পুঁটুর স্মৃতিচারণা
মৌমিতা চ্যাটার্জী
গল্পটা যাকে নিয়ে শুরু হল, একসময় তার প্রতাপে বাড়ীর একমাত্র কন্যা হওয়া সত্ত্বেও আমার জায়গাটাও বেশ নড়বড়ে হয়ে উঠেছিল। কখনও এই ক্ষোভও প্রকাশ করতাম যে দাঁড়িপাল্লায় আদরের পরিমাপ করলে আমার দিকটাই হয়ত হালকা থেকে যাবে। সেইসময় অনেক বেহিসাবী অভিমান জমত আমার অভিমানী মনের চোরাকুঠুরীতে। আসলে ভালোবাসার একছত্র সাম্রাজ্যের আধিপত্যে অংশীদার কেই বা চায়!
তা, আদরে গোবরে প্রতিপালিত এই চরিত্রটি কিন্তু কোনো রক্তমাংসের মানুষ নন। আদপে তিনি একজন শিষ্ট গোছের মার্জার।
মার্জারকুলের প্রতি আমার স্নেহ, পক্ষপাতিত্ব বরাবরই সারমেয়কুল অপেক্ষা কিঞ্চিৎ অধিক। এই প্রকৃতি আমার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। মায়ের মুখে শোনা আমি যখন কোলের শিশুটি, চুপ করে মার পাশে শুয়ে বিছানায় সুখনিদ্রায় যেতাম তখন জনৈকা এক স্নেহময়ী মার্জারজননী তার একমাত্র স্নেহের শাবককে বুকে আঁকড়ে ঐ একই বিছানায় আমাদের মা বেটির পায়ের কাছে স্থান করে নিত। এ বিষয়ে অনেকেরই বহু আপত্তি ছিল, মূলতঃ ক্ষুদ্র মানবশিশুটির স্বাস্হ্যহানির চিন্তায়। কিন্তু আমার বাবা মা দয়ার্দ্র হৃদয় কখনই তাতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেনি কখনও। আমার মায়ের বক্তব্য ছিল “প্রাণী হলেও সে ও তো মা, আমার সন্তানের অহেতুক ক্ষতি করবে না”। বস্তুত হতও তাই। আমার ছেলেবেলার খেলাধূলার সাথী দের মধ্যে আঠেরটি মার্জারের ভূমিকা ছিল মনে রাখার মত।
যাই হোক, প্রসঙ্গে ফিরি।
পুঁটু নাম্নী সেই পোষ্য মার্জার শাবকটি ছিল আমার ভীষন আদরের। ও আমাদের বাড়ীতে যখন আসে আমি তখন নবমশ্রেনীর ছাত্রী। পৌষমাসের এক ঝড় বাদলের শেষরাতে দরজা খুলে দেখি বারান্দার দরজার পাশে ছোট্ট একটা তুলোর পিন্ড কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। ভিজে চুপচুপে গা। গায়ে হাত দিতেই কুতকুত করে তাকাল। সম্ভবত আগের দিনের ঝড়ের রাতে পথ ভুলে চলে এসেছিল। বয়স আন্দাজ একমাসের কাছাকাছি। ব্যাস্, সেদিন থেকেই তিনি পাকাপাকিভাবে সদস্য হয়ে উঠলেন আমাদের পরিবারের। ছোটো ছোটো খুশী এসে ভীড় জমাতে লাগল ওকে ঘিরে। প্রতিদিন একপোয়া করে দুধ বরাদ্দ হল এই খুদে সদস্যের জন্য। তারপর একপ্রস্থ ছোট্ট থালা বাটি। মা ওকে সাদাভাত খাওয়ানো অভ্যেস করিয়েছিল। ফলে মাছের ঝোলমাখা ভাত তার মোটেই মুখে রুচত না। খেলেও ঐ সামান্য কাঁটা। তাও সবসময় না। আমি বলতাম ভন্ড বিড়াল তপস্বী!
দিন যেতে লাগল। পুঁটু আমাদের মাঝে বেড়ে উঠতে লাগল খুব আদরে।
সাদা ধবধবে দেহে, হালকা হলুদ ছোপ। ওর চোখ দুখানা আর লেজখানা ছিল ভারী আকর্ষনীয়। একটা চোখ নীল, আরেকটা সবুজাভ। ইয়া লম্বা মোটা ল্যাজের জন্য বাবুর কিন্তু গর্বে মাটিতে পা পড়ত না। জাতে হুলো হলেও সে ছিল একেবারে মেনি। প্রথম প্রথম বাইরে বেরনোয় ছিল দারুন অনীহা। প্রাকৃতিক কর্মও তিনি ঘরেই করতেন। তারপর একদিন মা দিল বেদম ধোলাই, একেবারে যেন বাড়ির বিগড়ে যেতে বসা ছোটো ছেলেকে শাসন করা হচ্ছে।তারপর থেকে ঐ কর্মটুকুর উদ্দেশ্য ছাড়া বাকী সময় ঘরেই কাটত শুয়ে বসে। সারাদিন মিউ মিউ করে আমার ও মায়ের পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ানো, যখন তখন কোলে ওঠা, নির্দ্বিধায় বিছানায় ওঠা এসব বিষয়ে তার ছিল অবাধ ছাড়। আমার মেজ জেঠু কনস্ট্রকাশনের কনট্রাকটার ছিলেন। তার একটা মোজাইক মেশিন ছিল। সেই মেশিনের উপর সারাক্ষণ তিনি অবাধে ল্যাজ গুটিয়ে গুটিসুঁটি হয়ে ঘুমাতেন। কেউ বাধা দেবার ছিল না।
আমাকে বাড়ীতে অঙ্ক করাতে আসতেন একজন রাগী মাস্টারমশাই, শমিত স্যার(নাম পরিবর্তিত)। ওনার কথা বলার ধরন, ব্যক্তিত্বে আমি তো আমি মা ও ওনাকে যথেষ্ট সমীহ করে চলত। একদিন অঙ্ক করার সময় আমি যথারীতি গাণিতিক সমীকরণে, বীজগণিতের সূত্রে ভুল করে স্যারের চোখ পাকানোর ভঙ্গীমার সামনে নতজানু।
স্যারের মেজাজ সেদিন সপ্তমে। কিছুতেই থামছেন আর না। ‘পুঁটু’ বোধহয় আমার বিপদ আঁচ করতে পেরে সটান একলাফে স্যারের কোলে উঠে, খুব নরম স্বরে একবার ম্যাঁও বলে নিজের উপস্থিতি জানান দিল। স্যারের তখন ত্রাহি ত্রাহি রব। একটা বনজঙ্গলের বিড়াল, সে কী না সটান কোলে? এসব আদিখ্যেতা তো চলবে না। স্যার বলে গেলেন বেড়াল রাখলে আমি আসছি না আর। সে যাত্রায় আমি পার পেলেও পুঁটু বেদম বকা খেল মা, বাবার কাছে।তারপর থেকে স্যার আসার আগে তেনাকে ঝুড়ি চাপা দিয়ে রাখা হত। ওর মস্ত একটা গুণ ছিল, অন্যায় করে বকুনি খেলে মাথা নীচু করে চুপ করে শুনত। একটি রা ও কাটত না, থুড়ি ম্যাঁও ডাকত না।
ওকে আমি শিখিয়েছিলাম হ্যান্ডশেক্ করতে। চুপ করে বারান্দার গ্রীলের ধারে ভালোমানুষী মুখ করে বসে থাকত আর যে আসত তারদিকেই মাথা ঝুঁকিয়ে, অভিবাদনের ভঙ্গীতে থাবা বাড়িয়ে দিত। সবাই তো অভিভূত! আমার ছোটোমাসী বলত এ তো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া বেড়াল!
দুধভাতের পাশাপাশি কালাকাঁদ সন্দেশ, পায়েস ছিল তার বিশেষ পছন্দের। একবার পেটপুরে পায়েস খেয়ে তার হল বেজায় বদহজম।
সে কী কান্ড! সারারাত বমনকার্য সম্পন্ন করে, হালকা হয়ে ভোররাতে মশারীর মাথায় উঠে সে কী নাচানাচি!
ও যখন একদম ছোটো ছিল, কাগজ পাকিয়ে বল বানিয়ে ওকে খেলতে দেওয়া হত। তারপর একটু বড় হতেই ওর জন্য কিনে আনা হল স্পেশাল স্পঞ্জের বল। খুব পছন্দের জিনিস! সে কারো সাথে ভাগ করা যাবে না। এমনকি আমার সাথেও না। ওটায় একমাত্র বাবা হাত দিতে পারত। রোজ সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে বাবা আলমারির মাথা থেকে ওটা পেড়ে নিয়ে খেলাত। প্রায় আধঘন্টা চলত দুজনের খেলাধুলা। তখন তার কী আনন্দ।
শুধু ঘরকুনোই নয়, সে ছিল মারাত্মক অলস প্রকৃতির। যদি তিনবেলা তৈরী খাবার মুখের সামনে পাওয়া যায় আরশোলা, ইঁদুর শিকারের পরিশ্রমে বিন্দুমাত্র মন বসবে কেন? এমনও হত, চোখের সামনে দিয়ে একটা আধটা আরশোলা পালাচ্ছে, তাঁর কোনো ভ্রক্ষেপও নেই। উনি নির্বিকার!
এ হেন অলস, গৃহকোণ আঁকড়ে বাঁচা প্রাণীটা আস্তে আস্তে বাইরের জগতে পা রাখা শুরু করল, যখন ওর বয়স দেড় বছর। স্বভাবগত কিংবা শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজনেই হয়ত বাইরের হাতছানি ওকে প্রবলভাবে টানত। একসময় এমন হল, বাড়ীতে প্রায় থাকত না বললেই চলে। প্রায়ই মারামারি, দলাদলির শেষে রক্তাক্ত হয়ে বাড়ী ফিরত। ঘরোয়া উপাদানে চলত তার সুশ্রুষা। যে পুঁটু দুধ, সাদাভাতের পিয়াসী ছিল, সে রান্নাঘর থেকে একেবারে না বলে কয়ে প্রায়ই দিনে ডাকাতি শুরু করল। মাছ নিয়ে পালানো, এর ওর বাড়ীতে গিয়ে চুরি করা ইত্যাদি শুরু করল। স্বভাবে এল বিরাট পরিবর্তন। শাসন করলে আঁচড়, কামড় তো আছেই। ওর আঁচড়, কামড়ে কতবার যে রক্তাক্ত হয়ে সূঁচের ফোড় খেতে হত, তার কোনো ইয়ত্তা ছিল না। শেষে ওষুধের দোকানের কাকু বাবাকে একদিন বলেই ফেললেন- “দাদা মেয়ে আগে না বেড়াল?”
আমরা চোখের সামনে দেখছিলাম ঘরের শান্ত ছেলে কেমন বিগড়ে যাচ্ছিল।
একদিন এক চরম অঘটন ঘটল। আমাদের পাশেই ভাড়া থাকত বাবা, মা, বাচ্চা সহ একটি সুখী পরিবার। বাচ্চাটি শখ করে একজোড়া খরগোশ পুষেছিল। রাজা ও রানী। দুধ সাদা, ফুটফুটে খরগোশ দুটি আমাদেরও ছিল বড় পছন্দের। জুটি বেঁধে নির্ভয়ে খেলে বেড়াত ওরা। কিন্তু একদিন এই জুটির ওপর পড়ল শয়তানটার দৃষ্টি। একটা শীতের সকালে নৃশংস ভাবে ঘাড় কামড়ে রাজাকে হত্যা করল ও। রানীর ছলছল, নির্বাক দৃষ্টি সেদিন আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমরা বুঝলাম জানোয়ারটা রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে। ও আর আমাদের শান্তশিষ্ট , নিরীহ ছানাটি নেই।
এভাবেই ধীরে ধীরে এগিয়ে এল শেষের বেলা।
পুঁটু প্রায়ই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জড়াত। আগেই বলেছি রক্তাক্ত হয়ে বাড়ী ফিরত প্রায়ই। একবার একটা বেপাড়ার বেড়ালের কামড়ে মারাত্মক ভাবে জখম হল একটা পা। আমরা বাড়ীতে প্রাথমিক চিকিৎসা করলাম। তাতে আশানুরূপ ফল না হওয়ায় পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হল। উনি ওষুধ দিলেন কিন্তু তাতে কোনো লাভ হল না। দিন দিন ঘা বেড়ে চলল। ধীরে ধীরে খাওয়া ও বন্ধ হয়ে গেল। ওর একসময়ের সেই তাগড়াই গর্বিত চেহারাখানাকে তিলে তিলে হাড় জিরজিরে হতে দেখে আমরা অসহায়ের মত দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জল ফেলতাম। শেষে একদিন রাতে খুব কাঁদল।বাবা উঠে গিয়ে একটু জল মুখে দিতেই প্রাণীটা চিরতরে মুক্তি পেল। অদ্ভুতভাবে সময়টা ছিল সেই পৌষমাস। আড়াই বছর আগে এমনই এক পৌষী ভোরে আমাদের মায়াডোরে বেঁধেছিল আদরের পোষ্যটা।
মায়া অতি বিষম বস্তু। সুদীর্ঘ এই জীবনে কারো সাথে হৃদয়ের অন্তরালে যত্নে লুকোনো মায়ার এক অদ্ভুত, অদৃশ্য বন্ধনে কখনও না কখনও, কোনো না কোনোভাবে আমরা বাধা পড়ে যাই। সে বাঁধন এতটাই অপ্রতিরোধ্য, যে যাবতীয় আক্ষরিক কিংবা গতানুগতিক নামজাদা বন্ধনকে অনায়াসেই প্রতিহত করতে পারে। কেটে গেছে প্রায় তেইশটা বছর। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে বহু অনভিপ্রেত জলধারা। মেজ জ্যাঠা, মা একে একে তারাও চিরস্থায়ী আস্তানা গড়েছে সেই কোন সুদূরে, না ফেরার দেশে। তবুও এতবছর বাদে পুঁটুর স্মৃতিচারণা করতে করতে কতবার যে চোখ ভিজেছে তার হিসাব দিতে পারব না। ঈশ্বরের ভাঙাগড়ার নিয়মে ও হয়ত অন্য কোথাও, অন্য কোনো রূপে জন্ম নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাচ্ছে। ওর সাথে কাটানো প্রতিটা মূহুর্ত বরং স্মৃতিতেই ধরা থাক। শব্দের ঈশ্বরের কথায় ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধা বিদায়ের পাত্রখানি’।
==============
মৌমিতা চ্যাটার্জী
জি.আই.পি কলোনী
জগাছা
হাওড়া 711112

Comments
Post a Comment