জোনাকি
অদিতি চ্যাটার্জি
কোলাপসিবল গেটটা খুলতে খুলতে ঋতু টের পায় তাঁর একতলার ফ্ল্যাটের ভেতরে খেলে বেরাচ্ছে কচি গলায় গাওয়া ' আমরা সবাই রাজা.." কলিং বেলটা একবার বাজিয়ে ভাবে, নিশ্চয়ই টুয়া এই গানটা আজ স্কুলে শিখেছে।
"মামমাম ..." ছোট্ট মানুষটা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেছে ঋতু কে। নরম রেশম রেশম চুলে নাক ডোবায় ও, বুকে ভরে গন্ধটা নেয়, ফিসফিস করে বলে " আমার সোনা, আমার ছোট্ট পাখি, আমার মা ।"
"টুয়া রাণী , মা সবে অফিস থেকে এসেছে, ছাড় মা কে। ঐ দ্যাখো তোমাকে দেখে ভেটকুটা কেমন বৌদির পায়ের তলায় চলে গেল !
বৌদি ভেটকু কিন্তু খুব হিংসুটে হচ্ছে ".. হি হি হা হা" সবিতার আর হাসি থামতেই চায় না , এই বাড়ির বহু পুরোনো লোক, কাছেই থাকেন ঋতু বাড়িতে ফিরলে তবে ছুটি । টুয়ার সবিতা মাসি।
"সবিতা দি এক কাপ চা করো প্লিজ আর টুয়ার দুধটাও দাও। আমি পাঁচ মিনিটে আসছি। " ভেটকু আর মেয়ে আলতো করে ঠেলে সরিয়ে হাসতে হাসতে ঋতু বেডরুমের দরজাটা খোলে।
আলোটা জ্বালতেই চোখে পরে পরমার হাসি মাখা মুখ ছোট্ট টুয়া কে কোলে । ওড়নাটা দিয়ে বোনের ছবিটা পরিষ্কার করে ঋতু। ফিসফিস করে বলে , " বোন তুই জীবনের সেরা উপহারটা দিলি আমাকে কিন্তু এইভাবে যে পাবো সত্যি ভাবিনি রে। থ্যাংক ইউ .." ছোট্ট করে মনে হল পাঁজরে কে যেন চিমটি কাটল। সত্যি সুখ কে পেতে গেলে কেন যে এতো মূল্য দিতে হয় !
পরমা ছিল, ঋতুর একমাত্র ছোট বোন, টুয়া যখন বছরখানেকের অ্যাপেনডিক্সটা ওর বাস্ট করে। সব কাজ মেটার পর অয়ন, টুয়ার বাবার তখন দিশেহারা অবস্থা । গুরগাঁও তে তো ঐ বাচচা নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই নেই, কলকাতায় বুড়ো বাবা মা কীভাবে সব সামলাবে...
এখনও মনে করতে পারে না কীভাবে টুয়া, পার্থ আর ঋতুর কোলে করে এই ফ্ল্যাটে আসলো, আসলে ও মনে করতেই চায় না । বোধহয় মা কী বাবা প্রস্তাবটা দিয়েছিল, বড় মেয়ের ঘরে টুয়া কে দিতে। কে জানে হয়তো ওরাও ভয় পেয়েছিল অয়ন যদি আবার বিয়ে করে অথবা অয়ন যদি আর যোগাযোগ না রাখে ! বাচ্চাটা তো পুরোপুরি জীবন থেকে হারিয়ে যাবে, মানুষের মন কে কে কার সহজে বুঝতে পারে ?
তবে সেই ঘটনারও তো প্রায় চার বছর হতে চললো, "অয়নটার মনে কী আছে জানি না, তবে টুয়া আমাদের মেয়ে, ব্যস।" দাঁতে দাঁত পেষে ঋতু ।
"মামমাম হলো তোমার?"
ঋতুর খেয়াল হয় বড্ড সময় নিয়ে ফেলছে, তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢোকে । কষে চোখে মুখে জলের ছিঁটে দিতে দিতে ভাবে এই একটা কাঁটা নিয়ে পার্থ আর ঋতু কে প্রায় চার বছর থাকতে হচ্ছে আইন মাফিক তো দত্তক ওরা এখনো টুয়া কে নেয়নি। বলা ভালো চক্ষু-লজ্জার খাতিরে বলতেই পারেনি তাই খাতায় কলমে অভিভাবক হয়ে আছে অয়ন এখনো । " ইসস অয়নটা যদি আবার বিয়ে করে তাহলে দত্তক নেওয়ার কথা বলতে কোনো সমস্যাই হতো না । কী যে ভাবছে কে জানে! " আবারও কেউ যেন পাঁজরে চিমটি কাটলো ।
"মামমাম গো....." নাহ্ এখন আর আবোলতাবোল চিন্তা নয়, মাথাটা ঝাঁকিয়ে নেয়, এদিকে কচি গলার তারস্বরের চিৎকারে বুঝি পাড়া এইবার জড়ো হল বলে , এ বড় সুখের সময় টুয়ার মা'র কাছে । হাসতে হাসতে ঋতু বলে,
"দাঁড়া রে ", ভয়টা তোয়ালে দিয়ে মুখ মোছার সাথে মুছে ফেলে টুয়ার ' মামমাম '।
বাইরে এসে দেখে টেবিলে রঙের বাক্স, ভেবলি পুতুলটা খাবার টেবিলে গড়াগড়ি খাচ্ছে, সোফায় ভেটকু কে কোলে নিয়ে বসে টুয়া রাণী।
" এ কি টুয়া দুধটা খাও নি তো ?"
"মামমাম চকলেট বিস্কুট টা আগে দাও। প্রমিস করেছিলে তো।"
দরজাটা বন্ধ করে রান্নাঘরে যায় ঋতু , কানে আসে টুয়া ভেটকু কে বলছে "লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে দুধটা খেয়ে নাও , আমি তোমাকে একটা রাইমস শোনাচ্ছি .."
"আহ্ ঈশ্বর তুমি সত্যি করুণাময়, টুয়া কে পাঠিয়ে আমাদের জীবনটাকে আলোয় ভরিয়ে দিয়েছো।"
পার্থ কে জড়িয়ে যখন টুয়া ঘুমায় সেখানে কোনো অয়ন থাকে না । বাবাই ডাকতে শিখিয়েছে মেয়ে কে পার্থ । ' বাবা' ডাকটা নাহয় অয়নের জন্যই রইলো।
"চলো এইবার দুধটা শেষ করো, সাতটা বাজতে চললো কিন্তু! " চোখটা একটু বড় করেই তাকায় মেয়ের দিকে। মেয়ে তো জোনাকি সে সারা বাড়িটা আলো করে দৌড়ে বেড়াচ্ছে এখন , আপনমনেই হাসতে থাকে ঋতু, তাঁর বুকের মধ্যে টুপটাপ করে জুঁই ফুল খসে পড়ছে, সেই সুগন্ধে মগ্ন এখন ঋতু।
দেওয়ালে, ফোনের স্কিন সেভারে হাসছে ' পার্থ-টুয়া-ঋতু।'
এখনো কোথাও অয়ন নেই ।
Aditi Chatterjee
Ranaghat, Nadia

Comments
Post a Comment