
লেখা-আহ্বান বিষয়ক
মাখনলাল প্রধান
আজকাল পত্রপত্রিকায়, ফেসবুকে, হোয়াটস অ্যাপে লেখা চাওয়া হয়। খুব কমই দেখি গল্প - কবিতা বা প্রবন্ধের আহ্বান। অর্থাৎ সাহিত্য পত্রিকা 'লেখা ' কথাটা বললে কেমন বেমানান শোনায়। সরাসরি বললে ভাল শোনায় যে গল্প, কবিতা পাঠান। তখন পাঠাবার মালিক ভাবতে বাধ্য হবেন যে গল্প চাওয়া হয়েছে, গল্প - টল্প নয়, কবিতা টবিতা নয়। লেখা ব্যাপারটা সচরাচর সাধারণভাবে হালকা বিষয়কেই ইঙ্গিত করে। আমি বুঝি, লেখা বলতে হাতের লেখা, মক্স করা, রচনা লেখা, ছোটোদের প্রশ্নোত্তর লেখা। হিসেবের খাতা লেখাও এর মধ্যে পড়ে।
না বলে উপায় নেই যে এখন বেশ হিসেব করেই প্রচার করা হয় - শব্দসংখ্যা। আমার মনে হিসেবি হওয়া ভালো, মিষ্টির দোকানে বা মুদিখানায় ওই পরিসংখ্যান ছাড়া চলবেই না।
জীবনের সবক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য, এমনকী সাহিত্যের বেলায়ও বটে। তবে সর্বত্র অ্যাকাউন্টেন্ট হলে তার ফল সব সময় ভালো হয় না শুনেছি। যাকে বলে বায়না দেওয়া বা অর্ডার করা কিংবা বাধ্য করা মাল নিখুঁত কমই হয়। আবার এটাও শুনেছি বড় লেখকদের ওই পত্রিকা শব্দসংখ্যা উল্লেখ করে বলে না, হয়তো বলে ছোট্ট মতন একটা গল্প দেবেন । যদি এমন হয় যে আপনার যতটা সম্ভব এবারের সংখ্যায় ছাপলেন, বেশি বেশি ছাপলেই পত্রিকা হবে নাহলে হবে না এমন কথা তো নেই। অবশ্যই ক্ষেত্র বিশেষে অল্প কথায় কনটেন্টটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে বলাটার উপর জোর দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অসামান্য সব সৃষ্টি হয়েছে। তার অসাধারণ উদাহরণ হল বঙ্কিমচন্দ্রের 'বাবু' প্রবন্ধ। এরকম দ্বিতীয় কোনো সৃষ্টি আমার নজরে আসেনি। অর্থাৎ ব্যাপারটা লেখকের দক্ষতার উপর নির্ভর করে। এটা একমাত্র প্রতিষ্ঠিত লেখকরাই করতে পারেন। আর বাচালতা করার সুযোগ দেওয়া চলবে না। অবশ্যই এ শিক্ষাটা স্কুল জীবনে আমরা অনেক পেয়েছি -- সারসংক্ষেপ লেখা, ভাবার্থ লেখা ইত্যাদি। তবুও যেটা বলতে হয়, তা হল সব সময় সবকিছু হয় না। ক্ষেত্র বিশেষে চলে বা চলা উচিত। বহু আগে শুরু হলেও আজকাল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অণুগল্প ও অণু কবিতা রচনা । যদিও বেশির ভাগই উল্লেখযোগ্য নয় । বরং বলা যায়, এসব ক্ষেত্রে গভীর মনোযোগ দিতে হয়।
আবার এটাও দেখেছি , বেশি সুতো ছাড়লেই ঘুড়ি মাঝ আকাশে উড়তে না উড়তেই মাথা ঘুরে পড়ে যায় মাটিতে। প্রতিটি স্টেপে ঠিক মতো পা না ফেললে ফসকাবেই। এক একজন এমন বলতে শুরু করেন যে, তখন না পড়েই বা অল্প একটু চোখ বুলিয়েই দায়সারা গোছের দায়িত্ব পালন করতে হয়। পাঠককে কখনও আবেগে নয় যুক্তিতে বেঁধে রাখতে হবে। যুক্তিবাদী পাঠক আপনার চির সঙ্গি হতে পারে।
আবার এটাও দেখেছি , বেশি সুতো ছাড়লেই ঘুড়ি মাঝ আকাশে উড়তে না উড়তেই মাথা ঘুরে পড়ে যায় মাটিতে। প্রতিটি স্টেপে ঠিক মতো পা না ফেললে ফসকাবেই। এক একজন এমন বলতে শুরু করেন যে, তখন না পড়েই বা অল্প একটু চোখ বুলিয়েই দায়সারা গোছের দায়িত্ব পালন করতে হয়। পাঠককে কখনও আবেগে নয় যুক্তিতে বেঁধে রাখতে হবে। যুক্তিবাদী পাঠক আপনার চির সঙ্গি হতে পারে।
আমি অস্বীকার করছি না যে প্রতিটি শিল্পের একটি নির্দিষ্ট অবয়ব তার সৌন্দর্যের জন্য অনিবার্য এবং সেটা শিল্পীর নিজস্ব প্রকাশ ভঙ্গিমার উপর অনেকখানি নির্ভর করে। নন্দনতত্ত্বের বিধানের বাইরে যাওয়াও সম্ভব নয়। যেমন ধরুন, রামায়ণ, মহাভারতের আয়তনের সঙ্গে মেঘনাদবধ কাব্যের আয়তনের যে ব্যবধান সেটা বিজ্ঞানসম্মত। একেই কি বলে সভ্যতা সঙ্গে শাজাহান নাটকের আয়তনের পার্থক্য তার বিষয় ও রচনাশৈলী এবং শিল্পের নিজস্ব ঘরানা। সেটাকে কখনো কখনো উনিশ -বিশ করা যায়, তার বেশি নয়। কিন্তু সব সময় নিয়ম ভাঙার মহানুভবতায় গোঁ ধরলে মানাটা খুবই কষ্টকর হয়ে উঠে এবং সেক্ষেত্রে শিল্পের পরিবর্তে শিল্পহীনতাই পরিলক্ষিত হয়। এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাই ভাল বলতে পারেন। আমরা যারা একটু -আধটু লিখি-শিখি তারা এটাই বুঝি লেখাটা যুক্তি ও কল্পনার ভাবনা উৎসারিত সম্পদ । তার সূচনা ও উপসংহার বক্তব্যের শাখা-প্রশাখা পাতা ফুল ফল ঋতুর তোয়াক্কা না করে চলতে পারে না। নানান ঘরানা সৃষ্টির মধ্যে মনোঘরানা বলে একটা সাবজেক্ট আছে, তাকে সব সময় কাজে লাগানোই আমাদের উদ্দেশ্য। শিল্পের নিজস্ব চলন আর অভিব্যক্তি আছে, তার উপর মানুষ কলম ধরে। তবুও বলা হয়, শিল্প কারও কারখানা জাত সামগ্ৰী নয়, তাকে ইচ্ছে মতো তৈরি করা যায় না। অর্থাৎ তার খেয়ালকে আমরা সীমাবদ্ধ করতে পারি না। যদি করা যায়, সেটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা যায় বৈকি। এবং করতে আপত্তি করা উচিত নয়। তাকে স্বাগত জানাই।
কিন্তু যখন অল্প পরিসরে অনেক লেখা ছাপানোর চিন্তা কাজ করে, একসাথে অনেক লেখককে ঠাঁই দেবার ভাবনা মাথায় ঢোকে আর সেটা লেখার উপর কোপ মারতে চায়, তখনই সমস্যা এসে পথ আটকে দাঁড়ায়। যারা এধরনের নির্দেশিকা জারি করেন তারা কেউই সার্থক স্রষ্টার সারিতে দাঁড়িয়ে নেই। এরজন্য প্রচারিত কোনো প্রচেষ্টা নেই। অর্থাৎ নবিশদের উপর এই দায়িত্ব চাপানো ঠিক নয়, অথবা অনেকগুলো লেখা স্বল্প পরিসরে ছাপানোর চেষ্টা মহৎ নয়। মহৎ লেখা অল্পই ছাপা উচিত। পত্রিকার মান মহৎলেখা উপহার দেওয়ার উপর নির্ভর করে। আমার মনে হয় সেদিকে অধিক নজর দেওয়া দরকার। অনেক পত্রিকা রামায়ণ - মহাভারতের মতো শরীর নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে, তারা তবুও নিজেদের লিটল ম্যাগাজিন বলে দাবি করে এবং তাদের সঙ্গে বসে কর্পোরেট মেজাজে দুপা নাচায়। অনুগৃহিত লেখকেরা ধন্য হয় আর কানে কানে কৃতজ্ঞতা জানায়। কৃতজ্ঞতা জানাতে ক্ষতি নেই, কলুপাড়ার ভেতর দিয়ে মার্সিডিস না চালালেই ভাল।
কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম। আসল কথা পত্রিকাগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। সাহিত্য চর্চা ও লেখকদের মধ্যে যুগপৎ একটা আন্দোলনের মানসিকতা থাকা ভাল, সেটা কোনো কোনো বিষয়ের উপর চললে আমার মনে হয় সাহিত্যের ভাল হতে পারে। সেজন্য মনের আবেগটা চেপে রাখতে পারলাম না বলে এতকথা শোনালাম।
................................
Makhanlal pradhan
Sukantapally, boral
Kol -700154
Comments
Post a Comment