পদ্মপুকুরের নীল চিঠি
বিপ্লব গোস্বামী
শহরের একেবারে শেষ মাথায় পদ্মপুকুর গ্রাম। টিনের চাল, উঠোনে তুলসীমঞ্চ, পেছনে বাঁশঝাড়, সামনে একফালি পুকুর। সেই গ্রামের মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে নীলাঙ্কী। বাবা রিটায়ার্ড প্রাইমারি মাস্টার, মা বাড়ি বাড়ি টিউশনি করে সংসার চালান। অনেক কষ্টে উচ্চমাধ্যমিকটা পাশ করেছে নীলাঙ্কী। বই পড়তে ভালোবাসে, স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, কিন্তু স্বপ্নের দাম মেটানোর সামর্থ্য নেই।
আর রাহুল? সে শহরের চৌধুরী বাড়ির একমাত্র ছেলে। দোতলা বাড়ি, বাগান, গাড়ি, দারোয়ান। ছোট থেকে ইংলিশ মিডিয়াম, দিল্লি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং, কথায় কথায় “ইউ নো”, “অ্যাকচুয়ালি”। পদ্মপুকুরে ওদের একটা পুরোনো বাগানবাড়ি ছিল। গরমের ছুটিতে রাহুল সেখানে আসত, দামি পারফিউমের গন্ধে ভরে যেত গ্রামের বাতাস।
সেই বাগানবাড়ির পাশের বকুলতলায় প্রথম দেখা। নীলাঙ্কী বই হাতে বসে, পরনে নীল ছাপা শাড়ি, কপালে ছোট্ট টিপ, চোখে কাজল, হাতে কাচের চুড়ি। রাহুলের বুটজুতো থমকে গিয়েছিল। শহুরে ছেলের বুকের ভেতর গ্রামের মেয়ে নীল কালিতে নাম লিখে দিয়েছিল।
তারপর দশটা বসন্ত। ছুটি পেলেই রাহুল ছুটে আসত পদ্মপুকুরে। নীলাঙ্কীর হাত ধরে সুরমার পাড়ে হাঁটা, বৃষ্টিতে ভিজে ফুচকা খাওয়া, জ্যোৎস্না-রাতে ছাদে বসে ভবিষ্যতের সংসার সাজানো। নীলাঙ্কী ভয় পেয়ে বলত, “তুমি তো বড়লোকের ছেলে, আমি গরিব ঘরের মেয়ে। আমায় ভুলে যাবে না তো?” রাহুল নীলাঙ্কীর আঙুলে আঙুল জড়িয়ে বলত, “এই হাত আমি ছাড়ব না। ঝড় হোক, জল হোক, সমাজ হোক, ছাড়ব না।” নীলাঙ্কী বিশ্বাস করত। গরিব ঘরের মেয়েরা অল্পেই বিশ্বাস করে, আর বিশ্বাস ভাঙলে পুরোটা ভেঙে যায়।
এক শ্রাবণ-সন্ধেয় রাহুল নীলাঙ্কীকে নিয়ে গিয়েছিল সুরমার ঘাটে। জলের ওপর আঙুল দিয়ে লিখেছিল, “রাহুল+নীলাঙ্কী=অনন্ত”। ঢেউ এসে মুছে দিয়েছিল। নীলাঙ্কী হেসে বলেছিল, “জলে লিখলে কি মোছেবে না? বুকের ভেতর লেখা থাক।” রাহুল সেদিন নীলাঙ্কীর কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল, “এই কপাল আমার। এই জীবন আমার।”
তারপর এল সেই দিন। রাহুলের চাকরি হল ব্যাঙ্গালোরে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, লাখ টাকা মাইনে। যাওয়ার আগে নীলাঙ্কীর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে রাহুল বলেছিল, “দু’বছর, শুধু দু’বছর। প্রজেক্টটা শেষ হলেই এসে মা-বাবাকে রাজি করিয়ে তোমায় নিয়ে যাব। তুমি শুধু অপেক্ষা করো, পাগলি।” নীলাঙ্কী আঁচলে মুখ লুকিয়েছিল।
দু’বছর গড়িয়ে পাঁচ বছর হল। প্রথম ছ’মাস চিঠি আসত, রাত জেগে ফোন আসত। তারপর কমতে কমতে একদিন বন্ধ হয়ে গেল। শুনেছে রাহুল এখন বড় সাহেব। বিশ তলার ফ্ল্যাট, কাচের জানালা, ঝাড়বাতি, কর্পোরেট পার্টি, ফিরিঙ্গি কলিগ। বাংলা বলতে লজ্জা পায়, নীলাঙ্কীর নামটা মনে আছে কি না কে জানে।
আর নীলাঙ্কী? সে এখনও পদ্মপুকুরে। বাবা শয্যাশায়ী, মায়ের চোখে ছানি। গ্রামের বাচ্চাদের টিউশনি পড়িয়ে, সেলাই করে সংসার টানে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ মেয়ের কপালে এর চেয়ে বেশি কী জোটে? রাত হলে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে, আর নীলাঙ্কীর বুকের ভেতর নোনা জল জমে।
নীলাঙ্কী কিছুই ফেলতে পারেনি। চায়ের কাপের কানায় রাহুলের ঠোঁটের ছোঁয়া, রুমালে রাহুলের গায়ের গন্ধ, নীল ডায়েরির ভাঁজে রাখা সেই চিঠি—যেখানে নীলাঙ্কী ‘ভালোবাসি’ লিখতে গিয়ে ‘ভালোবাশি’ লিখে ফেলেছিল, আর লজ্জা ঢাকতে কোণায় এঁকেছিল একটা কাঁপা গন্ধরাজ। রাগলে নীলাঙ্কীর কপালে তিনটে সরু নদী জাগত, রাহুল আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে বলত, “এই নদীতে আমি রোজ সাঁতার কাটব।” রাত তিনটেয় নীলাঙ্কীর ঘুম না এলে রাহুল বলত, “ঘুমো পাগলি, আমি তোর পাহারাদার, তোর আকাশ।”
এখনও মাঝরাতে নীলাঙ্কী মোবাইলে চোখ রাখে। মনে হয়, এই বুঝি রাহুলের এসএমএস আসবে। সে ভাবে হয়তো রাহুল আসবে। দরজা ঠেলে রাহুল হাসিমুখে বলবে, “সারপ্রাইজ! দেরি হয়ে গেল, কিন্তু কথা রাখলাম। তোর জন্য কামরাঙা এনেছি, আর এনেছি নীল বেনারসি। চল, কালই বিয়ে।” কোনো শব্দ হয় না। শুধু নীলাঙ্কীর নিঃশ্বাস ফিরে এসে তারই বুকে ধাক্কা খায়।
লোকে বলে, গরিবের মেয়ের স্বপ্ন দেখতে নেই। সময় সব ভুলিয়ে দেয়। নীলাঙ্কীর সময় থমকে আছে রাহুলের যাওয়ার দিনটায়, পদ্মপুকুর বাসস্ট্যান্ডে। দশ বছরের বিরহে সে দশবার ছাই হয়েছে, দশবার জন্ম নিয়েছে। আর রাহুল?সে নতুন বারান্দায় বেলি ফুলের টব সাজায়, নতুন পর্দার রং বাছে, নতুন মেমসাহেবের সঙ্গে কফি খায়, পাস্তা রাঁধে।
তবু নীলাঙ্কী অভিশাপ দেয় না।পদ্মপুকুরের জলে পা ডুবিয়ে শুধু প্রার্থনা করে, “যে মেয়েটা রাহুলের হাত ধরেছে, সে যেন ওর চোখের ভাষা পড়তে পারে। আমার মতো যেন মাঝরাতে বালিশ ভেজাতে না হয়। ‘ভালোবাসি’ শব্দটা যেন তার কাছে শুধু স্ট্যাটাস আপডেট না হয়, যেন একটা গোটা সংসার হয়। ওর হাসির আড়ালে যে ক্লান্তি, সেটা যেন ও মুছিয়ে দিতে পারে।”
নীলাঙ্কী আর গাছ হতে চায় না। গাছেরা বড় তাড়াতাড়ি ভোলে। শীত পাতা ঝরায়, বসন্ত নতুন পাতা আনে। সে এবার পদ্মপুকুরের নরম কাদা-মাটি হবে। রাহুলের ফেলে যাওয়া সব অভিমান, সব না-পাঠানো চিঠি, সব চাপা দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে পচবে, গলবে, সার হবে। সেই সারে ফোটাবে থোকা থোকা সাদা গন্ধরাজ। একদিন যদি রাহুল দামি গাড়ি করে এই গ্রামে আসে, তার যাওয়ার পথে গন্ধ হয়ে লেগে থাকবে নীলাঙ্কী। ক্ষমার চেয়ে বড় ভালোবাসা আর কী আছে?
ভুলে যাও, রাহুল। তোমার ভুলে যাওয়াটাই নীলাঙ্কীর মনে রাখার কারণ। উচ্চমাধ্যমিক পাশ গরিব ঘরের মেয়ের এইটুকুই প্রেম, এইটুকুই ঋণ। সে জন্ম-জন্মান্তর ধরে শোধ করবে। সুদের হিসেব নেই, লাভ-লোকসানের খাতা নেই।
তুমি ভালো থেকো, রাহুল। ব্যাঙ্গালোরের রোদে পিঠ দাও, এসি-র হাওয়ায় ঘুমোও, প্রাণ খুলে হাসো। নীলাঙ্কী নুনজলে জেগে থাকবে। কারণ ভালোবাসা মরে না। সে শুধু চোখের কোণে এসে নোনা অক্ষরে স্বাক্ষর রেখে যায়। গাল বেয়ে যে জল নামে, লোকে তাকে কান্না বলে। নীলাঙ্কী জানে, ওটা কান্না নয়। ওটা রাহুল। ওটা দশ বছরের প্রতিশ্রুতি।
আজও রোজ রাতে নীলাঙ্কী পদ্মপুকুরের সবচেয়ে উঁচু তালগাছটার নিচে দাঁড়ায়। হাওয়ার হাতে তুলে দেয় একটা না-লেখা চিঠি। যদি কোনোদিন ভুল করে সেই চিঠি রাহুলের বিশ তলার জানালায় গিয়ে পড়ে, রাহুল কি একবার নিচের দিকে তাকাবে? দেখবে, শহরের শেষ মাথায় একটা গ্রামের মেয়ে, একটা ভাঙা ঘর, একটা তুলসীমঞ্চ আর এক বুক নুনজলের স্বাক্ষর নিয়ে আজও তার নাম ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

Comments
Post a Comment