বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট: ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
আবদুল্লাহ আল আদীব
[বাংলাদেশের চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ, বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা বনাম জ্বালানির ঘাটতি এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ও শিল্প উৎপাদনে যে প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে এই তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ।
এই লেখায় ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ডেটা ও পরিসংখ্যান ব্যবহারের পাশাপাশি শ্রীলংকা, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির মতো দেশগুলোর সংকট উত্তরণের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক তত্ত্বের (যেমন: লুটপাটের অর্থনীতি, নরম বাজেট ও শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান) আলোকে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার একটি তুলনামূলক চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা আছে। একই সাথে সংকট মোকাবিলায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু নীতিগত সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে।]
ভূমিকা
মানবসভ্যতার ইতিহাস গভীরভাবে পাঠ করলে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব বারবার সামনে আসে—মানুষের প্রাত্যহিক ও জৈবিক চাহিদার সঙ্গে তার নির্মিত সামষ্টিক ব্যবস্থার সংঘাত। আদিম মানুষের জীবন ছিল প্রকৃতি, প্রয়োজন ও উৎপাদনের প্রত্যক্ষ সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র, বাজার ও মুদ্রাব্যবস্থা মানুষের জীবনকে বৃহত্তর কাঠামোর অধীন করেছে। এসব ব্যবস্থা মানুষের সম্মিলিত অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করলেও একপর্যায়ে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ, বণ্টন ও পরিচালনা ব্যবস্থাই মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে উঠেছে। ফলে খাদ্য, বাসস্থান, জ্বালানি ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতাও ক্রমে নির্ভর করছে জটিল অর্থনৈতিক সূচক, নীতিনির্ধারণ এবং ক্ষমতার কাঠামোর ওপর।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা— বিশেষত বাংলাদেশের মতো বিকাশমান অর্থনীতির সংকট— তাই কেবল সাময়িক কোনো দুর্যোগ কিংবা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন নীতিগত ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, সম্পদ বণ্টনের অসংগতি, আর্থিক খাতের অনিয়ম, জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ঘাটতির মতো পরস্পরসংযুক্ত সমস্যা। এসব সংকটের প্রভাব কোনো বিমূর্ত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পৌঁছে যায় মানুষের রান্নাঘরে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সামর্থ্যে, কর্মসংস্থানে এবং জীবনযাত্রার সামগ্রিক মানে। অর্থনীতির প্রকৃত সংকট তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার কিংবা মুদ্রার বিনিময়মূল্যের সংকট নয়— এটি মানুষের প্রয়োজন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গভীরতর এক প্রশ্ন।
১. সংকটের কারণ
ব্যাংক, বিদ্যুৎ আর গ্যাস আলাদা তিনটি সমস্যা মনে হলেও তিনটিরই শিকড় এক জায়গায়: বছরের পর বছর সমস্যা জমতে দেওয়া, আর যাদের জবাবদিহি করার কথা, তাদের জবাবদিহি না করা। বিশ্বব্যাংক ৬ অক্টোবর ২০২৬ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আর জ্বালানি সংকটের কারণে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে আসবে ৩.৪ শতাংশে, যা এপ্রিলের পূর্বাভাসের চেয়ে ১.২ শতাংশ পয়েন্ট কম।
ব্যাংক: ঋণ যখন উপহার…
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি তিন টাকার ঋণের প্রায় এক টাকা আদায় হচ্ছে না। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে, এই অঙ্ক ছিল ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। এক বছরে বেড়েছে ৭৬ হাজার ১২৭ কোটি টাকা।
এই বোঝা হঠাৎ তৈরি হয়নি। প্রথম আলোর হিসাবে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, আর ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে হয়েছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা এর পেছনে অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির ধারাবাহিকতার কথা বলেছেন। তাঁদের মতে এস আলম, বেক্সিমকোসহ কয়েকটি গোষ্ঠীর কেলেঙ্কারি এর বড় অংশ।
সবচেয়ে স্পষ্ট ছবি ইসলামী ব্যাংকের। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল, যা মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্টের মধ্যে এস আলম গোষ্ঠী নিজের ও ছায়া প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছিল, যার ৬৬ হাজার ৫০৭ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। ঋণ নেওয়া হয়েছিল পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব খাটিয়ে, পরিবার ও সহযোগীদের নামে।
বিশ্বব্যাংক আরও দুটি কঠিন চিত্র দিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ, যেখানে নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকার কথা। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৫৮.৯ শতাংশ আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ৪৩.২ শতাংশ। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক জুন পর্যন্ত জামানতবিহীন ৭৬ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, বারবার এই সহায়তা ও নিয়মে ছাড় দিলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা শোধরানো আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
গ্যাস: চাহিদা এক, জোগান আরেক…
দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন টানা নয় বছর ধরে কমছে। প্রথম আলোর হিসাবে দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, কিন্তু স্বাভাবিক সরবরাহ সীমিত থাকে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুটে। ফাঁকটা ভরে আমদানি করা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসে (এলএনজি), যা এখন মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মেটায়। সমস্যা হলো, এই আমদানি পথটাই সরু ও ভঙ্গুর। ২০২৬ সালের ২১ জুলাই মার্কিন মালিকানাধীন এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটে। ১০ আগস্ট সমুদ্র উত্তাল থাকায় সামিট টার্মিনালে জাহাজ থেকে গ্যাস নামানো যায়নি। ফলে ১২ আগস্ট দেশে মোট সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২১০ কোটি ঘনফুটে, অর্থাৎ চাহিদার অর্ধেকের কিছু বেশি। এর মধ্যে দেশীয় খনি থেকে এসেছে প্রায় ১৬৩ কোটি, আর দুই টার্মিনাল থেকে সর্বোচ্চ ৪১ কোটি ঘনফুট। আন্তর্জাতিক বাজারেও দাম চড়া। সেপ্টেম্বরের শুরুতে স্পট এলএনজির দাম ছিল প্রতি ইউনিট প্রায় ২২ থেকে ২৪.৬২ ডলার, একটি দরপত্রে ২৬ ডলারের প্রস্তাবও এসেছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বিশ্লেষক শফিকুল আলম দেখিয়েছেন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৩২৭.৮ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আনতে খরচ করেছে প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার, অর্থাৎ ৪০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। জ্বালানির ৬২.৫ শতাংশের জন্য দেশ এখন আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোলিয়াম আমদানির বিল দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
বিদ্যুৎ: সক্ষমতা আছে, চলার মতো জ্বালানি নেই…
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন করা যাচ্ছে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, অথচ উৎপাদন পাঁচ হাজারেরও কম। কোনো কোনো দিন লোডশেডিং ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে]। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু সেগুলো চালানোর গ্যাস নেই। রাষ্ট্রমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম অমিত নিজেই বলেছেন, গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহই গ্যাসচালিত কেন্দ্র চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ।
আরেকটি জট অর্থের। সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা (৪৪০ বিলিয়ন) বকেয়া রেখেছে। বকেয়া জমলে কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি কেনার সামর্থ্যও কমে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও বিদ্যমান সক্ষমতার ব্যবহার আটকে দিচ্ছে।
এই বিপদের সংকেত অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সতর্ক করেছিলেন, জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধে বিলম্বের কারণে লোডশেডিং মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর চলতে পারে। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ধীরগতির সমালোচনাও করেছিলেন। তখন নবায়নযোগ্য উৎস ছিল মোট স্থাপিত ক্ষমতার মাত্র ৪.৩০ শতাংশ, অথচ ২০৪১ সালের লক্ষ্য ৪০ শতাংশ।
ব্যাংক বিদ্যুৎ ও জ্বালানির যোগসূত্র…
ব্যাংক খাত দুর্বল হওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে নেমেছে ৪.৫ শতাংশে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এদিকে গ্যাস না পেয়ে কারখানা অর্ধেক ক্ষমতায় চলছে বা বন্ধ হচ্ছে। আইইইএফএ-র হিসাবে শিল্পকে গ্যাস বিক্রি হয় প্রতি ঘনমিটার প্রায় ৩০ থেকে ৩১.৫ টাকায়, অথচ আমদানি করা এলএনজির খরচই ৫০ টাকার বেশি। এই ঘাটতি সরকারের কোষাগার ও বিদ্যুৎ খাতের বকেয়ায় গিয়ে জমছে।
সংক্ষেপে কারণ চারটি: ১) ঋণ বিতরণে জবাবদিহির অভাব ও প্রভাবশালীদের ছায়া-ঋণ, ২) দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমতে দেওয়া ও আমদানিতে ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতা, ৩) বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, ৪) নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দেরি।
তথ্যসূত্র:
০১. আজকের পত্রিকা, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে (বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য)
০২. প্রথম আলো, ২ জুন ২০২৬: তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১,৪৮৭ কোটি টাকা
০৩. টিবিএস নিউজ: Banking woes, energy shortages, low revenue threaten Bangladesh's growth — World Bank (বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট, অক্টোবর ২০২৬)
০৪. ডেইলি স্টার, ৭ অক্টোবর ২০২৬: Growth to stay below 4% until FY28 on energy, banking woes
০৫. ডেইলি স্টার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫: Islami Bank's bad loans surpass Tk 1 lakh crore
০৬. ডেইলি স্টার, ১৩ আগস্ট ২০২৬: Lingering LNG crisis may drag power cut woes
০৭. প্রথম আলো (ইংরেজি), ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: Gas, power sectors face multiple problems; imports offer a short-term solution
০৮. শফিকুল আলম (IEEFA), ২৮ আগস্ট ২০২৬: More LNG is not the answer to Bangladesh's energy crisis (ডেইলি স্টারেও প্রকাশিত)
০৯. সিপিডি, ১২ জুলাই ২০২৩: Bangladesh's load-shedding will continue in the coming months or years — Dr Moazzem
২. সংকটের ফলাফল
এই সংকটের মূল্য অনেকেই দিচ্ছেন, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভার পড়ছে যাঁরা কাজ করে খান, আর যাঁরা বাজারে পণ্য কিনতে যান। কারখানায় উৎপাদন কমেছে, বাজারে দাম বেড়েছে, আর বিনিয়োগের পথ সঙ্কুচিত হয়েছে।
কারখানা: চালু আছে, কিন্তু পূর্ণ গতিতে নয়...
২১ জুলাই এক্সিলারেটের এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর থেকে শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ ঝুলে পড়েছে। নরসিংদীতে সাধারণত ১৫ পিএসআই চাপ থাকার কথা, নেমে দাঁড়িয়েছিল ২-৪ পিএসআই-তে, পরে প্রায় শূন্যে। দুই দিনে এখানকার ১০০টির বেশি টেক্সটাইল কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল। সাভার-আশুলিয়া-ধামরাইয়ের ১,৮৬৩টি কারখানায় জেনারেটর চালিয়ে গড়ে ১৫-২০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। একটি ওয়েট প্রসেসিং কারখানার দৈনিক উৎপাদন ৪৫-৫০ হাজার পিস থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ২৫-৩০ হাজারে, আর একটি সিরামিক কারখানার দৈনিক উৎপাদন ৮০ হাজার থেকে কমে ২০ হাজার।
খরচও লাফিয়ে বেড়েছে। আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় ডিজেলের দৈনিক খরচ ৫ হাজার থেকে বেড়ে ১৫ হাজার টাকা, অর্থাৎ তিনগুণ। একটি স্পিনিং মিলে বিকল্প জ্বালানির কারণে প্রতি পাউন্ড সুতার উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১২ শতাংশ। বিকেএমইএ-র পরিচালক মিনহাজুল হক বলেছেন, কোনো কোনো কারখানা এখন ২৪ ঘণ্টায় সাত-আট ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনও ধরে রাখতে পারছে না, আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বিদেশি ক্রেতাদের সময়সীমা ও চালান। নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়ার ভাষায়, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পোশাকের যোগান আসে নরসিংদী থেকে। এই কষ্ট শেষ পর্যন্ত রপ্তানির সময়সীমার ওপরই চাপ ফেলছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে চলতি অর্থবছরে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্পখাত সঙ্কুচিত হয়েছে, যা মহামারির পর প্রথম। রপ্তানি আয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ০.২ শতাংশ কমেছে।
বাজার: তেলের দাম বাড়লে সবকিছুর দাম বাড়ে...
২০ সেপ্টেম্বর সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে, যা ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর। ডিজেল ১১৫ থেকে ১৩৫, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ আর কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা। অর্থাৎ ডিজেলের দাম প্রায় ১৭.৪ শতাংশ বেড়েছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, আর বিপিসি মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে প্রায় ২২,৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে।
সরকারের যুক্তি, অর্থাৎ বিপিসির লোকসান, বাস্তব। কিন্তু ডিজেলের দাম বাড়লে প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। সেচ, পরিবহন আর পণ্যবহনে ডিজেল লাগে, তাই এর প্রভাব সব পণ্যে ছড়ায়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ (২০২৪-২৫ অর্থবছর), ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮.৭ শতাংশ, আর আগস্ট ২০২৬-এ ৮.৩ শতাংশ।
গ্রাম ও পথের পাশের জীবন...
১২ আগস্টের হিসাবে পল্লি বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর মোট চাহিদা ছিল ৮-৯ হাজার মেগাওয়াট, বরাদ্দ ছিল ৫-৬ হাজার মেগাওয়াট। নেত্রকোণায় চাহিদা ১২০ মেগাওয়াটের বিপরীতে পাওয়া গেছে ৫০-৬০ মেগাওয়াট। গোপালগঞ্জে দিনে প্রায় আট ঘণ্টা লোডশেডিং চলছিল। নারায়ণগঞ্জে ৩৩টি সিএনজি স্টেশনের মধ্যে ৩০টি গ্যাসের চাপ খুব কম বলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সিএনজি স্টেশনের প্রকৌশলী কাজী রাকিবুল ইসলামের ভাষায়, দরকার ১৫ পিএসআই, পাওয়া যাচ্ছে ১ পিএসআইয়েরও কম।
আস্থা আর বিনিয়োগের ক্ষত...
ব্যাংক খাতের দুর্বলতার প্রভাবে ঋণের প্রবাহ শুকিয়ে আসছে। জুন ২০২৬-এ বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৪.৫ শতাংশে, ৩৩ বছরের সর্বনিম্ন। সরকারি বিনিয়োগও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। অর্থাৎ নতুন কারখানা, নতুন চাকরি আর নতুন আয়ের সুযোগও কমছে।
ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ক্ষত কতটা গভীর, তা দুই বছর আগের একটি ঘটনায় ধরা পড়েছিল। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কিছু শাখায় গ্রাহকেরা পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকার বেশি তুলতে পারেননি। সৌদি আরব থেকে সদ্য ফেরা এক প্রবাসী শ্রমিক বাবার চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা চেয়েছিলেন, পেয়েছিলেন পাঁচ হাজার, পরে দশ হাজার। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে জামানতবিহীন প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে। সংস্থাটির সতর্কবার্তা, বারবার এমন সহায়তা দিলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা শোধরানো পিছিয়ে যেতে পারে।
দারিদ্র্যের শঙ্কা...
বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালের অক্টোবরে আশঙ্কা করেছিল, ২০২৬ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ২১.২ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেই সময়ের প্রতিবেদনে সেকথাও আছে, প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, তার মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ নারী, আর নিম্নআয়ের মানুষের বাস্তব মজুরি কমেছে ২ শতাংশ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফহমিদা খাতুন ও পিআরআই-র ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ বলেছিলেন, বিনিয়োগের মন্থরতা, কম কর্মসংস্থান আর দীর্ঘ মূল্যস্ফীতিই এর পেছনে কাজ করছে, আর শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সেই প্রক্ষেপণের পর জ্বালানি সংকট আরও গভীর হয়েছে।
তবু কিছু আশা আছে...
কিছু সংখ্যা অন্য রকম গল্পও বলে। প্রবাসী আয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৭.৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫.৬ বিলিয়ন ডলার। আগস্ট পর্যন্ত রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জুলাইয়ে ছয় বছর পর পলিসি রেট কমিয়েছে। বিদেশি মুদ্রার ভিত তাই কাঁচা নয়। সমস্যা শুধু অর্থের নয়, সমস্যা ব্যবস্থাপনা আর বিতরণেরও।
তথ্যসূত্র:
[০১]. আইএএনএস, ২৩ আগস্ট ২০২৬: Bangladesh factories shutting down as gas crisis worsens
[০২]. ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (বিডিনিউজ২৪ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী), ২৭ আগস্ট ২০২৬: Gas, power crunch cuts Savar-Ashulia factory output
[০৩]. বাংলা ট্রিবিউন, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো লিটারে ২০ টাকা (এনার্জি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তি)
[০৪]. পল্লি বিদ্যুৎ ও সিএনজির তথ্য পয়েন্ট ১-এর [৬] নং সূত্র থেকে: ডেইলি স্টার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
[০৫]. বণিক বার্তা (ইংরেজি), ৮ অক্টোবর ২০২৫: Bangladesh's poverty rate to reach four-year high, World Bank warns (বিশ্বব্যাংকের আগের প্রক্ষেপণ; প্রতিবেদনটির তারিখ ২০২৫-এর অক্টোবর)
[০৬]. ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ০৬ অক্টোবর ২০২৪: Banks hit by liquidity crunch, limited cash withdrawals spark nationwide frustration
৩. সংকট মোকাবেলায় সরকারি পদক্ষেপসমূহ
সরকার সংকট সামলাতে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগই সাময়িক। আর যেগুলো স্থায়ী সংস্কারের কথা বলে, সেগুলো এখনো কাগজে বা আলোচনার টেবিলে। কী করা হয়েছে? কতটা কাজে লেগেছে? এইসব পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা নানা প্রশ্ন তুলেছেন।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ: জোড়াতালির ব্যবস্থা...
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর ২০২৬ সালের মার্চেই সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেয়। ৯ মার্চ থেকে সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়, ঈদের ছুটি এগিয়ে আনা হয়, জ্বালানি বিক্রিতে দৈনিক সীমা বসে, আর পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার চারটি বন্ধ করে তার গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে চড়া দামে স্পট বাজার থেকে এলএনজি কেনা হয়। ৫ এপ্রিল থেকে সরকারি ও বেসরকারি অফিস চলে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা, আর দোকান ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ হওয়ার নির্দেশ আসে। আগস্টে ঘাটতি বাড়লে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হয় এবং বিদ্যুৎ বাড়াতে ৬,০০০ কোটি টাকা (৬০ বিলিয়ন) বরাদ্দ রাখা হয়।
কী ভালো হয়েছে: সংকটের শুরুতেই পদক্ষেপ নেওয়া গেছে, আর খরচ কমানোর বার্তা সব মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
কোথায় প্রশ্ন: এই পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে সাশ্রয়ের নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা হিসাব সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়নি। তেলচালিত কেন্দ্র এখন স্পট এলএনজির চেয়ে কিছুটা সস্তা: ফার্নেস অয়েলে ইউনিটপ্রতি খরচ ২১.৫১ টাকা, আর ২৪ ডলারের এলএনজিতে তা ২৩ টাকার বেশি। কিন্তু এতে আমদানি করা তেলের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ে, অর্থাৎ সমস্যার শিকড় একই থেকে যায়। আইইইএফএ-র জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম লিখেছেন, সংকটের জবাবে আরও এলএনজি আনা সমাধান নয়। ২০২৫ সালে দেশ এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার (৪০,৩০০ কোটি টাকা) খরচ করেছে, আর ২০৩০-এর পর এই বোঝা আরও বাড়তে পারে। তাঁর পরামর্শ: সীমান্তের ওপারের জলবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি (২০৩০ সালের মধ্যে ১০.৪৫ গিগাওয়াট), ব্যাটারি সংরক্ষণ আর গ্যাসের অপচয় কমানো।
তেলের দাম বাড়ানো: কার ঘাটতি কে মেটাচ্ছে?...
২০ সেপ্টেম্বর সরকার তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায়। ডিজেল ১১৫ থেকে ১৩৫, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা। সরকারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী মার্চ থেকে আগস্টে বিপিসির লোকসান ছিল প্রায় ২২,৮৭৫ কোটি টাকা, আর এই বৃদ্ধিতে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমবে।
যুক্তিটা বোঝা যায়। কিন্তু এর পাল্টা প্রশ্নগুলোও জোরালো:
#. সরকারের আয়ও বাড়ছে। তেল ও এলপিজি থেকে রাজস্ব ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০,৬০০ কোটি থেকে বেড়ে ১৩,৭০০ কোটি টাকা হয়েছে (প্রায় ২৯ শতাংশ)। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই এসেছে প্রায় ৩,৮০০ কোটি টাকা, যা এক বছর আগের চেয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি। কারণ এখন শুল্ক হিসাব হয় চালানের মূল্যে, তাই আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে রাজস্বও আপনা-আপনি বাড়ে।
#. বিপিসি আগে মুনাফা করেছে। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত বিপিসির নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৫৫,৮৩৭ কোটি টাকা। ভোক্তা প্রশ্ন করতেই পারেন, সেই মুনাফা কি আজকের লোকসানের জন্য জমানো ছিল?
#. দামের সূত্র নিয়ে পুরোনো আপত্তি। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ২০২৫ সালে বলেছিলেন, তেলের দাম নির্ধারণের সূত্রটি ত্রুটিপূর্ণ, কারণ তাতে বিপিসির বাড়তি মুনাফা ধরা হয়। তাঁর মতে সূত্র বাজারভিত্তিক করা উচিত।
#. ছাড় না দেওয়ার প্রশ্ন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলমের মতে, সরকারকে এখানে মুনাফা করার কথা নয়। বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, মূল্যস্ফীতি সামলানোর রাজস্ব ও মুদ্রানীতির পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়।
ফলাফল ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। বিবিএস-এর হিসাবে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশ, আগস্টে ছিল ৮.২৬। একই সময়ে গড় মজুরি বেড়েছে মাত্র ৭.৯০ শতাংশ, অর্থাৎ মজুরির চেয়ে দাম বেশি বাড়ছে। জাহিদ হোসেনের মতে, তেলের দামের প্রভাব সেপ্টেম্বরের মাত্র ১০ দিনে পড়েছে, তাই পরের এক-দুই মাস মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা কম।
ব্যাংক খাত: সত্য স্বীকার হয়েছে, মেরামত বাকি...
ব্যাংকের ক্ষেত্রে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের পর সম্পদমান পর্যালোচনা (এসেট কোয়ালিটি রিভিউ) শুরু হয়, যাতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর আসল অবস্থা বেরিয়ে আসে। ২০২৫ সালের মে মাসে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক (ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম) রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের একটি রোডম্যাপ দিয়েছে, যাতে আছে ঋণ পুনর্গঠন, দ্রুত আদায়, নিজস্ব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) গঠন এবং একটি এককালীন নিষ্পত্তি পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনায় খেলাপি গ্রাহক শুধু আসল ফেরত দিলে জমে থাকা সুদ পুরোপুরি মওকুফ হতে পারে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে জামানতবিহীন প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ১.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণসহায়তা এখন কয়েকটি শর্তের সঙ্গে যুক্ত। শর্তের মধ্যে আছে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৫ শতাংশ কমানো।
কী ভালো হয়েছে: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মামুন রশীদের মতে, সম্পদমান পর্যালোচনা ব্যাংকগুলোর লুকানো ক্ষত প্রকাশ করেছে, আর নতুন রোডম্যাপ সেই সংস্কারের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। তিনি সতর্ক আশাবাদী। তাঁর মতে সব খেলাপি ইচ্ছাকৃত নন, অনেক ব্যবসা অর্থনৈতিক ধাক্কায় পড়েছে, তাই সুদ মওকুফের কিছু যুক্তি আছে।
কোথায় প্রশ্ন:
#. কে ক্ষতি বহন করবে? মামুন রশীদের প্রশ্ন, সুদ মওকুফ হলে ক্ষতি যাবে কার ঘাড়ে: শেয়ারহোল্ডার, আমানতকারী, নাকি করদাতার? দুর্বল ব্যাংককে আবার মূলধন দিতে হলে আজকের স্বস্তি কাল সরকারের আর্থিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
#. তারল্য মানে মূলধন নয়। ডিসেম্বর ২০২৫-এ ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ, যেখানে ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকার কথা। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের হার ৫৮.৯ শতাংশ আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ৪৩.২ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, বারবার এমন সহায়তা ও নিয়মে ছাড় দিলে ব্যাংকগুলোর অবস্থা শোধরানো পিছিয়ে যেতে পারে।
#. একীভূতকরণের শর্ত নিয়ে বিতর্ক। মে ২০২৬-এর হিসাবে, ব্যাংক সমাধান আইনের ১৮(ক) ধারায় একীভূত পাঁচ ব্যাংকের সাবেক মালিকেরা সহজ শর্তে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারতেন। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এ ধারা বাতিলের সুপারিশ করেছে। বিরোধী সংসদ সদস্য, অর্থনীতিবিদ, টিআইবি ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন বাতিলের দাবি তুলেছে। সরকারের জবাব, জনগণের টাকায় দুর্বল ব্যাংক বাঁচানোর আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই, তাই এই ধারা রক্ষা করা হচ্ছিল।
#. পুরোনো অভ্যাসের ঝুঁকি। মামুন রশীদ মনে করিয়ে দিয়েছেন, অতীতে পুনঃতফসিল ও নিয়মে ছাড় ক্ষতি স্বীকারকে পিছিয়ে দিয়েছে, ঋণ ফেরতের শৃঙ্খলাও দুর্বল করেছে। ২০১৯ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, খেলাপি ঋণ "এক পয়সাও" বাড়বে না, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। এএমসি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার ওপর। দক্ষিণ কোরিয়ার কামকো ও মালয়েশিয়ার দানাহার সফল হয়েছিল, কিন্তু ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ার উদ্যোগ রাজনৈতিক প্রভাবে মার খেয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা: দাম বাড়ল, ঢাল কোথায়?...
তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্তকে বাঁচানোর মতো বড় কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়েনি। ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর আর্থিক সুযোগ সরকারের নেই, তার ওপর নতুন বেতন কাঠামো প্রতিবছর বাড়তি ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার চাপ ফেলবে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশ, আর বাজেট ঘাটতি ৩.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬-২৭-এ ৪.৮ শতাংশে যেতে পারে। সংস্থাটির বিশ্লেষণে, কর আদায় দুর্বল হওয়ার কারণ কর নীতির সীমাবদ্ধতা, কর ফাঁকি ও দুর্বল কর প্রশাসন।
তবে পথও আছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি আরও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে দিলে এবং খাদ্য ভর্তুকি ও চলমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিকে একত্র করলে সামান্য বাড়তি ব্যয়েই প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলে আনা সম্ভব।
তত্ত্বের আয়নায় আজকের বাস্তবতা...
কিছু বড় তত্ত্ব আজকের পরিস্থিতি বোঝার জন্য খুব কাজের। তাঁরা বাংলাদেশের কথা লিখেননি, কিন্তু তাঁদের যুক্তির সঙ্গে এখানকার ঘটনার মিল বেশ স্পষ্ট। এখানে তত্ত্বগুলো আমি সহজ করে বলার চেষ্টা করছি, আর মিলটা আমার ব্যাখ্যা, তাঁদের নিজেদের মন্তব্য নয়।
#. অর্থনীতি, নরম বাজেটের ফাঁদ (জানোষ কর্নাই)। হাঙ্গেরীয় অর্থনীতিবিদ কর্নাই বলেছিলেন, যখন লোকসান হলেই রাষ্ট্র বাঁচিয়ে দেয়, তখন প্রতিষ্ঠানের মনে আর মরার ভয় থাকে না, সে ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করে না। আজকের প্রশ্ন হলো, বারবার কর্জ পুনর্গঠন, সুদ মওকুফ আর তারল্য সহায়তা পেলে কোনো খেলাপি কি দায় মেটাতে শিখবে, নাকি আরও কর্জ নিতে উৎসাহ পাবে? বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা ও মামুন রশীদের আশঙ্কা তারই ইঙ্গিত দেয়।
#. লুটপাটের অর্থনীতি (আকেরলফ ও রোমার)। দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ দেখিয়েছিলেন, আমানত সুরক্ষিত আর তদারকি দুর্বল হলে মালিকেরা ব্যাংকের টাকা নিজের পকেটে তুলে নিয়ে ব্যাংককে দেউলিয়া বানিয়েও লাভবান হতে পারেন। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গোষ্ঠী ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্টের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছিল, যার ৬৬ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। বিষয়টি তত্ত্বের সঙ্গে মিলে যায়, তবে কোনো ব্যক্তির দোষ আদালতের রায় ছাড়া প্রমাণ হয় না।
#. রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান (আজেমওগলু ও রবিনসন)। তাঁরা বলেছেন, যে প্রতিষ্ঠান মুষ্টিমেয় কয়েকজনের সুবিধায় চলে, সেখানে সংস্কার কঠিন, কারণ সংস্কারে তাদেরই ক্ষতি। বিশ্বব্যাংকও বলেছে, কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ব্যাংক খাত থেকে অনেক বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিয়েছে। তাই ব্যাংক সংস্কারে মূল পরীক্ষা কোনো আইন নয়, বরং আইনকে তার নিজের পথে চলতে দেওয়া। ব্যাংক সমাধান আইনের ১৮(ক) ধারার তর্কটি সেই পরীক্ষারই অংশ।
#. সমাজবিজ্ঞান, ঝুঁকি সবার ওপর সমান পড়ে না (উলরিখ বেক)। বেক দেখিয়েছিলেন, আধুনিক সমাজে ঝুঁকি অসমানভাবে বণ্টিত হয়: যাঁর সামর্থ্য আছে, তিনি নিজেকে অনেকটা রক্ষা করতে পারেন। আজকের সংকটে সেটাই দেখা যাচ্ছে। আশুলিয়ার কারখানায় জেনারেটরে ডিজেল পুড়িয়ে উৎপাদন চালু রাখা যায় (যদিও খরচ বাড়ে), কিন্তু গ্রামের বাসিন্দারা দিনে আট ঘণ্টারও বেশি বিদ্যুৎ ছাড়া থাকেন।
#. অর্থনীতি, প্রস্থান আর প্রতিবাদ (আলবার্ট হিরশম্যান)। জার্মান-মার্কিন অর্থনীতিবিদ হিরশম্যান বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠান খারাপ চললে মানুষ হয় সরে যায়, নয়তো প্রতিবাদ করে। ব্যাংকের ক্ষেত্রে সরে যাওয়া মানে টাকা তুলে নেওয়া। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নগদ তোলার সীমা নিয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি, সেখানে আমানতকারীর সরে যাওয়ার পথ সীমিত, প্রতিবাদের জোরও কম। তাই আস্থা ফেরানো আরও কঠিন।
#. অর্থনীতি ও দর্শন, স্বাধীনতা মানে সুযোগ আর নিরাপত্তা (অমর্ত্য সেন)। নোবেলজয়ী সেন লিখেছেন, উন্নয়ন মানে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা বাড়ানো, আর তার জন্য দরকার স্বচ্ছতা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো ব্যবস্থা। এই মাপকাঠিতে প্রশ্ন ওঠে: তেলের দাম বাড়ানোর কারণ আর হিসাব সরকার বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, কিন্তু দাম বাড়ার সময় দুর্বল মানুষের জন্য ঢাল কোথায়?
#. দর্শন, ন্যায্যতা (জন রলস)। মার্কিন দার্শনিক রলস বলেছিলেন, কোনো ব্যবস্থা তখনই ন্যায্য, যখন তা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষের অবস্থাও বিবেচনায় রাখে। এই কষ্টিপাথরে দেখা যায়, বিদ্যুতের ঘাটতির বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়েনি, কোথাও আট-দশ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। নীতি ঠিক করার সময় এই বোঝা কারা বেশি বইছেন, সেটাও হিসাবে রাখা দরকার।
শেষ কথা: সরকারের পদক্ষেপগুলোর বড় বৈশিষ্ট্য একটি: সংকটের মুহূর্তে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া গেছে, কিন্তু স্থায়ী সংস্কারের পথে পায়ে চলার গতি ধীর। অর্থনীতিবিদের প্রধান প্রশ্ন তিনটি: বোঝা কার ঘাড়ে পড়ছে, সেই হিসাব সবাই জানে কি না, আর বর্তমান সাশ্রয় থেকে সরকার কোন স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে চায়। এই তিন প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে বাকি পথ।
তথ্যসূত্র:
[০১]. Al Jazeera, ৯ মার্চ ২০২৬: Bangladesh shuts universities, limits fuel sale as Iran war causes shortage
[০২]. Bangladesh Post, ৫ এপ্রিল ২০২৬: Austerity measures kick in amid energy crisis
[০৩]. Prothom Alo English, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: Gas, power sectors face multiple problems; imports offer a short-term solution; গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং: The Daily Star, ১৩ আগস্ট ২০২৬: Lingering LNG crisis may drag power cut woes
[০৪]. IEEFA (শফিকুল আলম, প্রথম ছাপা The Daily Star-এ, ২৮ আগস্ট ২০২৬): More LNG is not the answer to Bangladesh's energy crisis
[০৫]. বাংলা ট্রিবিউন, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো লিটারে ২০ টাকা
[০৬]. সিটিজেনস ভয়েস (টিবিএসের সূত্রে), ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মুখে সরকারের কর ছাড়ে অনীহা, প্রশ্ন অর্থনীতিবিদদের
[০৭]. bdnews24 (বাংলা), ৭ অক্টোবর ২০২৬: জ্বালানি তেলের ‘মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায়’ মূল্যস্ফীতি ফের ঊর্ধ্বমুখী
[০৮]. সিপিডি (প্রথম আলোর সূত্রে), ৮ এপ্রিল ২০২৫: তেলের দাম নির্ধারণের ত্রুটিপূর্ণ সূত্র সংশোধন করে তা বাজারভিত্তিক করা উচিত - ড. মোয়াজ্জেম
[০৯]. The Daily Star, ২৫ জুলাই ২০২৬: Can Bangladesh finally fix its NPL problem? (মামুন রশিদ)
[১০]. The Daily Star, ১৭ মে ২০২৬: Reforms tied to $1.7b WB loans: Govt mulls changing bank merger clause
[১১]. The Business Standard, অক্টোবর ২০২৬: Banking woes, energy shortages, low revenue threaten Bangladesh's growth: World Bank
[১২]. আজকের পত্রিকা, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
[১৩]. The Daily Star, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫: Islami Bank's bad loans surpass Tk 1 lakh crore
[১৪]. The Financial Express, ১০ অক্টোবর ২০২৪ (আনুমানিক ৩ অক্টোবরের ঘটনা): Banks hit by liquidity crunch, limited cash withdrawals spark nationwide frustratio
[১৫]. The Financial Express, ২৭ আগস্ট ২০২৬: Gas, power crunch cuts Savar-Ashulia factory output, drives up costs
তত্ত্বের বই ও প্রবন্ধ:
[ক]. জানোষ কর্নাই, “The Soft Budget Constraint”, Kyklos, ১৯৮৬
[খ]. জর্জ আকেরলফ ও পল রোমার, “Looting: The Economic Underworld of Bankruptcy for Profit”, Brookings Papers on Economic Activity, ১৯৯৩
[গ]. ডারন আজেমওগলু ও জেমস রবিনসন, Why Nations Fail, ২০১২
[ঘ]. আলবার্ট হিরশম্যান, Exit, Voice, and Loyalty, ১৯৭০
[ঙ]. অমর্ত্য সেন, Development as Freedom, ১৯৯৯
[চ]. জন রলস, A Theory of Justice, ১৯৭১
[ছ]. উলরিখ বেক, Risk Society (জার্মান ১৯৮৬, ইংরেজি ১৯৯২)
৪. সংকট মোকাবেলার অতীত অভিজ্ঞতা
এই দেশ এই প্রথম সংকটের মুখে পড়েনি। ১৯৭৪ সালে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিলেন, যা তখনকার জনসংখ্যার দুই শতাংশ। ২০২২ সালে ডলারের টান আর জ্বালানির দামে রিজার্ভ কমেছিল, লোডশেডিং ফিরেছিল। ২০২০ সালে করোনায় পোশাকের অর্ডার বাতিল হয়েছিল। আর ব্যাংক খাতের বড় প্রতারণাও নতুন নয়, হলমার্ক কেলেঙ্কারি তার একটি।
প্রশ্ন হলো: তখন কী করা হয়েছিল, কতটা কাজ হয়েছিল, আর কোথায় ভুল হয়েছিল? কারণ যারা অতীত থেকে শেখে না, তারা একই ভুল বারবার করে।
১৯৭৪: দুর্ভিক্ষ থেকে শেখা...
স্বাধীনতার মাত্র দেড় বছর পরেই দেশ বড় পরীক্ষায় পড়ে। সোয়াস (SOAS) বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন গবেষক নাওমি হোসেনের লেখা অনুযায়ী, সে সময়ের দুর্ভিক্ষে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ মারা যায়। কারণগুলো ছিল ভয়াবহ বন্যায় ফসল আর মজুরির বাজার নষ্ট হওয়া, ওপেকের তেল সংকটের সঙ্গে যুক্ত বড় মুদ্রাস্ফীতি, মজুতদারি, চোরাচালান আর স্থানীয় ঘাটতি। খাদ্যসহায়তার বড় অংশ বাজেট সহায়তা আর সরকারি বেতনে খরচ হয়েছিল, দুর্ভিক্ষ ত্রাণে নয়। লেখকের বর্ণনায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে প্রায় এক বছর খাদ্যসহায়তা আটকে রাখে।
নাওমি হোসেনের বিশ্লেষণে তদানীন্তন সরকার পর্যাপ্ত সাড়া দিতে পারেনি। জাতিসংঘে সহায়তা চাওয়া হয়, কিন্তু যা আসে, তার অনেকটাই পৌঁছায় শহরের মানুষ, সরকারি কর্মচারী আর রাষ্ট্রের জন্য জরুরি বলে গণ্য মানুষের কাছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ ভূমিহীন গরিবেরা পেয়েছেন শেষের অংশ।
কী বদলেছিল: লেখকের ব্যাখ্যায়, দাতাদের চাপে মুদ্রার মান কমানো আর বাজারমুখী নীতির দিকে যাওয়া শুরু হয়। খাদ্য নিরাপত্তার নিয়মিত নজরদারি বাড়ে, আর সবচেয়ে দরিদ্রদের দিকে লক্ষ্য ঠিক করার চিন্তা তৈরি হয়। আর সরকারি সহায়তার ফাঁকে জায়গা করে নেয় ব্র্যাক, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও গ্রামীণ ব্যাংকের মতো সংস্থা। বলা যায়, সরকারের অসফলতার ফাঁকে জনগণের নিজস্ব উদ্যোগ এগিয়ে এসেছিল।
আজকের সঙ্গে মিল: লেখকের সতর্কতা, জীবনযাত্রার মান দীর্ঘদিন খারাপ হতে থাকলে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়। ১৯৭৪-এর সঙ্গে আজকের পরিস্থিতি হুবহু এক নয়, আজ মানুষ দুর্ভিক্ষে মরছে না। তবে তেলের ধাক্কা, মুদ্রাস্ফীতি আর সরকারি সহায়তা কার কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেই প্রশ্নটা আজও প্রাসঙ্গিক।
বিদ্যুৎ: ঘাটতি থেকে উদ্বৃত্ত, তারপর আবার অন্ধকার...
২০০৯ সালে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর স্থাপিত ক্ষমতা ছিল ৪,৯৪২ মেগাওয়াট। ২০২২ সালের মার্চে সেটা দাঁড়ায় ২৫,৫১৪ মেগাওয়াটে, আর সর্বোচ্চ উৎপাদন ৩,২৬৮ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে হয় ১৩,৭৯২ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের আওতায় আসা মানুষ ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে সরকারি হিসাবে সবাই হয়ে গেছেন। এটা বড় অর্জন, এতে সন্দেহ নেই।
কিন্তু দাম দিতে হয়েছে অনেক। ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয়ে লেখা হয়, দেশে উৎপাদনক্ষমতা চাহিদার চেয়ে ৪০ শতাংশের বেশি, আর ভাড়া ও স্বল্পমেয়াদি ভাড়া কেন্দ্রগুলোকে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। সম্পাদকীয়ের নিজস্ব হিসাবে দশ বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার অপচয় হয়েছে। আরও বড় সমস্যা জ্বালানির। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দৈনিক ৩.৮০ বিসিএফ গ্যাস দরকার হলেও সরবরাহ ছিল ৩ বিসিএফ; বিদ্যুৎকেন্দ্রে বরাদ্দ ৮২০ এমএমসিএফডি। টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়েছে, সেগুলোর জন্য স্থির জ্বালানি নিশ্চিত করেনি অথবা চাহিদা যাচাই করেনি।
ফল হলো ২০২২-এ। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বাড়লে সরকার স্পট কেনা বন্ধ করে, ডিজেলচালিত কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহও বন্ধ হয়। আবার শুরু হয় অঞ্চল ভিত্তিক লোডশেডিং। ১৮ জুলাই ২০২২ দোকান ও শপিংমল রাত ৮টায় বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, সঙ্গে সাজসজ্জার বাতি নিভিয়ে রাখার কথাও। ডিপিডিসি নিষিদ্ধ সময়ের পর ব্যবসা চালু রাখা দোকানগুলোর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে অভিযান চালায়।
শিক্ষা: স্থাপিত ক্ষমতা বাড়ানো মানেই সুরক্ষা নয়। জ্বালানির জোগান আর দাম নিশ্চিত না হলে প্লান্ট কাগজেই থাকে, আর সেই অপ্রয়োজনীয় ক্ষমতার বিল পরিশোধ করতে হয় সবাইকে। ২০২৬ সালেও দেশ প্রায় একই ধরনের সাশ্রয়ের পথে নেমেছে।
২০২২: ডলার সংকট আর আইএমএফের দরজা...
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর খাদ্য আর জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি বিল ফুলে ওঠে। রিজার্ভ নভেম্বরের শুরুতে দাঁড়ায় ৩৫.৭৪ বিলিয়ন ডলার, এক বছর আগে যা ছিল ৪৬.৪৯ বিলিয়ন। আগস্টে সরকার জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ায়, যদিও কর্মকর্তারা বলেছিলেন এটা আইএমএফের শর্ত নয়। নভেম্বরে আইএমএফের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তির খবর আসে: ৪২ মাসের কর্মসূচি, প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার, সাত কিস্তিতে। অর্থমন্ত্রী এই সহায়তাকে বলেছিলেন “সতর্কতামূলক” পদক্ষেপ, যাতে অস্থিরতা সংকটে না দাঁড়ায়।
কী শর্ত ছিল? এক গবেষকের বিশ্লেষণে তালিকাটা এরকম: জ্বালানি খাতের ভর্তুকি তুলে নেওয়া, রিজার্ভ বাড়ানো, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, সূত্রভিত্তিক জ্বালানির দাম, মুদ্রানীতি কঠিন করা আর মুদ্রার নমনীয় বিনিময় হার। লেখকের বলা অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে সরকার কিছু শর্ত পিছিয়ে দিয়েছিল। পরে সূত্রভিত্তিক তেলের দাম চালু হয়, সুদের হার বাড়ে, ডলারের দরও অনেক উপরে ওঠে। তবু মূল্যস্ফীতি কমেনি: ২০২৩-এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া ৬ শতাংশ লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
আইএমএফের মিশন প্রধান সন্তুষ্ট হলেও আরও ব্যাংক সংস্কার, কর আদায় আর ভর্তুকি সীমিত করার তাগিদ দিয়েছিল। অর্থনীতিবিদ ফরিদ খানের মতে, কর্তৃপক্ষের সন্তুষ্টি সাধারণ মানুষের স্বস্তি আনেনি: “আইএমএফের সন্তুষ্টি জনগণকে কোনো স্বস্তি দেয়নি”।
শিক্ষা: সংস্কার দরকার তা নিয়ে তর্ক নেই। তবে সময়ের সিদ্ধান্ত আর সুরক্ষার ব্যবস্থা এর সঙ্গে জুড়ে থাকলেই কষ্ট সহনীয় হয়। আর সংস্কার পিছিয়ে দিলে পরে বড় ধাক্কায় পড়তে হয়। আজকের বিশ্বব্যাংকের শর্তগুলোও সেই পরীক্ষার সামনে।
ব্যাংক খাত: পুরোনো ক্ষত, পুরোনো ওষুধ...
হলমার্ক কেলেঙ্কারি ব্যাংক খাতের পুরোনো অসুখের একটি নিদর্শন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা হলমার্ক ও আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে ভুয়া নথি দিয়ে ৩,৫৪৭ কোটি টাকা দিয়েছিল। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০১৭ সালে এই লেনদেনকে বলেছিলেন “সম্পূর্ণ চুরি”, কারণ প্রকৃতপক্ষে কোনো টাকা বিতরণই হয়নি বলে তিনি জানিয়েছিলেন। ২০১৭ সালের হিসাবে সোনালী ব্যাংকের মোট প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা আমানতের বিপরীতে ৩৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়, যার মাত্র ১৯ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে যায়। ১,২১০টি শাখার মধ্যে ২০টিতেই ছিল ৮৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ।
সোনালী ব্যাংকের কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালে যে পদক্ষেপগুলোর কথা বলেছিল: সুদ মওকুফ, ঋণ পুনঃতফসিল আর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া। অর্থাৎ সমস্যা সামলাতে প্রথমেই পুনঃতফসিল আর মওকুফের মতো ওষুধ বেছে নেওয়া হয়েছিল, যা আজও আমরা দেখছি। সেই প্রতিবেদনে চূড়ান্ত বিচারের কথা নেই।
মামুন রশিদ মনে করিয়ে দিয়েছেন, অতীতে পুনঃতফসিল আর নিয়মে ছাড় ক্ষতি স্বীকারকে পিছিয়ে দিয়েছে, আর ২০১৯ সালে তদানীন্তন অর্থমন্ত্রীর বলা “এক পয়সাও” খেলাপি ঋণ বাড়বে না, এমন প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ায় সফল হয়েছিল, কিন্তু ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবে মার খেয়েছে।
শিক্ষা: সংকট সামলানোর সবচেয়ে সহজ পথ পিছিয়ে দেওয়া, আর সবচেয়ে কঠিন পথ দায়ীদের কাঁধে দায় তুলে দেওয়া। ব্যাংকে আসল পরীক্ষা হলো শুদ্ধাচার। আইন আছে, কিন্তু আইন যদি সবার ওপর সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে সব সংস্কার কাগজেই থাকে।
করোনাকাল: প্রণোদনা আর মানুষের নিজস্ব শক্তি...
২০২০ সালে করোনায় পোশাক রপ্তানি প্রায় থমকে যায়। এপ্রিলে রপ্তানি নামে মাত্র ৩৭৪ মিলিয়ন ডলারে, আগের বছরের এপ্রিলের চেয়ে ৮৫ শতাংশের বেশি কম। ৩১৮ কোটি ডলারের অর্ডার বাতিল বা স্থগিত হয়, আর প্রায় ১.৫ কোটি চাকরি ঝুঁকিতে পড়ে।
সরকার তখন এক লাখ কোটি টাকার বেশি (জিডিপির ৩.৭ শতাংশ) প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের লেখা অনুযায়ী, অধিকাংশই দেওয়া হয় ব্যাংকের ঋণের মাধ্যমে, প্রায় ৮২ শতাংশ; সরকার সুদের অর্ধেক ভর্তুকি দিত আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নগদ রিজার্ভ অনুপাত কমিয়ে ব্যাংকের হাতে অর্থ রাখে। অর্থাৎ তখন বড় সহায়তা দাঁড়িয়েছিল কর্জের ওপর।
কিন্তু নিচের দিকে আরও বড় শক্তি কাজ করেছিল। প্রবাসীরা অনেক বেশি টাকা পাঠান: জুলাই ২০২০-এ ২.৬ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের জুলাইয়ে ১.৬ বিলিয়ন ডলার ছিল। ফাহমিদা খাতুনের ব্যাখ্যায়, সংকটে মানুষ নিজের সঞ্চয় পাঠায়, ফেরত আসা কর্মীরা সঙ্গে সঞ্চয় আনেন, আর অনানুষ্ঠানিক পথ বন্ধ হওয়ায় ব্যাংকের পথে টাকা আসে। কৃষকেরাও ফসল ফলিয়েছেন: ২০২০ অর্থবছরে আমন ধানের উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে বেশি ছিল।
সব কিছু ভালো ছিল না। দারিদ্র্য কমানোর গতি থমকে যায়, কিছু মানুষ আবার দারিদ্র্যে ফিরে যান, আর বেকারত্ব বাড়ে। এর পরেও গত সংকটের অনেক ক্ষত থেকে যায়।
শিক্ষা: দুর্যোগের সময় বড় প্রণোদনা প্রয়োজন, তবে যদি তা ব্যাংক পথে যায় আর ক্ষুদ্র ও দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনে সহজে নাগাল না পায়, তাহলে সহায়তার ব্যাপ্তি সীমিত থাকে। আর সংকটে প্রবাসী ও কৃষকের মতো সাধারণ মানুষই অর্থনীতিকে দাঁড় করিয়ে রাখেন, তাঁদের সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়।
অতীত থেকে পাঁচ শিক্ষা:
#. সহায়তা পৌঁছাতে হলে দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাতে হবে। ১৯৭৪-এ সহায়তার বড় অংশ শহর আর সরকারি বেতনে গিয়েছিল। করোনায় প্রণোদনার বড় অংশ ব্যাংক হয়ে গিয়েছিল। লক্ষ্য ঠিক না হলে ক্ষতিগ্রস্ত বাদ পড়েন।
#. ক্ষমতা নয়, জ্বালানি আর হিসাবের নিশ্চয়তা দরকার। স্থাপিত ক্ষমতা চাহিদার চেয়ে বেশি থাকলেও গ্যাস-তেল আমদানির ডলার না থাকলে বাতি জ্বলে না।
#. সংস্কার পিছিয়ে দিলে দাম বাড়ে। আইএমএফের শর্ত পিছিয়ে দিয়েই মূল্যস্ফীতি সামলানো যায়নি।
#. ব্যাংকে ছাড় দিলে ক্ষত গভীর হয়। হলমার্কের সময়ের ওষুধ আজও এসেছে: সুদ মওকুফ, পুনঃতফসিল।
#. সাধারণ মানুষ দাঁড়ান, কিন্তু রাষ্ট্রের দায় ফুরায় না। প্রবাসী আর কৃষকের শক্তি, ব্র্যাক-গ্রামীণ ব্যাংকের উদ্যোগ আমাদের বাঁচিয়েছে। কিন্তু এসব সহনশীলতাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিকল্প বানানো যায় না।
তথ্যসূত্র:
[০১]. নাওমি হোসেন, প্রথম আলো ইংরেজি, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪: The lessons of the 1974 famine
[০২]. ডেইলি স্টার (সম্পাদকীয়), ১৬ মার্চ ২০২২: We are entirely under electricity coverage
[০৩]. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, জান্নাতুল নায়ম পিয়াল, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪: Where did all of Hasina's surplus electricity go?
[০৪]. ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১৯ জুলাই ২০২২: DPDC cutting off power supply to stores that continue business after 8:00 pm
[০৫]. আল জাজিরা, ৯ নভেম্বর ২০২২: IMF, Bangladesh reach preliminary deal for $4.5bn loan
[০৬]. ফরিদ খান, প্রথম আলো ইংরেজি, ১৮ মে ২০২৪: IMF satisfaction: Respite or disquiet for Bangladesh?
[০৭]. ঢাকা ট্রিবিউন, ৮ জুন ২০১৭: Hall-Mark scam shoots Sonali Bank default loan up
[০৮]. ফাহমিদা খাতুন, সিপিডি (ডেইলি স্টারে প্রকাশিত), ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০: How has Bangladesh managed the pandemic-affected economy so far?
[০৯]. ডেইলি স্টার, ২৫ জুলাই ২০২৬: Can Bangladesh finally fix its NPL problem? (মামুন রশিদ)
৫. সংকট মোকাবেলায় অন্যান্য দেশ কী করেছে
কোনো সংকটই সম্পূর্ণ নতুন নয়। পাশের দেশগুলোও কেউ দেউলিয়া হয়েছে, কেউ ঋণে ডুবে গিয়েছে, আবার কেউ সংকট থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাদের সফলতা আর ব্যর্থতা দুটোই আমাদের কাজে লাগে।
শ্রীলংকা, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া আর ইউরোপ। এই ৪টি দেশ— কী করেছিল, কী ফল পেয়েছিল, আর সেখান থেকে বাংলাদেশ কী শিখতে পারে। সত্য কথা বলতে গেলে, কোনো দেশই সম্পূর্ণ আদর্শ নয়, তাই সফলতার সঙ্গে তাদের ক্ষতির কথাও লেখা হয়েছে।
শ্রীলংকা: যখন দেশ দেউলিয়া হলো...
২০২২ সালের এপ্রিলে শ্রীলংকা প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ শোধ করতে পারেনি, সরকার খেলাপি হয়। তার আগেই বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ২০১৯ সালের প্রায় ৭.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২২-এর জুনে ৪০০ মিলিয়নেরও নিচে নেমে যায়। সরকার খাদ্য, জ্বালানি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে পারছিল না। সেপ্টেম্বর ২০২২-এ বছরের হিসাবে মূল্যস্ফীতি উঠে যায় ৭৩.৭ শতাংশে। মাসের পর মাস বিক্ষোভ চলে, আর জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
নতুন সরকার কী করল? রানিল উইক্রমসিংহের সরকার ২০২৩ সালের মার্চে আইএমএফের সঙ্গে চার বছরের ২.৯ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি ঠিক করে। সংস্কারের মূল দিকগুলো ছিল এরকম:
#. ২০২৩ সালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইন বাজেটের ঘাটতি মেটাতে টাকা ছাপানো বন্ধ করে দামের স্থিরতাকে প্রধান লক্ষ্য করে।
#. ভ্যাট বাড়ানো, করছাড় বাতিল আর আদায় জোরদার করা।
#. লোকসানি বিদ্যুৎ আর পেট্রোলিয়াম সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢেলে সাজানো আর দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক হওয়া।
#. বন্ডহোল্ডারেরা প্রায় ২৮ শতাংশ নামমাত্র ক্ষতি মেনে নেন; প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বাদ যায়।
ফলাফল কী হলো? ২০২২ সালে অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ সংকুচিত হয়, ২০২৪-এ বাড়ে ৫ শতাংশের বেশি। রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলার, মূল্যস্ফীতি নেমে নেতিবাচক স্তরে যায়, আর বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স ২০২৪-এ প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ৬.৫৭ বিলিয়ন ডলার হয়।
কিন্তু কষ্টও ছিল: নতুন কর আর দাম বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বরের ৪ শতাংশ থেকে জানুয়ারিতে ৬.৪ শতাংশে ওঠে। তবে ২০২২-এর প্রায় ৭০ শতাংশের তুলনায় তা অনেক কম। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে “আর্থিকভাবে দেউলিয়া দেশ” তকমার অমর্যাদার কথা বলেছিলেন আর আশা করেছিলেন, চ্যালেঞ্জ ধীরে ধীরে কাটবে।
রাজনীতিও এখানে বড় প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৫-এর জানুয়ারিতে নতুন সরকার বিদ্যুৎ বোর্ডকে দাম ২০ শতাংশ কমাতে বাধ্য করে, ফলে বোর্ডটি লোকসানে পড়ে। জুনে আবার দাম ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়, আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী।
শিক্ষা: শ্রীলংকা দেখিয়েছে, সংকট বড় হলে সংস্কারের খরচ ও বাড়ে, আর সেই খরচের বড় অংশ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। সময়মতো সংস্কারে নামলে এই খরচ কমতে পারে, এটি আমার কথা, সূত্রের নিজের দাবি নয়। দুই দেশের অবস্থা এক নয়, তবে সংকট বড় হওয়ার আগেই পদক্ষেপ নেওয়ার শিক্ষাটা সঠিক।
পাকিস্তান: ঋণ সরানো হয়, কমে না...
পাকিস্তানের বিদ্যুৎ খাত বাংলাদেশের অনেক কাছাকাছি একটি আয়না। সেখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যাকে বলা হয় “চক্রাকার ঋণ” (circular debt): এক পক্ষের অনিষ্পন্ন বিল পরপর আরেক পক্ষের কাঁধে পড়তে থাকে। আইএমএফের ৭ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচিতে এই ঋণ কমানো একটি প্রধান শর্ত।
কী করা হয়েছে? ২০২৫ সালের জুনে পাকিস্তান ১৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার (১.২৭৫ ট্রিলিয়ন রুপি) ইসলামি ফাইন্যান্স সুবিধার শর্তপত্র সই করে, যাতে বিদ্যুৎ খাতের ঋণ শোধ হয়। নভেম্বরে অর্থনৈতিক সমন্বয় কমিটি (ইসিসি) বিদ্যুৎ খাতের ঋণ মেটাতে ৬৫৯ বিলিয়ন রুপি (২.৩ বিলিয়ন ডলার) সরকারি গ্যারান্টি অনুমোদন করে। আইএমএফের শর্ত মেনে দাম বাড়ানো আর আর্থিক শৃঙ্খলার ফলে সমস্যা বাড়া থেমেছে, ছয়টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে আর ১৪টি সংশোধিত চুক্তিতে সই করেছে।
কিন্তু মূল সমস্যা রয়ে গেছে। পাকিস্তান ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি (প্যাক্রা) ক্যাপাসিটি পেমেন্টকে খাতটির “মূল প্রাতিষ্ঠানিক চাপ” বলেছে। স্থাপিত ক্ষমতা ৪১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, অথচ ব্যবহার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ; ফলে ইউনিটপ্রতি খরচ বাড়ে। ২০২৫ অর্থবছরে খাতটির আয়ের ৯৭ শতাংশই গিয়েছে জ্বালানি আর ক্যাপাসিটি পেমেন্টে। প্যাক্রা আরও বলেছে, ঋণ, উচ্চ স্থায়ী খরচ, দুর্বল চাহিদা আর সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা এখনও আছে।
অর্থাৎ ব্যাংকের কাছ থেকে নতুন সুবিধা নিয়ে পুরোনো বিল মেটানো হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার অপচয় আর চুক্তির বোঝা পুরোপুরি কমেনি।
শিক্ষা: বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা প্রস্তুত রাখার বিনিময়ে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধের চুক্তি করলে সেই বোঝা দীর্ঘদিন থাকে। আবার কর্জ নিয়ে কর্জ মেটানো মানে সমস্যা বদলানো, মিটানো নয়। বাংলাদেশেও স্থাপিত ক্ষমতা চাহিদার চেয়ে বেশি আর বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ।
দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৭: সোনা দান আর কঠিন সংস্কার...
১৯৯৭ সালের শেষদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ওয়ান মুদ্রা ডলারের বিপরীতে ১,৯৯৫-এ নেমে যায়, রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে ডিসেম্বরে প্রায় ৪ বিলিয়নে দাঁড়ায়, আর বিদেশি ঋণ পৌঁছায় ১৫৩ বিলিয়ন ডলারে। তখন বড় অঙ্কের সহায়তা নিতে হয়: আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক আর অন্য দেশগুলো মিলিয়ে মোট ৫৫ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ, যার মধ্যে আইএমএফের অংশ ২১ বিলিয়ন। শর্ত ছিল সুদের হার বাড়ানো, সরকারি খরচ কমানো, শ্রমবাজার আর মুদ্রার বিনিময় হার আরও নমনীয় করা আর বাণিজ্য উন্মুক্ত করা।
কষ্টটা ছিল গভীর। বেকার মানুষ ১৯৯৭ সালের অক্টোবরে ৪৫২ হাজার থেকে ১৯৯৮ সালে ১৩৭৮ হাজারে ওঠে, বেকারত্বের হার ২.৬ শতাংশ থেকে ৬.৮ শতাংশ। অথচ কোরিয়ার মানুষ খালি হাতে বসে থাকেনি।
সোনা দানের আন্দোলন: ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন মানুষ সোনা দিয়েছিলেন, মোট প্রায় ২২৫ থেকে ২২৭ টন, যার মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। পরিবারপ্রতি গড়ে প্রায় ৬৫ গ্রাম সোনা। ব্যাংক ও নাগরিক সংগঠনের পাশাপাশি সরকার ও সংবাদমাধ্যম (কেবিএস, এমবিসি) এই অভিযানে অংশ নিয়েছিল। সোনার মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যা ৫৫ বিলিয়নের প্যাকেজের তুলনায় ছোট। তবু এর বড় মূল্য ছিল আস্থা আর একতার বার্তা।
সবাই কি এর কৃতিত্ব দিয়েছে? ব্যাপারটা সহজ নয়। ২০১৭ সালের একটি জরিপে প্রায় ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন জাতীয় ঐক্যের কারণে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে, ৪২ শতাংশ আইএমএফ সংকটকে কারণ গণ্য করেছেন, আর মাত্র ১৫ শতাংশ বলেছেন সংস্কার ও পুনর্গঠনকে। সমালোচকেরা বলেন, “দেশপ্রেমের” আবেগ সংকটের আসল কারণ আড়াল করে দিয়েছিল, আর পরে পুনর্গঠনই বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
ফলাফল: স্বল্পসময়ের মধ্যে দেশটি ঘুরে দাঁড়ায়। ১৯৯৯-এর সেপ্টেম্বরে ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ সহায়তা শোধ হয়, আর ২০০১-এর ২৩ আগস্টে বাকি ৬ বিলিয়নও মেয়াদের আগে পরিশোধ করা হয়। তখন রিজার্ভ দাঁড়িয়েছিল ৯৯ বিলিয়ন ডলারে।
শিক্ষা: জনগণের অংশগ্রহণ আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, কিন্তু সংস্কারের বিকল্প হতে পারে না। সরকার আগে সত্য বলার ও দায় নেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়, তারপরই তাঁদের ত্যাগ চাইতে হয়। আর ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির সফলতার কথা মামুন রশিদ বলেছেন।
ইউরোপ: দাম ও সুরক্ষা, দুটোই একসঙ্গে...
২০২২ সালে রাশিয়ার গ্যাস কমে গেলে ইউরোপের সামনেও জ্বালানি সংকট আসে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো, জার্মানিসহ, আগস্ট ২০২২ থেকে মার্চ ২০২৩ পর্যন্ত গ্যাস ব্যবহার ১৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য ঠিক করেন। আইএমএফের হিসাবে জার্মানিতে মে মাসে গ্যাস ব্যবহার পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ, জুনে ৮ শতাংশ আর জুলাইয়ে ১৫ শতাংশ কমেছিল।
কীভাবে সাশ্রয় হলো? আইএমএফের বিশ্লেষণে প্রধান কারণ ছিল চড়া দাম। জুনে ব্যবসার গ্যাসের দাম গত পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে ২৬৭ শতাংশ বেশি ছিল। বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন গাড়ি শিল্প, খুব বেশি করে ব্যবহার কমায় আর সম্ভব হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যায়। তবে সাশ্রয়ের দাম দিতে হয়েছিল: জুলাইয়ে উৎপাদন ও সেবা খাতের কাজকর্ম দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সংকুচিত হয়েছিল, আর আইএমএফ জার্মানির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২০২২-এ ১.২ আর ২০২৩-এ ০.৮ শতাংশ করে।
সুরক্ষার দিকটাও ভাবা হয়েছিল। জার্মানির “গ্যাস ব্রেক” কর্মসূচির নকশা ছিল এরকম: আগের বছরের ব্যবহারের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাসের জন্য প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২ ইউরো সেন্ট দাম, আর সেই সীমার বেশি ব্যবহার করলে বাজারদর। সামগ্রিক দামের বাকি অংশ সরকার সরবরাহকারীকে মিটিয়ে দেয়। শিল্পের জন্য আলাদা সীমা ছিল: ২০২১ সালের ব্যবহারের ৭০ শতাংশের ওপর প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৭ ইউরো সেন্ট। এই নকশার সুবিধা হলো, সীমার বেশি ব্যবহার করলে বেশি দাম দিতে হয়, তাই সাশ্রয়ের আগ্রহ থাকে।
সমালোচনাও ছিল। ধনী পরিবার বেশি গ্যাস ব্যবহার করে, তাই চূড়ান্ত অঙ্কে তাঁরা বেশি সহায়তা পান; ভাড়াটিয়ারা আলাদা মিটারের অভাবে সুবিধা পেতে দেরি আর অস্পষ্টতার মুখে পড়েন। সরকারি ব্যয় ২০২৩ ও ২০২৪-এ প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ইউরো ধরা হয়, আর পুরো প্যাকেজ জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ, যা দুর্বল বাজেটের দেশের পক্ষে বহন করা কঠিন।
শিক্ষা: দামের ইঙ্গিত আর সুরক্ষা, দুটোই প্রয়োজন। সাশ্রয় চাইলে সাম্প্রতিক বাজারদরের সঙ্গে ব্যবহারের সম্পর্ক রাখতে হয়। আবার দরিদ্রদের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে হলে লক্ষ্য ঠিক করতে হয়, নইলে ধনীরাই বেশি সহায়তা পেয়ে যান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বড়, কারণ বিশ্বব্যাংকের হিসাবে রাজস্ব আয় জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশ। তাই লক্ষ্য ঠিক না করলে সহায়তার অর্থ পর্যাপ্ত হবে না।
বাংলাদেশের জন্য চার শিক্ষা...
#. শ্রীলংকার শিক্ষা: আগেভাগে সংস্কার নেওয়াই ভালো। দেউলিয়া হওয়ার পর সংস্কারের খরচ পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। আর সংস্কারের মাঝপথে নীতি উলটালে (বিদ্যুতের দাম কমিয়ে আবার বাড়ানো) অনিশ্চয়তা বাড়ে।
#. পাকিস্তানের শিক্ষা: ঋণ সরালে সমস্যা মিটে না। ক্ষমতার চুক্তি, অব্যবহৃত ক্ষমতা আর ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা বাড়তেই থাকে। বাংলাদেশেও ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি আগেই দেখা গেছে।
#. দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা: আস্থা আগে, তারপর ত্যাগ। জনগণ সোনা দিয়েছিলেন, কিন্তু সংস্কারের বড় কাজ সরকারকেই করতে হয়েছিল। সত্য তথ্য আর দায় স্বীকার ছাড়া ত্যাগ চাওয়া সহজ নয়।
#. ইউরোপের শিক্ষা: দামের ইঙ্গিত আর লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষা। সাশ্রয়ের আগ্রহ ধরে রাখতে দামের ইঙ্গিত দরকার, আবার সবাইকে সমান সহায়তা দিলে ধনীরা বেশি পান, তাই সহায়তা লক্ষ্য করে দিতে হয়।
কোনো দেশই সম্পূর্ণ আদর্শ নয়, আর কোনো দেশের অবস্থা অন্যটির হুবহু নয়। তবে চার দেশের কথা থেকে একটা সুর কাছাকাছি: সময়মতো সত্য বলা, সময়মতো সংস্কার আর দরিদ্রদের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত।
তথ্যসূত্র:
[০১]. আইএফআরই (IFR), জেসন মিচেল, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫: From crisis to recovery
[০২]. দ্য পেনিনসুলা (কাতার), ১১ জুন ২০২৫: Sri Lanka raises electricity price in line with IMF bailout
[০৩]. মালয় মেইল (এএফপি), ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪: Sri Lanka says financial crisis 'gradually' easing
[০৪]. দ্য নিউজ, তানভির মালিক, ৩ মার্চ ২০২৬: Pacra flags structural risks to power sector despite IMF-backed reforms
[০৫]. আরব নিউজ, ৮ নভেম্বর ২০২৫: Pakistan economic body approves $2.3 billion for circular debt financing
[০৬]. উইকিপিডিয়া: Gold-collecting campaign (উইকিপিডিয়ার তথ্য বদলাতে পারে, তাই অনেক সংখ্যা ৭ নং সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে (পরিবারপ্রতি ৬৫ গ্রামের হিসাবটি শুধু এখানেই আছে))
[০৭]. কোরিয়া হেরাল্ড, নো কিং-মিন, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩: From 'miracle to debacle': Painful 'IMF days' of 1997-1998
[০৮]. আইএমএফ নিউজ, ইয়ুশু চেন ও গ্যালেন শের, ১২ আগস্ট ২০২২: Germany is on track to meet gas saving target
[০৯]. কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (সিপা), কর্বিও ও মার্জ, ফেব্রুয়ারি ২০২৩: Understanding Germany's Gas Price Brake
৬. এখন কী করা উচিত
সবার আগে দরকার সত্য বলা। সংকটের আকার, ঋণের অঙ্ক, ভর্তুকির হিসাব আর পরিকল্পনার সময়সীমা জনগণের সামনে খোলাখুলি রাখতে হবে। কারণ গোপন করা সংকট কখনো মেটে না, শুধু বড় হয়। সিপিডি ২০২৬ সালের আগস্টে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি, এই তিন স্তরের পদক্ষেপের কথা বলেছে। আমিও এই ৩টি ধারা মেনে চিন্তা করেছি। যা এখনই করতে হবে, তারপর যা কয়েক বছরে, শেষে যা দীর্ঘ পথে।
ক. সরকারের করণীয়: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ...
প্রথমে সংখ্যাগুলো মনে রাখা দরকার। সিপিডির হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের গ্যাস ব্যবহারের ২৮.৮২ শতাংশ এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে। গ্যাসের কাঠামোগত ঘাটতি প্রতিদিন ১,২০০ থেকে ১,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস, কয়লা আর ফার্নেস অয়েল মিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৮৪ শতাংশের বেশি। আর দেশের নিজস্ব গ্যাস মজুত ২০৩১ সালের দিকে ফুরিয়ে আসার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ শুধু আজকের লোডশেডিং নয়, সামনের দশকের অন্ধকারও আমাদের দরজায়।
১. জরুরি পদক্ষেপ (এখনই থেকে কয়েক মাস)। সিপিডির প্রস্তাব: এলএনজি কেনার পদ্ধতি এমনভাবে সাজানো, যাতে কম দামে আর সঠিক সময়ে কেনা যায়; দাম ও নিয়মকানুনে সংস্কার, যাতে জ্বালানি দক্ষভাবে ব্যবহার হয়; আর সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো, যাতে দামের ধাক্কা গরিবের ঘাড়ে না পড়ে। জ্বালানির দামের সূত্র নিয়েও প্রশ্ন আছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন দামের বর্তমান সূত্রকে ত্রুটিপূর্ণ বলেছেন। তাই দাম কীভাবে ঠিক হয়, তার হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা সরকারের প্রথম দায়িত্ব।
২. মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ (কয়েক বছর)। এলএনজি টার্মিনাল ও মজুত ক্ষমতা বাড়ানো, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা শক্ত করা, সময় বেঁধে জ্বালানি-মিশ্রণে বৈচিত্র্য আনা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি বড় আকারে বাড়ানো। এখানে সবচেয়ে দ্রুত ফল দিতে পারে ছাদের সৌরবিদ্যুৎ। সরকারি তথ্যে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছাদে সৌর সক্ষমতা ৪১৮ মেগাওয়াট। আইইইএফএ ২৩৯টি প্রতিষ্ঠানে ৬৬৭ মেগাওয়াট পেয়েছে এবং অনুমান করছে, বর্তমান সক্ষমতা ইতিমধ্যে ১ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে থাকতে পারে (এটি অনুমান, নিশ্চিত হিসাব নয়)। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫.৫ গিগাওয়াট নতুন ছাদ-সৌর। কিন্তু পথে বাধা আছে। নতুন শুল্ক কাঠামোয় শিল্পের ছাদ-সৌর প্রকল্পের খরচ ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশ হয়েছে; নেট মিটারিং অনুমোদনে ১০-১৫ দিনের কথা থাকলেও দেরি হচ্ছে। আইইইএফএ-র সুপারিশ হলো পূর্ণ শুল্কমওকুফ। হিসাবটাও লোভনীয়: সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় প্রায় ০.০২৮ থেকে ০.০৩২ ডলার, অথচ শিল্পের দিনের বেলার শুল্ক ০.০৯৪ ডলার। ফলে প্রতি ইউনিটে সাশ্রয় প্রায় ০.০৬১ ডলার।
৩. দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, কৌশলগত জ্বালানি মজুত এবং দেশের ভেতরে গ্যাস খোঁজাকে সিপিডি "কৌশলগত জাতীয় জরুরি অবস্থা" হিসেবে দেখার কথা বলেছে। আইইইএফএ-র বিশ্লেষক শফিকুল আলমের কথাও এখানে প্রাসঙ্গিক: ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানিতে খরচ হয়েছে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার, আর "আরও এলএনজি" সমাধান নয়। তাঁর পরামর্শ নবায়নযোগ্য শক্তি (১০.৪৫ গিগাওয়াট লক্ষ্য), আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণ আর গ্যাসের অপচয় কমানো।
৪. ক্যাপাসিটি পেমেন্টের হিসাব খোলা। ২০২২ সালে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় লিখেছিল, বিদ্যুতের সক্ষমতা চাহিদার চেয়ে ৪০ শতাংশের বেশি, আর বছরে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা যাচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জে। যে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও টাকা পায়, তার চুক্তির শর্ত জনসমক্ষে এনে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। জনগণের টাকায় চলা চুক্তি জনগণের কাছে গোপন থাকতে পারে না।
খ. সরকারের করণীয়: ব্যাংক খাত...
ব্যাংক খাতের ক্ষত বড়, তাই ওষুধও কড়া হতে হবে। ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা। আর পত্রিকায় প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী আইএমএফ ৮০০ মিলিয়ন ডলারের কিস্তি আটকে রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত মাইনাস ২.৬ শতাংশ। এই অবস্থায় সবচেয়ে দরকারি কয়েকটি পদক্ষেপ:
১. সত্য হিসাব দেখানো। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই করে ফলাফল জনগণের সামনে প্রকাশ করা ও খেলাপি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা সত্যিকার হিসাবে ঠিক করা লেখক সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদের প্রস্তাব। সমস্যা গোপন রাখলে তা ফুলে ওঠে, সমাধান হয় না। (লেখাটি মতামতধর্মী প্রবন্ধ, তাই এর পরামর্শগুলো লেখকের মত বলেই ধরতে হবে।)
২. দুর্বল ব্যাংকে কঠোর নিয়ম। দ্রুত সংশোধনের নিয়ম (Prompt Corrective Action) চালু করা, যেখানে সংশ্লিষ্ট মালিকের জন্য কোনো ছাড় থাকবে না। বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমাতে ১০টি পদক্ষেপের কথা বলেছে। তার মধ্যে আছে ব্যাংক সমাধান কাঠামো, আমানতের আরও জোরালো সুরক্ষা, রাজনৈতিক নিয়োগের বদলে যোগ্য পরিচালক, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার, শুধু সচল ব্যাংকের জন্য জরুরি তারল্য সহায়তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা।
৩. খেলাপি ঋণ রাজনৈতিক চাপমুক্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনায়। দ্য ডেইলি স্টারে মামুন রশিদ লিখেছেন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) রাজনীতি থেকে স্বাধীন থাকতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার কামকো আর মালয়েশিয়ার দানাহার্তা কাজ করেছে, আর ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ায় সফল হয়নি। শিক্ষা পরিষ্কার: কোম্পানি থাকলেই হয় না, সেটি স্বাধীন হতে হবে। সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ আরও বলেছেন, সরকারি অর্থে একটি “ব্যাড ব্যাংক” গড়ার তিনি বিরোধী।
৪. আইন ও আদালত। সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদের প্রস্তাবে আছে দেউলিয়া আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে পুনর্গঠনের সময়সীমা, অর্থঋণ আদালতের সংস্কার এবং “ইচ্ছাকৃত খেলাপি” শব্দের স্পষ্ট সংজ্ঞা ও প্রয়োগ। সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২ সংশোধন করে স্বায়ত্তশাসন এবং ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আইএফআরএস ৯ চালুর কথাও আছে। ব্যাংক একীভূতকরণের ধারা (১৮-ক) নিয়েও সরকারের ভাবনা চলছে; বিশ্বব্যাংকের ১.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের সঙ্গে সংস্কারের শর্ত যুক্ত।
গ. সরকারের করণীয়: সামাজিক সুরক্ষা ও রাজস্ব…
সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা পড়ে সেই মানুষের ওপর, যার কোনো দোষ নেই। তাই সরকারের করণীয়ের তৃতীয় দিকটি হলো গরিবকে রক্ষা করা আর রাজস্বের ভিত শক্ত করা।
১. সহায়তা হবে লক্ষ্যভিত্তিক। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী জ্বালানি, সার ও সামাজিক সহায়তায় সরকার খরচ করে জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ। অথচ সবচেয়ে গরিব পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সুরক্ষাবলয়ের সহায়তাই পায় না। দারিদ্র্য আবার বাড়ছে, ২২.৮ শতাংশের দিকে। সরকারি কর্মসূচি চলছে ১০০টিরও বেশি, কয়েক ডজন মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ: দাম সবার জন্য কমানো হলে সে সুবিধা বেশি পায় ধনী আর বড় প্রতিষ্ঠান; সারের ভর্তুকির অংশ অন্যত্র চলে যায়; খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি (ওএমএস) আর খাদ্যের বিনিময়ে কাজ কর্মসূচিতেও ফুটো আছে, অর্থাৎ সুবিধার একটি অংশ লক্ষ্যে পৌঁছায় না। পরামর্শ: বড় ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে যাচাইকৃত গরিব পরিবারকে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া, খাদ্যসহায়তার প্রকল্প একত্র করা, ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাড়ানো আর ডিজিটাল অর্থ প্রদান। সব মিলিয়ে সংস্কার হলে প্রায় ২.৮৫ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারে। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও সামাজিক সুরক্ষার পরিসর বাড়ানোর কথা বলেছেন।
২. ক্যাপাসিটি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ। বিশ্বব্যাংক বলেছে, দ্রুত ভাড়ায় আনা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষমতা-মাশুল প্রচুর সরকারি অর্থ গিলে ফেলে। তাই নতুন চুক্তি স্বচ্ছ প্রতিযোগিতায়, আর পুরনো চুক্তির হিসাব জনসমক্ষে হওয়া উচিত।
৩. রাজস্বের ভিত শক্ত করা। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে কররাজস্ব জিডিপির ৭.০ শতাংশ। রাজস্ব না বাড়িয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো শর্টকাট নেই। সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদের প্রবন্ধে প্রস্তাব: এনবিআর পুনর্গঠন, ভ্যাট যুক্তিযুক্ত করা, আয়করদাতা ৩.৫ মিলিয়ন থেকে ১০ মিলিয়নে নিয়ে যাওয়া, আর কর-জিডিপি অনুপাত ৭-৮ শতাংশ থেকে ১০-১২ শতাংশের দিকে নিয়ে যাওয়া। কথাগুলো কঠিন, কিন্তু আয় না বাড়লে সব সহায়তাই হয় সীমিত, আর ব্যাংকের দায় শেষ পর্যন্ত করদাতার ঘাড়েই আসে।
ঘ. জনগণের করণীয়…
এখানকার পরামর্শগুলো আমার নিজের ব্যবহারিক প্রস্তাব, কোনো একক সূত্র থেকে নেওয়া নয়। তাই সেগুলো বিচার করে নিন।
চুপ করে সয়ে যাওয়া আর অন্ধভাবে দলের স্লোগান আওড়ানো, দুটোই অসহায়ত্বের রূপ। অর্থনীতিবিদ আলবার্ট হিরশম্যানের মতে, প্রতিষ্ঠানের অবনতিতে মানুষের সামনে দুটি পথ: ছেড়ে যাওয়া (exit) অথবা কণ্ঠ তোলা (voice)। গণতন্ত্রে দ্বিতীয়টিই শক্তি।
১. প্রশ্ন করুন, তথ্য চান। তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ অনুযায়ী সরকারি দপ্তরে লিখিত আবেদন করা যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি, খেলাপি ঋণের তালিকা, সামাজিক সুরক্ষার প্রতিটি কর্মসূচির হিসাব— সবকিছুর সঙ্গে জনগণের সরাসরি সম্পর্ক আছে।
২. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নিজের অংশ। অপচয় কমানো, অপ্রয়োজনে বাতি ও যন্ত্র বন্ধ রাখা, আর যাঁরা পারেন তাঁরা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানো। শিল্পের ছাদের হিসাবে দেখা গেছে, নিজস্ব সৌর উৎপাদন বিলের বোঝা কমাতে পারে। এখানে কর নিয়মের জটিলতা আর নেট মিটারিংয়ের দেরির বিষয়টি সরকারকে দেখতে হবে।
৩. গুজবে আতঙ্ক নয়, যাচাই করুন। ব্যাংক নিয়ে গুজব ছড়ালে সবচেয়ে ক্ষতি হয় সাধারণ আমানতকারীর। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা আর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিবৃতি ভালো করে দেখে তবেই সিদ্ধান্ত নিন।
৪. ভোট ও নাগরিক চাপ। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রার্থীদের কাছে কথা নয়, লিখিত সময়বদ্ধ পরিকল্পনা চাওয়া: বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ব্যাংকে কী করবেন, কত দিনের মধ্যে। অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও সজাগ জনমত থাকা গণতান্ত্রিক দেশে দুর্ভিক্ষের মতো ভয়াবহ সংকট ঠেকানো সহজ হয়।
৫. দুর্নীতির সামাজিক বর্জন। খেলাপি ঋণ, লুট ও সুযোগসন্ধানীর প্রতি সমাজ সম্মান দেখালে তাদের দাম বাড়ে। সমাজ যত এই অন্যায়কে অসম্মান করবে, এর শিকড় তত দুর্বল হবে।
ঙ. সময়সূচি…
সময়সীমা বাঁধা ছাড়া কোনো পরিকল্পনা কাজ করে না। নিচের সাজানোটি আমার, তবে তিন স্তরের কাঠামোটি সিপিডির, আর ব্যাংক খাতের প্রস্তাবগুলো বিশ্বব্যাংক ও টিবিএস-এর প্রবন্ধ থেকে নেওয়া।
#. ০ থেকে ৩ মাস: সব আমদানি ও ক্যাপাসিটি চুক্তির হিসাব জনসমক্ষে আনা। ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাইয়ের ফলাফল প্রকাশ। গরিবের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার প্রস্তুতি।
#. ৪ থেকে ২৪ মাস: ছাদের সৌর শুল্ক সহজ করা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি আইন, ব্যাংক সমাধান কাঠামো, সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচি একত্র করা, আইএফআরএস ৯ চালু (প্রস্তাবিত সময়সীমা ২০২৭ সালের ডিসেম্বর)।
#. ২ থেকে ৫ বছর: এলএনজি টার্মিনাল, সঞ্চালন ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য শক্তির লক্ষ্য (২০৩০ সাল পর্যন্ত)।
#. ৫ থেকে ১০ বছর: দেশের গ্যাস খোঁজা, জ্বালানি মজুত আর সংস্থাগত সমন্বয়।
উপসংহার
এই প্রবন্ধের ছয়টি অংশে একটি কথাই বারবার এসেছে: সংকট কোনো একদিনে আসেনি, তাই একদিনে যাবেও না। কিন্তু যে দেশ সত্য বলে, নিয়ম মানে, প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতি থেকে স্বাধীন রাখে আর গরিবকে আগে বাঁচায়, সে দেশ সংকট পার হয়। অন্য দেশের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। সরকারের দায় পরিকল্পনা প্রকাশ করা, জনগণের দায় প্রশ্ন করা।
তথ্যসূত্র:
[০১]. Ittefaq, "CPD for urgent measures to address energy crisis", 13 Aug 2026 — https://en.ittefaq.com.bd/17714/cpd-for-urgent-measures-to-address-energy-crisis
[০২]. pv magazine, Matthew Lynas, "Bangladesh hits 1 GW rooftop solar capacity", 5 Aug 2026 — https://www.pv-magazine.com/2026/08/05/bangladesh-hits-1-gw-rooftop-solar-capacity/
[০৩]. Dhaka Tribune, Wafiur Rahman, "World Bank: subsidies failing Bangladesh's poorest", 7 Oct 2026 — https://www.dhakatribune.com/business/421495/world-bank-subsidies-failing-bangladeshs-poorest
[০৪]. Prothom Alo English, "World Bank recommends 10 steps to mitigate bank sector risks", 24 Apr 2025 — https://en.prothomalo.com/business/local/b3ga6a6il7
[০৫]. The Business Standard, Sayeed Ibrahim Ahmed (মতামত), "Fixing the financial architecture", 10 Jun 2026 — https://www.tbsnews.net/node/1458701
[০৬]. IEEFA, "More LNG is not the answer to Bangladesh's energy crisis" — https://ieefa.org/resources/more-lng-not-answer-bangladeshs-energy-crisis
[০৭]. Citizens Voice / TBS, 23 Sep 2026 — https://citizensvoicebd.com/economy/143830/
[০৮]. The Daily Star, Mamun Rashid, "Can Bangladesh finally fix its NPL problem?", 25 Jul 2026 — https://www.thedailystar.net/business/news/can-bangladesh-finally-fix-its-npl-problem-4232061
[০৯]. The Business Standard, "Banking woes, energy shortages, low revenue threaten Bangladesh's growth: World Bank" — https://www.tbsnews.net/economy/banking-woes-energy-shortages-low-revenue-threaten-bangladeshs-growth-world-bank-1564136
[১০]. The Daily Star editorial, 16 Mar 2022 — https://www.thedailystar.net/views/editorial/news/we-are-entirely-under-electricity-coverage-2983781
[১১]. The Daily Star, 17 May 2026, "Reforms tied to $1.7b WB loans, govt mulls changing bank merger clause" — https://www.thedailystar.net/business/economy/news/reforms-tied-17b-wb-loans-govt-mulls-changing-bank-merger-clause-4177456
ধন্যবাদ ও বিনীত,
আবদুল্লাহ আল আদীব।
স্বাধীন কলাম লেখক।
অর্থনীতি বিভাগ (মাস্টার্স), চট্টগ্রাম কলেজ।
#মতামত লেখকের নিজস্ব; দায়ও।

Comments
Post a Comment