রিক্সার চাকা ও হারান কাকার জীবন
কুহেলী রায়
ভোরের আলো তখনো ঠিকমতো চোখ মেলেনি। শহরের রাস্তা আধো আলো,আধো অন্ধকার।শিশির ভেজা ভোরে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরনো রিক্সা। বহু পুরানো, বহু পথচলতার।একসময় উজ্জ্বল লাল রং ছিল। এখন তা ধুলো আর সময়ের আঘাতে ফিকে।তবু রিক্সাটার গায়ে হাত বোলালেই বোঝা যায় এ শুধু বাহন নয়– এক জীবনের সাক্ষী। তার সিটে ছেঁড়া কভার, ঘন্টায় হালকা মরিচা আর পিছনের বোর্ডে আঁকা আছে একটি নিষ্পাপ গ্রাম বাংলার ছবি।
এই রিক্সার মালিক ও চালক হারান কাকা। বয়স প্রায় ষাট ছুঁই ছুঁই। শরীরটা ঝুঁকে গেছে,তবুও রিক্সার হাতল ধরলেই চোখে মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা দেখা দেয়। এই রিক্সায় তার সংসার, তার স্বপ্ন :: তার জীবনের গল্প।
হারান কাকা প্রতিদিন ফজরের নামাজের আগেই উঠে পড়েন। ছোট ভাঙাচোরা ঘরের কোণে রাখা তার প্রিয় রিক্সার ঘন্টায় একবার হাত বুলিয়ে দেখে নেন —আজও ঠিকঠাক বাজছে কিনা।এই ঘন্টার শব্দেই শুরু হয় তার দিন ; আবার ঘন্টার শব্দেই দিন শেষ হয়। প্রতিদিন হারান কাকা রিকশা চাকার দিকে তাকিয়ে বলতেন: “চল বন্ধু, আজও আমাদের অনেক পথ যেতে হবে।”
কিছু বয়স্ক যাত্রী মাঝে মাঝে বলতো: “কিগো হারান, তুমি আবার রিকশার সাথেও কথা বলো নাকি?”
হারান কাকা হেসে উত্তর দিতেন : “কথা বলব না কেন ;এই চাকা ঘোরে বলেই তো আমার জীবনে এগিয়ে চলেছে। ওর সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক। ও যে আমার পরম আত্মীয়।”
হারান কাকার জন্ম গ্রামে। এই গ্রামে সবাই তাকে ভীষণ ভালোবাসতো কারণ তিনি ছিলেন সবচেয়ে হাসিখুশি ও পরিশ্রমী এক মানুষ। নদীর ধারে ছোট্ট একটি শান্ত গ্রাম। চারিদিকে সবুজ ধান খেত। কাঁচা রাস্তা আর তাল খেজুর গাছের সারি। যেখানে একসময় তার বাবা চাষ করতেন। কিন্তু ভয়ঙ্কর এক বর্ষায় নদী ভাঙ্গন তাদের সবকিছু কেড়ে নেয়। জমি যায়,ঘর যায় সমস্ত স্বপ্ন যেন ভেসে যায় নদীর জলে। হারান কাকার জীবনটা সহজ ছিল না।ঠিক তখনই তার শহরে আসা।প্রথমদিকে মজুরির কাজ,পরে এক পরিচিতের কাছ থেকে এই রিক্সাটা কিনে নেওয়া।সেদিন থেকেই হারান কাকা ও রিক্সা দুজনের একসাথে পথ চলা শুরু।
শহরের প্রতিটা রাস্তা হারান কাকার মুখস্ত। কোন গলিতে সকালে বেশি যাত্রী,কোন গলির মুখে সন্ধ্যায় বেশি ভিড়;সব জানেন তিনি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি জানেন মানুষের মুখ:কারণ রিক্সার সিটে বসে মানুষের শুধু শরীর নয়, তার মনটা নিয়েও ওঠে।
প্রতিদিন সকালে স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে হারান কাকার রিক্সা চলতো। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হারান কাকা তাদের নানান ধরনের গল্প শোনাতো।
কখনো বলত তার ছোটবেলার কথা,কখনো তার সেই পুরানো গ্রামের কাহিনী,কখনো বা তার সেই ফেলে আসা দিনের গল্প।
একদিন সকালে স্কুল ছুটির সময় এক বালক উঠল রিক্সায়।চোখে ভয়,হাতে রিপোর্ট কার্ড। ধীরে ধীরে বলল : “কাকা,বাড়ি যাবো”। হারান কাকা বুঝলেন: “কিছু একটা হয়েছে।”
ছেলেটা হঠাৎ বলেই ফেলল: “অংকে কম নম্বর পেয়েছি,বাবা বকবে”।
নম্বর মানুষ বানায় না রে।চেষ্টা করলেই হল।
ছেলেটা নেমে যাওয়ার সময় যেন একটু হালকা হয়ে গেল।
রিকশায় প্রতিদিনের যাত্রীরা আলাদা আলাদা গল্প নিয়ে আসে। কেউ অফিসের দুশ্চিন্তা,কেউ সংসারের টানা পোড়েন।
হারান কাকা কারো গল্প পুরোপুরি শোনেন না।কিন্তু কিছুটা অনুভব করেন কারণ জীবনের ওজন তিনি ভালই চেনেন।
একদিন বর্ষার সন্ধ্যায় আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলো। রাস্তা জলে ভরে গেল।এমন সময় এক গর্ভবতী মহিলা উঠলেন রিক্সায়। সঙ্গী তার স্বামী।হাসপাতাল অনেক দূরে,কিন্তু কোন যান সেই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছিল না। হারান কাকা এক মুহূর্ত ভাবলেন না। কাদা, জল যানজট সব পেরিয়ে তিনি রিকশা নিয়ে এগিয়ে চললেন। পা কাঁপছিল তবুও থামলেন না।
শেষমেষ হাসপাতালে পৌঁছলেন লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বলল : “কাকা আপনি না থাকলে…..।”
হারান কাকা কিছু নিলেন না।
বললেন : “মা আর বাচ্চা ভালো থাকলেই আমার এই ভাড়া মিটে গেছে।”
একদিন বিকালে হঠাৎ কালো করে আকাশে মেঘ জমলো। ঝড় শুরু হল।সবাই তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে ছুটতে লাগলো। হারান কাকা তখনও বাজার থেকে এক বৃদ্ধ কে নিয়ে ফিরছিলেন।ঝড়ের দমকা হাওয়ায় রিকশা যেন দুলছিল। কিছুতেই এগোতে পারছিলেন না।
বৃদ্ধ লোকটি বলল, “থাক বাবা,আমি নেমে কোনরকমে হেঁটেই চলে যাই”।
হারান কাকা বললেন, “না তা কখনো হয় না। আপনাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়াই আমার কাজ।”
বৃদ্ধটি মনে মনে খুব খুশি হয়ে বললেন , “তুমি সত্যিই খুব বড় মানুষ হারান”।
এই ভাবেই একটা সাধারণ রিকশার চাকা হয়ে উঠেছিল হারান কাকা জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ও প্রেরণা।
রিক্সার পিছনের বোর্ডের আঁকা ছবিটা হারান কাকার নিজের হাতে আঁকা নয়:কিন্তু সেই ছবিটা তার ভীষণ প্রিয়। গ্রাম বাংলার শৈশব ফিরে আসে সেই ছবির দিকে তাকালে। নদী,নৌকা ,খোলা আকাশ সবই যেন আজও সেখানে আটকে আছে।
কখনো কখনো গভীর রাতে রিকশা থেকে যাত্রী নামিয়ে হারান কাকা রিক্সাতেই একা একা বসে থাকে কিছুক্ষণ। একটু বিশ্রাম নেন।
তখন রিক্সার চাকা,রাস্তার আলো, নীরবতা সবমিলিয়ে মনে হয় জীবন যেন এখানেই থেমে আছে। সেই নীরবতায় তার মনে হয় এত বছর রিকশা চালিয়ে তিনি কি পেলেন।উত্তরটা খুব পরিষ্কার না কিন্তু মনে হয় মানুষ পেয়েছেন। রিকশার চাকা যতই এগিয়ে চলেছে ;সেই চাকার সঙ্গে ঘুরে চলেছে হারান কাকার জীবনের পরিশ্রম, আশা আর ভালোবাসার গল্প।
একদিন এক তরুণ উঠলো রিকশায়।আধুনিক পোশাক,কানে হেডফোন।ফোনে কথা বলতে বলতে বলল: “ রিক্সা চালিয়ে কি আর ভবিষ্যৎ আছে”। হারান কাকা কিছুই বললেন না। রিস্কার চাকা ঘোরাতে থাকলেন।
নেমে যাওয়ার সময় সেই তরুণ বললো: কাকা আপনার রিকশায় বসে খুব ভালো লাগলো।
অন্য একরকম অনুভূতি হল। হারান কাকার মনে হল কথাটা যেন অনেক বড় ;এর একটা গভীর মানে আছে।
শহর বদলাচ্ছে। মেট্রো, বাস ,ক্যাব সব এসেছে।অনেক রিকশা হারিয়ে যাচ্ছে। বন্ধুরা কেউ কেউ এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছে কিন্তু আজও হারান কাকা তা পারেন না ;কারণ এই রিকশার সাথে তার শ্বাস জড়িয়ে আছে।
একদিন হঠাৎ হারাম কাকা অসুস্থ হয়ে পড়ল।কয়েকদিন রিকশা বেরোলো না।গলির মোড়ে কেমন যেন ফাঁকা লাগছিল।
আশ্চর্যের ব্যাপার কয়েকজন যাত্রী খোঁজ নিতে এলো। কেউ দিল ফল, কেউ ভালোবাসা ,কেউ ওষুধ।হারান কাকার চোখে জল এসে গেল।
তিনি বুঝলেন আজও তিনি একা নন।
সুস্থ হয়ে আবার রিকশায় উঠলেন। হাতল ধরতেই মনে হল রিকশাটা আজও তাকে আবার চিনে নিয়েছে।আপন করে নিয়েছে ।
সেই পুরনো অভ্যাস;রিকশার ঘন্টায় টুং করে আওয়াজ হল ।
আর সেই শব্দ হতেই শুরু হলো নতুন এক জীবন।
একদিন একটা ছোট্ট মেয়ে রিকশাতে উঠলো।
উঠে বলল: “দাদু দাদু, আমি বড় হয়ে রিকশার ছবি আঁকবো”।
হারান কাকা হেসে ফেললেন ;ভাবলেন এই শহর যতই বদলে যাক।
রিক্সার গল্প থেকেই যাবে।
সন্ধ্যার আকাশে লালচে আলো।রাস্তার মোড়ে মোড়েও আলো জ্বলে উঠেছে।
হারান কাকা ধীরে ধীরে রিক্সা চালান।
প্রতিটা চাকার ঘূর্ণিতে জমে আছে হাসি, কান্না,আশা ভালোবাসা।
রিক্সা শুধু মানুষ বহন করে না; রিক্সা বহন করে জীবন ।
আর হারান কাকার রিক্সা এক চলমান গল্প; ভালোবাসা কষ্ট স্বপ্ন আর মানবিকতার গল্প। যার শেষ নেই।
রিক্সার চাকা ঘুরতেই শুধু রাস্তা নয়;জীবনের গল্পও এগিয়ে চলে।
কুহেলী রায়
সহকারী শিক্ষিকা
আরামবাগ বিবেকানন্দ একাডেমি
ঠিকানা
গ্রাম রাধানগর
পোস্ট:নাঙ্গুলপাড়া
থানা:খানাকুল
জেলা :হুগলী

Comments
Post a Comment