কবি নাসির ওয়াদেনের 'অদৃশ্য অস্তিত্বের দরোজা' চলমান জীবনের জীবন্ত চিত্রনাট্য
পাঠপ্রতিক্রিয়া : আবদুস সালাম
কবি নাসির ওয়াদেন মফস্বলের জীবন ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে তার সাহিত্যের আঙিনায় বিচরণ।
মফঃস্বল শুধু ভৌগোলিক পরিচয় নয়—এটি তাঁর সাহিত্যচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কবিসত্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।তার বৈশিষ্ট্য হলো বিজ্ঞানমনস্কতা। বাস্তবতার সঙ্গে জাদু-বাস্তবতার মিশ্রণ তাঁর কবিতার একটি পছন্দের প্রবণতা।
কবিতাকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখেননি; কবিতার ভাষা, শব্দনির্মাণ ও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক বোধ তার কবিতায মূল সুর।
ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি দারিদ্র্য, শোষণ, বিশ্বাসভঙ্গ, সামাজিক অসাম্য ও মানুষের অস্তিত্বের সংকট উঠে আসে। ভাষা ও চিত্রকল্পের ব্যাবহারে নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।তার কবিতায় উঠে আসে প্রকৃতি, গ্রামবাংলা, ঋতু, পাখি, আলো-আঁধারি ইত্যাদির সঙ্গে আধুনিক জীবনের সংকট।
[অদৃশ্য অস্তিত্বের দরোজা] কাব্যগ্রন্থটি একটি ভাবনাপ্রধান, প্রতীকনির্ভর ও অস্তিত্বসচেতন এবং পরীক্ষামূলক আধুনিক কবিতার বই। তার বড়ো সাফল্য তিনি কাব্য ভাষা তৈরী করতে পেরেছেন।কবিতা চোখে পড়লেই চিনতে পারি লেখককে।এখানেই কবির বড়ো সাফল্যের দিক।
[অদৃশ্য অস্তিত্বের দরোজা ]সাতাশটি কবিতার জমাট সংকলন।
যেসকল কবিতা ভালো লাগলো তার অনুভূতিটুকু তুলে দিলাম।
কবিতা :-আটকে আছি
. এটি স্পষ্টভাবে অস্তিত্বের বন্ধন ও বুদ্ধির সংকটের কবিতা
“জন্ম আর মৃত্যুর সত্য জেনেও কেন
হলুদপাতার ঝরে থাকা পতনের ঝরণা...”
—জীবন ও মৃত্যুর অনিবার্যতা জেনেও কবির মনে প্রশ্ন আসে। যুক্তি ও জ্ঞানের সংকটে।
শেষের দুটি লাইন—
“আমি যুক্তির কানাগলির চোরাপথে আটকে
আটকে আছি দুর্বোধ্য জ্ঞানের ছুরির ফলায়”
—কবিতার মূল বক্তব্যকে বেশ শক্তিশালী ভাবে ধরে আছে।
জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করবে—এই প্রচলিত ধারণার বিপরীতে অতিরিক্ত জ্ঞান ও যুক্তিই কখনও কখনও মানুষকে বন্দি করে—এখানে সেই দার্শনিক বার্তা অজ্ঞাতসারে দিতে চেয়েছেন।
কবিতা:- নদীর কাছে পাহাড়ের কাছে
কবি এখানে প্রকৃতি, প্রেম, স্মৃতি ও বিচ্ছেদের অনুভূতি একসঙ্গে এনেছেন। নদী ও পাহাড় এখানে নিছক প্রাকৃতিক উপাদান নয়—দুটি মানসিক অবস্থারও প্রতীক হিসেবে নিয়ে এসেছেন।
“নদী চোখে জলে লেখা আলোকথা”
অথবা
“নিভৃত যৌবন জুড়ে আসে জোয়ারের পর ভাটা”
—এই চিত্রকল্পগুলিতে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অন্তর্রলীন মিশে থাকার বার্তা এনেছেন
নদী ও পাহাড়ের কাছে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা কবিতাটিকে এক ধরনের স্মৃতিমেদুরতায় ডুবিয়ে দিতে চেয়েছেন।
কবিতা . ‘এগিয়ে যাচ্ছি’
এটি তুলনামূলকভাবে দার্শনিক ও আত্মঅন্বেষণমূলক কবিতা।
“কেন যাই সামনের দিকে
পিছনের দিকে নয়”—এই প্রশ্নটি খুব সাধারণ হলেও এর মধ্যে জীবনের গভীর দর্শন আছে। মানুষ কেন অতীতের দিকে না ফিরে ভবিষ্যতের দিকে এগোয়—কবিতাটি সেই প্রশ্নের মধ্যেই যাত্রাকে নিশ্চিত করার অনুভব তুলে ধরেছেন।
“শান্তি কিনতে গেলাম অশান্তির দোকানে”—অসাধারণ এক পরস্পরবিরোধী চিত্রকল্পের অবতারণা করেছেন। কবি যে এখানে কতটা সুচতুর এবং জ্ঞানী তার নিদর্শন অবলীলায় পাঠকের দরবারে মেলে দিয়েছেন।
মহাশূন্যে ঈশ্বরের কাছে”
এখানে কবি অস্তিত্ব বাদীর মাত্রাকে বড়ো করে দেখিয়েছেন। ঈশ্বর এখানে কেবল ধর্মীয় সত্তাকে কবির চূড়ান্ত আশ্রয়ের মাথা নত করতে চান নি বরং, এক অনিশ্চিত প্রশ্নের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছেন।
কবিতা:-‘ধোঁয়া রঙের মৃত্যু’
অসাধারণ ও অন্যতম ঘন ও চিত্রকল্পনির্ভর কবিতা। মৃত্যু সরাসরি মৃত্যুর কথা নয় বরং ক্ষয়, হারিয়ে যাওয়া, স্মৃতি ও অস্তিত্বের বিলীন হয়ে যাওয়ার প্রতীক।
“প্রসন্ন বিকেল সারাদিন জমে থাকা শেকড়ের স্বাদে”—এই বাক্যবন্ধ প্রয়োগে তিনি সময়, স্মৃতি ও প্রকৃতিকে একাকার করে দিয়েছেন।
শেষ লাইন টি ও অসাধারণ।
“টুকরো টুকরো আলো কিংবা দু’মুঠো বিষাদে
লেগে আছে ধোঁয়া রঙের মৃত্যু”
এখানে আলো এবং বিষাদকে পাশাপাশি রেখে মৃত্যু সম্পর্কে একটি অস্পষ্ট অথচ অনুভবযোগ্য আবহ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন । কবিতাটি অনেক খানি অস্পষ্ট এবং পরাবাস্তববাদী ধারণায় প্রবাহিত করতে চেয়েছেন । পাঠককে তিনি অনুভব করতে বাধ্য করেছেন।
. কবিতা:-‘বসতবাটি’
নিরাশ্রয়তা, দারিদ্র্য ও অস্তিত্বসংকটের কবিতা।
‘নিজস্ব বসতবাটি নেই’,
‘ঘরদোরটার ছিল না’ কথাগুলির অভিজ্ঞতা শুধু একটি ব্যক্তির নয়; এখানে যেন প্রান্তিক মানুষের সামগ্রিক অনিশ্চিত জীবনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ঠাম ছিল, ঠাঁই ছিল না তাদের জন্যে”
বিপরীতার্থক চিত্রকল্পের অবতারণা করেছেন। পৃথিবীতে সৌন্দর্য আছে, অথচ মানুষের থাকার জায়গা নেই—এই বৈপরীত্য কবিতাটি গভীরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
কবিতা:- "মাটির শপথ"
বিভেদ নাই, কর্ম আছে:*
"তোমাতে আমাতে তফাৎ বিবর্ণ ধোঁয়াশা ধর্মের
এস হাত দিয়ে স্বপ্ন দেখি। অযথা ঘুম ঘোরে স্বপ্নের কথা বলেন নি। কর্মের মাধ্যমে স্বপ্নের অবতারণা করেছেন।
হাতদুটো শুধু কর্মের"
কবি বলছেন ধর্ম-বর্ণের তফাৎ সব "বিবর্ণ ধোঁয়াশা"। বাস্তবের মাটিতে আমরা সবাই এক। স্বপ্ন দেখতে হবে, কিন্তু হাত দিয়ে, কাজ করে।
"রাত্রি আঁধার, চারদিকে ডাইনীদের দাপাদাপি রাতের শেষ, ভোরের আলো, আসে না একাকী"
সমাজে অন্যায়, কুসংস্কার "ডাইনি"র মতো দাপাচ্ছে। কিন্তু ভোর মানে পরিবর্তন, সেটা একা একা আসে না। সম্মিলিত জনগণের যোগদানই একমাত্র সম্ভব।
"মাটির শপথ, আজন্ম রয়েছি হেথা
প্রপিতামহের মাটির অঙ্গে শেষ পর্যন্ত ছুঁয়ে রবে মাথা।"
" জন্ম থেকে মৃত্যু — এই মাটিতেই থাকা। পূর্বপুরুষের মাটিকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আঁকড়ে থাকা। এটাই শেকড়ের টান।
ধর্মের বিভেদ ভেঙে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়ে, কাজের মাধ্যমে স্বপ্ন দেখার কথা বলা হয়েছে। কবি এখানে মননশীল অনুভব সুক্ষ্ম ভাষায় তুলে এনেছেন।
কবিতা:-‘আলোর দেওয়ালে দরজা নেই’
শিরোনামটিই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আলো সাধারণত মুক্তির প্রতীক ।অথচ সেই আলোর দেওয়ালে দরজা নেই ।
মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু প্রবেশের পথ অনিশ্চিত। ‘বেনজির মৃত্যু-মিছিল’, ‘অনিশ্চিত মেঘ’, ‘ভয়’, ‘শৈশবের মাঠ’—এসব চিত্রকল্পের মধ্যে ব্যক্তিমানুষের স্মৃতি ও বৃহত্তর অস্তিত্ব-সংকটকে পাশাপাশি এসে দাঁড় করিয়েছেন অসাধারণ দক্ষতায়।
কবিতা :-ত্রিশূল
‘ত্রিশূল’ কবিতায় ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার সবচেয়ে স্পষ্ট। ত্রিশূল, ত্রিনয়ন, তেত্রিশ কোটি দেবতা, মন্ত্র, মঙ্গলকারী, পাপ, হিংসা, লোভ—এসবের মধ্য দিয়ে কবি ধর্মের বাহ্যিক দিকে আঙুল তুলেছেন। মানুষের অন্তর্গত আত্মা অহংকার ক্রমে নৈতিকতাকে প্রশ্ন চিহ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
বিশেষত “অন্ধত্ব” ও “অহংকার”-এর বিরুদ্ধে কবিতাটির অবস্থান মানবমুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা দিয়েছে ।এখানে ধর্মীয় প্রতীককে মানবিক মূল্যবোধের আলোয় পুনর্বিবেচনা করার চেষ্টা করেছেন। এখানেই কবিতাটির দৃঢ় দিক লক্ষণীয়। সমাজের মুখে যেন সজোরে একটা থাপ্পড় দিয়ে তাকে সচেতন হওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
কবিতা :-নভেম্বরের ভালোলাগার মাস’
প্রেমের সঙ্গে ইতিহাস ও সমকাল মিশে গেছে। শহীদের অসমাপ্ত কাজ, শ্রমিকের রক্ত, আগুনের উত্তাপ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ—সবকিছু মিলিয়ে ভালোবাসা এখানে নিছক ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; তা হয়ে ওঠে সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং মানবতার আকাঙ্ক্ষা।
“তিনভাগ কালো আর একভাগ আলো”—এই চিত্রকল্পটি কবিতাটির সমগ্র দর্শনকে যেন এক লাইনে ধারণ করেছে।কবির দার্শনিক স্বত্তা এখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে।
কবিতা:-‘আগুন পাখির ডানা’
এখানে কবি সময়, স্মৃতি, প্রেম ও মানবতার মধ্যে একটি সেতুবন্ধনের আকাঙ্ক্ষা আছে। ‘আগুন পাখি’ এখানে ধ্বংসের পাশাপাশি পুনর্জন্ম ও আলোরও প্রতীক। “এক আলো থেকে অন্য আলোকে গমন”—এই ভাবনাটি কবির ইতিবাচক ও মানবিক বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন । “পাখির ডানা”দিয়ে কবি স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষা কে পুষে রাখার বার্তা দিয়েছেন। এটি নিছক সৌন্দর্যের কবিতা নয়। এতে কবি অন্ধকার ভেদ করে উড়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন অজান্তেই।
কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় কবি নিজস্ব কাব্যভাষা ও চিন্তার একটি স্পষ্ট মানচিত্র তৈরীর প্রবণতা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর কবিতায় প্রচলিত কাব্যরীতির বাইরে গিয়ে প্রতীক, চিত্রকল্প ও আপাত-বিচ্ছিন্ন শব্দবন্ধের মাধ্যমে বক্তব্য নির্মাণের প্রবণতা পুষে রেখেছেন।
নাসির ওয়াদেনের এই কবিতাগুলির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য আমার চোখে পড়ে তা হলো “চিত্রকল্পের ভিতর দিয়ে বক্তব্য নির্মাণ”। তিনি সরাসরি বলেন না—ইঙ্গিত করেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, দারিদ্র্য, প্রেম, মৃত্যু, ঈশ্বর, স্মৃতি, যুক্তি ও অস্তিত্ব—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়।
আর একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—প্রচলিত সুন্দর ও মসৃণ কবিতার ভাষার বদলে তিনি অনেক সময় খসখসে, অপ্রত্যাশিত এবং ধাক্কা-দেওয়া শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন। এটি তাঁর কাব্যভাষার স্বাতন্ত্র্য। প্রচলিত ছন্দ-অলংকারের বাইরে মুক্ত, চিত্রকল্পনির্ভর ও ‘অ্যান্টি-পোয়েট্রি’ ভাবনার প্রতি তাঁর আগ্রহের স্পষ্ট ইঙ্গিত লক্ষ্য করি।
কাব্যকৌশল হয়, তা গ্রহণযোগ্য; কিন্তু কয়েকটি জায়গায় সামান্য শব্দ-সংযম ও নির্মাণের শৃঙ্খলা কবিতাগুলিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সব মিলিয়ে, অদৃশ্য অস্তিত্বের দরোজার কবিতাগুলিকে আমি সহজপাঠ্য লিরিকের কবিতা বলব না; বরং এগুলি ভাবনাপ্রধান, প্রতীকনির্ভর, অস্তিত্বসচেতন এবং পরীক্ষামূলক আধুনিক কবিতা।
কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা নতুন প্রজন্মের কাছে দলিল হিসেবে পরিগণিত হবে।
প্রথম প্রকাশ বইমেলা-২০২৬
পূর্ণ প্রতিমা প্রকাশনী, ৯২ জাফরপুর রোড ,কলকাতা ১২২
কবির মোবাইল নম্বর: 7908327569
Comments
Post a Comment