আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা
ও গোলামির
ভয়ংকর ফাঁদ…
আবদুল্লাহ
আল আদীব
ক্ষমতা ও শোষণের ঐতিহাসিক বিবর্তন: প্রস্তরযুগ থেকে জ্ঞাননিয়ন্ত্রণের যুগ…
মানবসভ্যতার
ইতিহাসকে যদি একটিমাত্র প্রশ্ন দিয়ে পড়া যায়, তবে সেই প্রশ্নটি হতে পারে—ক্ষমতা কার হাতে এবং সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে?
কৃষির আবির্ভাবের আগে মানুষের জীবন ছিল মূলত শিকার, সংগ্রহ ও পারস্পরিক সহযোগিতানির্ভর। কৃষির বিকাশের সঙ্গে জমি, উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও সম্পত্তির ধারণা তৈরি হলো। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নিল সামাজিক শ্রেণিবিভাগ, করব্যবস্থা, শ্রমের বিভাজন এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব। ক্ষমতা আর কেবল শারীরিক শক্তির বিষয় রইল না; তা হয়ে উঠল সম্পদ ও মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা।
প্রাচীন মিশর, সুমের, ব্যাবিলন, পারস্য, গ্রিস ও রোম—বিভিন্ন সভ্যতা তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। সাম্রাজ্যের
বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ, দখল, কর ও শ্রমের নিয়ন্ত্রণ। বিজিত জনগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা তাই মানব ইতিহাসের একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
মধ্যযুগে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হলো ধর্মীয় বৈধতা। ইউরোপে রাজতন্ত্র ও চার্চের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, ক্রুসেড, ইনকুইজিশন ও ধর্মীয় নিপীড়নের ইতিহাস দেখায়—ক্ষমতা শুধু অস্ত্র দিয়ে টিকে থাকে না; মানুষের বিশ্বাস ও চিন্তার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাও তার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। অবশ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান একই সময়ে শিক্ষা ও জ্ঞান সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রেখেছে।
রেনেসাঁ, রিফরমেশন ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লব মানুষের চিন্তার জগতে বড় পরিবর্তন আনে। যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান পুরোনো কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করতে শুরু করে। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন মানুষের মুক্তির শক্তি হয়েছে, তেমনি পরবর্তী সময়ে সামরিক শক্তি, বাণিজ্য ও সাম্রাজ্য বিস্তারেরও শক্তিশালী হাতিয়ার হয়েছে। নতুন করে জ্ঞানের বিদ্রোহকে আবার দখলে নেওয়া হলো।
এরপর আসে উপনিবেশবাদের
যুগ। ইউরোপীয় শক্তিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সম্পদ আহরণের পাশাপাশি প্রশাসন, ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যমেও উপনিবেশিত সমাজকে নতুন কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। ফলে শাসনের পুরোনো অস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন অস্ত্র—জ্ঞান ও প্রতিষ্ঠান।
শিল্পবিপ্লব
ক্ষমতার চরিত্রকে আরও বদলে দেয়। জমির পরিবর্তে কারখানা ও পুঁজি অর্থনৈতিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। বিপুলসংখ্যক
মানুষ মজুরিভিত্তিক
শ্রমে যুক্ত হয়। একই সময়ে গণশিক্ষার বিস্তার ঘটে এবং স্কুল হয়ে ওঠে আধুনিক রাষ্ট্র ও শিল্পসমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সময়ানুবর্তিতা, নির্ধারিত পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা, শৃঙ্খলা ও দক্ষতা—সবকিছুই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।
এখানেই শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ
দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। শিক্ষা কি মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায়, নাকি তাকে বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার উপযোগী করে তোলে?
বিশ্বযুদ্ধের
যুগে ক্ষমতার লড়াই আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ ও সামরিক প্রতিযোগিতার সংঘাতে দুটি বিশ্বযুদ্ধ কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও পৃথিবী দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র
ও সোভিয়েত ইউনিয়নকেন্দ্রিক দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবেশ করে। কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের মতো সংঘাত দেখিয়ে দেয়—ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অনেক সময় সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডেও সংঘটিত হতে পারে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বব্যবস্থায়
যুক্তরাষ্ট্রের
প্রভাব বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে বিশ্বায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বহুজাতিক কর্পোরেশন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাবও বাড়তে থাকে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে ক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে তথ্য। বিগ ডেটা, অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তি মানুষের আচরণ সম্পর্কে অভূতপূর্ব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করেছে।
অর্থাৎ ক্ষমতার হাতিয়ারও সময়ের সঙ্গে বদলেছে—ভূমি থেকে অস্ত্র, অস্ত্র থেকে পুঁজি, পুঁজি থেকে প্রতিষ্ঠান, আর প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য ও জ্ঞান।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের পর শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ফিরে তাকালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে। শিক্ষা কি কেবল জ্ঞান অর্জনের স্বাধীন পথ, নাকি রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সমাজের বিদ্যমান কাঠামোও এর মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ তৈরি করে?
আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ফল, সার্টিফিকেট, চাকরি, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতা
এত গুরুত্বপূর্ণ
হয়ে উঠেছে যে অনেক সময় শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য—প্রশ্ন করা, যুক্তি করা, সৃজনশীল হওয়া এবং স্বাধীনভাবে
চিন্তা করা—পেছনে পড়ে যায়। একটি ঘণ্টা বাজে। সব শিশু একসঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। একসঙ্গে বসে। একসঙ্গে উত্তর দেয়। একটি প্রশ্নের একটি সঠিক উত্তর থাকে। ধীরে ধীরে শিশুটি ভুলে যায়— প্রশ্নেরও নিজস্ব স্বাধীনতা আছে। তাকে শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়; কিন্তু কে তাকে শেখাবে
কীভাবে নিজের জীবনের প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়? তাকে শেখানো হয় চাকরি পেতে, কিন্তু কে তাকে শেখাবে কাজের অর্থ কী? তাকে শেখানো হয় সফল হতে, কিন্তু কে তাকে জিজ্ঞেস করবেÑ তুমি যে সাফল্য চাও, সেটা কি সত্যিই তোমার?
শিক্ষাব্যবস্থায় ক্ষমতা ও গণতন্ত্রের দ্বন্দ্ব…
শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, সৃজনশীলতা, কৌতূহল ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু বাস্তব সমাজে শিক্ষা কখনোই সম্পূর্ণ ক্ষমতানিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক শক্তি, অর্থনৈতিক শ্রেণি ও সামাজিক কাঠামোর প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—শিক্ষা কি কেবল মানুষকে মুক্ত চিন্তার অধিকারী করে, নাকি বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোর উপযোগী করেও গড়ে তোলে?
প্রথমত, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী অনেক সময় শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিজেদের আদর্শ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তারা চায় শিক্ষার্থীরা
তাদের মতাদর্শ মেনে চলুক, প্রশ্ন না করুক, শুধু শেখানো বিষয় গ্রহণ করুক। পাঠ্যক্রম, ইতিহাসের উপস্থাপন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ কিংবা ছাত্ররাজনীতি— বিভিন্ন ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব প্রবেশ করে। এর ফলে শিক্ষার্থীর নিজস্ব মত গঠন ও ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা সংকুচিত হয়ে যায়। অথচ গণতান্ত্রিক
শিক্ষার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত— প্রশ্ন করার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতকে সহ্য করার সক্ষমতা।
দ্বিতীয়ত, রয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব। শিল্পায়ন ও আধুনিক অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল শ্রমবাজারের
চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তখন শিক্ষার্থী একজন স্বাধীন চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় একটি দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। মার্ক্সীয় বিশ্লেষণে এই সম্পর্ককে বুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের দ্বন্দ্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিক্ষাব্যবস্থার একটি অনিবার্য বাস্তবতা। রাষ্ট্রই সাধারণত শিক্ষার আইন, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বড় অংশ নির্ধারণ করে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছাড়া বৃহৎ পরিসরে শিক্ষাব্যবস্থা
পরিচালনা করাও কঠিন। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ যদি অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয় এবং শিক্ষার্থীর স্বাধীন অনুসন্ধান, সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার জায়গা সংকুচিত করে, তাহলে শিক্ষা তার মানবিক উদ্দেশ্য হারাতে পারে।
চতুর্থত, শিক্ষায় শ্রেণিবৈষম্য
গণতান্ত্রিক
শিক্ষার অন্যতম বড় বাধা। একই সমাজে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান উন্নত শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে পারে; অন্যদিকে দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান অনেক সময় মৌলিক শিক্ষার সুযোগই সীমিতভাবে পায়। ফলে শিক্ষা সামাজিক বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে কখনো কখনো বিদ্যমান বৈষম্যকে পুনরুৎপাদনও
করে। এই বৈষম্য কেবল শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের চিন্তা, স্বাধীনতা ও সমালোচনামূলক দক্ষতাকেও প্রভাবিত করে। রাস্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা শিক্ষাব্যবস্থা
প্রায়শই ক্ষমতাসীন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়, এবং সাধারণ মানুষের ক্ষমতা অর্জনের পথ বন্ধ করে দেয়।
হাজার বছরের পুরনো শ্রেণিভেদের কাঠামো ও মানবসভ্যতার অভ্যস্ততা…
আমরা কি জানি এই পৃথিবীতে মানুষের বাস ২ লক্ষ বছরেরও বেশি সময় ধরে, কিন্তু এই মানবসভ্যতার ইতিহাস আমরা জানি আজ থেকে দশ হাজার বছর আগের ইতিহাস পর্যন্ত, যেটাকে লভ্যপ্রস্তরযুগ বলা হয়। মানুষ গুহার জীবন থেকে বেরিয়ে আসে এবং কৃষি কাজ করতে শেখে। এরপর মানুষ তৈরি করে সভ্যতা, রাষ্ট্র, আইন- একই সাথে তৈরি করে দ্বন্দ্ব, আধিপত্য ও ভোগদখল। মানুষ তার খাদ্যের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শেখে এবং তার সংরক্ষণও তারা শিখে যায়। আর একই সাথে তৈরি হয় মানুষের দুইটি শ্রেণী-
১) একটা শ্রেণি কেবলই কাজ করে যাবে,
২) আরেকটা শ্রেণি যারা কেবলই ভোগ করবে।
আর সেই সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত যা আজও পৃথিবীতে বিদ্যমান। একটা মালিক আরেকটা দাস, একটা শাসক আরেকটা শাসিত।
আমরা কি জানি? কিছুদিন আগেও দাসত্ব আইনগতভাবে বৈধ ছিলো এবং কেউ যদি এই দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে চাইতো তবে এটাকে রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আর এই রোগের নাম ছিলো "Drapetomania"।
১৮৫১ সালে
মার্কিন চিকিৎসক "Samual A. Cartwright" বলেন- একজন দাস "Drapetomania" নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে, সে তার প্রভুর দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আশ্চর্যের বিষয় হলো তিনি এ রোগের ঔষধও বাতলে দেন। কি ছিলো এই রোগের ঔষধ? এই রোগের ঔষধ হলো দাসকে চরমভাবে প্রহার করা, তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া, যেন সে সবসময় তার প্রভুর আজ্ঞাবহ থাকে।
প্রায় সকল ইতিহাসবিদ, ও দার্শনিক বলেন- মানবসভ্যতার ইতিহাস আসলে পুরোটাই একটিমাত্র অভ্যস্ততার ইতিহাস। আর সেই অভ্যস্ততা হলো ক্ষমতা ও শোষণ। মানবসভ্যতা সবসময় বিপরীত দুটি মেরুতে বিভক্ত থাকে। পৃথিবীতে বিপ্লব হয় ক্ষমতার রদবদল করানোর জন্য, কিন্তু বরাবরই টিকে থাকে হাজার বছরের গড়া বিভাজন ও দাসত্বের কাঠামো। তবে আমরা কেউ-ই সেই কাঠামো ভেঙে, সেই অভ্যস্ততা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না। হাজার বছর ধরে চলমান শ্রেণিবিভাজনের এই অভ্যস্ততা থেকে যে-ই বেরিয়ে
আসতে চাই- আমরা তাকে পাগল বলি। আমরা আমাদের অভ্যস্ততার বাইরের কিছুকে স্বীকার করতে পারি না, এবং তার থেকে বেরিয়ে আসারও চেষ্টা করি না। তবে কিছু কিছু ব্যতিক্রম ঘটনা আছে। তেমনই একটা ঘটনা হল রুশবিপ্লব বা অনেকে তাকে রাশিয়ার অক্টোবরবিপ্লব বলেও জানেন।
সেই হাজার
বছরের ক্ষমতা-শোষণ ও দাসত্বের আধুনিক ও চূড়ান্ত সংস্করণ গণতন্ত্র নামক পুঁজিবাদী দাসতন্ত্র যখন পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করছে, শোষণের নতুন ধারা হচ্ছে পুঁজিপতি বুর্জোয়া বনাম প্রলেতারিয়েত শ্রমিকশ্রেণি, পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছে দন্দ্ব, সংঘর্ষ ও দলে-দলে সংঘাত, সব জায়গায় বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভাজন ও শোষণের অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়ে যাচ্ছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে-
তখন কার্ল
মার্ক্স তৈরি করেন সমতার এক নতুন অ্যালগরিদম। তারই ভাবনায় অনুপ্রাণিত হয়ে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই দশ হাজার বছরের শোষিত নিঃস্ব সম্প্রদায় দেখলো দিগন্তের বুকে নতুন সূর্য। কিন্তু তাকেও মানবসভ্যতার অভ্যস্ততার কাছে একসময় হেরে যেতে হয়। আর আমরা আঁটকা পড়ি একটি নিখুঁত গভীর ষড়যন্ত্রে, দাসত্বের আধুনিক সংস্করণে- যার নাম শিক্ষাব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের গলায় লাগানো পৃথিবীর ক্ষমতাসীনদের দাসত্বের অদৃশ্য শিকল!!
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, নাকি মৃত্যুদণ্ড?...
ছোট বেলা
থেকে আমরা জেনে এসেছি শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আসলেই কি তাই? সত্যি কথা হলো বর্তমান সময়ের শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড নয়, শিক্ষা এখন জাতির মৃত্যুদণ্ড।
তাহলে চলুন
পত্রিকা থেকে কিছু খবর দেখে নেওয়া যাক-
ঘটনা_০১: সৈকতের আত্মহত্যা।
২০২৩ সালের
Banglanews24 রিপোর্টে বলা হয়, সৈকত নামের
২৪ বছরের এক যুবক স্ব-লেখা সুইসাইড নোটে
উল্লেখ করেছিলেন যে, “দু’বছর আগেই
পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছিলাম, কিন্তু চাকরি পাইনি।”
তাঁর রুম থেকে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির বই পাওয়া যায়, যা নির্দেশ করে তিনি সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ঘটনা_০২: রাজীব চক্রবর্তীর ঘটনা।
২০২২ সালে
NewsBangla24 রিপোর্টে বলা হয়, রাজীব চক্রবর্তী নামের
২৭ বছর বয়সী একজন যুবক তিন বছর আগে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন, কিন্তু চাকরি না পেয়ে হতাশায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
স্বপরিবার বা আত্মীয়ের কথায়, তিনি বলেছিলেন: “পড়ালেখা শেষ করলাম কিন্তু চাকরি পাই না … এই টিউশনি করে কীভাবে চলবে?”
ঘটনা_০৩: মাসুদ আল মাহাদীর আত্মহত্যা।
২০২১ সালে Prothom
Alo জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েট সম্পন্ন করা ২৯ বছর বয়সী মাসুদ আল মাহাদীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে ভালো ফলসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন।
পরিবার বলেছে, তিনি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন এবং দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়া তাকে হতাশ করেছিল।
ঘটনা_০৪: তানভীর রহমান (ঢাবি)।
২০১৮ সালে Daily
Inqilab রিপোর্টে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ
কোর্স শেষ করেও সরকারি চাকরি না পাওয়ায় হতাশ হয়ে ৩০ বছরের যুবক তানভীর রহমান নবম তলা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
তাঁর ব্যাগে
ঘুমের ওষুধ পাওয়া গেছে, এবং আত্মহত্যার কারণ হিসেবে “সরকারি চাকরি না পাওয়া” উল্লেখ করা হয়।
ঘটনা_০৫: অস্হায়ী সামাজিক প্রত্যাশা ও পরিবারিক চাপ।
BMC
Public Health-এ প্রকাশিত “Understanding complex causes of
suicidal behaviour among graduates in Bangladesh” শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের যুব গ্র্যাজুয়েটদের ওপর সামাজিক ও পারিবারিক চাপে অত্যন্ত ভার রয়েছে।
গবেষণাটি দেখায়
যে “পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক প্রত্যাশা” (patriarchal social
expectations) বিষয়টি
গুরুত্বপূর্ণ কারণ — পরিবারের মর্যাদা বজায় রাখা, আয়ের নিশ্চয়তা দেওয়া বা ভালো চাকরি পাওয়া ইত্যাদির চাপ অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয় আত্মহত্যার ঝুঁকি।
ঘটনা_০৬: চাকরিহীনতা, দারিদ্র্য, লজ্জাসূচক প্রতিকৃতি ও আত্মসম্মান কমে যাওয়া।
একই BMC গবেষণায় বলা হয়েছে যে উচ্চ বেকারত্ব (unemployment) গ্র্যাজুয়েট আত্মহত্যার অন্যতম কারণ।
গবেষণা দেখায়, চাকরি না পাওয়া বা দারিদ্র্য তাদের আত্মসম্মান কমিয়ে দিতে পারে। “স্টিগমা (shame)” এবং অনাদৃত সামাজিক মর্যাদার অনুভূতি মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে এবং আত্মহত্যার চিন্তা চালু করতে পারে।
চলুন এবার
শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন দেখে নিই:
➤০১: শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সাম্প্রতিক প্রবণতা।
PMC
(Health Science Reports)‑এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে ২০২২ ও ২০২৩ সালে সংবাদপোর্টালগুলোতে ৯৮৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে।
একই গবেষণায় উল্লেখ
আছে, সেই বছরগুলিতে “undergraduate graduates” শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ছিল ১৯.২% যা সংখ্যায় হয় ১৮৯ জন।
স্ব-রিপোর্টেড কারণগুলোর মধ্যে
“academic pressure and failure” ২০২৩-এ ১১.৩% পর্যন্ত বেড়েছে, যা নির্দেশ করে শিক্ষাগত ব্যর্থতা আত্মহত্যার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ।
➤০২: উচ্চশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের ওপর সামাজিক ও পারিবারিক চাপ।
BMC
Public Health‑এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০–৩২ বছরের
গ্র্যাজুয়েট যুবকদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি দেখা যায়।
গবেষণা মতে, পারিবারিক মর্যাদা বজায় রাখার সামাজিক প্রত্যাশা (যেমন “ভালো চাকরি করো এবং পরিবারকে অর্থ দাও”) তাদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ায় এবং এটি আত্মহত্যার ঝুঁকিকে পূর্ণ করে।
➤০৩: বিশ্ববিদ্যালয়‑ছাত্রদের আত্মহত্যার প্রবণতা (বিশেষত প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি)।
Social
Science Journal for Advanced Research‑এর একটি
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের আত্মহত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গবেষণাটি দেখায়
যে, একাধিক কারণ — শিক্ষাগত চাপ, আর্থিক বোঝা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা — এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।
➤০৪: সাম্প্রতিক মিডিয়া প্রতিবেদন।
The
Business Standard জানায়
যে ২০২৪ সালের সমীক্ষায় ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে (স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা মিলিয়ে)।
রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়‑স্তরের শিক্ষার্থীরাও (উচ্চ শিক্ষা) এই তালিকার অংশ; BD News24 বলেছে, আত্মহত্যাকারীদের ১৭.৭৪% বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের।
দৈনিক বাংলা
রিপোর্টেও বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়‑স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ছিল ৮৬ জন।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আসল উদ্দেশ্য কি?...
আপনি কি কখনও ভেবেছেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত লক্ষ্য কী? এই শিক্ষা
ব্যবস্থা কি সত্যিই সৃজনশীল, স্বাধীন এবং কৌতুহলী মানুষ তৈরি করছে, নাকি কেবল শৃঙ্খলাবদ্ধ শ্রমিক এবং বেকার তৈরি করছে?
(TBS
News) বলে- বাংলাদেশের মোট বেকারের সংখ্যা ২৭–২৮ লক্ষ
মানুষ।
জাতীয় বেকারত্বের হার হল ৩.৬৬%।
যার মধ্যে
বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় ৯.১৬ লক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে
বেকারত্ব ≈ ১৩.৫৪%।
শিক্ষাগত স্তর
অনুযায়ী বেকারত্ব হল:
মাধ্যমিক ≈ ২১.৩%
উচ্চ মাধ্যমিক ≈ ১৪.৯%
বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট
≈ ৩১.৫%।
মোট শিক্ষিত বেকার ≈ ৮.৮৫ লাখ।
কেন আমাদের
দেশে এতএত শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে?
এখন আমি আপনাদের সামনে সেই প্রশ্নের উত্তরের কিছু বিশ্লেষণ তুলে ধরব।
আচ্ছা বলুনতো, আপনি কি এদের সম্পর্কে কিছু জানেন?
স্টিভ জবস (ড্রপআউট),
বিল গেটস (ড্রপআউট),
মার্ক জুকারবার্গ (ড্রপআউট),
ইলন মাস্ক (ডিগ্রি ছিল, কিন্তু যা করেছে সব ডিগ্রির বাইরে),
রে ক্রক,
হেনরি ফোর্ড,
রিচার্ড ব্র্যানসন (কখনো কলেজেই যায়নি)
আপনি হয়তো
বলবেন, না জানার কি আছে এরা সবাইতো বিলিওনিয়ার।
হ্যাঁ, আপনি
ঠিক বলেছেন, এরা বিলিওনিয়ার, কিন্তু এদের সম্পর্কে আরেকটি সত্য যা আমরা অনেকেই জানি না, তা হল- এরা শিক্ষা ব্যবস্থার সেই ফাঁদ ও চক্রান্ত বুঝতে পারা লোক, যারা নিজেদেরকে সেই ফাঁদ থেকে বের করতে সমর্থ হয়েছেন।
এরা বুঝেছে—
ডিগ্রি চাকরি
দেয়, কিন্তু দুনিয়া বদলাতে লাগে স্বাধীন সৃজনশীল চিন্তা— যা স্কুল শেখায় না।
তারা সময় নষ্ট করে না— হাবিজাবি “তথ্য
শেখা”-তে, তারা শেখে “খেলা কিভাবে চলে”।
সাধারণ মানুষ
শেখে:
কিভাবে কাজ করতে হয়,
বিলিয়নিয়ার শেখে:
কিভাবে কাজ তৈরি করতে হয়,
কিভাবে টাকা
চলে,
সিস্টেমের ফাঁক
কোথায়,
মানুষ কী চায়,
বাজার কীভাবে
নড়ে।
এগুলো স্কুলে
নেই।
শিক্ষাব্যবস্থার বইতেও
নেই।
শিক্ষা ব্যবস্থা চায় তুমি চাকরি করো,
কারণ চাকরি
করলে তুমি predictable (নিয়ন্ত্রণযোগ্য)।
বিলিয়নিয়াররা খুব দ্রুত বুঝে যায়—
চাকরি মানে
তুমি নিজের মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, এমনকি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে কারো স্বপ্ন পূরণ করছো, ব্যবসা মানে নিজেরটা গড়ছো।
এখন আপনি
হয়তো আমার উপর চরমভাবে রেগে গিয়ে বলতে পারেন- ভাই আপনি একটা পাগল, আপনি সব আজাইরা কথা বলছেন, আপনি শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানেন না!
আপনি চোখ লাল করে হয়তো আমাকে প্রশ্ন ছুড়ে দিতে পারেন- "আমাদের এইযে এত এত জ্ঞান আর সার্বিক জীবনযাত্রার মানের এত উন্নতি আর সমৃদ্ধি সবকিছু কিভাবে হচ্ছে?"
এ প্রশ্নের উত্তর
ক্লিয়ার করার জন্য আমি প্রথমেই মানবসভ্যতার দীর্ঘ বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলেছিলাম এবং বলেছিলাম মানবসভ্যতা সবসময় বিপরীত দুটি মেরুতে বিভক্ত -
১) স্বাধারণ নিঃস্ব শ্রেণি, যারা কেবল খেটে যাবে
২) মালিক শ্রেণি, যারা কেবল ভোগ করবে।
এখন আপনাদের বুঝতে
হবে পৃথিবীর যত নিয়ম-কানুন ও ব্যবস্থাপনা সবকিছু তৈরি করে সেই মালিক শ্রেণি, আর তারা কখনোই চাইবে না যে এই শ্রেণিবিভাজন ভেঙে যাক।
আমাদের শিক্ষা
ব্যবস্থার লক্ষ্য মানুষের স্বাধীনতা নয়— নিয়ন্ত্রণ।
মানুষকে “সম্পূর্ণ মানুষ” হিসেবে গড়ে তোলাই যদি উদ্দেশ্য হতো, তাহলে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাতো, নিজের পথ বেছে নিতে শেখাতো, চিন্তা করতে শেখাতো।
কিন্তু হয়েছে
ঠিক উল্টোটা।
১. শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষের স্বাধীনতা নয়, আনুগত্য তৈরি
করে।
পাঠ্যসূচি এমনভাবে বানানো
হয় যাতে তুমি নিয়ম মেনে চলতে শেখো; প্রশ্ন তুলতে নয়।
বইয়ের বাইরে
চিন্তা করলেই তুমি ‘ভিন্ন’, ‘অসুবিধাজনক’, ‘অপছন্দনীয়’ হয়ে যাও।
২. সার্বিক জীবনমান উন্নয়ন নয়— দক্ষ শ্রমিক
তৈরি করা।
রাষ্ট্র ও ক্ষমতাধর গোষ্ঠী চায় একটি বড় শ্রমবাহিনী, যারা আজীবন চাকরি করবে, ট্যাক্স দেবে, আর প্রশ্ন করবে না।
তাই শিক্ষা
ব্যবস্থা দক্ষ কর্মী তৈরি করে— কিন্তু স্বাধীন মনের মানুষ নয়।
৩. সৃজনশীলতার নামে
মুখস্থবিদ্যার সাম্রাজ্য।
সৃজনশীলতা থাকলে
মানুষ স্বাধীন হয়।
কিন্তু পরীক্ষাভিত্তিক মুখস্থবিদ্যা মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলে যেন তারা শুধু আদেশ পালন করতে জানে।
৪. মানুষ নয়— ‘রিসোর্স’ তৈরি করা হয়।
শিক্ষাব্যবস্থার সব ভাষায় আপনি শুনবেন—
“Human
resource”, “manpower”, “skilled labour”।
মানুষকে মানুষ
বলা হয় না,
বলা হয় “সম্পদ”— যার কাজ সিস্টেমকে চালানো।
৫. শিক্ষা
প্রকৃতশিক্ষা হলে সমাজ বদলে যেত।
এ কারণে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যেন মানুষ জানলেও বুঝতে না পারে, আর বুঝলেও বলতে না পারে।
বেকারত্বের প্রধান কারণ শিক্ষণের অভাব…
✪ শিক্ষা (Education)।
মানুষকে স্বাধীন করার
নামে যে ব্যবস্থাকে আমরা “শিক্ষা” বলি, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে সভ্যতার সবচেয়ে সূক্ষ্ম বন্দিত্ব।
শিক্ষা হলো রাষ্ট্রের তৈরি এক বিশাল ল্যাবরেটরি,
যেখানে মানুষকে মানুষ
নয়— পরীক্ষায় পাশ করা শ্রমিক, আনুগত্য শেখা নাগরিক, আর সিস্টেম-অনুগত মেশিন বানানো হয়।
মানুষ জন্মায়
আলাদা হয়ে,
কিন্তু শিক্ষা
তাকে একই ছাঁচে ঢেলে ফেলে।
তারপর বলে— "তুমি শিক্ষিত, তুমি সফল।"
আসলে?
আমরা প্রশিক্ষিত।
আমার শাসিত।
আমরা মানকৃত।
আমরা অন্যের
ভবিষ্যৎ বানানোর উপকরণ।
শিক্ষার লক্ষ্য
কখনোই মানুষকে মুক্ত করা নয়,
লক্ষ্য হলো মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করা।
✪ শিক্ষণ (Learning)।
এখন আসল সত্য— শিক্ষণ হলো সেই বিপ্লবী শক্তি, যা মানুষকে সিস্টেমের বাইরে নিয়ে যায়, যাকে রাষ্ট্র ভয় পায়, যাকে প্রতিষ্ঠান দমন করে, কারণ শিক্ষণ মানুষকে নিজস্ব চিন্তা দিতে পারে।
শিক্ষণ জন্মায়
কৌতূহল থেকে—
অভিজ্ঞতার আগুন
থেকে—
ভুল করার
সাহস থেকে—
জীবনের দিকে
তাকিয়ে প্রশ্ন করার ক্ষমতা থেকে।
শিক্ষা আমাদেরকে উত্তর
দেয়,
শিক্ষণ আমাদেরকে প্রশ্ন
করতে শেখায়।
শিক্ষা আমাদেরকে বলে— “এভাবে ভাবো।”
শিক্ষণ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করে— “কেন এভাবে ভাববো?”
এ কারণেই
শিক্ষণ মানুষের জন্মগত স্বাধীনতা,
আর শিক্ষা
মানুষের উপর আরোপিত নিয়ম।
চলুন, আমরা
শিক্ষা এবং শিক্ষণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেখে নিই:
১. উৎপত্তির উৎস।
শিক্ষা: সমাজ, রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে।
শিক্ষণ: মানুষের ভেতর
স্বাভাবিকভাবে জন্মায়।
২. কাঠামো।
শিক্ষা: নিয়ম, সিলেবাস, পরীক্ষা, গ্রেড—সবকিছু কাঠামোবদ্ধ।
শিক্ষণ: কোনো
কাঠামো নেই; যেখানে-যেভাবে পাওয়া যায়, সেখান থেকেই শিখে নেওয়া।
৩. উদ্দেশ্য।
শিক্ষা: সামাজিক মানানসই মানুষ
তৈরি করা, শ্রমবাজারে প্রস্তুত করা।
শিক্ষণ: ব্যক্তির বিকাশ, স্বাধীন চিন্তা ও স্ব-উন্নয়ন।
৪. নিয়ন্ত্রণধর্মিতা।
শিক্ষা: বাইরে
থেকে চাপানো; কী শিখবে– কে শিখাবে– কীভাবে শিখবে সব নির্ধারিত।
শিক্ষণ: ভেতর
থেকে আসে; আগ্রহ, কৌতূহল ও অভিজ্ঞতা দিয়ে ঘটে।
৫. শেখার ধরন।
শিক্ষা: মুখস্থ, পরীক্ষানির্ভর, মানকৃত।
শিক্ষণ: অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, ভুল ও প্রয়োগনির্ভর।
৬. স্বাধীনতা।
শিক্ষা: স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ; সিস্টেমের মধ্যে শেখা।
শিক্ষণ: স্বাধীন; নিজের মতো শেখা।
৭. সময়সীমা।
শিক্ষা: নির্দিষ্ট সময়—স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত।
শিক্ষণ: জীবনভর।
৮. মানসিক প্রভাব।
শিক্ষা: চাপ, পরীক্ষা-ভয়, প্রতিযোগিতা।
শিক্ষণ: আনন্দ, কৌতূহল, আবিষ্কারের অনুভূতি।
৯. ফলাফল।
শিক্ষা: সার্টিফিকেট,
ডিগ্রি, চাকরি।
শিক্ষণ: দক্ষতা, জ্ঞান, ব্যক্তিগত উন্নতি।
১০. মানুষের ওপর প্রভাব।
শিক্ষা: মানুষকে সমাজের
জন্য তৈরি করে।
শিক্ষণ: মানুষকে নিজের
জন্য তৈরি করে।
আসল সত্য
হল- আমাদের দেশে শিক্ষার ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিক্ষণের অভাব।
শিক্ষার ঘাটতি হল-
✪
শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোনো ও অপ্রাসঙ্গিক,
✪
পাঠ্যসূচি বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত নয়,
✪
পরিক্ষা মূখস্ত নির্ভর,
✪
সৃজনশীলতা ও দক্ষতা বিকাশ হয় না।
এটা হল সিস্টেমের সমস্যা।
আর শিক্ষণের অভাব হল-
✪
ছাত্র নিজে জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব সংযোগ ঘটাতে পারে নি,
✪
শিখেছে কেবল তথ্য, কিন্তু দক্ষতা ও চিন্তার পদ্ধতি শেখেনি,
✪
নিজের শেখাকে কর্মে, সমস্যা সমাধানে ও উদ্ভাবনে রূপান্তর করতে পারে নি।
এটা হল ব্যক্তির শেখার প্রক্রিয়ার দূর্বলতা।
ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় মধ্যযুগের শিক্ষা ব্যবস্থা…
ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় শিক্ষা
ব্যবস্থার সময়কাল ধরা হয় প্রায় ৬ষ্ঠ–১৮শ শতক পর্যন্ত।
আর এই যুগকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়-
➤ হিন্দু / বৌদ্ধ মধ্যযুগ (৬ষ্ঠ–১২শ শতক)
➤ ইসলামি মধ্যযুগ / সুলতানি–মুঘল যুগ (১২শ–১৮শ শতক)
এই দুই পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠ্যক্রম, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও জ্ঞানের কাঠামো অনেকটাই ভিন্ন ছিল, আর এই দুই শিক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয় উপমহাদেশকে বিশ্বের প্রাচীনতম জ্ঞানের কেন্দ্রগুলোর একটি বানিয়েছে।
একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, এই সময় ইউরোপে তেমন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিলো না, সবদিক দিয়ে
ভারতীয় উপমহাদেশ উন্নত ও এগিয়ে ছিলো। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াতো তখন আবিস্কারও হয় নি।
তখন এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার
জন্য চীন, তিব্বত, আরব, পার্সিয়া, মধ্য এশিয়া থেকে ছাত্ররা আসতো।
আর এখন আমরা সেখানে যাই।
আচ্ছা যাইহোক, আমরা কি জানি এই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে জন্ম নেয় বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—
তক্ষশিলা, নালন্দা, বিক্রমশীলা, সোমপুর বিহার, ওদান্টপুরী ও জগদ্দল বিহারের মত ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এগুলো শুধু
শিক্ষাকেন্দ্র ছিল না, এগুলো ছিল মানবসভ্যতার গবেষণাগার।
এইসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো
হতো- চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, ভাষাতত্ত্ব, গণিত, লজিক, দর্শন, কূটনীতি, কৃষিবিজ্ঞান— যে জ্ঞান পৃথিবীকে এগিয়ে দিয়েছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা
থেকে এখানে ছাত্ররা পড়ার জন্য আসতো। এগুলো ছিল সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়— মনন, মুক্তচিন্তা, গবেষণা ও জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র।
শুধু ভারতীয়
উপমহাদেশের নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে
প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিলো খৃঃপূর্ব ৬০০ অব্দের আগে, যার নাম তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়। এটি বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি অঞ্চলে ছিলো। এখানে ১০,০০০ এর বেশি শিক্ষার্থী দূরদূরান্ত থেকে এসে পড়াশোনা করতো। চিকিৎসা (Ayurveda), রাজনীতি, সামরিকবিদ্যা, অর্থনীতি, দর্শন, ব্যাকরণ, জ্যোতিষ, কৃষি, ধাতুবিদ্যা, স্থাপত্য প্রভৃতি বিষয় এখানে পড়ানো হতো। পণ্ডিত চাণক্য (কৌটিল্য), পাণিনি, অত্রেয়- এর মতো মহান শিক্ষক এখানে পাঠদান করতেন।
এরপর আরেকটি
বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও বলা যাক। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় আনুমানিক ৪২৭ খৃষ্টাব্দের দিকে। এটিকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের প্রথম “আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়”, যেখানে শিক্ষক এবং ছাত্ররা এক সাথে থাকতেন।
সর্বোচ্চ পর্যায়ে এখানে
প্রায় ১০,০০০ ছাত্র
ছিলো এবং প্রায় ২,০০০ শিক্ষক
ছিলো। চীনদেশের পরিব্রাজক হিউয়েন সাং- এর বর্ণনা থেকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। ওই সময় নালন্দায় ৩ টা লাইব্রেরি ছিলো-
১) রত্নসাগর,
২) রত্নদধি ও
৩) রত্নরঞ্জক।
এগুলোর মধ্যে
শুধুমাত্র রত্নদধি লাইব্রেরি-ই ছিলো এখনকার ৯ তলা বিল্ডিং-এর সমান। প্রাচীন চীনা ভিক্ষু জুয়ান্জাং- এর তথ্য অনুযায়ী: তিনি ৭ম শতকে নালন্দায় পড়াশোনা করেছিলেন। তার লেখা অনুযায়ী, গ্রন্থাগারে হাজার হাজার বই ছিল, যা বিভিন্ন দেশের ভাষায় লেখা।
আবার চীনা
বৌদ্ধ ভিক্ষু ই-চিং- এর তথ্যমতে (ইনিও নালন্দায় পড়াশোনা করেছিলেন) গ্রন্থাগারে পাণ্ডুলিপি ছিলো প্রায় ৯০ লক্ষ্য
(মতান্তর রয়েছে)। আর এখানের ভর্তি পরিক্ষা ছিলো খুবই কঠিন। ১০ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করতো মাত্র ২-৩ জন।
কিন্তু ধীরে
ধীরে এসব বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আধিপত্য হারাতে থাকে এবং একসময় বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৬৮০ খৃষ্টাব্দে নালন্দায় ছাত্র কমে হয় ৪০০০ জন আর অধ্যাপক ৬০০ জন। ১৭৯১ খৃষ্টাব্দে ছাত্র ১১০০ আর অধ্যাপক ৪০০। এরপর ১৮৬৭ সালে ছাত্র ১৫০ জনের মত আর অধ্যাপক নাই বললেই চলে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত একটু পরে বলছি, এর আগে ইসলামি মধ্যযুগ সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া যাক।
মুসলিম শাসনের আগমনে ভারতীয় উপমহাদেশে মাদ্রাসা হয়ে ওঠে নতুন শিক্ষাকেন্দ্র। তখন শিক্ষককে বলা হতো মুয়াল্লিম বা মুদাররিস
বিনামূল্যে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। দরিদ্র ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিলো। পাঠ্যক্রম ছিলো (Dars-e-Nizami) ভিত্তিক। পড়াশোনায় নতুন বিষয় যুক্ত হয়- কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন প্রভৃতি বিষয় পড়ানো হতো।
প্রধান মাদ্রাসাগুলো ছিলো- দিল্লির মাদ্রাসা-ই-নাসিরিয়া, ফিরোজ
শাহর মাদ্রাসা শাহি মাদ্রাসা (ঢাকা ও লাহোর), মাদ্রাসা-ই-হুসেনি।
মুঘল আমলে
শিক্ষা বহুজাতিক ও পরিশীলিত হয়। সম্রাট আকবর বাচ্চাদের জন্য প্রাথমিক পাঠ্যক্রম বানান, রাজকীয় গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন।
এসময় মহাভারত, রামায়ণ, উপনিষদের মত ধর্মীয় গ্রন্থগুলোকে বিভিন্ন পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করা হতো।
এরপরে সম্রাট
জাহাঙ্গীর ও সম্রাট শাহজাহান মাদ্রাসাগুলোকে নতুন করে সংস্কার করেন। পার্সিয়ান ভাষাকে প্রশাসনিক ভাষা করা হয়। বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতি সাধিত হয়।
সর্বশেষ সম্রাট
আওরঙ্গজেবের সময়কালে ধর্মীয় শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়।
তবে এখানেও
একটা মজার বিষয় আছে, সেটা কি জানেন? মধ্যযুগে শিক্ষা ছিল না জনগণের অধিকার। আজকে যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মত শিক্ষাও মানুষের মৌলিক চাহিদা, তখন এই মৌলিক চাহিদার মধ্যে শিক্ষা ছিলো না।
শিক্ষা গ্রহণ
করতো- রাজা, জমিদার, ধর্মযাজক, উচ্চবর্ণ ও অভিজাত শ্রেণির সন্তানেরা।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তি গঠন নয়, বরং ক্ষমতা
রক্ষা। কারণ তারা জানত— “যদি সবাই শিক্ষিত হয়, তবে সচেতন
হবে ও সবাই প্রশ্ন করবে। আর প্রশ্ন উঠলে সিংহাসন ভেঙে যাবে।”
তাই সাধারণ মানুষকে রাখা হতো অশিক্ষার আঁধারে-- যাতে তারা সহজেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকে। সংক্ষেপে বলা যায়- আগে মানুষ অশিক্ষায় দাস হতো, আর এখন মানুষ শিক্ষায় দাস হচ্ছে। আগের দাসত্ব ছিল চোখে দেখা, আজকের দাসত্ব অদৃশ্য-- GPA, সার্টিফিকেট, চাকরি, KPI, টার্গেটের জালে বন্দি মানুষ।
মধ্যযুগীয় শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পতন…
মধ্যযুগীয় শিক্ষা
ব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পতনের কারণ এখন আমি তুলে ধরার চেষ্টা করবো। বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য যুগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধ্বংস হয়েছিলো বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধবিগ্রহের কারণে। ১০ম–১২শ শতকে
ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল অনেকগুলো রাজ্যে বিভক্ত। রাজ্যগুলো একটির সাথে আরেকটির যুদ্ধ লেগেই থাকতো, আর তাছাড়া উত্তর ভারত বারবার আক্রমণের মুখে পতিত হয়। যেখানে রাজা বদল হয়, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকতে
পারে না। রাষ্ট্রীয় তহবিল, জমিদান, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক, পৃষ্ঠপোষকতা এসব ভেঙে পড়লে শিক্ষা এমনিতেই বিপর্যস্ত হয়।
তারপর বিশ্বের সবচেয়ে
বড় তিন বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়- নালন্দা, বিক্রমশীলা ও উদন্তপুরী ১২শ শতকে বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়।
নালন্দার লাইব্রেরি মাসের
পর মাস ধরে জ্বলেছিল, আর এখানে ছিল লক্ষ লক্ষ পাণ্ডুলিপি।
তৎকালীন সময়ে
এগুলো ছিল বৌদ্ধ নেটওয়ার্কের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র। বখতিয়ার খিলজির ভয় ছিলো শিক্ষিত সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহ সংগঠিত করতে পারে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখতে জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস ছিল কৌশল।
১০ম শতক পর্যন্ত বৌদ্ধধর্ম প্রধান শিক্ষা-সংস্কৃতির বাহক থাকলেও পরে ব্রাহ্মণ্যবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে, ইসলামি শক্তির আবির্ভাব ঘটে এবং বৌদ্ধ পৃষ্ঠপোষকতা ভেঙে যায়।
এর ফলে ছাত্র কমে যায়, নতুন ভিক্ষু ভর্তি হয় না, পাণ্ডুলিপি সংস্কার বন্ধ
হয়, শিক্ষকরা অন্যত্র পালিয়ে যায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধ্বংসের আগে থেকেই “ভুতুড়ে প্রতিষ্ঠান” হয়ে যাচ্ছিল।
তারপর ১৭০০–১৮০০ সালে মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে গেলে— মাদ্রাসা অনুদান কমে যায়, জমিদান হারায়, শিক্ষকরা অন্য পেশায় চলে যায়, গ্রন্থাগার রক্ষণাবেক্ষণ থেমে যায়। ফলে শিক্ষা সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাবহীন হয়ে পড়ে।
মারাঠা, রাজপুত, আফগান, পর্তুগিজ, ফরাসি— সব পক্ষের সংঘর্ষে মানুষের জীবনযাত্রা এত অস্থির হয়ে যায় যে শিক্ষা বিলাসিতায় পরিণত হয়।
এরপর আসলো
চূড়ান্ত ও শেষ আক্রমণ ব্রিটিশ শাসন— জ্ঞান ধ্বংসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। যা আমাদের সভ্যতার গৌরব পুরোপুরি শেষ করে দিল, তা হলো ব্রিটিশদের নকশাকৃত শিক্ষাব্যবস্থা। তোল, মাদ্রাসা, মক্তব সব ধ্বংস।
ব্রিটিশরা ১৮৩৫ সালের “Macaulay’s Minute”–এ বলে— “Indian education must create clerks for
the British Empire.”
“আমাদের এখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে এমন এক শ্রেণি গড়ে তুলতে— যারা আমাদের এবং আমাদের শাসিত লক্ষ লক্ষ মানুষের মাঝে দোভাষীর মতো কাজ করবে…”
অর্থাৎ- দর্শন
নয়, বিজ্ঞান নয়, যুক্তি নয়, মানবিক নয়, স্বাধীন চিন্তাও নয়- তারা চেয়েছিল কেবল অফিস সহকারী, কেরানি, লিপিকর।
স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে। ব্রিটিশরা স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার জমি, অনুদান, কর রেয়াত সব প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে শত শত তোল, মাদ্রাসা, পাটশালা, সংস্কৃত কলেজ বন্ধ হয়ে যায়।
ভারতীয় জ্ঞানকে অপমান করে তারা বলেছিলো— “A single shelf of a European library is worth all the
literature of India.”
“একটি ভাল ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি মাত্র তাকই ভারত ও আরবের সমগ্র দেশীয় সাহিত্যকীর্তির চেয়েও মূল্যবান।”
এই মনোভাবেই তারা
ধ্বংস করেছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ২০০০ বছরের শিক্ষার অভিজ্ঞান।
তাহলে এখন এই মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কী?
📌 নালন্দা: UNESCO World
Heritage আংশিক
পুনর্নির্মাণ করেছেন। এটি এখন পর্যটন কেন্দ্র। আসল জ্ঞানভাণ্ডার চিরতরে হারানো। আধুনিক নালন্দা প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রাচীন নালন্দার মতো নয়।
📌 তক্ষশীলা: পাকিস্তানে ধ্বংসস্তূপ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে রয়েছে, শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে নয়।
📌 বিক্রমশীলা: আংশিক খনন কাজ হয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত, কোনো পূর্ণাঙ্গ পুনর্জাগরণ নেই।
📌 উদন্তপুরী, সোমপুর বিহার: মাটির নিচে তবে কিছু অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। এটি এখন গবেষণার উপযোগী, কিন্তু শিক্ষার কেন্দ্র নয়।
📌 মধ্যযুগীয় মাদ্রাসা–মক্তব: সুলতানি ও মুঘল ধ্বংস হলেও আংশিক টিকে আছে, কিন্তু পাঠ্যক্রম পুরনো। আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নেই।
সামগ্রিক সত্য
হলো- ভারতীয় উপমহাদেশ তার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যময় শিক্ষা হারিয়েছে যুদ্ধ, রাজনীতি, ধর্মীয় দ্বন্দ্ব, ব্রিটিশদের উপনিবেশিক শোষণ এবং বাজারকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কারণে।
যা হারিয়েছে তা হলো- বিশ্বসেরা লাইব্রেরি, বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বসেরা দর্শন, আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ।
আজ যা আছে তা হলো- ধ্বংসস্তূপ, জাদুঘর, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং অমূল্য কিন্তু নীরব এক ইতিহাস।
ইউরোপ উন্নত হওয়ার প্রধান কারণগুলো…
ভারতীয় উপমহাদেশে যখন স্বর্ণযুগ চলছিলো তখন ইউরোপে ছিলো Dark Age। আর এই Dark Age এর যুগ শেষ হয় রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর। বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, শিক্ষা প্রায় থমকে যায়। পড়াশোনা সীমাবদ্ধ ছিল গির্জা ও পুরোহিতদের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, গবেষণার গতি ধীর, যুদ্ধ-হানাহানি বেশি।
আবার একটি
সময়ে দেখা যায় ইউরোপে শুরু হয় রেনেসাঁ, শিল্প বিপ্লব, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এবং পৃথিবীর ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসে প্রায় হাজার বছর পিছিয়ে থাকা ইউরোপ। এখন প্রশ্ন হলো- ইউরোপ কিভাবে উন্নতির চূড়ায় পৌছালো?
চলুন, এখন আমরা এই বিশ্লেষণের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে জানার চেষ্টা করি।
মনে আছে? ১৪৫৩ খৃষ্টাব্দে অটোমান সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের পতন ঘটিয়েছিলো। এটি ছিলো তৎকালীন সময়ে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও উন্নতির চূড়ায় থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুরক্ষিত শহর। এটি ইউরোপের উন্নয়ন, বিশেষ করে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও রেনেসাঁর জাগরণে অত্যন্ত গভীর ও সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল। এটি ইউরোপীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর অন্যতম।
সেই সময় কনস্টান্টিনোপল ছিলো গ্রিক দর্শন, প্রাচীন গ্রন্থ, বিজ্ঞান, গণিত ও সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার। অটোমানরা বিজয় করলে শত শত গ্রিক পণ্ডিত গ্রিস, ইতালি ও পশ্চিম ইউরোপে পালিয়ে যায়, এবং সঙ্গে নিয়ে যায়— প্লেটো, এরিস্টটল, হিপোক্রেটিসের অপ্রকাশিত বহু কপি, গ্রিক ও ল্যাটিন পাণ্ডুলিপি, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার গ্রন্থ।
এরফলে ইতালির
ভেনিস, রোম, ফ্লোরেন্স— এসব স্থান হয়ে ওঠে গ্রিক জ্ঞানের কেন্দ্র। আর এটাই রেনেসাঁর গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ইউরোপ প্রথমবার গ্রিক
জ্ঞানকে প্রত্যক্ষভাবে পায়। এর আগে ইউরোপ গ্রিক দর্শন পেত প্রধানত আরবদের অনুবাদ থেকে (ইবনে রুশদ, আল-ফারাবি ইত্যাদি)। কিন্তু ১৪৫৩ এর পর তারা মূল গ্রিক গ্রন্থগুলো হাতে পায়।
এতেকরে গবেষণায় নির্ভুলতা আসে, দর্শন, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা নতুন দিশা পায়। রেনেসাঁ আরও শক্তিশালী হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
হলো ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল পতন হওয়ার ৩ বছর আগে ১৪৫০ সালে গুটেনবার্গ প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কার করেন। ঠিক এই সময়ে হাজার হাজার গ্রিক বই ইউরোপে পৌঁছে যায়। ফলাফল হয় শত শত বিরল গ্রিক বই দ্রুত ছাপা হয় এবং ইউরোপের হাতে পৌঁছে যায়— এটা ছিল জ্ঞান বিস্ফোরণের মতো পর্যায়।
অটোমান বিজয়ে
ইউরোপের বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যায়। আগে সিল্ক রোডের মাধ্যমে ভারত, চীন, আরব থেকে বাণিজ্য করত ইউরোপ। কিন্তু কনস্টান্টিনোপল পতনের পর ওসমানীরা বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়। ইউরোপীয়রা সরাসরি পূর্বে যেতে না পেরে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়। যার কারণে সমুদ্রপথে ভারত-চীন যাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। এই প্রতিযোগিতা থেকেই কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করল, আর ভাস্কো দা গামা ভারত পৌঁছাল। শুরু হলো বিশ্বব্যাপী ইউরোপীয়দের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম। এতেই ইউরোপ বিপুল সম্পদ পেল ও উন্নত হতে শুরু করলো।
সত্যিকথা হলো ইউরোপের উন্নতির ইতিহাস হচ্ছে অন্যের জ্ঞান ও সম্পদ লুট করার ইতিহাস। ১৫শ–২০শ শতকে
ইউরোপ উপনিবেশ শাষণের মাধ্যমে ভারত, আফ্রিকা, আমেরিকা থেকে বিশাল সম্পদ লুট করে। সেই অর্থ দিয়ে ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। ইউরোপের উত্থানে উপনিবেশিক লুট একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি।
সময় ৮ম–১৩শ শতকে আরব-মুসলিম বিজ্ঞানীরা গ্রিক
গণিত, দর্শন, চিকিৎসা উন্নত করলেন। খৃষ্টানরা ১০৮৫ সালে টলেডো দখল করে, আর আন্দালুসিয়ার মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছে গেল- ইবনে সিনার চিকিৎসা বই, আল-খাওয়ারিজমির গণিত, ইবনে রুশদের দর্শন ও আল-বিরুনির বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। এটাই
হলো ইউরোপের পুনর্জাগরণের প্রথম ভিত্তি।
এরপর ক্রুসেড যুদ্ধের সময় পূর্বের সাথে ইউরোপের সাংস্কৃতিক সংযোগ ঘটে। ১১শ–১৩শ শতকে
ইউরোপীয়রা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা, বিশ্ববিদ্যালয়, বাজারব্যবস্থা দেখে। তারা তখন উপলব্ধি করতে পারে যে তারা জ্ঞান, বিজ্ঞানে অনেক পিছিয়ে আছে। আর তাছাড়া তারা বারবার মুসলমানদের সাথে যখন ক্রুসেড যুদ্ধে হেরে যায়, এই ধাক্কা ইউরোপকে পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দেয়।
এরপরই ইউরোপে
একেরপরএক বিপ্লব সংঘটিত হয়। রেনেসাঁ, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, আলোকায়ন ও শিল্প বিপ্লব পুরো ইউরোপকে বদলে উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে দেয়।
ব্রিটিশরা শিক্ষার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশকে শোষণের ইতিহাস…
ব্রিটিশরা কিভাবে
শিক্ষার মাধ্যমে পুরো জাতিকে শোষণ করেছিলো চলুন এখন সে সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক।
ব্রিটিশদের আগমনের
আগে— নালন্দা, বিক্রমশীলা, তক্ষশীলা, সোমপুরের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ও হাজার হাজার স্থানীয় পাঠশালা, মক্তব, মাদ্রাসায় পড়াশোনা হতো।
ব্রিটিশ সার্ভের তথ্যমতে, ১৮২০ সালের আগে ভারতীয়দের ৮০% এর বেশি
শিশু স্থানীয় পাঠশালায় পড়তো।
এটি ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যের সাথে
সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়— কারণ একটি জ্ঞানী জাতিকে দাস বানানো যায় না।
উপমহাদেশ দখলের
পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হিসাব-নিকাশ করে বুঝলো—
যাদের নিজস্ব
ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি আছে তারা শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়বে। তাই প্রথমে শিক্ষা ব্যবস্থাই ভেঙে ফেলতে হবে যেন জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। এরপর একটি “নতুন মানুষ” তৈরি করতে হবে— যারা চিন্তায়–চেতনায় ব্রিটিশদের অনুগত থাকবে।
একথাই পরবর্তীতে লর্ড ম্যাকলের ভাষায় স্পষ্ট হয়— “A single shelf of a European library is
worth all the literature of India.”
এটি ছিল সেই দৃষ্টিভঙ্গি— যার ওপর পুরো শিক্ষানীতি দাঁড়িয়ে ছিলো।
এরপর ১৮১৩
সালের চার্টার অ্যাক্টের মাধ্যমে শিক্ষা দখলের সূচনা হয়। মিশনারি স্কুলের মাধ্যমে ব্রিটিশ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বৃদ্ধি করা হয়, ইংরেজি ভাষায়
শিক্ষা প্রচলন শুরু করা হয় ও ভারতীয় সাহিত্য ও ভাষাকে “অপ্রয়োজনীয়” ঘোষিত করা হয়।
১৮৩৫ সালে
উইলিয়াম অ্যাডাম একটি রিপোর্ট করেন। তিনি গ্রামে-গ্রামে ঘুরে দেখলেন ভারতীয় পাঠশালা ব্যবস্থা কত উন্নত, তখন রিপোর্টে তিনি লিখেছিলেন— শিক্ষার মান স্থানীয়ভাবে খুব উচ্চ, ছাত্র-শিক্ষকের সংখ্যা বিপুল, নিয়মিত উপস্থিতি ও সমাজভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত আছে।
তখন ইষ্ট
ইণ্ডিয়া কোম্পানির স্কুলগুলো ছিল খালি, মানুষ সেখানে পড়াশোনা করার জন্য আগ্রহী ছিলো না।
তাই ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিল-
লোকাল শিক্ষা
ভেঙে ফেলতে হবে, তবেই ইংরেজি শিক্ষা ঢুকবে।
লর্ড ম্যাকলে – ১৮৩৫ সালের Minute on Education সিস্টেম চালু করে। এটাই ছিল জাতি শোষণের টার্নিং পয়েন্ট। ম্যাকলের লক্ষ্য ছিলো- ভাষাগত দাসত্ব তৈরি করা, ইংরেজিকে উচ্চশ্রেণির ভাষা বানানো, বাংলা, হিন্দি, সংস্কৃত, ফারসি এসব ভাষাকে অকেজো হিসেবে তুলে ধরা। মানুষ যেন মনে করে নিজের ভাষায় শিক্ষা নিম্নমানের।
আরো একটি
গুরুত্বপূর্ণ ষড়যন্ত্র হলে একটি “মধ্যবিত্ত দালাল শ্রেণি” তৈরি করা। ম্যাকলের নিজের ভাষায়— “We must create a class of persons who are Indian in
blood and colour, but English in taste, opinions, morals and intellect.”।
অর্থাৎ— চামড়ায়
ভারতীয়, চিন্তায় ইংরেজ—এমন মানুষদের দিয়ে পুরো জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করা।
এই শ্রেণি
থেকেই পরে ক্লার্ক, কেরানি, অফিসার, দালাল এলিট তৈরি হয়— যারা ব্রিটিশ শাসনকে
টিকিয়ে রাখে।
একইসাথে ব্রিটিশরা- স্থানীয় পাঠশালা থেকে অর্থ বন্ধ, ট্যাক্স বাড়িয়ে শিক্ষকদের দেউলিয়া করা, মাদ্রাসা ও টোলগুলোকে গুরুত্বহীন ঘোষণা, প্রাচীন গ্রন্থ ও জ্ঞানকে অবৈজ্ঞানিক বলে অবমাননা ও দরিদ্র মানুষকে বাধ্য করা ইংরেজি না জানলে চাকরি নেই, এইসব উপায় অবলম্বন করে স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
ব্রিটিশদের শিক্ষা
তাদের তিনটি উদ্দেশ্য পূরণ করত—
১) চিন্তা, বিজ্ঞান, দক্ষতা নয়, শুধু ব্রিটিশ প্রশাসনের চাকরির
উপযোগী কেরানি তৈরি করা।
২) ইতিহাসকে বিকৃত
করা।
৩) মানসিক
দাসত্ব: মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল— ইংরেজি জানলেই উন্নত, নিজের ভাষায় মানুষ অশিক্ষিত, নিজের ইতিহাস গর্ব করার মতো নয়।
এগুলোই ব্রিটিশ উপনিবেশিক শিক্ষা
সফল হওয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক।
১৮৫৮–১৯৩৫
সালে পুরো জাতিকে প্রশাসনিক যন্ত্র বানানো হয়। এই সময় ব্রিটিশরা— "Low College" এ তাদের আইন শিখতে বাধ্য করে। এইভাবে ব্রিটিশরা সবচেয়ে নরম, কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র শিক্ষা ব্যবহার করে পুরো উপমহাদেশকে শোষণ করেছিলো।
ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের তৈরি করা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান…
ব্রিটিশরা আমাদের
ভারতীয় উপমহাদেশে অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। যেমন- ১৮১৭ সালে কলকাতার হেডকলেজ (Hindu College), ১৮৪০ সালে মাদ্রাজ কলেজ (Madras Presidency College), ১৮৫৭ সালে বোম্বাই, মাদ্রাজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮৮২ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮৮৭ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হয়।
কিন্তু একটা
মজার ব্যাপার কি জানেন? তখন এইসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনটিতেই কোন পড়াশোনা হতো না। শুধু বছর শেষে পরিক্ষাটা নেওয়া হতো। আর হাতে গোনা কয়েকটি প্রশ্ন করেই তাদেরকে পরিক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়া হতো। আর এমন অদ্ভুত বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু তখন ইউরোপেও ছিলো, যার নাম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়।
এরপর ১৮৫৮
সাল থেকে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করানো শুরু করে, আর ১৯০৪ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পড়াশোনা করানো শুরু করে। কিন্তু তখন এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকার কোন টাকা দিতো না, এখন যেরকম
একটা আর্থিক বাজেট থাকে, সেরকম কিছুই ছিলো না।
কিন্তু একটি
সময়পর কেবল পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের কাছ থেকে বার্ষিক ৩০ হাজার রূপি করে পেতো। কিন্তু তারপরেও এই অঞ্চলের শিক্ষার মান তেমন একটা ভালো না হওয়ায়, এটা নিয়ে লন্ডনে সমালোচনা শুরু হয়। তখন ১৮৮২ ও ১৮৮৩ সালে হান্টার কমিশন (Hunter Commission) গঠন করা হয়। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়নে এটি তেমন সফল হতে পারে নি। এরপর জর্জ কার্জন (George Curzon) ভারতীয় উপমহাদেশে Viceroy হয়ে আসেন এবং পুরো
শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করেন।
তার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে "কার্জন হল" নামে একটি হলও আছে। উনি নতুন করে নতুন উদ্দামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন।
এখন আপনি
শুনলে হাসবেন, আসলে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলেতে তখন কি বিষয় পড়ানো শুরু হয়। তখন এখানে ৩ টি বিষয় পড়ানো হতো-
১) ইউরোপের ইতিহাস (European History)
২) ইউরোপের দর্শন (European Philosophy)
৩) ইংরেজি সাহিত্য (English literature)
চিন্তা করে দেখুন- আমরা আছি ভারতীয় উপমহাদেশে কিন্তু পড়ছি ইউরোপের ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্য। কিন্তু আরো একটি আশ্চর্যজনক বিষয় হলো তৎকালীন সময়ে ইংল্যান্ডেও ইংরেজি সাহিত্য পড়ানো হতো না। আরেকটা বিষয় হলো- তখন এখানে কোন কৃষিশিক্ষা পড়ানো হতো না, অথচ ভারতীয়
উপমহাদেশ ছিল কৃষিনির্ভর একটি দেশ। তখন কিন্তু আমেরিকায় কৃষিশিক্ষা পড়ানো হতো।
আপনারা কি জানেন তখন মানুষ কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পড়াশোনা করতো? এখনের মত তখনও সেই উদ্দেশ্য ছিলো একটা- সরকারি চাকরি। তখনকার সময়ে মা-বাবারা সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কেবল একটি সুন্দর পরিকল্পনা ও আশা করতেন- ছেলে পড়াশোনা করে একটা সরকারি চাকরি করবে। আর এই সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ পদ ছিলো ব্রিটিশদের আন্ডারে কোন কেরানি বা পিয়নের কাজ। এমনকি বর্তমান সময়েও আমাদের দেশের অনেক যুবক মাস্টার-ডিগ্রি কমপ্লিট করে প্রশাসনিক বিভাগে কেরানি ও পিয়নের কাজ করে। আমি সরকারি চাকরির এ ফাঁদ সম্পর্কে পরে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
১৮৯০ সালের
মধ্যে ওই ৩ টা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৬০ হাজার জনের মত সার্টিফিকেট পাই। এদের ৩ ভাগের ১ ভাগই কিন্তু ওকালতি করতে চলে যায়।
১৮৮৭ সালের
একটা জরিপ মতে, তখনকার Middle Rang- এ ২১ হাজারের মত সরকারি কর্মচারী ছিলো, এবং তার ৭১℅ এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে
মেট্রিকুলেশন পাস করেছে। আর বাকি ২৯℅ ইউরোপ থেকে
পড়াশোনা শেষ করেছে। এই ৭১℅ এর মধ্যে
হিন্দু ৪৪℅, মুসলিম ৭℅ আর ইউরোপীয়ান ছিলো
১৯%। এদের প্রত্যেকের একটাই লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিলো- একটা সরকারি চাকরি করা।
১৯২১ সালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ছিলো একটাই ক্যাডার উৎপাদন করা। আগে যার নাম ছিলো ICS আর এখন বলে BCS।
জন লক, বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিং ও আমেরিকার শিক্ষা ব্যবস্থা…
তৎকালীন সময়ে
বা শুরুর দিকে আমেরিকায়ও কিন্তু কেবল চাকরির উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পড়াশোনা করা হতো। বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিং বলেছিলেন- আমাদের তরুণদেরকে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা দিতে হবে, যেটা পড়ে তারা একটা চাকরি নিতে পারবে। তিনি জন লকের দ্বারা অনেক অনুপ্রানিত ছিলেন। এটাকে বলা হয় প্রায়োগিক শিক্ষা। ফ্রাঙ্কলিং কিন্তু এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ১৭৫০ সালে Pennsylvania University প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৮৬২ সালে আব্রাহাম লিঙ্কন একটা নতুন Act জারি করেন। ওইসময় যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ চলতেছিলো আর শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা ছিলো খুবই নাজেহাল। আব্রাহাম লিঙ্কনের Act অনুযায়ী প্রত্যেক সিনেটর বা সংসদ সদস্য তার এলাকার সরকারের আন্ডারে থাকা ৩০ হাজার একর জমি বিক্রি করে দিতে পারবে, এবং সেই টাকা সে বিনিয়োগ করতে পারবে। বিনিয়োগ করার পর লভ্যাংশের একটি অংশ দিয়ে নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং দেখাশোনা করতে হবে। আর এভাবে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করা হয়েছিলো এগুলোকে বলা হতো Land Grant Universities। এইভাবে প্রায় কয়েকহাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিলো। এটা যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিলো তার নাম হলো Morrill Act। কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো শ্রমিক উৎপাদন করা। এগুলোর মধ্যে প্রথম যে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়েছিলো তার নাম John Hopkins Universit।
চলুন এবার
জন লক ও বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিং এর শিক্ষা নীতি সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়া যাক।
জন লক এবং বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিং— দু’জনই আধুনিক
শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবাচক ভিত্তি গড়লেও, তাদের ধারণাগুলোর গভীরে লুকিয়ে আছে বেশ কিছু নেগেটিভ দিক, যেগুলো আজকের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিকৃত করেছে, একে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, উৎপাদনশীল দাস তৈরির যন্ত্রে পরিণত করেছে।
জন লকের
শিক্ষাদর্শনের নেগেটিভ দিক হলো- জন লক “স্বাধীনতা, অধিকার, অভিজ্ঞতা”— এসব কথা বললেও বাস্তবে তার শিক্ষাদর্শন পরে কিছু বড় সমস্যার জন্ম দেয়।
তার তৈরি Tabula
Rasa নীতি
রাষ্ট্র ও এলিটদের জন্য মানুষ গঠন করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
লক বলেন
মানুষের মস্তিষ্ক জন্মের সময় সাদা কাগজ। এই ধারণা শোনায় ভালো।
কিন্তু বিপদ
হলো— যে রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন এলিট শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে, সে-ই মানুষের চরিত্র, চিন্তা, মূল্যবোধ সব লিখে দিতে পারবে।
এটি পরবর্তীতে সৃষ্টি
করে— প্রোপাগান্ডা-ভিত্তিক পাঠ্যক্রম, ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রসৃষ্ট নাগরিক, স্বাধীন চিন্তাশীল মানুষ নয়, obedient worker, ব্রেইনওয়াশড প্রজন্ম।
আপনারা দেখবেন
বিশ্বের সব শক্তিশালী রাষ্ট্র শিক্ষা দিয়ে নাগরিক বানায়— এই ধারণাই লকের ট্যাবুলা রাসা থেকে এসেছে।
তিনি বলেন
অভিজ্ঞতা দিয়ে জ্ঞান হয়— এর মানে
শিক্ষার্থী তার পৃথিবীকে দেখে-শুনে শেখে।
কিন্তু বিপদের
জায়গা— যদি অভিজ্ঞতা রাষ্ট্র তৈরি করে দেয়, তাহলে শিক্ষার্থী সেই নিয়ন্ত্রিত বাস্তবতাকেই সত্য ভাববে।
“যা দেখছো—সেটাই সত্য”- এই দর্শন অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এটি সৃষ্টি
করে— মিডিয়া-নির্ভর সত্য, পাঠ্যপুস্তক-নির্ভর ইতিহাস, ক্ষমতার স্বার্থে তৈরি অভিজ্ঞতা। মানুষকে ‘বাস্তব’ ভাবার নামে সীমিত দৃষ্টিভঙ্গিতে ফেলে রাখে।
লকের শিক্ষাদর্শন মধ্যবিত্ত কর্মী
তৈরি করার দিকে ঝুঁকে যায়। লক যুক্তি, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা এসবের ওপর জোর দেন।
ফলে মানুষ
ভালো কর্মচারী হয়, কিন্তু বিদ্রোহী চিন্তাবিদ হয় না। লকের শিক্ষাদর্শন প্রশ্নহীন, নৈতিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ “ডিসিপ্লিনড সিটিজেন” তৈরি করে— যা শিল্পবিপ্লব পরবর্তী শ্রমিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জন্য আদর্শ ছিল।
লক বলেন
রাষ্ট্র নাগরিক তৈরি করবে। এই নাগরিক মানেই রাষ্ট্রের অনুগত মানুষ। এখানেই শিক্ষার স্বাধীনতা শেষ ও রাষ্ট্রের আধিপত্য শুরু।
ফলে শিক্ষা
হয়ে যায়— রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রচারের যন্ত্র, আইন মান্য করার প্রশিক্ষণ, ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থ অগ্রাধিকার
আর বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিং এর শিক্ষাদর্শন বাস্তবভিত্তিক ও প্রোগ্রেসিভ ছিল, কিন্তু কিছু ত্রুটিও আছে, যা পরে বড় সমস্যা সৃষ্টি করে।
Utilitarian
বা উপযোগবাদী শিক্ষা যা মানুষকে উৎপাদন-যন্ত্র বানায়।
ফ্রাঙ্কলিংর কলেজগুলো শেখাত— অর্থনীতি, প্রযুক্তি, ব্যবসা, বৈজ্ঞানিক দক্ষতা।
ভালো শোনালেও— শিক্ষা মানবিক, নৈতিক, সমালোচনামূলক চরিত্র হারায়। মানুষ সামাজিক যন্ত্রাংশ- এ রূপান্তরিত হয়। এটি আজকের শিক্ষাব্যবস্থার মূল সমস্যা— চাকরি পাওয়ার জন্য শিক্ষা, দক্ষ শ্রমিক তৈরির কারখানা।
ফ্রাঙ্কলিং শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠান নির্ভর
করেন। শিক্ষা হয়ে যায় ইনস্টিটিউশন-ডিপেন্ডেন্ট। জ্ঞান বেসরকারি হাতে চলে যায়। শিক্ষা বাজার ও রাষ্ট্র উভয়ের নিয়ন্ত্রণে পড়ে। আজ যে শিক্ষা এক ভয়ংকর ইন্ডাস্ট্রি হয়ে গেছে— তার শিকড় এখানেই।
প্রুশীয়
মডেল: শিক্ষা যখন আনুগত্য
তৈরির প্রতিষ্ঠান…
১৮শ শতাব্দীর প্রুশিয়ায় রাষ্ট্র যখন প্রাথমিক শিক্ষাকে বিস্তৃত করতে শুরু করে,
তখন শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল জ্ঞান প্রদান ছিল না। ১৭৬৩ সালের রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ঘটে। সমকালীন রাষ্ট্রীয় চিন্তায় শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল শিশুদের মধ্যে রাজা ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, কর্তব্যবোধ এবং শৃঙ্খলা তৈরি করা। গবেষণাতেও প্রুশিয়ার এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ব্যবস্থাকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রগঠনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল শিশুর বয়স। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে জোর করে অনুগত করা কঠিন; কিন্তু শিশুকে ছোটবেলা থেকেই নির্দিষ্ট নিয়ম, সময়সূচি, কর্তৃত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে অভ্যস্ত করা তুলনামূলক সহজ। প্রুশীয় শিক্ষাচিন্তায় তাই আনুগত্যকে শুধু শাস্তির মাধ্যমে নয়, বরং এমনভাবে শেখানোর কথা বলা হয়েছিল যাতে শিক্ষার্থী কর্তৃত্ব মেনে চলাকে স্বাভাবিক ও সঠিক আচরণ হিসেবে অভ্যন্তরীণ করে নেয়।
নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে আসা, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করা, শিক্ষককে কর্তৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করা,
নির্ধারিত পাঠ অনুসরণ করা, নিয়ম ভঙ্গের জন্য শাস্তি পাওয়া— এসবের
মাধ্যমে শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়। এই মডেলকে পরবর্তীকালে বৃহত্তর রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জাতীয় পরিচয় নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়।
পরবর্তী শিল্পসমাজে যে বৈশিষ্ট্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠ— সময়নিষ্ঠা, নিয়ম মানা, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসরণ, নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা— সেগুলোর
সঙ্গে গণশিক্ষার এই কাঠামোর একটি ঐতিহাসিক সামঞ্জস্য তৈরি হয়।
অর্থাৎ প্রুশীয় শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার ছিল মানুষকে শুধু শিক্ষিত করা নয়, তাকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার মধ্যে অভ্যস্ত করে তোলা। পরবর্তী শিল্পসমাজে সেই শৃঙ্খলাই শ্রমজীবনের প্রয়োজনীয় আচরণের সঙ্গে সহজে মিলে যায়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো,
নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে প্রুশিয়ার পরাজয়ের পর ১৯শ শতাব্দীর শুরুতে শিক্ষা ও জাতীয় সংহতির সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। শিক্ষার মাধ্যমে ভাষাগত ও জাতীয় ঐক্য তৈরি, দেশপ্রেম জাগানো এবং ভবিষ্যৎ সামরিক দায়িত্বের জন্য জনগণকে প্রস্তুত করার চিন্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হোরেস ম্যান ও গণশিক্ষার
বিস্তার…
উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রে হোরেস ম্যান common school আন্দোলনের
অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। গণশিক্ষাকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করার মাধ্যমে বিদ্যালয়কে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কেন্দ্রীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়।
এর ইতিবাচক দিক ছিল ব্যাপক মানুষের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও দেখা দেয়— যখন লক্ষ লক্ষ শিশুকে একই পাঠ্যক্রম, একই নিয়ম, একই সময়সূচি ও একই মূল্যায়ন ব্যবস্থার মধ্যে আনা হয়, তখন শিক্ষা কি কেবল জ্ঞান দেয়, নাকি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক আচরণও তৈরি করে?
গণশিক্ষা বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ে। রাষ্ট্র নির্ধারণ করতে শুরু করে— কোন বিষয় পড়ানো হবে,
কোন ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ, কোন মূল্যবোধ শেখানো হবে,
কীভাবে পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং শিক্ষার্থীর সাফল্য কীভাবে পরিমাপ করা হবে।
এখানে শিক্ষার একটি মৌলিক ক্ষমতা তৈরি হয়:
যে প্রতিষ্ঠান পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করে,
সে অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে পরবর্তী প্রজন্ম কী জানবে এবং কোন বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কেবল বিদ্যালয় পরিচালনার প্রশ্ন নয়; এটি জ্ঞান ও চিন্তার ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নও।
এখানে শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। শিশু নিজের ইচ্ছায় যা শিখবে— এমন স্বাধীন শিক্ষার পরিবর্তে তাকে নির্দিষ্ট বয়সে বিদ্যালয়ে যেতে হবে, নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম অনুসরণ করতে হবে,
নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হবে এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তার জ্ঞান মূল্যায়িত হবে। ফলে শিক্ষা একই সঙ্গে জ্ঞান প্রদান এবং আচরণ ও শৃঙ্খলা তৈরির প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে শিল্পায়নের বিস্তারের সঙ্গে এই কাঠামোর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়। শিল্পসমাজের প্রয়োজন ছিল এমন কর্মী, যারা সময় মেনে চলবে, নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করবে, নির্দেশ বুঝবে এবং বৃহৎ উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে
সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে পারবে। ফলে বিদ্যালয়ের সময়সূচি, নিয়ম, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শিল্পসমাজের শ্রমশৃঙ্খলার সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ তৈরি হয়। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্পসমাজ একই সময়ে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বিকশিত করেছিল, যা পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রকফেলার
এবং শিক্ষায়
বেসরকারি
পুঁজির প্রবেশ…
John
D. Rockefeller Sr. ১৯০২ সালে General Education Board প্রতিষ্ঠা
করেন। শুরুতে তিনি ১০ লাখ ডলারের প্রতিশ্রুতি দেন;
কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর অনুদান বেড়ে ৪৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়— তৎকালীন হিসেবে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো philanthropic প্রতিষ্ঠানে অন্যতম বৃহত্তম অর্থায়ন।
Rockefeller Foundation এবং General
Education Board একই প্রতিষ্ঠান নয়। GEB ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত; Rockefeller Foundation-এর সনদ হয় ১৯১৩ সালে। GEB আলাদাভাবে পরিচালিত হলেও Rockefeller পরিবারের অর্থায়নে গড়ে ওঠে এবং ১৯০২–১৯৬৫
সময়ে প্রায় $325 million বিতরণ করে।
GEB-এর কাজ ছিল ব্যাপক। তারা বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মেডিকেল শিক্ষা, দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষা এবং কৃষিশিক্ষায় অর্থায়ন করেছিল। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে তারা কৃষি ও শিক্ষাকে একসঙ্গে আধুনিকীকরণের চেষ্টা করে। কৃষকদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, উৎপাদনশীলতা ও ব্যবস্থাপনার ধারণা শেখানো হয়। তরুণদের জন্য কৃষিভিত্তিক ক্লাবও গড়ে ওঠে।
এখন প্রশ্ন হলো— যখন একটি বিশাল ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক শিক্ষা খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি শুধু বিদ্যালয় নির্মাণ করছেন— নাকি
একই সঙ্গে শিক্ষার অগ্রাধিকার ও মানুষের দক্ষতার সংজ্ঞাকেও প্রভাবিত করছেন?
রকফেলার সমর্থিত GEB-এর কার্যক্রমে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, বৈজ্ঞানিক ও ব্যবসামুখী করার স্পষ্ট লক্ষ্য দেখা যায়। Rockefeller
Archive Center-এর ইতিহাসে বলা হয়েছে, GEB দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকে এমনভাবে আধুনিক করতে চেয়েছিল যাতে উৎপাদন বাড়ে এবং কৃষি বৃহত্তর বাজার ও শিল্প অর্থনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়।
অর্থাৎ শিক্ষার একটি নতুন ধারণা এখানে দেখা যায়: জ্ঞান → দক্ষতা → উৎপাদনশীলতা → অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
এই ধারাটি নিজে কোনো অপরাধ বা ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নয়। কিন্তু এর মধ্যে একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি শিক্ষার মূল্য প্রধানত নির্ধারিত হয় একজন মানুষ কত বেশি উৎপাদন করতে পারে, কত দক্ষ কর্মী হতে পারে অথবা অর্থনীতিতে কত বেশি অবদান রাখতে পারে—তাহলে
শিক্ষার মানবিক, সৃজনশীল ও মুক্তচিন্তার উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে যেতে পারে।
সার্টিফিকেটের শৃঙ্খল পরবর্তী সময়ে শিক্ষা ও চাকরির সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। একজন মানুষের জ্ঞান বা সৃজনশীলতার পরিবর্তে তার সনদ, ডিগ্রি, ফলাফল ও পেশাগত যোগ্যতা সামাজিক সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে।
ফলে শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই একটি নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করে:
বিদ্যালয় → পরীক্ষা → ফলাফল → ডিগ্রি → চাকরি → আয়।
শিক্ষা তখন স্বাধীন জ্ঞান অনুসন্ধানের পাশাপাশি জীবিকা অর্জনের পূর্বশর্তে পরিণত হয়।
আধুনিক সমাজে বাধ্যতামূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সময়কালও দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার সীমিত সময়ের পরিবর্তে একজন তরুণকে বহু বছর বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পর আসে চাকরির প্রতিযোগিতা। তারপর কর্মজীবন, আয়, পরিবার, ঋণ, সামাজিক দায়িত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার চাপ। ফলে একজন মানুষের জীবনের বড় একটি অংশ নির্ধারিত হয়ে যায় শিক্ষা → কর্মসংস্থান → পারিবারিক দায়িত্ব → জীবিকা— এই ধারায়।
ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায়: মানুষকে কি এত দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা ও কর্মজীবনের ধারাবাহিকতায় আবদ্ধ করা হচ্ছে যে স্বাধীনভাবে সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যায়?
তারপর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর একটি কাঠামো হলো পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতা। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও
শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে
সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ সম্ভবত এখানে। শুরুতে বাইরের কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীকে নিয়ন্ত্রণ করে। পরে শিক্ষার্থী নিজেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে শেখে। ভালো ফল করতে হবে, ভালো কলেজে যেতে হবে, ভালো চাকরি পেতে হবে, বেশি আয় করতে হবে— এই প্রতিযোগিতা তাকে নিরন্তর নিজের কর্মক্ষমতা বাড়াতে বাধ্য করে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ আর সবসময় বাইরে থেকে আসে না। মানুষ নিজেই নিজের সময় নিয়ন্ত্রণ করে,
নিজেকে মূল্যায়ন করে এবং ব্যর্থতার ভয় থেকে নিজেকে নির্ধারিত পথে পরিচালিত করে। একদিকে শিক্ষা মানুষকে পড়তে, লিখতে, বিজ্ঞান জানতে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে এবং দক্ষ হতে শেখায়। অন্যদিকে একই ব্যবস্থা তাকে পরীক্ষা দেওয়া, কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন গ্রহণ করা এবং শ্রমবাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করতেও শেখায়।
আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য হলো— রকফেলার অর্থায়নের ইতিহাস সম্পূর্ণ ইতিবাচকও ছিল না। বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষায় GEB-এর ভূমিকার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা ছিল। Rockefeller
Archive Center-এর নিজস্ব ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে তাদের কিছু শিক্ষাকর্মসূচি তৎকালীন বর্ণবৈষম্যমূলক কাঠামোর সীমার মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে তথাকথিত industrial
education-এর মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট ধরনের শ্রমের জন্য প্রস্তুত করার ধারণা ব্যবহৃত হয়েছিল। এমনকি GEB-এর একজন কর্মকর্তা কৃষ্ণাঙ্গদের “efficiency”-র
জন্য শিল্পশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছিলেন।
এখানেই শিক্ষার আরেকটি অন্ধকার দিক স্পষ্ট হয়:
কাকে কী শিক্ষা দেওয়া হবে— এই সিদ্ধান্তও ক্ষমতার বিষয়।
একজন দরিদ্র শিশুকে যদি বলা হয়, “তোমার জন্য ব্যবহারিক শ্রমের শিক্ষা যথেষ্ট”; আর ধনী পরিবারের সন্তানকে দেওয়া হয় উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান, দর্শন ও নেতৃত্বের সুযোগ— তাহলে শিক্ষা আর সামাজিক বৈষম্য ভাঙার মাধ্যম থাকে না;
বরং বিদ্যমান শ্রেণিবিন্যাসকে পুনরুৎপাদন
করার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
যখন রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে
বিপুল ব্যক্তিগত পুঁজি যুক্ত হয় এবং শিক্ষার লক্ষ্যকে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে ক্রমশ যুক্ত করা হয়, তখন শিক্ষা কি সত্যিই স্বাধীন মানুষ তৈরি করছে, নাকি বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় মানুষ তৈরি করছে?
উপসংহার…

Comments
Post a Comment