মেঘের সাথে খেলা
মাসুদ রানা
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। প্রতিটি ঋতুরই রয়েছে নিজস্ব রূপ, সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য। তবে আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসের বর্ষাকাল যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব উৎসব। চারদিকে সবুজে মোড়ানো মাঠ, নদী-নালা, খাল-বিল, গাছপালা আর কালো-সাদা মেঘের আনাগোনায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। কখনো কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যায়, আবার কখনো সাদা তুলোর মতো মেঘ নীল আকাশে ভেসে বেড়ায়। সেই দৃশ্য দেখলেই আজও আমার শৈশবের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে মেঘের সঙ্গে খেলার সেই আনন্দময় সময়, যা আজও হৃদয়ের গভীরে অমলিন হয়ে আছে।
আমাদের ছোট্ট গ্রামটি ছিল সবুজে ঘেরা। চারদিকে ধানের ক্ষেত, পাটের জমি, বাঁশঝাড়, কাঁঠাল গাছ, আমগাছ, জামগাছ, শিশুগাছ আর নারকেল গাছের সারি। বর্ষাকাল এলেই গ্রামের রূপ যেন একেবারে বদলে যেত। মাঠঘাট পানিতে ভরে যেত, খাল-বিলে টইটম্বুর পানি, নদীতে স্রোতের শব্দ, আর আকাশজুড়ে মেঘের বিশাল রাজত্ব। সকালবেলা সূর্যের আলো ফুটলেও হঠাৎ করেই কালো মেঘ এসে আকাশ ঢেকে ফেলত। তারপর শুরু হতো ঝুম বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির শব্দ, টিনের চালের টুপটাপ আওয়াজ, বাতাসের শীতল স্পর্শ—সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির এক অনন্য সঙ্গীত।
তখন আমার বয়স আট থেকে দশ বছরের মধ্যে। আমি পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। বর্ষাকাল এলেই বই-খাতা গুছিয়ে রেখে আমরা ছুটে যেতাম মাঠে। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিল না, কম্পিউটার গেম ছিল না। আমাদের আনন্দ ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, নদীতে সাঁতার কাটা, বৃষ্টিতে ভেজা আর মেঘের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখা—এসবই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ।
বর্ষার দিনে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতাম ঘুড়ি উড়াতে। নিজের হাতে কাগজ কেটে, বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘুড়ি বানাতাম। কখনো রঙিন কাগজের ঘুড়ি, কখনো পলিথিনের ঘুড়ি। অনেক সময় নিজেরাই সুতা মাঞ্জা দিতাম। তারপর গ্রামের খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি উড়াতাম। নীল আকাশে যখন সাদা মেঘ ভেসে বেড়াত, তখন মনে হতো আমাদের ঘুড়িটিও যেন মেঘের সঙ্গে খেলছে। বাতাসে দুলতে দুলতে ঘুড়ি অনেক ওপরে উঠে যেত। আমরা চিৎকার করে আনন্দ করতাম। কখনো মনে হতো ঘুড়ি যেন মেঘ ছুঁয়ে ফেলেছে। সেই মুহূর্তে মনে হতো, আমরাও যেন মেঘের রাজ্যে পৌঁছে গেছি।
বৃষ্টির আগে যখন হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করত, তখন আমরা বুঝে যেতাম বৃষ্টি নামবে। সেই বাতাসে ঘুড়ি আরও সুন্দরভাবে উড়ত। বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘুড়ি যখন আকাশে নেচে বেড়াত, তখন মনে হতো প্রকৃতি নিজেই আমাদের সঙ্গে খেলছে। মেঘ, বাতাস আর ঘুড়ির এই মিলন ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর আনন্দ।
বৃষ্টি শুরু হলে আমরা কখনো ঘরে ফিরে যেতাম না। বরং আরও বেশি আনন্দে ভিজতাম। কাদামাটির মাঠে দৌড়ে বেড়াতাম। পা পিছলে পড়ে যেতাম, আবার হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াতাম। জামাকাপড় কাদায় মাখামাখি হয়ে যেত, কিন্তু তাতে আমাদের কোনো চিন্তা ছিল না। মায়েরা বকাবকি করলেও পরদিন আবার একই কাজ করতাম।
বর্ষাকালে গ্রামের ছেলেদের সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল হাডুডু। বৃষ্টিতে ভেজা কাদামাটির মাঠে এই খেলার আনন্দ ছিল অন্যরকম। সবাই কাদা মেখে একে অপরকে ধরার চেষ্টা করত। কেউ পিছলে পড়ে গেলে সবাই হেসে উঠত। কাদা, বৃষ্টি আর হাসির মিলনে মাঠ মুখর হয়ে উঠত। সেই আনন্দ আজকের আধুনিক খেলাধুলায় খুঁজে পাওয়া যায় না।
বর্ষার সময় আমরা খাল-বিল আর পুকুরে সাঁতার কাটতাম। পানিতে ডুব দিয়ে কে কত দূর যেতে পারে, কে আগে ওপারে পৌঁছাবে—এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা চলত। অনেক সময় বড় বড় গাছের ডাল থেকে লাফ দিয়ে পানিতে পড়তাম। কাঁঠাল গাছ, জামগাছ কিংবা আমগাছের ডাল ধরে উঠে তারপর সোজা পানিতে ঝাঁপ দিতাম। পানির ছিটায় চারপাশ ভরে যেত। আজ ভাবলে মনে হয়, কত সাহস ছিল তখন! কিন্তু সেই সাহসের মধ্যেও ছিল নির্মল আনন্দ।
পুকুরের পাড়ে বৃষ্টির মধ্যে আমরা পিছলে নামার খেলাও খেলতাম। ঘাসে ভেজা ঢালু পাড় দিয়ে দৌড়ে এসে পিছলে পানির দিকে নেমে যেতাম। কেউ হাসত, কেউ পড়ে যেত, কেউ আবার উঠে আবার একই কাজ করত। সেই ছোট্ট খেলাগুলোই আমাদের কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিনোদন।
বর্ষাকালে খাল-বিলে পাতিহাঁসের দল ভেসে বেড়াত। ছোট ছোট হাঁসের ছানাগুলো পানিতে সাঁতার কাটত। আমরা দাঁড়িয়ে সেগুলো দেখতাম। মাঝে মাঝে ছোট মাছ লাফিয়ে উঠত। পানিতে শাপলা ফুটত। দূরে ব্যাঙ ডাকত। ফড়িং উড়ে বেড়াত। প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্য আমাদের মন ভরে দিত।
বৃষ্টি থেমে গেলে আকাশে রংধনু উঠত। আমরা সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে দেখতাম। মনে হতো আকাশে যেন সাত রঙের একটি সেতু তৈরি হয়েছে। সেই রংধনু আর ভেসে চলা মেঘ আমাদের কল্পনাকে আরও ডানা মেলতে শিখিয়েছিল।
সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরে ভেজা কাপড় বদলে গরম ভাত খেতাম। মা অনেক বকাবকি করতেন, কিন্তু তাঁর চোখে ছিল ভালোবাসা। বাবা বলতেন, "বেশি ভিজিস না, ঠান্ডা লাগবে।" তবুও পরদিন আবার আমরা বৃষ্টিতে নেমে পড়তাম। কারণ শৈশবের আনন্দ কোনো বাধা মানত না।
আজ সময় বদলে গেছে। গ্রামের সেই মাঠের অনেক জায়গায় বাড়িঘর হয়েছে। অনেক খাল-বিল ভরাট হয়ে গেছে। শিশুরা এখন মোবাইল ফোন, টেলিভিশন আর ভিডিও গেম নিয়ে ব্যস্ত। খোলা মাঠে ঘুড়ি উড়ানো, কাদামাটিতে হাডুডু খেলা কিংবা গাছ থেকে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়ার দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। প্রকৃতির সঙ্গে শিশুদের সেই গভীর বন্ধনও যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
তবু বর্ষার আকাশে যখন কালো মেঘ ভেসে আসে, কিংবা সাদা মেঘ নীল আকাশে উড়ে বেড়ায়, তখন আমার মন আবার ফিরে যায় সেই ছোট্ট গ্রামে। মনে হয়, আবার যদি বন্ধুদের নিয়ে মাঠে যেতে পারতাম! আবার যদি নিজের হাতে কাগজের ঘুড়ি বানিয়ে মেঘের সঙ্গে উড়িয়ে দিতে পারতাম! আবার যদি বৃষ্টিতে ভিজে কাদামাটির মাঠে হাডুডু খেলতে পারতাম! আবার যদি সেই গাছের ডাল থেকে পুকুরে ঝাঁপ দিতে পারতাম!
মেঘের সঙ্গে খেলা শুধু একটি খেলা ছিল না; এটি ছিল আমাদের কল্পনার ডানা, আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর বন্ধনের একটি সুন্দর স্মৃতি। মেঘের দিকে তাকিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতে শিখেছি। বাতাসের সঙ্গে লড়াই করে ঘুড়ি উড়িয়ে আমরা সাহস পেয়েছি। বৃষ্টিতে ভিজে আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখেছি।
আজও বর্ষার প্রথম মেঘ দেখলে হৃদয়ের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগে ওঠে। মনে হয়, শৈশব কোথাও হারিয়ে যায়নি। সে এখনও মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে। শুধু সময়ের দূরত্ব তাকে চোখের আড়াল করেছে। কিন্তু স্মৃতির আকাশে সেই মেঘ, সেই ঘুড়ি, সেই বৃষ্টি আর সেই গ্রামের মাঠ আজও আগের মতোই ভেসে বেড়ায়।
জীবনের যত ব্যস্ততাই আসুক, মেঘের সঙ্গে খেলা করা সেই দিনগুলো কখনো ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ শৈশবের সেই বর্ষা, সেই মেঘ, সেই কাদামাটি, সেই ঘুড়ি আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের জীবনের সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে আনন্দময় এবং সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।
----------------------
মাসুদ রানা, ইরাক প্রবাসী।

Comments
Post a Comment