প্রথম পরাজয়
সৈকত প্রসাদ রায়
ডা. অমূল্য ভূষণ চট্টোপাধ্যায় - নামটা শোনামাত্রই রোগীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন। চার দশকের বেশি সময় সরকারি হাসপাতালে তিনি হৃদরোগ সার্জারির জগতে এক কিংবদন্তি। অসংখ্য মানুষ তাঁর হাতে নতুন জীবন পেয়েছেন। সহকর্মীরা তাঁকে ডাকতেন “হার্টের জাদুকর”। কোনদিন তিনি কোনো হার্টের অপারেশনে অসফল হননি |
কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল অনন্য। দারিদ্র্য-পীড়িত রোগীকে বিনা খরচে চিকিৎসা করতেন, প্রায়ই ওষুধও কিনে দিতেন নিজের পকেট থেকে। এই কারণেই হয়তো সমাজে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার অভাব ছিল না।
অবসরের দিন তাঁকে ঘিরে হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে করতালির ঝড় উঠেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এতদিনের পরিশ্রম শেষে এবার বিশ্রাম নেবেন তিনি। কিন্তু ডাক্তারবাবুর কাছে চিকিৎসা শুধুই পেশা নয়, জীবনের এক অনিবার্য দায়িত্ব। তাই অবসরের পরও অনুরোধে মাঝেমাঝে বেসরকারি নার্সিংহোমে অস্ত্রোপচার করতেন।
২৪ জানুয়ারি, রাত প্রায় দশটা। শীতের রাতে ডাক্তারবাবু নিজের লাইব্রেরিতে বসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই উল্টাচ্ছিলেন। হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠল।
- “হ্যালো, ডা. চট্টোপাধ্যায়? আমি সিটি নার্সিংহোম থেকে বলছি। স্যার, এক রোগী ভর্তি হয়েছে। অবস্থা ভীষণ গুরুতর। হার্টে মারাত্মক ব্লক, এখনই ওপেন হার্ট সার্জারি ছাড়া উপায় নেই। আপনি কি আসতে পারবেন?”
ডাক্তারবাবু এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন। পঁচাত্তর এর ওপরে বয়স হয়েছে, শরীরও আগের মতো সুস্থ নয়। তবুও বললেন -
“আমি আসছি। রোগীকে প্রস্তুত করুন।”
তিনি জানতেন, রাত যতই হোক, ডাক্তারি মানে জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ।
নার্সিংহোমে পৌঁছে রোগীর রিপোর্টগুলো নার্সের কাছ থেকে নিলেন, দেখে বুঝলেন কিছু করার নেই। নার্সকে বললেন,
নার্স বললেন, “রোগী নিজেই অপারেশনটা করাতে চাচ্ছে আর আপনার নাম করছেন। বলছেন, আপনি অপারেশন করলেই তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন।”
ডাক্তারবাবু কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে থাকলেন, তারপর নার্সকে কেবিন নম্বর বলতে বললেন। নার্স বলার পর ১১ নম্বর কেবিনের দিকে ডাক্তার চট্টোপাধ্যায় নিজেই এগিয়ে চললেন, রোগীকে নিজের চোখে দেখতে। কেবিনের দরজা খুলে ঢুকে অবাক হয়ে গেলেন। রোগীকে প্রথম দেখার মুহূর্তেই বুক ধক করে উঠল তাঁর। বিছানায় শুয়ে আছে সৃজনী ঘোষ— তার একসময়ের সহপাঠী, তার জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেমিকাও বটে|
নবম শ্রেণির থেকে সৃজনীর সঙ্গে আলাপ, সঞ্জয় স্যারের বাড়ি পড়তে গিয়ে। তাদের সম্পর্ক নীরব কিন্তু খুব গভীর ছিল। একসাথে স্যারের নোট শেয়ার করা বা রাত বেশি হলে সৃজনীকে বাড়ি অবধি এগিয়ে দেওয়াও সবই নীরবে হতো। ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময় থেকেই তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে লাগলো।
অমূল্যবাবুর বাবা-মা প্রথম থেকেই ছেলেকে ডাক্তার বানানোর জন্য পরিকল্পনা করেছিলেন। সৃজনীর সঙ্গে ছেলের বন্ধুত্ব তারা মেনে নেননি। একদিন অনিন্দ্য বাবু ছেলেকে সরাসরি জানিয়ে দিলেন—“সৃজনীর সঙ্গে তোমার আর কোনো সম্পর্ক রাখার দরকার নেই। এছাড়া ওদের উপাধি ঘোষ ,কায়স্থ, তাই সৃজনীকে নিয়ে যদি তোমার কোনো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা থাকে, সেটাও ভুলে যাও। আমরা মেনে নেব না। পড়াশোনায় মন দাও।” অমূল্যবাবু ভাবলেন, ডাক্তারি পড়া শেষ করে এসে তাদের সম্পর্কটা নিয়ে ভাববেন|
কিন্তু ছয় বছর পরে, যখন ডাক্তারি পাশ করে ফিরে এলেন, তখন সৃজনীর অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে গেছে।
অভিমান হোক বা অনিচ্ছা, অমূল্যবাবু আর বিয়ে করলেন না। হাজার অনুরোধের পরেও ডাক্তার বাবুকে বিয়ের পিরিতে বসানো গেল না। বেলুর মঠে দীক্ষা নিয়ে সম্পূর্ণভাবে মানব সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন|
সৃজনীর জীবন তখন তছনছ হয়ে গিয়েছিল। চরিত্রহীন ল্ম্পট বর চয়নের পাল্লায় পড়ে , বাড়ি থেকে দেখে শুনে বিয়ে দিলেও কেউ জানতেন না পোস্ট অফিসে চাকরি করা চয়ন ল্ম্পট চরিত্রহীন।
সৃজনীর মেয়ে নন্দিনীর জন্মের পর শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচার বেড়েছিল। অন্যদিকে চয়ন নিজে তার স্ত্রীকে বন্ধুদের উপহার দেওয়ার জন্য চেষ্টা করতে লাগল। সৃজনী সেটা বুঝতে পেরেই এক বছরের নন্দিনীকে নিয়ে এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে কলকাতায় এসে উঠল এক পাড়াতো দাদা-বৌদির সংসারে। তখন বাবা-মা কেউ ছিল না।
দাদা হকার, বৌদি পরের বাড়িতে রান্না করতেন। সৃজনীও নন্দিনীকে মানুষ করার জন্য কখনও পরের বাড়িতে রান্না করতেন, কখনও আয়ার কাজ করতে লাগল।
নন্দিনী বড় হয়ে প্রাইভেট কোম্পানিতে সেলসের কাজ পেল। সৃজনীর কাজ করা বন্ধ হলো, কিন্তু ততদিনে শরীরের অনিয়ম, খাওয়ার অনিয়মের কারণে হার্টের রোগ বাসা বেঁধেছে। সাধারণ ডাক্তার দেখালেও সৃজনী খোঁজ রেখেছিলেন তার জীবনের প্রথম ভালোবাসা অমূল্যর। শুনেছে, সে এখন বিরাট বড় হার্টের ডাক্তার।
সামনেই নন্দিনীর বিয়ে সৌনকের সঙ্গে। সৌনক সৃজনীর হবু জামাই। সৃজনী বুঝতে পারছেন, হাতে আর বেশি সময় নেই। অনেকেই বলছেন, ডাঃ অমূল্য ভূষণ চট্টোপাধ্যায়কে দেখানোর জন্য।
সৌনকের ইচ্ছে নতুন প্রজন্মের ডাক্তারদের দেখানো, কারণ অমূল্যবাবুর বয়স হয়েছে। কিন্তু সৃজনী এতদিন নিজের মুখ অমূল্যকে দেখাবেন না ভেবেও, শেষ সময় এসে যেন প্রবল টান অনুভব করছেন—একবার অন্তত অমূল্যকে শেষ দেখা দেখবেন।
নিজেকে কিছুতেই আর সামলাতে পারছেন না সৃজনী। মেয়ে জামাইয়ের কাছে দিয়ে বললেন, “অমূল্য, তার সহপাঠী, তাই অমূল্যকেই আমি দেখাব। আর অপারেশন করলে অমূল্যই করবে।”
নন্দিনী রাজি ছিল। সৌনকও রাজি হয়ে গেল। তারা ঠিক করল, “ অমূল্যবাবুর চেম্বারে গিয়ে সৃজনীকে দেখাবে।”
কিন্তু সেই রাতেই সৃজনীর বারাবারি অবস্থা হলো - তরিঘরি তারা সৃজনীকে ভর্তি করল সিটি নার্সিং হোমে।
অমুল্যবাবু নার্সিংহোমের বিছানায় শুয়ে থাকা সৃজনীকে প্রথমে চিনতে একটু অসুবিধা হয়েছিল। রোগা, ক্লান্ত, ফ্যাকাশে মুখখানি যেন একেবারেই বদলে গিয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই বুক কেঁপে উঠল - এ যে তাঁর সৃজনী! অচেতন আবেগে ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে এলো,
“ সৃজা…!”
এই নামেই তিনি একসময় স্নেহভরে সৃজনীকে ডাকতেন।
শুনেই সৃজনীর চোখ জলে ভরে গেল। ফিসফিস করে বলল,
- “অমু… তাহলে তুমি এলে…!”
বলতে বলতেই সৃজনীর চোখ বেয়ে গড়িয়ে নামতে লাগল অশ্রু।
অমুল্যবাবু এগিয়ে এসে তার কাঁপা হাত দু’টি আলতো করে ধরলেন। সেই স্পর্শে সৃজনীর শরীর হঠাৎ কেঁপে উঠল। বহুদিনের পুরোনো স্নেহ-ভালোবাসার ছোঁয়া যেন ফিরে এলো এই ক্ষণিকের মুহূর্তে।
আর যেন মনে হলো, অগণিত দুঃখ-কষ্ট, অসুখ-বেদনা সব মিলিয়ে সৃজনীর মন-প্রাণ এক মুহূর্তের জন্য হালকা হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর সৃজনী যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো, তখন অমুল্যবাবুর দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক তরুণীর ওপর। বয়স চব্বিশ–পঁচিশের বেশি নয়। মেয়েটি গম্ভীর চোখে তাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সৃজনী আলতো স্বরে বলল - “ও আমার মেয়ে, নন্দিনী।”
নন্দিনী এক মুহূর্ত দেরি না করে এগিয়ে এসে দ্রুত অমুল্যবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। অমুল্যবাবু কেঁপে উঠলেন। তিনি কাঁপা হাতে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে মেয়েটির মাথায় হাত রাখলেন, কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সৃজনীর অসংখ্য রিপোর্ট, ডাক্তারের লেখা কাগজ - সবই যেন একসঙ্গে বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধছিল।
নন্দিনীর চোখ ভিজে এলো। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেলেও হঠাৎ ফেটে পড়ল আবেগে - “কাকু, আমার সামনেই বিয়ে, আপনি মা কে ভালো করে দিন। আমার তো মা ছাড়া কেউ নেই, ছোট থেকে একা……”
বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল নন্দিনী।
সৃজনী চোখ মুছে হাসার চেষ্টা করল। কাঁপা গলায় মেয়েকে বলল
- “দেখো, বোকা মেয়ের কান্নাকাটি! ওরে তুই জানিস না, তোর এই অমুল্য কাকু তো হার্ট-অপারেশনের ম্যাজিশিয়ান। আজ অবধি কারও প্রাণ যায়নি ওর হাতে। আমি-ও হাসতে হাসতে ফিরে আসব, দেখিস। তাই তো, অমু?”
বলেই সৃজনী ভালোবাসা ভরা চোখে তাকাল অমুল্যবাবুর দিকে।
অমুল্যবাবু নন্দিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন -
“ভগবানকে ডাকো মা, তার ইচ্ছের উপরে আমরা কেউ নই।”
বলেই হঠাৎ করে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন, কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে অমুল্যবাবু ছাদে চলে গেলেন।
চাঁদের আলোয় ছাদ ঝলমল করছে, কিন্তু অমুল্যবাবুর পুরো ছাদই অন্ধকারে ঢাকা। চোখ বুজে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তিনি সারদা মা’কে স্মরণ করতে লাগলেন। নিজের মনেই বললেন -
“মা, সৃজনীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর নিজের জীবনের আর কোনো মানেই খুঁজে পেতাম না। তখন তো তুমি আমায় আগলে রেখেছিলে। এই বয়সে এসে এ কেমন পরীক্ষায় ফেললে মা? কেন সৃজাকে আবার আমার কাছে এনে দিলে, তাও এই অবস্থায়? আমি তো জানি, আমি ওকে বাঁচাতে পারব না। কিন্তু… আমি এবার কী করব মা?”
নিজের ভেতরে যেন হঠাৎই উত্তর পেয়ে গেলেন অমুল্যবাবু। মনে মনে ভাবলেন—
“আমি ডাক্তার সবার আগে। আমাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করতে হবে। হারের আগে হেরে যাওয়ার কোনো মানেই নেই। আমাকে আমার কর্তব্য করতেই হবে।”
এই ভেবেই তিনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলেন। ডিউটি সিস্টারকে ডেকে বললেন - “পেশেন্টকে রেডি করুন।”
অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগেই করিডরে নন্দিনী চোখে জল নিয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে ছিল। অমুল্যবাবু এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় হাত রেখে বললেন—
“চিন্তা কোরো না মা, ভগবান আছেন, তাকেই ডাকো।”
এরপর তিনি ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দেখলেন, সৃজনী একদৃষ্টে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। অমুল্যবাবু এগিয়ে গিয়ে সৃজনীর হাত ধরলেন। সৃজনীও পাল্টা অমুল্যবাবুর হাত শক্ত করে চেপে ধরে নিজের কপালে আর গালে ঠেকালো।
অমুল্যবাবুর ভেতরটা যেন ভেঙে পড়ল, তবু মুখে কঠিন ভাব বজায় রাখলেন। চোখের ইশারায় সৃজনীকে আশ্বস্ত করলেন, তারপর ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিলেন।
অপারেশন থিয়েটারে আলো ঝলমল করছে। অমুল্যবাবু স্ক্যালপেল হাতে নিলেন। সময় যেন থেমে গেছে।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা লড়াই চলল। বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও হৃদপিণ্ড ঠিকমতো সাড়া দিচ্ছে না। অমুল্যবাবুর কপালে ঘাম জমে গেল।
নন্দিনীর কান্নাভেজা চোখ, সৃজনীর তাঁর হাত ধরে বাঁচতে ফেরার বিশ্বাস, আর শেষ মুহূর্তে সৃজনীর অমুল্যবাবুর হাত চেপে ধরা - সবকিছুই ছবির মতো অমুল্যবাবুর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। জুনিয়র ডাক্তারদের নিয়ে সামনে এগিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রতিটি পদক্ষেপেই বুকের ভেতর কাঁপন উঠছিল, তবু হাত থামছিল না।
আর মাঝেমধ্যেই মনের গভীরে তিনি সারদা মাকে স্মরণ করছিলেন
কিন্তু না - মেডিকেল সায়েন্সের রিপোর্টকে তিনি মিথ্যে প্রমাণিত করতে পারলেন না। জীবনে প্রথমবারের মতো হার্ট অপারেশনের ম্যাজিশিয়ান ডাঃ অমুল্যভূষণ চট্টোপাধ্যায় হেরে গেলেন।
আর জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি হারালেন তাঁর ভালোবাসা—সৃজাকে।
হৃদপিণ্ড থেমে গেল। মনিটরে সোজা রেখা। চলে গেল সৃজনী… চিরতরে।
ডাক্তারবাবু বিহ্বল হয়ে ফিসফিস করে বললেন - “আমাকে ক্ষমা করো, সৃজা।”
এক অদ্ভুত যন্ত্রণা বুক চেপে ধরল তাঁকে। তিনি বুঝলেন, নিজের শরীরও দুর্বল হয়ে আসছে।
বাইরে খবর ছড়িয়ে পড়তেই কান্নার রোল উঠল। নন্দিনী চিৎকার করে কাঁদছে, হবু জামাই আর তাঁর বন্ধুরা উত্তেজিত হয়ে বলছে - “তখনই বলেছিলাম, বুড়ো ডাক্তারকে বিশ্বাস কোরো না। নতুন ডাক্তার দেখাতে হবে। এখন দেখো কী সর্বনাশ হলো!”
অবশেষে ওয়ার্ডবয়রা সাদা চাদরে ঢাকা এক দেহ বের করল। নন্দিনী চিৎকার করে দৌড়ে এল -“মা!”
সে নিথর দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, বুক ভেঙে কান্না শুরু করল। চারপাশের সবাই ধরে টানতে চাইছে, কিন্তু সে ছাড়ছে না।
এক ওয়ার্ডবয় বলল - “মুখটা একবার খুলে দাও।”
চাদরের কোণা সরাতেই নন্দিনী হতবাক হয়ে গেল। এ তার মা নয়! এ তো তার ডাক্তার কাকু - ডা. অমূল্য ভূষণ চট্টোপাধ্যায়।
বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল সবাই। কান্না থেমে গিয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
পেছন থেকে আরেকটি দেহ বের হলো সেটিই ছিল সৃজনীর নিথর দেহ।
নার্স ভাঙা গলায় বললেন—
- “ডাক্তারবাবু সৃজনীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। জীবনে প্রথম পরাজয়—তাও আবার আপনজনের কাছে।শেষ মুহূর্তেও তিনি সৃজনী দেবীর হাত ধরে ছিলেন।”
নন্দিনী এগিয়ে এল ডাক্তার কাকুর দিকে। হাত ধরে ফিসফিস করে বলল - “আপনি কথা রাখতে পারেননি কাকু… কিন্তু আমি জানি, প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন,কারণ মা আমাকে বলে গিয়েছেন যে, আপনি মায়ের একমাত্র ভালোবাসার মানুষ ছিলেন। মাকে ফেরাতে গিয়ে আপনিও চলে গেলেন। এখন আমি কাকে নিয়ে থাকবো?”
চারপাশে উপস্থিত সবাই নীরব। হবু জামাই আর তাঁর বন্ধুরাও মুখ নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
করিডরে তখন শুধু কান্নার শব্দ।
ডা. অমূল্য ভূষণ চট্টোপাধ্যায় সারা জীবন অসংখ্য মানুষকে বাঁচিয়েছেন। তাঁর হাতে হাজারো রোগী নতুন জীবন পেয়েছে। তবু জীবনের একমাত্র পরাজয় এলো তাঁর আপনজনের সামনে - তাঁর ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে—মানুষের দৃষ্টিতে যদিও তিনি ভালোবাসার মানুষটিকে হারালেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জীবনের ওপারেও ভালোবাসার মানুষের হাত ধরেই গেলেন।
দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল গান—
“ওপারের ডাক যদি আসে
শেষ খেয়া হয় পারি দিতে,
মরণ তোমায় কোনদিনও
পারবে না কভু কেড়ে নিতে…”
----------------------------------------
সৈকত প্রসাদ রায়,
রানাঘাট , নদীয়া
Comments
Post a Comment