জনাই আর মালদহের মনোহরা
সোনালী সরকার
“মনোহরা" নামটাতেই অনেক মাধুরীর মাধুরী আছে।মনোহরা শব্দের অর্থ হচ্ছে যা মন হরণ করে। ছোটোবেলায় কিংবা আজ ও এই মিষ্টি খেতে আমি ভালোবাসি।আগে কাকু মহদীপুর থেকে এই মিষ্টি এনে আমায় খাওয়াতেন। আমার বাড়ি মালদা জেলার ঐ মহদীপুরের আশেপাশে।
মনোহরা একসময় হুগলি জেলার জনাইয়ের খুব বিখ্যাত, তেমন কলকাতার রসগোল্লা,মালদার রসকদম্ব, বর্ধমানের সীতাভোগ সেরকম। এটি প্রায় দুশো বছরের পুরোনো। শ্রীরামপুরের জানাইয়ে এই মিষ্টি উৎপত্তি লাভ করে। জনাইয়ে সেই আদি কাল আগে জমিদার ছিলেন কালীপ্রসন্ন মুখার্জি।তিনি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর জন্য কাজ করতেন।হিসেব মতো ব্রিটিশ সরকাররের যাওয়া আসা ছিল উনার গ্রাম, জেলায়। একদিন হলো কী যে খবর এলো, জমিদার বাড়িতে ব্রিটিশ সরকাররের এক নামী লোক আসবেন, উনার আবদার এমন এক মিষ্টি যা দীর্ঘদিন দিন ধরে রেখে খাওয়া যায় এবং যা শুকনো থাকবে।এই প্রসঙ্গে কালিবাবু সমস্ত ময়রাকে খবর দিলেন এইরকম মিষ্টি তৈরি করতে।এই সময় এক ময়রা কালীবাবুর কথায় এই মিষ্টি বানালেন কিন্তু নাম তখনও ঐ মিষ্টির দেওয়া হয়নি।যাই হোক ঐ শুকনো মিষ্টি ইংরেজের পাতে পড়তেই বলে উঠলেন এরকম মিষ্টি তিনি কখনো খাননি,স্বাদ ও পাননি। এককথায় অসাধারণ। এই মিষ্টি আমার মন হরন করে নিয়েছে।তখন থেকেই এই মিষ্টির নাম হলো “মনোহরা”। আরও বলা হয় ১৮২৬ সালে হুগলি জেলার জানাইয়ের বাসিন্দা কলকাতায় এসে মিষ্টির দোকান শুরু করেন।পরে তাঁর পুত্র ভীম চন্দ্র নাগ এই মিষ্টির দোকানকে আরো এগিয়ে নিয়ে যান। কলকাতায় এই মনোহরা মিষ্টি উনারাই প্রথম নিয়ে আসেন এরকম কথিত আছে। তাঁর দোকানের মনোহরা ভাবের শাঁস ,এলাচ,ক্ষীর দিয়ে তৈরি হতো যা আমাদের পশ্চিমবঙ্গের নবাবের শহর মুর্শিদাবাদে সকল নবাবদের প্রিয় ছিল।এই হলো তার ইতিহাস আর নামকরন । এবার আসি তার পদ্ধতি যা নিয়ে এই মনোহরা তৈরি হয়েছে।
এটি তৈরীর জন্য মূলত ছানা, চিনি, এলাচ লাগে।
প্রথমে ছানা তৈরী করে ছানা ও চিনি মিশিয়ে নাড়তে হয় যতক্ষণ না সেটা একটা মিশ্রণ আকারে চলে আসে আর ছানা থেকে জল শুকিয়ে আঠালো ভাব না আসা অব্দি মিশ্রণটিকে নাড়তে হবে। তারপর তাতে এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে দেওয়া হয়। মিশ্রণ ঠান্ডা হলে হাতে সামান্য ঘি মাখিয়ে ছোট্ট ছোট্ট করে মিশ্রণটিকে গোল গোল করে বলের মতো তৈরি করা হয়।তারপর তিনি আর জল দিয়ে শিরা তৈরি করে, গোল করা সন্দেশগুলো ঐ শিরার মধ্যে গুড়িয়ে রাখা হয়।প্রায় ৩ ঘন্টা ঠান্ডা করার পর চিনির রসে জমে আমাদের খাদ্য রসিক বাঙালির "মনোহরা” মিষ্টিটি তৈরি হয়।মনোহরা মিষ্টি টাকে উপর থেকে মনে হবে ডিমের খোলস দ্বারা ঢাকা আছে,আর ভেতরে নরম সন্দেশ। কখনও কখনও এটা নলেন গুড় দিয়েও তৈরি হয়,যা স্বাদকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এবার আসি মহদীপুরের মনোহরার গল্পে।এটি মালদা জেলার একটি বর্ডার অধুষ্যিত জায়গা। এখানকার মনোহরা এখনো সবার নজর কাড়ে,মন কাড়ে। মালদহের মনোহরা প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো। বংশপরম্পরায় এখনো এই মিষ্টি নিজের ইতিহাস বহন করে আসছে।এটি স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে এখনো ধরে রেখেছে। মহদীপুরের বাসিন্দা অনন্তলাল গুপ্ত বাংলাদেশের পাবনা জেলা থেকে মিষ্টি এনেছিলেন এই মহদীপুরে।এখন এই ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তার পুত্র অজিত গুপ্ত।গৌড় ঘুরতে আসা সকল পর্যটকদের মনোহরা এক আকর্ষণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।এই মনোহরার টানে সকলে ভিড় করে এখানে।আগে মালদা শহরে মনোহরা আসতো ঐ মহদীপুরের এলাকা থেকে, তারপর ব্যবসায়ীরা এটা শহরে বিক্রি করতেন। মালদহের মনোহরা ক্ষীর, নারকেল,এলাচ,আর খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি হয়। ভেতর নরম আর উপরে চিনির সাদা আস্তরন থাকে। শুধু মালদহে নয় এই মিষ্টির চাহিদা সীমান্ত পেরিয়ে ও ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং বলা যেতেই পারে যে খায়নি, সে আর কিছুই খায়নি।
Comments
Post a Comment