নারী জাগরণের দিশারী বেগম রোকেয়া
আবু রাইহান
আমাদের দেশের সরকারিভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়লে এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক,বিদেশি ইতিহাস লেখক এবং আমাদের দেশের ভাড়াটে ইতিহাস রচয়িতারা অত্যন্ত সচেতনভাবে ইতিহাসের পাতা থেকে ভারতে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের অবদানকে মুছে ফেলার চেষ্টায় অবিরাম লিপ্ত রয়েছে।ইতিহাসের এই বিকৃতি দেখে স্বাধীনতা সংগ্রামী সত্যেন সেন তাঁর ‘ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’ পুস্তকে লিখেছেন, ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের অবদানকে অবহেলা করে বিস্তৃতির তলায় চাপা দেওয়া এক জাতীয় অপরাধ।’ সত্যানুসন্ধানী মনীষী এম আব্দুর রহমান চাপা পড়ে থাকা ইতিহাসের এই উজ্জ্বল অধ্যায়কে আমাদের সামনে তুলে ধরতে তিনিই প্রথম আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনে অগ্নিযুগের বিপ্লবী হিসাবে দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনে কেবল মুসলিম পুরুষরা শুধু নয়, মুসলিম নারীরাও এগিয়ে এসেছিলেন। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে উপেক্ষিতা এই বীরাঙ্গণা মুসলিম মহিলাদের কথা তিনিই প্রথম স্বীকৃতির আলোয় তুলে ধরলেন।
রংপুরে মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মান রোকেয়া খাতুন(1880-1932) । তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগর চেতনার মানুষ। 'সকলের জন্য শিক্ষা' চিন্তার রূপায়ণে কেবল মুসলমান সমাজে নয়, সারা ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি সার্থক সামাজিক আন্দোলনের দিশারীও সর্বজনের সর্বকালের প্রেরণা।চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক রোকেয়া খাতুন ছিলেন বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং প্রথম বাঙালি নারীবাদী।নারী উন্নয়ন, বিশেষ করে মুসলিম নারী সমাজের উন্নয়নের জন্য তিনি সারাজীবন নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। ‘মুক্তিফল’ নামক পুস্তকে তিনি দেখিয়েছেন যে, নারীর সহায়তা না পেলে একা পুরুষের চেষ্টায় দেশের স্বাধীনতা আনা সম্ভব নয়! ‘অবরোধবাসিনী’ পুস্তকে তিনি বাংলা ও বিহার এর অবরোধবাসিনী মহিলাদের জীবনের যে বেদনাময় চিত্র তুলে ধরেছেন তা সমাজব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত হানার প্রেরণা । এদিক থেকে তিনি একজন বিপ্লবী।তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ এবং বাঙালি মুসলিম নারীদের সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা!প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান না করলে ও অনগ্রসর সমাজে নারীদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগাবার যে প্রচেষ্টা তিনি সারাজীবন ধরে করে গেছেন তার মূল্য কম নয়।
বেগম রোকেয়ার ডাক নাম ছিলো ‘রুকু’। বিয়ের পর তিনি পরিচিত হলেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন হিসাবে। রোকেয়ারা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন।পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে রোকেয়ার স্থান চতুর্থ। তিনি তাঁর বোন করিমুন্নেসা ও বড় ভাই ইব্রাহিম’র উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় লেখাপড়া শুরু করেন। রোকেয়া’র পরিবারে আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষার প্রচলন ছিলো কিন্তু বাংলা এবং ইংরেজি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিলো। সর্বপ্রথম রোকেয়ার দুই’ভাই সাবের পরিবারের ঐতিহ্যকে সাহসের সাথে ভেঙ্গে দিয়ে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেন। জমিদার হিসাবে রোকেয়ার বাবা জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলি সাবের বেশ নামডাক ছিলো।বড় ভাই ও বোন করিমুন্নেসার সাহয্য-সহযোগীতা নিয়ে বেগম রোকেয়া বাংলা এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়সে খান বাহাদুর সাখাওয়াত হোসেন’র সাথে তাঁর বিয়ে হয়।রোকেয়া ২৮ বছর বয়সে তার স্বামীকে হারান অর্থাৎ মাত্র দশ বছর ঘর করার পরই পরই তিনি বৈধব্যের বসন পরেন।
স্বামীর মৃত্যুর ভেতর দিয়েই শুরু তাঁর সংগ্রামমুখর জীবন।সম্পত্তি নিয়ে স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সন্তানের সাথে বিরোধ হওয়াতে ১৯১০ সালের শেষের দিকে ভাগলপুর ছেড়ে কলকাতা চলে যান। ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ পাঁচ মাসের মধ্যে আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে মাত্র আট জন ছাত্রী নিয়ে কলকাতার এক গলিতে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’এর কাজ শুরু করেন।স্কুল চালু করার সময় বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে যেমন তিনি সাহায্য সহযোগীতা পেয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন অসংখ্য অসহ্য লাঞ্ছনা এবং উপহাস।
বেগম রোকেয়া বাস্তবতার ভেতর দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, শুধু শিক্ষা দিলেই নারীরা মুক্ত এবং সচেতন হবেন না। তাঁদের নিজস্ব সামাজিক জীবন গঠন করার প্রয়োজনীয়তাও তীব্রভাবে অনুভব করতে পেরেছিলেন। লব্ধ অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১৬ সালে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ (মুসলিম মহিলা সমিতি) নামে এক মহিলা সমিতি প্রতিষ্টা করেন।মহিলা সমিতি প্রতিষ্টার জন্যে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত যখন দ্বারে দ্বারে ধরনা দিচ্ছিলেন তখন তাঁকে নিয়ে সমাজের অগণিত লোকে অবজ্ঞা অবহেলায় হাসি-ঠাট্টা করেছেন।উনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে সময়ের বিচারে ব্যাপারটি অবশ্যই বিশ্ময়কর তবুও সত্য যে, বাংলার এক রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে জন্ম নিয়ে বেগম রোকেয়া নামের ক্ষণজন্মা এই মহীয়সী মহিলা যে সাহসীকতার পরিচয় দিয়ে গেছেন তা আজও বিরল। যার লেখনী শুরু হয় ১৯০৩ সালের দিকে।লেখনীর ভেতর দিয়ে যার আমৃত্য সংগ্রাম আর সাধনা ছিলো ঘুণেধরা প্রতাগত সমাজের কঠিন কর্কশ পুরানো প্রাচীর ভেঙ্গে দিয়ে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।বেগম রোকেয়া সারাটি জীবন প্রবল প্রত্যাশা বুকে নিয়ে প্রচন্ড প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে পরিমার্জিত সুশীল সুন্দর প্রশান্তিময় এক সমাজ গঠন করতে।তাঁর প্রথম বই ‘মতিচূর’ প্রকাশিত হয় ১৯০৪ সালে। এই গ্রন্থের একাধিক প্রবন্ধে তিনি নারী মুক্তি এবং নারীর সামাজিক অধিকার ও উন্নতির কথা বলে গেছেন। বেগন রোকেয়া বিবাহের পর তাঁর স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন’র কাছেও ইংরেজি লেখা ও পড়া শিখে বিশ্বকে জানার সুযোগ, সাহস ও যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন বলেই নারী পুরুষের বৈষম্য দূর করবার পক্রিয়া ও কৌশলগত দিক নিয়ে প্রজ্ঞাবান আলোচনা-সমালোচনা করতে তিনি পেরেছিলেন।রোকেয়া নারীবাদী লেখিকা মেরী করেলি’র রচনা থেকে আরম্ভ করে ইংরেজি অনেক রচনাই পড়েছিলেন যার ফলশ্রুতিতে তাঁর লেখায় যুক্তিবাদ ও মৌলিকতা ছিলো।তিনি নিজে ধার্মিক এবং আধুনিক শিক্ষিত প্রগতিশীল ছিলেন বলে মুসলিম মহিলাদের শিক্ষিত ও স্বনির্ভর করার আধুনিকতার প্রগতিশীল পথকে সুগম করতে বেগম রোকেয়া প্রদীপ্ত প্রতিজ্ঞায় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেছিলেন।
জ্যোতির্ময়ী রোকেয়া তাঁর নারীবাদী চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন ‘মতিচূর’ প্রবন্ধ সংগ্রহের প্রথম (১৯০৪) ও দ্বিতীয় খণ্ডে (১৯২২)। সুলতানার স্বপ্ন (১৯০৫),পদ্মরাগ (১৯২৪),অবরোধবাসিনী (১৯৩১) ইত্যাদি তার সৃজনশীল রচনা। তার সুলতানার স্বপ্নকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক ধরা হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবার আগে তাঁর লেখাগুলো নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। তার রচনা দিহয়ে তিনি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, ধর্মের নামে নারীর প্রতি অবিচার রোধ করতে চেয়েছেন, শিক্ষা আর পছন্দানুযায়ী পেশা নির্বাচনের সুযোগ ছাড়া যে নারী মুক্তি আসবে না --তা বলেছেন। রোকেয়া অলঙ্কারকে দাসত্বের প্রতীক বিবেচনা করেছেন এবং নারীদের অলঙ্কার ত্যাগ করে আত্মসম্মানবোধে উজ্জীবিত হয়ে আর্থরাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে সচেষ্ট হতে আহ্বান জানিয়েছেন-‘আমরা বহুকাল হইতে দাসীপনা করিতে করিতে দাসীত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। ক্রমে পুরুষরা আমাদের মনকে পর্য্যন্ত দাস করিয়া ফেলিয়াছে।--তাহারা ভূস্বামী গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে আমাদের "স্বামী" হইয়া উঠিয়াছেন।--আর এই যে আমাদের অলঙ্কারগুলি– এগুলি দাসত্বের নিদর্শন।-কারাগারে বন্দিগণ লৌহনির্ম্মিত বেড়ী পরে, আমরা স্বর্ণ রৌপ্যের বেড়ী পরিয়া বলি "মল পরিয়াছি। উহাদের হাতকড়ী লৌহনির্ম্মিত, আমাদের হাতকড়ী স্বর্ণ বা রৌপ্যনির্ম্মিত "চুড়ি!--আমাদের ঐ বহুমূল্য অলঙ্কারগুলি দাসত্বের নিদর্শন ব্যতীত আর কিছুই নহে !”
তাঁর সামাজিক সব কর্মকান্ডছিল মহানগর কলকাতা জুড়ে, অথচ কলকাতার কোনো কবরখানায় সমাহিত করা সম্ভব হয়নি তাঁকে।তৎকালীন ধর্মীয় সমাজ বেগম রোকেয়াকে কলকাতার কোন কবরস্থানে কবরের অনুমতি দেয়নি। কেননা তিনি নারী হয়ে মুসলিম মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, নারীর অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, এবং রচনা করেছিলেন সাহিত্য। তাঁর কবর রয়েছে কলকাতার উপকন্ঠে, সোদপুর পানিহাটিতে।তাঁর কবর পানিহাটি গার্লস স্কুলের ভেতরে অবস্থিত। তাঁর কবরের উপর স্বেতপাথরের যে ফলক রয়েছে, সেখানে লেখা রয়েছে –স্ত্রী শিক্ষা ও নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ‘বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন'কে এখানে সমাহিত করা হয়েছিল।যেভাবে মাইকেল মধুসূদনের মরদেহের ওপর খৃষ্টান বা হিন্দু কারো দায় ছিলনা। তাঁর দেহ কে কোথায় কবরস্থ করবে সে নিয়ে বিতর্ক তো ইতিহাস... সেভাবেই লোকচক্ষুর আড়ালে কোনো এক আবদুর রহমানের দেওয়া জমিতে, পানিহাটিতে গঙ্গার ধারে সমাহিত হলেন রোকেয়া।মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি তাঁর কোন ছাত্রীকে বলেছিলেন "কবরে শুইয়া শুইয়াও যেন আমি মেয়েদের কলকোলাহল শুনতে পাই।"সেই ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছিল প্রায় এক দশক বাদে। ঠিক ঐ স্থানেই গড়ে উঠেছে পানিহাটি বালিকা বিদ্যালয়।
সমাজকর্মী বা সমাজ সংস্কারক রোকেয়ার চেয়ে অনেক অনেক বড় ছিলেন সাহিত্যিক রোকেয়া। তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট ছিলো সহজ-সরল, তীক্ষ-ধারালো এবং জোরালো ভাষার প্রয়োগ এবং শক্তিধর যুক্তি।
তাঁর প্রখর যুক্তিবাদী কলম মুসলিম সমাজের মৌলবাদী ভিত কে নাড়িয়ে দিয়ে ছিলেন।
---------------------
Comments
Post a Comment