একটা মেয়ে-মানুষের শরীর
উত্তম ভট্টাচার্য
'দাদা আমি একটু মারব?'
ভিড় ঠেলে অল্প বয়সী এক কলেজ ছাত্রীর আর্তি! এবং অনুমতি আদায়ের আগেই একেবারে সপাটে চড়! ঠিক জানোয়ারটার দক্ষিণ গালে।
তারপর পরপর ওগালে, এগালে, দু'গালেই!
জানোয়ারটা দেখতে ঠিক মানুষের মত! পকেটে তিনতিনটে দামি কম্পানির পেন, বিদেশি দামি কম্পানির ফুলহাতা শার্ট, প্যান্ট,দামি জুতা পরে জানোয়ারটাকে ঠিক মানুষের মতোই দেখতে লাগছিল।
সিস্টেমের ছকে একজন অঙ্কের প্রফেসর! জানোয়ারটার কামনা শক্তি নাকি ভীষন প্রবল।
জানোয়ারটা নারীর শরীর পেতে চায়। প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন মেয়েমানুষকে নিয়ে মত্ত থাকতে চায় জানোয়ারটা। নিজের পদাধিকার বলে ক্লাসে ফেল করানোর ভয় দেখিয়ে, কলেজ থেকে বের করে দেবার হুমকি দিয়ে, অশ্লিল ছবি পাঠিয়ে-জানোয়ারটা কামনা শক্তি মেটায়!
মেয়েটা তারই কলেজের নির্যাতিতা এক ছাত্রী! হতদরিদ্র ঘর থেকে উঠে আসা অত্যন্ত মেধাবী অসহায় ছাত্রীটা প্রায় প্রতিদিনই জানোয়ারটার শিকার!
এতোদিন ধরে কিচ্ছু করতে পারছিল না মেয়েটা। বারবার জানোয়ারটার লালসার শিকার হয়েছে সে।
দরজায় দরজায় কড়া নেড়েও কোনো রকমের পাত্তা পায়নি মেয়েটা। তোয়াক্কাও করেনি কেউ মেয়েটার বুকচাপা আর্তনাদের।
অসহায় হয়ে বন্ধু বান্ধবদের জানিয়েছে, প্রিন্সিপালকে জানিয়েছে এমনকি পুলিশ এবং পুলিশমন্ত্রীকে পর্যন্ত জানানোর হুমকি দিয়েছে মেয়েটা! তবুও কোনো রকমের সুরাহা হয়নি আজও। উল্টে, দিনের পর দিন তাকেই হুমকির পর হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে। পুলিশকে জানালেই বা সংবাদমাধ্যমে খবর রটালেই জানোয়ারটার থেকে ভয়ানক আর কেউ হবে না! একেবারে জীবন্ত কবর দেবে বলে হুমকি দিয়ে গেছে সে। বডিরও কেউ কোত্থাও হদিস জানতে পারবে না। আর জীবনে পড়াশোনা করার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
ফলে, মেয়েটা কুঁকড়ে যেত জানোয়ারটার ভয়ে।
দীর্ঘদিনের সেই ক্ষোভ আর ঘৃণায় কাঁচা দগদগে ঘায়ের মত আজও তার মন সূচের মত খচখচ করে বিঁধছিল আর আগুনের মতো চিনচিন করে পুড়ছিল!
আজ এতদিন পর কলেজের ছাত্রছাত্রীর হাত ধরে একেবারে সাধারণ মানুষের হাতে এসে পড়েছে জানোয়ারটা। একেবারে কোমড়ে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে ঘোরানো হচ্ছিল জানোয়ারটাকে।
মানুষ আজ যেন আক্ষরিক অর্থেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। এর উপযুক্ত শাস্তি চান তারা। তাই একেবারে ঝাঁকে ঝাঁকে লোক মৌমাছির মত ঘিরে ধরেছিল জানোয়ারটাকে দেখতে।
তাই দেখে আর স্থির থাকতে পারেনি মেয়েটা। একেবারে একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে ছুটে গিয়ে মৌমাছির চাকটা সরিয়ে দিয়েই একটা ছোট্ট আর্তি করেছিল-দাদা, আমি একটু মারব!'
তারপর অনুমোদন এর অপেক্ষা না করেই ফটাফট দুগালে থাপ্পরের পর থাপ্পর বসাতে লাগল।
তাকে দেখে উৎসাহিত হয়ে উত্তেজিত একঝাঁক মৌমাছির চাক হতেও তেড়ে এলো আবেদনটা। একে ছাড়বেন না দাদা, এর কঠিন সাজা হওয়া দরকার। জানোয়ারটার এতে কিচ্ছু হবে না, একে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন দাদা, এর উপযুক্ত মলমের ব্যবস্থা করা দরকার।
ফলে, আবারও উৎসাহিত সকালের মধ্যে নতুন করে আলোড়ন পড়ে গেল। সকলে মিলে একসাথে কলরব সহকারে নিজের নিজের মনের ক্ষোভ আর জ্বালা মেটাতে উঠেপড়ে লেগে গেল। চিৎকার করে উঠল- এই 'শুয়োরের বাচ্চা'! তোর মা-বোন নেই বুঝি ঘরে?'
বলেই আবার উদোম ক্যালানি! কিল,চর, ঘুষি! কেউ বা ছুঁড়ছে ঝাড়া দু'পায়ে লাথি! ফলে, দশদিক হতে দশ হাতে ধোলাই খেতে খেতে জানোয়ারটা এবার কেঁদেই ফেলল, আর কাঁদতে কাঁদতে হাত জোড় করে কী যেন একটা বলতে যাচ্ছিল।
শুধু এইটুকু বুঝা গেল- 'আমার ভুল হয়ে গেছে, আর এমন হবে না!'
অমনি ছাত্রী সেই মেয়েটা চিৎকার করে উঠল- সাবধান, খবরদার দাদা, এ হারামির বাচ্চাটা সাধারণ কেউ নয়-কেউকেটা দাদা, কেউকেটা!শাসকদলের কেউকেটা। ছাড়া পেলেই বেটা আবার আমার জীবন হেল করে দেবে।
প্লিজ একে ছাড়বেন না দাদা।
কিন্তু, সেটা আর সম্ভব হলো না। তাদের কারোরই পক্ষেই আর জানোয়ারটাকে বেশিক্ষণ ধরে রাখা সম্ভব হলো না।
কোথা থেকে একপাল সসস্ত্র হুলিগানদের সঙ্গে নিয়ে গোটা পনেরো কুড়ি ঊর্দিধারীর দল ঝাঁপিয়ে পড়ল জনতার সেই ঢলে। এবং শকুনের মত মস্ত বড়ো বড়ো ডানা মেলেধরে ছোঁ মেরে নিমিষেই ছিনিয়ে নিল সেই জানোয়ারটাকে!
তারপরই শুরু হলো এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ!
প্রথমেই লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করল মৌমাছির চাকের মতো ঘিরে ধরা মানুষগুলোকে।
তারপরই যারা 'আইন নিজের হাতে নিয়ে' জানোয়ারটাকে পথে টেনে নামিয়েছিল তাদের উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় 'সবক' শেখাতে লাগল।
লাল রং দেখলে ধর্মের ষাঁড়েরা ভয় পায় জানা ছিলসবার। কিন্তু, ওরা কেন ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মত ছেলেমেয়েগুলোকে এলোপাতাড়ি মারতে শুরু করল তার সঠিক কারণ জানা ছিল না। ছেলেমেয়েগুলোর হাতে কোনো নির্দিষ্ট রং এর ঝান্ডাও তো ছিল না।
তবুও.....
হুলিগানদের টার্গেট ছিল কিন্তু ওই কলেজ ছাত্রীটা। পুলিশ পুলিশের মতো ছোঁ-মেরে জানোয়ারটাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলেও হুলিগানের দল কিন্তু ছাড়ল না ছাত্রীটাকে। তারা প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে সকলের চোখের সামনে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে টেনে নিয়ে চলল মেয়েটিকে।
ওড়নাটা টেনে খুলে দিল একজন। আরেকজন ঘাড়ে হাত রেখে হুমকি দিল- 'তোর কিচ্ছু হবে না, চল আমার ঘরে চল।'
কেউবা পিছনে কোমরের উপরে দু'চার ঘা ডান্ডা চালিয়ে দিয়ে বলল- 'মাগীর সতীত্ব বের করব আজ চল!'
মেয়েটা সদ্যধরাপড়া মুরগির মত বার কতক ছটফট করল; তারপর একসময় ভীষন রবে গর্জন করে উঠলো- খবরদার! আমি কিন্তু প্রয়োজনে মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও যাব। মুখ্যমন্ত্রীকে সব জানাতে বাধ্য হব। আমি কিন্তু এর শেষ দেখে ছাড়বো।
ওমনি উড়ে এলো একটা থ্যাবড়া হাতের বাপ মায়ের নাম ভুলে যাওয়া থাপ্পর। একেবারে মেয়েটার চোখমুখ নাকের উপর।
সেই আঘাত সহ্য করতে না পেরে সঙ্গে সঙ্গে নাকমুখ ফেটে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এলো মেয়েটার। মাথাটা ঘুরে এল তার। চোখমুখ অন্ধকার দেখতে দেখতে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল নিমিষে। জল জল বলে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। মাথায় একটু জল দাও, প্লিজ! বাঁচাও আমাকে, আমাকে বাঁচাও!
কিন্তু, তাতে চিঁড়ে ভিজল না কারও! হুলিগানদের ভেদ করে ত্রিসীমানায় ভিড়তে পারছে না কেউ-ও!
ঠিক তখনই আর দুজন পুলিশের খুব মায়া মমতা হলো। যারা জানোয়ারটাকে সবক শেখাতে এসেছিল তাদের বিদ্ধস্ত, ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত আধমরা দেহগুলো ছেড়ে ছুটে এসে মেয়েটাকে পুলিশের জিপে তুলে নিয়েই নিমিষে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল।
চিৎকার করে উঠল কেউ কেউ! চিৎকার করে জনতার উদ্দেশে আর্তি জানাতে লাগলো- দাদা, একটা কিছু করুন, মেয়েটা কে ওরা হাপিস করে দেবে দাদা, মেয়েটাকে ওরা মেরে ফেলবে, বাঁচতে দেবে না দাদা!
ভয়ে সিঁটকে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বললো- কী করবেন বলুন! পুলিশ নিজেই তো ওদের সঙ্গে নিয়ে এসেছে। আপনি কাদের কাছে হেল্প চাইবেন বলুন!
মেয়েটা অসহায়ের মত কান্নাকাটি জুড়ে দিল।
এ যেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্র! পথের দুধারে পসরা বিছিয়ে যারা বসেছিল তারাও তাদের নিজেদের পসরাগুলো পটাপট গুটিয়ে নিতে নিতে হা-হুতাশ করতে লাগলো- এরা সবার কামধান্দা বন্ধ করে দেবে দাদা। কাউকেই বাঁচতে দেবে না শালারা। কাজের ধান্দায় শহর উঠে আসা লোকজনও আক্ষেপ করতে লাগলো- 'মেয়েমানুষের উপর এদের এমন বর্বর নারকীয় অত্যাচার আর সহ্য করা যায় না দাদা। রাজ্যের আজ প্রতিটি জেলায় জেলায়, স্কুলে কলেজে, অফিসে ময়দানে, প্রান্তরে প্রান্তরে এমনটা ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে পড়েছে দাদা।
আপনি কটাকে রুখতে যাবেন বলুন, ক'টাকে আটকানো সম্ভব আপনার একার পক্ষে?
আর জি করের কেসটা দেখলেন না?
নিজের কাজের জায়গায় জলজ্যান্ত একটা মেয়েকে কেমন খুন করে হাপিস করে দিলো!
কেউ কি ধরা পড়ল? না কারও সঠিক কোনো বিচার হলো?
এরাজ্যে এসব এখন জলভাত দাদা।
আপনি শুধু এই একটা মেয়েকে দেখছেন, একবারটি শুধু গাড়াগাঁয়ে যান। দেখবেন, দাদাগিরি কাকে বলে? রাজ্যের সব কলেজে কলেজেই মেয়েদের আজ এমনটাই অবস্থা হয়েছে দাদা। কোনোটা প্রকাশ্যে আসছে কোনোটা রাতের কালো অন্ধকারেই ভুতের মত মরে পড়ে থাকছে। সত্যিই মানুষের কাছে আজ আর কিচ্ছুটি করার নেই। মানুষ আজ সত্যিই বড়ো অসহায়!
সেটাও বলা শেষ হলো না লোকটার। সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল এক সাদা পোশাকের পুলিশ অফিসার। একেবারে কলার ধরে লোকটাকে হিড়হিড় টেনে এনে তুলল সেই পুলিশের ভ্যানে। তারপর রক্তাক্ত অচৈতন্য প্রতিবাদীদের মতো খাঁচাবন্দী করে হুসহুস করে বেড়িয়ে গেল মস্ত সেই লালবাড়িটার দিকে।
ফলে, বাকি লোকগুলোও নিজেরাই নিমিষেই ফাঁকা করে দিল জায়গাটা।
কেউ কোত্থাও নেই, চারদিক ফাঁকা। একেবারে শ্মশানের নিস্তব্ধতা!
নিয়ম অনুযায়ী, চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আদালতে 'আসামীদের' পেশ করতে হয়। কিন্তু, আজ বাহাত্তর ঘন্টা কেটে গেলেও মেয়েটাকে আদালতে পেশ করা গেল না। তার নিম্নাঙ্গ দিয়ে সমানে রক্ত ঝড়ে পড়ছিল সেদিনও।
পুলিশ লকআপেই পরপর সাতজন পুলিশকর্তা প্রথম রাতেই মেয়েটিকে জোর করে সবক শিখিয়ে গিয়েছিল।
তারপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল সেই জানোয়ারটার মুখে।
জানোয়ারটা একের পর এক হুলিগানদের সঙ্গে নিয়ে মেয়েটাকে সবক শিখিয়ে দিয়েছিল।
অবশেষে, দুপায়ের ফাঁকে মস্ত একটা লোহার রড চালনা করে দিয়েছিল।
এতোক্ষণ ধরে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেলেও এবার সত্যি সত্যিই হার মানলো মেয়েটা। একেবারে চোখজোড়া ঠিকড়ে বের করে এনে চিরকালের মত চিৎকার করা বন্ধ করে দিয়ে জানোয়ারটার বীভৎস হিংস্র মুখটার পানে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
অন্যদিকে, অবশেষে আর উপায় খুঁজে না পেয়ে হুলিগানেরদল সেই রাতেই গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছিল বডিটা।
ফলে,আজও আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি মেয়েটাকে। যদিও, লকআপ হতে মেয়েটার 'খোঁজে'- 'পালিয়ে যাওয়ার' একটা লুকআউট নোটিশ জারি করা হয়েছে!
------------------
উত্তম ভট্টাচার্য
যাদবপুর, কোলকাতা-৭০০০৩২.

Comments
Post a Comment