স্বাধীনতা : স্বাদ-বিস্বাদ
অশোক দাশ
খাঁচায় বাঁধা পাখি ডানা ঝাপটায়। শেকল কেটে সে উড়ে যেতে চায় অসীম নীলাকাশে। বন্ধন মুক্তির স্বাদ কে না পেতে চায়!
আজ পনেরোই আগস্ট দেশের স্বাধীনতা দিবস। ভোর থেকেই বিভিন্ন ক্লাব- বিদ্যালয় -কলেজ থেকে ভেসে আসছে,বিউগেল- ড্রাম আর গ্রামোফোনের আওয়াজ।
অশিতপর পর বৃদ্ধ অলকেশ বাবু একজন প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী। দেশকে স্বাধীন করার জন্য জেল খেটেছেন অনেক অসহ্য নির্যাতন সহ্য করেছেন,
কিন্তু ব্রিটিশ এর কাছে মাথা নত করেননি। আজ তিনি চলৎশক্তিহীন জীর্ণ দীর্ণ।
তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন ভারত সরকারের দেয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পেনশন। এর জন্য সংসারের অন্যান্যদের সাথে মনোমালিন্য কম হয়নি।
বর্তমানে তার সংসারের পোষ্য সংখ্যা পাঁচ জন।
এক ছেলে, ছেলের বউ নাতি-নাতনি ও অলকেশবাবু। একমাত্র ছেলে দিনমজুরি খেটে সংসার প্রতিপালন করে। টানা কদিন নিম্ন চাপের বৃষ্টির জেরে মাঠের কাজ প্রায় বন্ধের মুখে। বাড়িতে খাদ্য সামগ্রী বাড়ন্ত। তাই ছেলেটি কোন ভোর সকালে বেরিয়ে গেছে কাজের সন্ধানে।
বৌমা গেছে পাড়ার মুদির দোকানে যদি কিছু খাদ্যদ্রব্য ধারে পায়।
কিছু সময় পরে বৌমা গজগজ করতে করতে ব্যাগ হাতে গৃহে প্রবেশ করে। ঠিক পিছনেই আনন্দে নাচতে নাচতে হইচই করতে করতে নাতি-নাতনি চলে আসে। তাদের হাতে বিস্কুটের প্যাকেট, লজেন্স, এবং কেক। তারা গিয়েছিল সামনেই ক্লাবের মাঠে স্বাধীনতা দিবসের উৎসবে। ওখানেই ওরা পেয়েছে এই সমস্ত উপহার সামগ্রী।
দাদু, আজ ক্লাবে কেক দিয়েছে, ছোট নাতনি খিল- খিল করে হাসতে- হাসতে বলতে থাকে। আনন্দে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সকালের সোনা রোদ্দুরে র মতো।
দিদিভাই, সবার মুখে হাসি দেখার জন্যই তো আমরা দেশটাকে স্বাধীন করেছিলাম। শ্বশুরের মুখে ওই কথা শুনেই বৌমা বিরক্তিমাখা সুরে বলতে থাকে, থাক বাবা, আর পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। নুন আনতে পান্তা ফুরায় যাদের তাদের আবার স্বাধীনতা উৎসব।
পাশের বাবুদের বাড়ি থেকে ভেসে আসে ইলিশ মাছ ভাজার গন্ধ ,মাংস রান্নার সুবাস। গন্ধে রসনায় জীবে আনে জল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নাতি-নাতনিরা।
বৌমা, দেশটাকে স্বাধীন করতে যারা প্রাণ দিল তাদের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। তাদের প্রত্যাশা ছিল
সব মানুষ খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্যের সমান সুযোগ পাবে। কিন্তু একদল সুবিধাভোগী শাসকবর্গ
সেই স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ করে দিল।
মানুষে -মানুষে বিভেদ -হানাহানি -জাতপাত- অস্পৃশ্যতা -ধর্মের সুড়সুড়ি -খুন -সন্ত্রাস -লুটপাট- ধর্ষণ আজ নিত্যদিনের ঘটনা ।দেশটা ওরা নরক বানিয়ে দিলো।
একদিকে বিলাস বৈভব অপরদিকে অনিকেত বুভুক্ষু মানুষের মৃত্যুর মিছিল।
সুজলা সুফলা সোনার ভারত আজ শ্মশান ভূমি ।
দাদু তোমার চোখে জল,তোমাকে খুব খিদে পেয়েছে তাই না? তুমি কেকটা খাও। নাতি দাদুর চোখের জল মুছে দেয়।
না দাদুভাই, তুমি খাও। তোমরা বড় হও তখন জানতে পারবে কত মহান বীরপুরুষ , কত মহীয়সী জননী-জায়া- দুহিতা এই দেশ স্বাধীন করার জন্য
অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন।
দাদুভাই ,তোমরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তোমরাই পারবে সমস্ত কলুষতা মুক্ত দেশ গঠন করতে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে
তোমরাও বলবে 'যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে সরাবো পৃথিবীর জঞ্জাল
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
......................
অশোক দাশ
ভোজান, রসপুর, হাওড়া ,পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

Comments
Post a Comment