দুরন্ত ও দুর্দান্ত শৈশব
নিশা তালুকদার
আজ আমি লিখতে চলেছি নিজের জীবনের শৈশবের সুন্দর মুহূর্ত। যার মধ্যে কষ্টের পাশাপাশি ছিল বীরত্ব, বাবা মায়ের পাশে থাকার লড়াই। আজ আমি যা তা কেবল আমার অতীতের কঠোর পরিশ্রম বাবা মায়ের আশীর্বাদ।
বয়স তখন ১২ কি ১৩ হবে। ছেলে-মেয়ের মধ্যে তফাৎ আমি বুঝতাম না। বুঝতে দেয়নি কখনো বাবা। সব সময় বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে আমার দিন বেশি কাটতো। বাবা তখন খুব পরিশ্রমী। তিন ছেলে মেয়ের দায়- দায়িত্ব। আমার মাকেও অবশ্যই সারাটাজীবন পরিশ্রম করতেই দেখে গেলাম। ভাই আর আমি তখন বাবার দুই ছেলের মত। সর্বদা বাবার কাজে সাহায্য করতে তৎপর।
বাবার সাথে পুকুর থেকে শাপলা তোলা থেকে শুরু করে, ভানে করে বস্তা ভর্তি মাটি নিয়ে গিয়ে বাড়ি আশেপাশের নিচু জায়গায় উঁচু করা। ইট, বালির কাজ সমস্ত কিছুতেই পারদর্শী। নিজেকে তখন অনেক শক্তিশালী মনে হত।
রোদে পুরে গোবোর দিয়ে ঘুঁটে দেওয়া। যা আজ সবার কাছে কল্পনার বাইরে। মাঠের থেকেই জ্বালানি, সবজি সংগ্রহ করতাম। তখন প্রত্যেক সপ্তাহে মার সঙ্গে মাঠে যেতাম বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি নিয়ে আসতাম। মুসলিম চাষিরা সেই সময় ছিল খুব উদার মনের মানুষ। তাদের মতে " হকলে খাইয়া পইরা বাঁচুক "।
মাঠে ঘুরে ঘুরে লঙ্কা, বেগুন, ধনেপাতা, কলমি শাক, পাট শাক, লাল শাক, পটল, উচ্ছে, ঝিঙে এবং শীতকালীন বাঁধাকপি- ফুলকপি,পালং শাক প্রভৃতি পাওয়া যেত।
বাবা রোজ কাজে যাওয়ার সময় সকালে তিন ভাই বোনকে দু-টাকা করে দিয়ে যেতো। আর সেই দু-টাকায় সেই সময় কত কিছু কিনে খেতাম। আমার অভ্যেস ছিল রোজ শনিবার বাবার সহিত রেশন তুলতে যাওয়া আর দোকান, বাজার পাটে যাওয়া। রেশন নেওয়া হয়ে গেলে স্টেশন সংলগ্ন জায়গায় থেকে ঝুরিভাজা কিনে খাওয়া। নতুন নতুন ছবির ক্যাসেট কিনে আনতাম। আর বাজারে গেলেই সবাই আমায় চিনতো মঙ্গলের মেয়ে বলে। আমি বাইনা জুড়ে দিতাম এটা খাব, ওটা খাব। আমি বাবার আদরের ছোট মেয়ে ছিলাম। কেও যখন আমাকে জিজ্ঞেস করতো মনা কিসে পড়িস? বাবা নির্দ্বিধায় গড়গড় করে বলে যেত খুব বুদ্ধিমান মেয়ে আমার ক্লাস সিক্সে পড়ে। বাবা আমার ব্যাপারে বলতে বলতে গর্ব বোধ করতো। পড়ালেখায় আমি আগাগোড়াই মাঝামাঝি। আমাকে নিয়ে কোনো প্রকার কমপ্লেন কখনো শুনতে হয়নি বাবা-মাকে।
পাড়া প্রতিবেশীর সবার প্রিয় ছিলাম। সবার কাজে সাহায্য করা থেকে শুরু করে, পাশে দাঁড়ানো, সবেতেই ছোটবেলা থেকেই দক্ষ। ২০১৯ সাল পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ছিল ছোটবেলার খুনসুটি, বাবা-মায়ের সাথে সময় কাটানো, বন্ধু বান্ধবীদের নিয়ে মেতে থাকা। কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে সবকিছু বদলে গেছে এখন আমি অনেক বড় হয়ে গেছি। এখন আর মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়ানো হয় না। সেই চঞ্চল মেয়েটা আজ অনেক শান্ত হয়ে গেছে।
বিকেল হলেই তখন সবুজ ঘাসে পা পরতো। বন্ধু- বান্ধবের অভাব ছিল না কোনোদিন। চিন্তা কাকে বলে এই বিষয়ে অজ্ঞাত ছিলাম। আমার মনে পড়ে একবার আমি আর কোনদিন বাড়ি ফিরবো না বলে সারাদিন ঘুরে বেড়াই আমার এক বান্ধবীকে নিয়ে। কি সাংঘাতিক কান্ড, আমি বনবাসি হবার কথা ভাবছিলাম। নেহাতই ছেলে মানুষি বলে সেইদিন মা খুব বকে ছিল। কিন্তু, আজও আমার ইচ্ছে করে। মনে হয় ঘর বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাই। এক অজানা স্রোতে গা ভাসাই। বর্তমানে এটা ভেবেই খারাপ লাগে আর কখনো ফিরে পাবো না সেই দুরন্ত ও দুর্দান্ত দিনগুলো। সবই কেবল রয়ে যাবে স্মৃতির পাতায়।
-----------------------------
নিশা তালুকদার
ঠিকানা: নদীয়া জেলার মদনপুর গ্রাম

Comments
Post a Comment