মেঘালয়ের মেঘবালিকা
কুহেলি রায়
গারো খাসিয়া জয়ন্তিকা পাহাড় এগুলি আমরা ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় পড়েছি। কখনো চোখে দেখা হয়নি। সেই পাহাড়ের কোলেই অবস্থিত মেঘালয়। আমাদের ভারতের আরেক রাজ্য যে রাজ্য জলপ্রপাত বৃষ্টি রাজ্য বলেই খ্যাত।
মেঘালয় যাওয়ার জন্য আমরা সকলে মিলে গুয়াহাটি স্টেশনে নামার কথা ছিল কিন্তু আমরা হঠাৎ করেই কামাখ্যার স্টেশনে নামলাম; কারণ আমাদের হোটেল বুক করা ছিল নীলাচল। নীলাচল হোটেলে ওঠার পর আমরা মা কামাখ্যা, প্রেমানন্দ ও একটা দিন পুরো আরো চারপাশের নানান ছোট্ট ছোট্ট বিখ্যাত জায়গা দর্শন করলাম। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের “ভীমা শংকর” আমরা দর্শন করেছিলাম। জানিনা সত্যি সেটা ভীমা শংকর কিনা কিন্তু জায়গাটি ছিল অপূর্ব সুন্দর।তারপরের দিন সকালে গাড়ি নিয়ে চললাম শিলং এর দিকে মেঘালয়ের দৃশ্য অনুভব করব।চার দিনের জন্য একটা গাড়ি বুক করে নেওয়া হল।
শিলং শহর ছাড়তেই আচমকা বদলে গেল দৃশ্যপট। মেঘালয় রাজ্যের অসামান্য দৃশ্যপঠ ক্রমশ খোলা হয়ে গেল। রূপকথার ঘুমন্ত পরীর মতো চারিদিক নিরালা। অলস চোখে চেয়ে থাকবে শুধু কালো পিঠের রাস্তাটা। চারিদিকে পাহাড়ের চূড়াটা যেন কেউ করাত চালিয়ে কেটে রেখেছে। গাড়ির সংখ্যা খুব কম। হঠাৎ আসা একটা ছোট্ট গ্রাম গতির বিপরীতে চলে যাবে নিমেষে। রাস্তায় বড় বড় জনপদ, প্রচুর থাকার জায়গা, খাবার হোটেল এসব চোখে পড়ে না একদমই। চারিদিকে পাহাড় ঘেরা এক নীরব উপত্যকার বুক চিরে ছুটে চলেছে আমাদের সেই গাড়ি। ড্রাইভার দাদার সাথে খুবই সখ্যতা হয়ে গিয়েছিল। পাহাড়ি মানুষের মধ্যে জটিলতা খুবই কম । মুখে হাসি আর কাঁধে একটি ছোট্ট ব্যাগ এই হল তাদের আপামোর সঙ্গী। যেখানেই যাই সে হোটেল বা যেকোনো জায়গায়; প্রত্যেকে মুখে চিবিয়ে চলেছে থিম্পু, আমাদের ভাষায় পান।
প্রথমেই বলি ডাওকির গল্প। একটা ছোট্ট জনপদ। সামান্য খাবার ও কিছু জলের বোতল। পাশাপাশি গাড়ি রেখে আমরা ঢালাই রাস্তা ধরে একপ্রকার 300 সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলাম নৌকা বিহারের জন্য। ঘাটে অনেক নৌকা বাধা। খাসি ও জয়ন্তী আর মাঝখান দিয়ে ডাউকীর চলার পথ। ডাওকীর স্বচ্ছ জলের নিচে দেখা যায় সুন্দর সুন্দর নুরির আলপনা। উপরের নীল, পাশের সবুজ স্বচ্ছ জলে গুলে তৈরি করেছে এক সুন্দর রং, সেই রংটাই মনে ছড়িয়ে পড়ে। জন্ম অকেজো মানুষ ও খুব নিমিষে রোমান্টিক হয়ে ওঠে। আমাদের নৌকা খানিক উজান বেয়ে চলে যাবে এক মনোরম উপল উপত্যকায়। পারে নেমে জলে পা ভেজানোর চপলতা। জল এত স্বচ্ছ যে সব কিছু প্রতিবিম্বিত হবে ছোট্ট বেলার আঁকার মত।। এই সব কিছু যখন আপন মনে চলতে থাকে তখন আমাদের হুশ ফেরালেো মাঝির তারা।
এবার আসি সেই মাওলিলং এর কথাই, এশিয়ার সবথেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গ্রাম।রাস্তাগুলি যেন পটে আঁকা ছবি। সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ছিল সেই গান,”কথা ছিল হেঁটে যাবো ছায়াপথ”। সব রোমান্টিকতার বর্ণনা হয় না, সব আবেগের ভাষা হয় না।
আরেক দৃশ্যপট আমাদের গাড়ি চলেছে লিভিং রুট ব্রিজের দিকে। বটের ঝুড়ি নেমে শিকড় হয়ে একে অপরকে আঁকড়ে ধরেছে পরম আত্মীয়ের মত। তৈরি করেছে নদীর উপর একটি প্রাকৃতিক ব্রিজ। চারিপাশে পরিবেশ অতি সুন্দর এবং বেশ নির্জন। স্থানীয় লোক দ্বারা অঞ্চলটি সংরক্ষিত এবং প্রবেশ মূল্য নির্ধারিত।
এরই মাঝে মাঝে চলেছে ঝরনা জলপ্রপাত দেখা।
সে গল্প তো আর শেষই হয় না। গাড়ি ফিরবে আমাদের স্বপ্নের শিলং পাহাড়ে। ছবির মত সাজানো শিলং পাহাড়ে; এক একটা বাঁক যেন এক একটা প্রেমের কবিতা।।
চেরাপুঞ্জি ও মৌসিন রাম যাওয়ার পথে এবং ফেরার পথে পাইন বোনের দেখা পেলাম। মনে বেঁচে উঠল সেই গান, "শিলং এর পাইন বনে বনে কত গান আছে লেখা দেখো”। উমিয়াম হ্রদ ও শিলং পিক তার ফটিক স্বচ্ছ জল ও চারপাশে সবুজ পরিবেশের জন্য আমাদের কাছে হয়ে উঠেছিল অন্যতম আকর্ষণীয়। যে দি তাকাই চারিদিক পাহারে মোড়া কখনো উপত্যকা সে এক মন ভোলানো দৃশ্য।
অবশেষে আর কি বলি তোমাকে যতই দেখি যতই বলি কথা আর হয়না শেষ; অপেক্ষায় রইলাম আবারও কখনো ফিরব তোমার দেশে! তোমার সাথে হাত ধরে হাঁটবো এই আশা নিয়েই শেষ করি আজকের লেখনী।।
.....................
কুহেলি রায়
সহকারি শিক্ষিকা
আরামবাগ বিবেকানন্দ একাডেমি
জেলা: হুগলী
Comments
Post a Comment