হারানো ছাতা
সেখ নাজিরুল ইসলাম
বৃষ্টি হলেই আজকাল আমার পুরোনো ছাতাটার কথা খুব মনে পড়ে।
ছাতাটা এখন আর আমার কাছে নেই। কোথায় হারিয়ে গেছে, সেটাও মনে নেই। শুধু মনে আছে, তার রং ছিল হলুদ। খুব উজ্জ্বল হলুদ নয়—বরং বহু বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া, একটু ফিকে হয়ে আসা হলুদ।
সেই ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে আমরা একদিন অনেকক্ষণ বৃষ্টি দেখেছিলাম। রাস্তার ওপারে ট্রাম চলে যাচ্ছিল, ফুটপাথে মানুষের ব্যস্ততা, আর কফির কাপ থেকে উড়তে থাকা ধোঁয়া।
কলেজ থেকে ফেরার ব্যস্ত ভিড়ের ডানকুনি লোকালে ওঠার সময়, ছাতাটা ঠিক যত্ন করে গুছিয়ে ঢুকিয়ে নিতাম ব্যাগের এক পাশে।
কোনো এক নিম্মচাপের মেঘলা দিনে লোকচক্ষুর আড়ালে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে পড়তাম প্রেমিকার হাত ধরে।
ছাতাটার নিচে যখন পাশাপাশি হাঁটতাম তখন আমাদের হাত দুটো ছুঁয়ে যেত বারবার।
ছোট্ট ছাতায় বৃষ্টির ফোঁটা এড়াতে গিয়ে আমরা আরও কাছাকাছি এসে দাঁড়াতাম।
ছাতা মাথায় হাঁটার সময় সে দুষ্টুমি করে হাতের মধ্যে জল নিয়ে ছিটিয়ে দিত আমার মুখে, আর আমি চলতি রাস্তায় ছাতাটা মুড়ে দিতাম।
সর্দির ধাত আমার। কত বার ভেজা গায়ে বাড়ি ফিরে জ্বর বাগিয়েছি, তার হিসাব নেই।
ছাতাটা যেন ছোট্ট একটা জগৎ। ঠিক যেন মাথার ওপর এক চিলতে ছাদ। যা কিনা লোকজনের ভিড়ের থেকে একান্ত আলাদা করে দিত আমাদের।
কিছু মানুষ জীবনে আসে, তারপর চলে যায়। কিন্তু তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিছু ছোট জিনিস থেকে যায়। একটা গান। একটা রাস্তা। একটা গল্পের বই। কিংবা একটা হলুদ ছাতা। রয়ে যায় চুপটি করে বুকের এক কোণে।
বছর কেটে যায়। মানুষ বদলায়। শহর বদলায়। পুরোনো দোকানের জায়গায় নতুন দোকান আসে। পরিচিত রাস্তাগুলোও একসময় অচেনা লাগে।
শুধু বৃষ্টি বদলায় না।
বৃষ্টি নামলেই মনে হয়, কোথাও একটা হলুদ ছাতা এখনও খোলা আছে। তার নিচে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তারা হয়তো জানে না, এই মুহূর্তটাই একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থেকে যাবে।
কিছু স্মৃতি আসলে আমাদের কাছে ফিরে আসতে চায় না। তারা শুধু দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকে। বৃষ্টি নামলে একটু কাছে আসে, তারপর আবার মিলিয়ে যায়।
হয়তো এটাই স্মৃতির স্বভাব।
তাকে ধরে রাখা যায় না।
শুধু বৃষ্টির শব্দের মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য তাকে অনুভব করা যায়।
--------------------------------
সেখ নাজিরুল ইসলাম
জলামাদুল মণ্ডল পাড়া, চণ্ডীতলা, হুগলী।

Comments
Post a Comment