অতিরিক্ত সাবান মাখা কি স্বাস্থ্যকর?
গৌতম সমাজদার
আমরা বিভিন্ন কারণে বাইরে বেরোই। ধূলোবালি পোশাক পরিচ্ছদে জমা হওয়ার সাথে সাথে সেইসব ধূলোকণা আমাদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এসে জমা হয়। জামাকাপড় কিছুটা তা রোধ করলেও আমাদের মুখমণ্ডল খোলা থাকায় এইসব নোংরা এসে মুখসহ শরীরে লেগে থাকে। তাই আমরা প্রতিনিয়তই এই ধূলোবালি নোংরার হাত থেকে বাঁচার জন্য যথেচ্ছ সাবান ব্যবহার করি বা করতে বাধ্য হই। এই সাবান আমাদের দৈনিক প্রয়োজন হয়। গায়ে সাবান না মাখলে মনেই হয় না স্নান করেছি। মনও ভরে না। কিন্তু এই সাবান মাখা সাময়িক স্বস্তি দিলেও জানেন কি, সাবান আদৌ মাখা উচিত কিনা? এটা জোরের সাথেই বলা যায়, ত্বক বিশেষজ্ঞরা ও চিকিৎসকরা কিন্তু রোজ সাবান মাখতে বারণ করেন। এক্ষেত্রে কারণ জানলে আপনিও আঁতকে উঠবেন, যদিও আমরা স্নানের সময় সাবান ব্যবহার করি ত্বকে জমে থাকা ময়লা বা জীবাণু ধুয়ে যাওয়ার জন্য। এটা হয়ত ঠিক যে আমরা প্রতিদিন কাজের সূত্রে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের সংস্পর্শে আসি। সাবান মাখলে হয়ত এর থেকে কিছুটা হলেও নিস্তার পাওয়া যায়। বাইরের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস শুধু শরীরের বাইরের অংশে জমে, তা নয়। এগুলো ত্বকের ছিদ্রের মধ্যেও জমতে থাকে। সাবান এটা পরিষ্কার করে দেয় কিছুটা। কিন্তু উল্টো ছবিটাও আছে। আমাদের শরীরে ত্বকের ওপর প্রচুর পরিমাণে মাইক্রো অর্গানিজম থাকে। এই উপকারী মাইক্রো অর্গানিজমগুলো ত্বকের রোগ প্রতিরোধী স্তর তৈরী করে। বারবার সাবান মাখলে এই মাইক্রো অর্গানিজমগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এগুলো নষ্ট হয়ে গেলে ত্বকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
মনে রাখতে হবে, শরীরের এই ত্বক দেহের সবচেয়ে বড় রোগ প্রতিরোধী অঙ্গ। এটি ঢাল হয়ে শরীরের ভিতরের বিভিন্ন অঙ্গকে রোগের হাত থেকে বাঁচায়। বারবার বেশী বেশী করে সাবান মাখলে ত্বকের স্বাভাবিক তেল বা সিরাম কমে গিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই তৈলাক্তভাব কমে গেলে ত্বকে এগজিমা ও সোরিয়াসিসের মতো চর্মরোগ দেখা দেয়। মনে রাখতে হবে সাবান একদিকে যেমন সংক্রমণ প্রতিরোধ করে, তেমনই বেশী ব্যবহার করলে আবার ত্বকের সংক্রমণও ডেকে আনে। সপ্তাহে সাত দিনই আমরা গায়ে সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করি। সুগন্ধি সাবানে প্রচুর পরিমাণে কেমিক্যাল থাকে যা ত্বকের ভীষণ ক্ষতি করে। রোজ সাবান মাখলে ত্বক মারাত্মক খসখসে ও শুষ্ক হয়ে যায়। ত্বকের এই নিজস্ব আর্দ্রতাকেও এই সাবান নষ্ট করে দেয় যা পরিণামে ত্বকের ক্ষতি করে। গবেষণায় জানা যায় অতিরিক্ত সাবান ব্যবহারে ত্বকের পি. এইচের মান পরিবর্তন করে। ত্বকের আদর্শ পি. এইচের মাত্রা হল ৫.৫। সাবানের এই ক্ষারীয় মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ, যা ৯, যা ত্বকের পি. এইচ মাত্রা বদলে দিতে পারে এবং অচিরেই ত্বকের প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা নষ্ট করে দেয়। দেখা গেছে গৃহবধূরা আমাদের দেশে রান্না থেকে কাপড় ধোয়া পর্যন্ত সমস্তরকম কাজের ক্ষেত্রে সাবান ব্যবহারে অভ্যস্ত।
এই অতিরিক্ত সাবান ব্যবহারের ফলে তাদের হাতে এক ধরণের একজিমা হয়, যাকে বলে 'হাউস ওয়াইফস একজিমা'। আবার সাবান থেকে হতে পারে 'সোপ ডার্মাটাইটিস'। অ্যাটোপিক একজিমা দেখা যায় শিশুদের মধ্যে। দেখা গেছে সাবানের ব্যবহার কমালে এই রোগও কমে যায়। মনে রাখতে হবে, তাই বলে সাবান মাখা সম্পূর্ণ বন্ধ করা যাবে না। কারণ তাহলে ত্বকের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে ত্বকের কোন সমস্যায় মলম ব্যবহার করলে তা ত্বকের ভেতরে পৌঁছবে না। সাবান অল্প ব্যবহার করতে হবে। স্নানের পরে ত্বকে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। তাহলে সাবানের উপকারও পাওয়া যাবে, আবার ত্বকও শুষ্ক হয়ে যাবে না। আমরা জানি বয়ঃসন্ধিকালে মুখে সিরাম উৎপাদন হয় বেশী। সেই সময় তেল চিটচিটে মুখ থেকে মুক্তি পেতে অনেককেই সাবান দিয়ে ঘন ঘন মুখ ধুতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে দিনে একবারই মুখ ধোয়ার কথা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন।
এছাড়া সোপ ফ্রি ক্লিনজার নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সাবান কেনার সময় ফ্যাটি ম্যাটার পরখ করে নিতে হবে। এটা যত বেশী, সাবানের মান তত ভাল। তাতে এই সাবান মুখে মাখলে ত্বকের ক্ষতির সম্ভাবনা কম। সেক্ষেত্রে গ্লিসারিন, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড, নিয়ামিনামাইড কিম্বা ইউরিয়া দেওয়া তরল সাবান ব্যবহার করা যেতেই পারে। গায়ে মাখার সাবানের মেয়াদ ঠিক আছে কিনা দেখে নিতে হবে। নাহলে মাসের পর মাস অথবা বছর ধরে একই সাবান গায়ে মাখা উচিত নয়। যেকোন প্রসাধনীরই মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে, যেটি মোড়কের গায়ে লেখা থাকে। কিন্তু তা দেখে নিতে আমরা ভুলে যাই। রেখে দেওয়া সাবানকেসে যেন জল জমে না থাকে। তাতে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের জন্ম হয়, যা ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। তাহলে সাবান বদলে নিতে হবে। আতঙ্ক বা ভয় নয়, সতর্ক থাকুন, উজ্জ্বল ত্বকের মালিক হোন।

Comments
Post a Comment