পদবির সম্বন্ধে কিছু কথা
প্রাচীন কালে বা আদি মধ্যযুগে নামের পাশে কোন পদবির লেজুড় ছিল না। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর এবং সব দেব দেবীরা ছিল পদবি বিহীন। নামেই তারা পরিচিত ছিল। সত্য যুগেও সবাই শুধু নামেই পরিচিত ছিল। যেমন, রাজা হরিশচন্দ্র, শান্তনু শকুন্তলা, নল দময়ন্তী, সাবিত্রী সত্যবান, মান্ধাতা ইত্যাদিদের কোন পদবি ছিল না। রামায়ণে ও মহাভারতে আর ছাত্রিশটি পুরাণের চরিত্রের আমরা পদবি পাই না। এমনকি মনু বংশের প্রথম মনু স্বয়ম্ভর মনু থেকে স্বরচিষ, তামস, রৈবত, বিবস্বান, বৈবস্বত সহ মোট তের জন মনুদের পদবি ছিলনা। মুনি ঋষিদের পদবির কথা জানা যায়না। শুধু অগস্ত, বাল্মিকী, বশিষ্ঠ, বিশ্বমিত্র ইত্যাদি নামেই পরিচিত।
ত্রেতা দ্বাপর যুগেও, সূর্য্য ও চন্দ্র বংশের পদবির অস্তিত্ব ছিলনা। তারা শুধু রাম লক্ষ্মণ, ভরত শত্রুঘ্ন, যুধিষ্ঠির ভীম, অর্জুন, দুর্যোধন ইত্যাদির পদবি ছিল না। কলি যুগে সম্রাট অশোক, বিক্রমাদিত্য, চানক্য, কালিদাশ, আর্যভট্ট, বরাহমিহির অপালা, গার্গীদের কোন পদবী ছিল না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক পত্রলেখকের বাঙালী মেয়ের পদবি সন্মন্ধে জানতে চাওয়ায় তিনি উত্তরে লিখেছিলেন, ' মেয়েরই হোক আর পুরুষেরই হোক পদবি মাত্রই বর্জন করবার আমি পক্ষপাতী।ভারতবর্ষের অন্য প্রদেশে তার নজির আছে এই আমার ভরসা।' এছাড়া তিনি লিখেছেন, ( পত্রলেখককে নয়) ' নামের ভার যথাসম্ভব লাঘব করারই আমি সমর্থন করি। শ্বশুরকুলের পরিচয়ে দ্রৌপদীকে পান্ডবী বলা হয়নি।' ধর্ম ঠাকুর মূলত গ্রাম দেবতা। তিনি ধর্মপ্রাণ নামে পরিচিত। তার পূজা হয় প্রস্তরখন্ডে সিঁদুর মাখিয়ে। সাধারণত বাউড়ি, বগদি, হাঁড়ি, ডোম প্রভৃতি নিম্নবর্গের মানুষেরা ধর্মঠাকুরের পূজা করেন। এই বর্গের মানুষেরাই এক সময় সংখ্যাগুরু ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে তাদের অধিকার ছিলনা। গুপ্তযুগে ব্রাহ্মণরা দলে দলে আসতে শুরু করেন। কিন্তু যেহেতু তারা বাংলার আদি বাসিন্দা ছিলনা তাই ধর্মঠাকুরকেও ব্রাহ্মণ দেবতা বলা চলে না।
অষ্টম শতকে বাংলাদেশে চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার পরে গ্রাম সভা ও বিশিষ্ট নাগরিকরা সাধারণ একজনকে সট পদে বসিয়ে দিয়েছিলেন। যার নাম গোপাল। এই গোপাল নামের শেষাংশ ধরে রাখার প্রচেষ্টায় উত্তরাধিকারিরা সকলেই নামের শেষে গোপালের পাল অংশকে পদবি হিসাবে ব্যাবহার করতে থাকেন। এথেকেই ঐতিহাসিক পাল বংশের সূত্রপাত। মধ্যযুগে সুলতানী আমলে সেন বংশ সামন্তবাদী সমাজব্যাবস্থা ও পেশাগত কাজের সূত্র ধরে নামের সঙ্গে উপাধি বা উপনাম যুক্ত হওয়ার প্রচলন শুরু হয়। বল্লাম সেন শুধু সর্বজনবিদিত কৌলীন্য প্রথার সৃষ্টি করেননি তিনি বাঙালীদের জন্যপ্রচুর পদবি সৃষ্টি করেন।
শুধু কুলীন ব্রাহ্মণ বা কায়স্থ নয়, জাত সৃষ্টি করলেন ছত্রিশটি তার সাথে সৃষ্টি করলেন ছত্রিশটি পদবি। লক্ষ্মণ সেন বাঙালীর জাত ও পদবীর ' চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' এর ব্যাবস্থা করে দেন। বহিরাগত হয়ে তিনি পারতপক্ষে বাঙালীর সর্বনাশ করার ব্যাবস্থা করেন। ভাগবৎগীতায় নাকি আছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণবলেছেন, 'সবচেয়ে বেশী গুণ সম্পন্ন ব্যাক্তি হবে ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায় আর কম গুণ বা কোন গুণ নেই সে হবে শূদ্র সমপ্রদায় ভুক্ত। তাই সেখানে জাত বা পদবির কোন কথা নেই।
ব্রাহ্মণদের পদবী বলতে আমরা জানি বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, চক্রবর্তী, চট্টোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায় এই পদবিগুলোকে যত প্রাচীন বলে ভেবে থাকি, আদতে সেটা তানয়। বঙ্গদেশেও ব্রাহ্মণদের পদবিগুলো ছিল অন্য ধরনের, অন্য রকমের। বাঙালী রাঢ়ী ব্রাহ্মণদের আদি পদবি ছিল গুড়, হড়, মহান্তি, গড়গড়ি, কুলকুলী, মাসচটক, দিমসাই, সেয়ক, চৌতখন্ডি, পর্কটি ইত্যাদি অনেক রকম। রাজ্যে ব্রাহ্মণের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের বেশী। আমরা চারপাশে যে সংখ্যায় বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায় দেখা মেলে
সেই অনুপাতে রাঢ়ী পদবি অত দেখা যায়না। সুতরাং অনুমান করা যায় যে গাঞি পদবী অন্য পদবীর মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। গাঞি নামগুলো যে আদি পদবী তার কিছু কিছু প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়। যেমন কুশারী, সিমলাই, বটব্যাল, গড়গড়ি, পালধি, কাঞ্জিলাল, বাপুলী, পতিতুন্ডি ইত্যাদি। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে বাকচি, লাহিড়ী, মৈত্র, ভাদুড়ী, সান্যাল পদবি সুপরিচিত।
এছাড়া গাঞি পদবি আতর্থী, বিশী, ঝম্পটি ইত্যাদি গাঞি নাম যখন পদবি হিসাবে বহাল তবিয়তে আছে, তাহলে অনুমান করা যায় যে অন্যান্য আদি পদবিগুলি পরিচিত পদবিগুলোর মধ্যেই আশ্রয় নিয়েছে।
যারা টোলে পড়ায় এবং একটি বেদ পাঠ করেছেন তাদের বলা হয় পন্ডিত, সেই ভাবে দুটি বেদ পাঠে দ্বিবেদী, তিনটি বেদ পাঠে ত্রিবেদী চারটি বেদ পাঠে চতুর্বেদী। এগুলো সব উপাধি। বংশ পরম্পরায় এগুলোযে পদবি হয়ে গেল তার অর্থ কিন্তু এমন নয়যে, পুরুষানুক্রমে তারা সকলেই বেদ বিশারদ ছিলেন। উপাধ্যায় একটি উপাধি। আর্যাবর্ত থেকে ক্রমশ এই পদবিগুলো যতই পূর্ব ভারতে অগ্রসর হয়েছে ততই তা অপভ্রংশ হয়ে দেশজ রূপ পেয়েছে। বিহারে তাই পন্ডিত হয়ে গিয়েছে পান্ডে, দ্বিবেদী হয়েছে দুবে, ত্রিবেদী হয়েছে তিওয়ারি, চতুর্বেদী হয়েছে চৌবে। অন্যদিকে উপাধ্যায় হলেন ওঝা বা ঝা। রামায়ণ রচয়িতা কৃত্তীবাস ওঝা তার এক দৃষ্টান্ত। ঘোষ, বসু , মিত্র, দত্ত শব্দগুলো প্রাচীন হলেও পদবি হিসাবে এগুলোর কোন প্রাচীন ব্যাবহার খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ আমাদের এই নামের শেষে এই লেজুরের ব্যাবহার যথেষ্ট প্রাচীন নয়। দাশগুপ্ত, সেনগুপ্ত, দত্তগুপ্ত এই সব পদবি ইতিহাস বলে এই যুগ্ম পদবীর প্রচলন রীতিমত আধুনিক। অন্যদিকে নন্দী, কুন্ডু, পাল বা দাস জাতীয় কিছু পরিচিত পদবিকে ধরে নিই জাতি বিশেষের পদবি। কিন্তু আদপেই তা নয়। লেখক লোকেশ্বর বসু তাঁর 'আমাদের পদবির ইতিহাস' বইতে লিখেছেন, 'বাঙালী হিসাবে আমাদের যতই গর্ব থাক, হিমাচল প্রদেশে, হরিয়ানায়, পাঞ্জাবে বাঙালী একটি তপশিলি জাতি। অথচ তাদের চেহারা আর্যসদৃশ। তিনি লিখেছেন, 'অন্তজ জাতিগুলোর চরম দারিদ্র কেন, কেনই বা তারা শ্রমসাধ্য নিকৃষ্ট ধরণের কাজ করতে বাধ্য হয়েছিল , তার ব্যাখ্যা মিলবে মনুসংহিতায় ও অন্যান্য শাস্ত্রাদিতে, যার মতে চন্ডাল, চর্মকার ও রজকের মাতা ব্রাহ্মণ কন্যা এই প্রতিলোম বিবাহের অপরাধেই শৃদ্রকে এই শাস্তি দেওয়া হয়। প্রাক অর্থবান উন্নত শূদ্রেরও সামাজিক প্রতিষ্ঠা থাকায় ব্রাহ্মণ কন্যারা অন্য বর্ণে মাল্যদান করেছিল বর্ণ শিথিলতার সুযোগে। বৌদ্ধপরবর্তী যুগে বর্ণাশ্রমের প্রতাপ ফিরে আসায় সেই সব শূদ্রকে সমাজে নিম্ন স্থান দিয়ে এমন বৃত্তি নির্দেশ করে দেওয়া হয় যার ফলে চিরন্তন দারিদ্র তাদের চিরসঙ্গী হয়ে পরে, শিক্ষাদীক্ষা ও রুচি ইত্যাদির পতন ঘটে। অথচ এমন বহু পদবি আছে যেগুলো ব্রাহ্মণ, কায়স্থ উচ্চবর্ণের মধ্যে যেমন রয়েছে তেমনি তপশিলীভুক্ত জাতির মধ্যেও আছে আবার অন্যান্য বর্ণহিন্দু জাতির মধ্যেও সেগুলি প্রচলিত। নন্দী, কুন্ডু, পাল, দাস বিভিন্ন বর্ণহিন্দু জাতির মধ্যেই দেখা যায়। এগুলি এখন কায়স্থদের মধ্যেও প্রচলিত। নন্দী ব্রাহ্মণদের একটি আদি পদবি।
নীচে পদবীগুলোর সন্মন্ধে কিছু তথ্য দেওয়া গেল। মোটামুটি অধুনা যে পদবীগুলো আমাদের কাছে অতি পরিচিত তার বর্ণনা দিলাম।
বন্দ্যোপাধ্যায় : বন্দ্য + উপাধ্যায় = বন্দ্যোপাধ্যায়। বন্দ্যঘটি গ্রামের কুলীন ব্রাহ্মণরা প্রথম ব্যাচ শুরু করেছিলেন বন্দ্যোপাধ্যায় পদবীর।
মুখোপাধ্যায় : মুকুটি বা মুখুটি অঞ্চলের বসতির থেকে বিকশিত হয়েছে মুখোপাধ্যায় পদবি।
চট্টোপাধ্যায় : 'চাটু' গ্রাম থেকে ' চাটুতি', তার সঙ্গে উপাধ্যায় যোগে চট্টোপাধ্যায় পদবি।
গাঙ্গুলি বা গঙ্গোপাধ্যায় : 'গঙ্গাকুলি' নামক স্থানের সঙ্গে যুক্ত গাঙ্গৌলি থেকে গাঙ্গুলি পদবি পরে উপাধ্যায় যোগে গঙ্গোপাধ্যায়।
চক্রবর্তী : ইংরেজদের দেওয়া উপাধি যা পরে পদবি হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এটা আসলে ব্রাহ্মণদের উপাধি পদবি নয়।
চৌধুরী : চৌধুরী ছিল সামন্ত রাজার পদবি। এটা একচতুর্থাংশ রাজস্ব আদায়কারি, উচ্চারণ পরিবর্তনের মাধ্যমে এসেছে 'চৌধুরী। এই চৌথ আদায় বা রাজস্ব আদায়কারী পদ সৃষ্টি হয়েছিল বাংলার রাষ্ট্রব্যাবস্থায়।
অধিকারী : যাত্রা দলের অধিকারীর কথা আমরা জানি, এটি ব্রাহ্মণের পদবি।
কবিরাজ : পদবির নামেই বোঝা যায় এরা চিকিৎসাবিদ্যার সংগে যুক্তছিলেন বলে এমন উপাধি এবং পদবি।
কাঞ্জিলাল : 'গাঞি' নামক আদি পদবির অন্তর্ভুক্ত। ব্রাহ্মণ।
কুন্ডু : কুলীন বৈদ্য ছিলেন এই পদবিযুক্তরা।
গুহঠাকুরতা : বাঙালী হিন্দু কুলীন কায়স্থ। জমিদার বংশজাত পদবি।
খাসনবীশ : মূলত হিসাবরক্ষক হিসাবে পূর্বপুরুষরা জীবিকানির্বাহ করতেন এনারা।
গুপ্ত : 'গুপ্ত বংশের' প্রথম ব্যাক্তির উপাধি পরে পদবি হিসাবে ব্যবহৃত। এই পদবির লোকেরা এককালে বণিক ছিলেন।
গোস্বামী : শর্মা বা স্বামী পদবির বৈষ্ণবীয় রূপান্তর হয়ে গোস্বামী পদবী।
বসু : বিশ্ববসু বা পৃথ্বীবসু থেকেই বসু পদবীর উৎপত্তি।
ঘোষ : বর্ণভেদ প্রথায় এই পদবির অধিকারীর কুলীন কায়স্থ ও গোয়ালা ঘোষ দুটি ভাগে বিভক্ত তবে অন্যমতে ঘোষক থেকে ঘোষ পদবি এসেছে।
ঘোষাল : ঘোশ বা ঘোশাল নামক গ্রাম থেকে এ পদবির জন্ম।
ভুঁইয়া, ভৌমিক: এই বংশ পদবিটি এসেছে খোদ ভূমির মালিকানা থেকে। কুলীন বংশ পদবিই ছিল তা।
ভাদুড়ী : 'বাদড়' গ্রাম থেকে ভাদুড়ী বংশ পদবির জন্ম হয়েছিল।
মজুমদার: রাষ্ট্রের ও জমিদারের দলিল পত্রাদির রক্ষক রাজকর্মচারীর জন্যে এই পদবি সংরক্ষিত ছিল।
মল্লিক : ভূম্যাধিকারী বা জোতদারের উপাধি। গ্রাম প্রধান বা সমাজের প্রধান ব্যাক্তি মালিক তা থেকে মল্লিক পদবি।
সামন্ত : যারা ভূমিদান পেতেন সেইসব রাজকর্মচারীর উপাধি পরে পদবি।
-----------------------------
সংগ্রাহক ঃ দীপক পাল
Comments
Post a Comment