ফ্রুক্টোজ এবং ক্যানসার বিস্তার: আধুনিক ক্যানসার গবেষণার একটি নতুন দিগন্ত
অনিন্দ্য পাল
ক্যানসার চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হলো টিউমারের পুনরাবৃত্তি এবং মেটাস্ট্যাসিস (metastasis)—অর্থাৎ শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ক্যানসার কোষের ছড়িয়ে পড়া। সম্প্রতি দ্য উইস্টার ইনস্টিটিউটের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি যুগান্তকারী গবেষণা ক্যানসার বিজ্ঞানে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। ২০২৩-২০২৬ সময়কালের গবেষণার ধারাবাহিকতায় Nature Aging জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় ক্যানসারের পুনরাবৃত্তির পেছনে একটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত অপরাধীকে চিহ্নিত করা হয়েছে—আর সেটা হলো ফ্রুক্টোজ (এক ধরণের শর্করা বা ফলের চিনি)। প্রথাগতভাবে জিন বা প্রোটিনকে ক্যানসার প্রসারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে মনে করা হলেও, এই আবিষ্কার ক্যানসার চিকিৎসায় মেটাবোলাইট বা বিপাকীয় পদার্থের গুরুত্বকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
কেমোথেরাপি এবং 'সেনেসেন্স' কোষের ভূমিকা
সাধারণত ক্যানসার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয় দ্রুত বিভাজিত হওয়া ক্যানসার কোষগুলোকে ধ্বংস করার জন্য। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয় তখন, যখন কিছু ক্যানসার কোষ কেমোথেরাপির হাত থেকে রক্ষা পেয়ে একটি বিশেষ সুপ্ত অবস্থায় প্রবেশ করে, যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় 'সেনেসেন্স' (senescence) বলা হয়।
পূর্বে ধারণা করা হতো যে সেনেসেন্স কোষে পরিণত হওয়া মানেই কোষগুলোর নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া। কিন্তু বর্তমান গবেষণা বলছে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। কেমোথেরাপিতে বেঁচে যাওয়া এই কোষগুলো অত্যন্ত সক্রিয় থাকে এবং আশেপাশের সুস্থ বা অন্য ক্যানসার কোষগুলোর সাথে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন অণুর একটি জটিল মিশ্রণ নিঃসরণ করতে থাকে। এই যোগাযোগের মাধ্যমেই তারা পুনরায় টিউমার গড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে।
ফ্রুক্টোজ: অপ্রত্যাশিত সংকেত বাহক
উক্ত গবেষণার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হলো এই যোগাযোগের মূল বাহক বা মেসেঞ্জার হিসেবে ফ্রুক্টোজ-এর আত্মপ্রকাশ। গবেষকরা প্রি-ক্লিনিক্যাল মডেলে দেখতে পেয়েছেন যে, সেনেসেন্স বা সুপ্ত ক্যানসার কোষগুলো প্রচুর পরিমাণে ফ্রুক্টোজ নিঃসরণ করে।
এই ফ্রুক্টোজ কেবল একটি বর্জ্য পদার্থ নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী জৈব সংকেত হিসেবে কাজ করে।
কোলেস্টেরল দমন: ফ্রুক্টোজ আশেপাশের ক্যানসার কোষগুলোতে প্রবেশ করে সেখানকার কোলেস্টেরলের মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়।
কোষীয় বন্ধন শিথিল করা: কোলেস্টেরল হ্রাসের ফলে কোষগুলোর একে অপরের সাথে আটকে থাকার বা জোড়া লেগে থাকার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
সহজে বিস্তার (মেটাস্ট্যাসিস): কোষের পারস্পরিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ায় ক্যানসার কোষগুলো সহজেই মূল টিউমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রক্তপ্রবাহ বা লসিকাতন্ত্রের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
খাদ্যাভ্যাস এবং ক্যানসার প্রসারের সংযোগ
এই গবেষণার ফলাফল কেবল ল্যাবরেটরির পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার গভীর সংযোগ রয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় ফ্রুক্টোজ গ্রহণ—বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয় (সফট ড্রিংকস) এবং অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার থেকে প্রাপ্ত ফ্রুক্টোজ—শরীরের অভ্যন্তরে এই মেটাস্ট্যাটিক সংকেতগুলোকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
এর মানে দাঁড়াচ্ছে, আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস সরাসরি ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের বিস্তারকে ত্বরান্বিত বা মন্থর করতে পারে। যদিও ফ্রুক্টোজ প্রাকৃতিকভাবে ফলমূল ও শাকসবজিতে থাকে (যা পরিমিত পরিমাণে উপকারী), তবে কৃত্রিম বা উচ্চমাত্রার ফ্রুক্টোজ সিরাপ (High-Fructose Corn Syrup)যুক্ত পানীয় ক্যানসার রোগীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রমাণিত হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ করণীয়: এই আবিষ্কার ওভারিয়ান ক্যানসার (বিশেষ করে উচ্চ-গ্রেড সেরাস ওভারিয়ান ক্যানসার) এবং অন্যান্য কঠিন ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন চিকিৎসার পথ উন্মুক্ত করেছে।
এতদিন চিকিৎসকরা কেবল প্রোটিন এবং জিনের মিউটেশন লক্ষ্য করে ওষুধ তৈরি করতেন। এখন ফ্রুক্টোজ বিপাককে (fructose metabolism) লক্ষ্য করে ওষুধ আবিষ্কারের নতুন পথ তৈরি হলো।
আবার ফ্রুক্টোজ বিপাকের সাথে জড়িত নির্দিষ্ট এনজাইমগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে পারলে টিউমার কোষের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে।
খাদ্যতালিকাগত পরিবর্তন (Dietary Modification): ক্যানসার চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য সুনির্দিষ্ট ডায়েট চার্ট তৈরি করা, যেখানে ফ্রুক্টোজের মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
দ্য উইস্টার ইনস্টিটিউটের এই গবেষণা ক্যানসার গবেষণার প্রচলিত ধারণায় এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে। এটি প্রমাণ করে যে ক্যানসার কেবল জিনের ত্রুটি নয়, বরং এটি শরীরের সামগ্রিক বিপাক প্রক্রিয়া এবং খাদ্যাভ্যাসের সাথে গভীরভাবে জড়িত। ফ্রুক্টোজের মতো একটি সাধারণ অণু কীভাবে ক্যানসারের মতো মারণব্যাধিকে টিকিয়ে রাখতে এবং ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে, তা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে এক নতুন লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যতালিকা এবং মেটাবলিক পাথওয়ে নিয়ন্ত্রণই রোগীর বেঁচে থাকার হার বাড়ানোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
................
তথ্যসূত্র : লাইভ সায়েন্স ম্যাগ
উইকিপিডিয়া, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক।
===============
অনিন্দ্য পাল, চম্পাহাটি, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা।

Comments
Post a Comment