তানভীর আহমেদ হৃদয়
বাংলা কবিতায় এমন কিছু কবি আছেন, যাঁদের জীবনকাল খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু তাঁদের উচ্চারণ সময়ের চেয়ে দীর্ঘজীবী। সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁদেরই একজন। মাত্র একুশ বছরের জীবনকে তিনি এমন এক তীব্র কাব্যিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করেছিলেন, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল মানুষের জীবন, ক্ষুধা, শ্রম, যুদ্ধ, শোষণ এবং একটি নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন। তাঁর কবিতায় ফুল আছে, চাঁদ আছে, শিশুর মুখ আছে—কিন্তু সেই সৌন্দর্য কখনো বাস্তবের ক্ষুধা ও যন্ত্রণাকে অস্বীকার করে না।
সুকান্তের কবিতাকে বুঝতে হলে প্রথমেই বুঝতে হয় তাঁর সময়কে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যে তখন বাংলার সমাজ বিপর্যস্ত। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছিল। সেই সময়ের কবির কাছে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা লেখা এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা হয়ে উঠতে পারত। তাই সুকান্ত কবিতার মুখ ঘুরিয়ে দিলেন মানুষের দিকে।
তাঁর কবিতায় ক্ষুধা শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়; ক্ষুধা হয়ে উঠেছে এক গভীর নন্দনতাত্ত্বিক সত্য। “ছাড়পত্র” কবিতার সেই বিখ্যাত উচ্চারণ—
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
বাংলা কবিতায় এমন তুলনা একই সঙ্গে নির্মম এবং অসাধারণ। পূর্ণিমার চাঁদ সাধারণত প্রেম, সৌন্দর্য ও রোমান্টিকতার প্রতীক। কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে সেই চাঁদ আর চাঁদ থাকে না—রুটির মতো দেখায়। অর্থাৎ ক্ষুধা মানুষের সৌন্দর্যবোধকেও বদলে দেয়। এখানে সুকান্ত আসলে প্রশ্ন করছেন—যে পৃথিবীতে মানুষের পেটে অন্ন নেই, সেখানে সৌন্দর্যের প্রচলিত সংজ্ঞা কতটা সত্য?
এই প্রশ্নই সুকান্তকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
তিনি কবিতাকে কেবল অনুভূতির অলংকার বানাননি; কবিতাকে করেছেন প্রত্যক্ষ জীবনের ভাষা। তাঁর কবিতায় রান্নাঘর যেমন আছে, তেমনি কারখানা; শিশুর মুখ যেমন আছে, তেমনি শ্রমিকের ঘাম; চাঁদ যেমন আছে, তেমনি রুটি। এই বৈপরীত্যই তাঁর কবিতার নিজস্ব শক্তি।
তবে সুকান্তের কবিতার কেন্দ্রে শুধু ক্ষুধা নেই; আছে আগামী দিনের প্রতি গভীর আস্থা। তিনি ধ্বংসের কবি নন, নির্মাণের কবি। বর্তমান পৃথিবী যতই অসহনীয় হোক, তিনি ভবিষ্যৎকে ছেড়ে দেননি। “ছাড়পত্র”-এ তাঁর অঙ্গীকার—
“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
এই উচ্চারণের মধ্যে একজন কবির চেয়ে একজন নির্মাতাকে বেশি দেখা যায়। এখানে ‘শিশু’ শুধু একটি নবজাতক নয়; সে ভবিষ্যতের প্রতীক। তার জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার অর্থ হলো এমন একটি সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে ক্ষুধা থাকবে না, শোষণ থাকবে না, মানুষের মর্যাদা সম্পদের কাছে পরাজিত হবে না।
সুকান্তের কবিতায় শিশুর উপস্থিতি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিশুরা তাঁর কাছে নিষ্পাপ ভবিষ্যৎ। তাদের চোখ দিয়ে তিনি পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে চেয়েছেন। অথচ সেই পৃথিবীর বর্তমান বাস্তবতা ছিল নির্মম। তাই শিশুর হাসি এবং সমাজের ক্ষুধা—এই দুই বিপরীত বাস্তবতা তাঁর কবিতায় পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়।
সুকান্তের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর সংহতি। তিনি দূর থেকে শ্রমিক-কৃষকের জীবন দেখেননি; তাঁদের জীবনসংগ্রামকে নিজের কবিতার ভেতরে নিয়ে এসেছেন। ফলে তাঁর কবিতায় শ্রম কোনো অবহেলিত বিষয় নয়। ঘাম, মাটি, কারখানা, রুটি—এসবই তাঁর কাব্যের উপাদান। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবী যারা তৈরি করে, পৃথিবীর অধিকারও তাদেরই হওয়া উচিত।
এই জায়গা থেকেই তাঁর কবিতায় প্রতিবাদের জন্ম। কিন্তু তাঁর প্রতিবাদ কেবল স্লোগান নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষত, মমতা এবং স্বপ্ন। তিনি যে পৃথিবী ভাঙতে চেয়েছেন, তার জায়গায় কেমন পৃথিবী চান—সেটিও স্পষ্ট করেছেন। ফলে তাঁর দ্রোহ ধ্বংসাত্মক নয়; তার গভীরে রয়েছে মানবিক নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।
তাঁর বিখ্যাত কবিতার আরেকটি পঙ্ক্তি—
“চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল।”
এখানে “জঞ্জাল” শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীর জঞ্জাল বলতে শুধু দৃশ্যমান আবর্জনা বোঝানো হয়নি; বোঝানো হয়েছে মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার, বৈষম্য, অন্যায়, শোষণ ও অমানবিকতার দীর্ঘ ইতিহাস। একজন তরুণ কবি নিজের ক্ষুদ্র জীবনকে একটি বৃহৎ সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করছেন। এ কারণেই সুকান্তের কবিতা ব্যক্তিগত জীবনকে ছাড়িয়ে সমষ্টিগত জীবনের দলিল হয়ে ওঠে।
সুকান্তের ভাষা নিয়েও আলাদা করে কথা বলা প্রয়োজন। তাঁর কবিতার ভাষা জটিল নয়, কিন্তু গভীর। তিনি শব্দের চাকচিক্যের বদলে শব্দের অভিঘাতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় এমন সব উপমা এসেছে, যা প্রচলিত কাব্যরুচিকে চমকে দেয়। রুটি, ধান, ঘাম, মজুর, ক্ষুধা—এসব সাধারণ শব্দকে তিনি কাব্যের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছেন। ফলে তাঁর কবিতা পাঠককে শুধু মুগ্ধ করে না; অস্বস্তিতেও ফেলে। আর সেই অস্বস্তিই তাঁর কবিতার সাফল্য।
কারণ সত্যিকারের কবিতা কখনো শুধু সুন্দর করে না, কখনো কখনো চোখ খুলে দেয়।
সুকান্তের জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। ১৯৪৭ সালে, মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্বাধীনতার সূচনালগ্ন পর্যন্তও তিনি বেঁচে থাকতে পারেননি। যে পৃথিবীর স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেই পৃথিবীর পূর্ণ রূপ দেখার সুযোগ তাঁর হয়নি। কিন্তু তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নই তাঁকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। কারণ পৃথিবী এখনও সম্পূর্ণ বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে ক্ষুধা আছে, যুদ্ধ আছে, উদ্বাস্তু আছে, শ্রমের অবমূল্যায়ন আছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য আছে। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে দ্রুত বদলে দিয়েছে, কিন্তু মানুষের মৌলিক সংকটের সবগুলো দূর করতে পারেনি। ফলে সুকান্তের “ঝলসানো রুটি” আজও কেবল একটি কবিতার চিত্রকল্প নয়; এটি সভ্যতার বিবেকের সামনে দাঁড়ানো এক প্রশ্ন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাই শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ নয়, শুধু ‘ক্ষুধার কবি’ও নয়। তিনি ছিলেন মানুষের ভবিষ্যতের কবি। তাঁর কবিতার ভেতর দিয়ে একজন তরুণ কণ্ঠ বারবার ঘোষণা করেছে—বর্তমান যত অন্ধকারই হোক, পৃথিবীকে বদলাতেই হবে।
তাঁর কবিতার শক্তি এখানেই যে, তিনি আমাদের শুধু একটি পৃথিবী দেখাননি; দেখিয়েছেন আরেকটি পৃথিবীর সম্ভাবনাও। যেখানে পূর্ণিমার চাঁদ আর ঝলসানো রুটি নয়, সত্যিই সৌন্দর্যের প্রতীক হতে পারে; যেখানে কোনো শিশুকে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে হবে না; যেখানে শ্রমের মর্যাদা থাকবে এবং মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
সুকান্ত চলে গেছেন বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর কবিতার ভিতরে যে তরুণটি দাঁড়িয়ে আছে, সে এখনও প্রশ্ন করে—এই পৃথিবী কার? আর কাদের জন্য পৃথিবীকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই সুকান্তের কবিতার আজকের প্রয়োজন। তাঁর কবিতা তাই অতীতের স্মারক নয়—এখনও জেগে থাকা এক অসমাপ্ত অঙ্গীকার।
.........................................
তানভীর আহমেদ হৃদয়
কবি গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
বাংলাদেশ
Comments
Post a Comment