলের বিস্তর মঞ্চে নাটক করানো হতো। অমল ও দই
ওয়ালা , কাবুলিওয়ালা অবাক জলপান ,মৃত্যুঞ্জয় ক্ষুদিরাম এই সব নাটকে
অভিনয় করানো হতো। কতবার নাটকে অংশগ্রহণ করেছি। আমার স্কুলে মনে পড়ে আমার
সেই চার বন্ধুকে সঞ্জয় ,সোনালী ,দেবস্মিতা আর বিশ্বজিৎকে। কারণ আমাদের
রোল নাম্বার গুলি পরপর ছিল এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত। এখন আমরা যেমন দেখি
স্কুলগুলিতে পার্কের ব্যবস্থা তখন আমার শৈশবের স্কুলটিতেও এরকম একটি
পার্কের ব্যবস্থা ছিল। পার্কে দোলনা ,শিশো, স্লিপার সমস্ত কিছু ছিল স্কুলের
টিফিনের সময় আমরা সকলে মিলে ওখানে বসতাম টিফিন খেতাম কি আনন্দই না করতাম।
আমার সেই ছোটবেলার বন্ধু বিশ্বজিৎকে খুব মনে পড়ে। ও খুব শান্ত স্বভাবের
ছিল আমরা যখন সবাই একসাথে টিফিন খেতাম বিশ্বজিৎ রোজ ভালো ভালো টিফিন আনতো
সেখান থেকে ভাগ করে আমাকে দিতো। কখনো পেস্তা বাদাম কখনো সন্দেশ । ভীষন ধনী
বাড়ির ছেলে ছিলো বিশ্বজিৎ। অনেক সময় বড় চারচাকা গাড়িতে করে ওর বাবা
স্কুলে দিয়ে যেতো বিশ্বজিত কে। কিন্তু স্কুলে সবাই সমান। স্কুলে যখন
শিক্ষক দিবস হতো কত যে অনুষ্ঠান হতো কি বলবো। মমতা দি টিফিন টাইমে দোতলায়
ওনার ঘরে ডাকতেন হার মোনিয়াম টি বার করে কত গানের চর্চা করাতেন। মমতাদির
ছেলে মেয়ে ছিলো না তাই ছাত্র ছাত্রীদের খুব ভালোবাসতেন আমাকে মনে হয় একটু
বেশি ভালোবাসতেন কারন ওনার সাথে গান গুলো সুন্দর করে করতাম। মমতাদি ডান
হাতে ঘড়ি পরতেন। ভীষন স্টাইলিশ ছিলেন .. তেমনি সুন্দর ছিলো গানের গলা।
মমতাদির বর সব সময় সাদা পাঞ্জাবি পরতেন উনি স্কুলের ছেলেমেয়েদের খুব
ভালো বাসতেন , আমাদের জন্য চকলেট বিস্কুট সব এনে রাখতেন আর টিফিন টাইমে
দোতলায় গান চর্চা করতে গেলে সবাই কে দিতেন। আমাদের স্কুলের চত্বরে
অনেক ফলের গাছ ছিল বড় বড় নারকেল কুলের গাছ, নারকেল গাছ, কাঁঠাল গাছ,
পেঁপে গাছ ..কত রকম যে ফুলের গাছ কি বলব। পরিবেশটি দেখলেই একটা সুন্দর
অনুভূতি হত পড়াশোনার পাশাপাশি এই গাছ গুলো যেন আমাদের মনের সাথে জুড়ে
গিয়েছিলো। নিয়ম শৃঙ্খলা পড়াশোনা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সবই ছিল আমাদের
প্রীতি কল্যাণ নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়ে।
ধীরে ধীরে
শৈশব থেকে মনের মধ্যে ঢুকে ছিল কিভাবে পড়াশোনার পাশাপাশি গান ,কবিতা,
নাটক, হাতের কাজ সব কিছুকে ভালোবাসা যায়। দিদিমণিদের দেখতাম আর মনে হতো
দিদিমণি হলে হয়তো এরকমই হতে হয় । হেড দিদিমণি মিনতিদির যেমন শাসন ছিল
সেরকম সকল ছাত্র-ছাত্রীদের খুব ভালবাসতেন। ছোটবেলা থেকে শান্ত স্বভাবের এবং
পড়াশোনায় প্রতি মনোযোগী ছিলাম বলে বরাবরই আমি আমার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের
কাছে খুব ভালোবাসা পেতাম। মনে পড়ে যায় যখন স্কুলে একসাথে দল বেঁধে হেঁটে
হেঁটে যেতাম অনেক বন্ধু-বান্ধব সঙ্গে থাকতো তার মধ্যে বিশ্বজিৎ ছিল আমার
প্রিয় বন্ধু ,কারণ ক্লাসের মধ্যে অনেকে বদমাশি দুষ্টুমি করলেও আমি কখনো
সেসব করতাম না। তাই আমার মত শান্ত স্বভাবের বন্ধুরাই আমার সঙ্গে মিশতো।
বিশ্বজিতের একটি সুন্দর নীল রঙের ছোট্ট সাইকেল ছিল মাঝে মাঝে আমাকে সেটার
পিছনের সিটে বসিয়ে স্কুলে নিয়ে যেতো। আবার ছুটির পর ফেরার সময় সকলে দল
বেঁধে ফিরতাম। কি আনন্দ হোতো । প্রতিবছর রেজাল্ট ভালো করতাম তাই দিদিমনিরাও
খুব ভালোবাসতো। আজ থেকে ৩২ ... ৩৩ বছর আগে ফেলে আসা সেই শৈশবের স্কুলটিকে
আজো মনে পড়ে। একটি আধুনিক মডেল স্কুল। মনে পড়ে যায় মমতা দি তৃতীয়
শ্রেণিতে একবার আমার নাক ফুটিয়ে দিয়ে ছিলো সূচ সূতো করে যাতে আমি নাকের
পরতে পারি। হ্যাঁ পাঁচ.. পাঁচ টি বছর কেটে ছিলো ঝাঁটিপাহাড়ি প্রীতিকল্যান
নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির অর্ধেক
জীবন। তারপর বাবা আবার বদলি হয়ে গেলো আমার হাইস্কুল পরিবর্তন হোল। তবে
আমার ফেলে আসা শৈশবের স্কুল জীবন, দিদিমণিরা ,বন্ধুরা সব আজ কোথায় হারিয়ে
গেছে হয়তো স্মৃতি থেকে অনেকের হারিয়ে গেছে সে সব দিন , মিনতি দি, কৃষ্ণা
দি, মমতাদি ওনারাও নেই হয়তো আজ সব পরিবর্তন হয়ে গেছে কালের নিয়মে।
কিন্তু সেই দোতালার স্কুল বিল্ডিং সেই ঝাউ গাছ সেই কাঁঠাল গাছের সারি
আমাদের প্রার্থনা ,বেদ মন্ত্র উচ্চারণ , স্কুলের পার্কের দোলনায় দোল
খাওয়া, একসাথে টিফিন খাওয়া ,নাটকে অংশগ্রহণ করা, স্কুলের খেলাধুলায়
অংশগ্রহণ করা, প্রাইজ পাওয়া ,আর ফেলে আসা বন্ধুদের কথা এখনো মনে আছে খুব
যত্নে ভালোবাসায়।
শৈশবের স্কুল জীবন যা আমাদের জীবনের একটি সুন্দর অধ্যায় হয়ে থেকে যায় হয়তো সবার জীবনে।

Comments
Post a Comment